নির্বাচন কেবলমাত্র ভোট গ্রহণের একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, আস্থা এবং ভবিষ্যৎ পথচলার পরীক্ষা। গণতন্ত্রের প্রাণ হলো ভোটাধিকার, আর সেই ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ যদি নিরাপদ না হয়, তবে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায়। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ যে শান্ত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ প্রত্যক্ষ করেছে, তা নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক সময়ের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এই অধ্যায়ের নেপথ্যে যে শক্তি নীরবে, সংযতভাবে এবং দৃঢ় হাতে নিরাপত্তার বলয় রচনা করেছে, তারা হলো আমাদের গর্বিত সশস্ত্র বাহিনী—বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী।
নির্বাচনকে ঘিরে আমাদের জাতীয় স্মৃতিতে রয়েছে অস্থিরতার বহু দৃশ্য—কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, মারামারি, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও। নির্বাচন মানেই যেন উত্তেজনা, শঙ্কা, অনিশ্চয়তা—এমন একটি ধারণা বহু বছর ধরে আমাদের সমাজে গেঁথে ছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচন সেই ধারণাকে অন্তত একটি দিনের জন্য হলেও চ্যালেঞ্জ করেছে। ভোটকেন্দ্রের ভেতর-বাইরে শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ, ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং দিনব্যাপী শান্ত অবস্থা—এসবের পেছনে ছিল এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী নিরাপত্তা ছায়া। সেই ছায়া ছিল সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি, যাদের কাঁধে গত দেড় বছর ধরেই নানা দায়িত্বের ভার ছিল, আর তার ওপর যোগ হয়েছিল নির্বাচন নিরাপত্তার অতিরিক্ত চাপ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় নির্বাচন একটি “হাই-রিস্ক ইভেন্ট”—এমন একটি সময়, যখন রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা সক্ষমতা কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। ‘স্টেট ক্যাপাসিটি’ বা রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখানে নির্ধারণ করে দেয়, জনগণ তাদের অধিকার প্রয়োগে কতটা নিশ্চিন্ত থাকবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাস্তবতায় দেখা যায়, যখন বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা কাঠামো চাপে থাকে বা জনআস্থার সংকটে ভোগে, তখন সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়ক শক্তি হিসেবে এগিয়ে আসতে হয়। এই সহায়তা নিয়ন্ত্রণমূলক নয়; বরং এটি স্থিতিশীলতা রক্ষার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। এবারের নির্বাচনেও আমরা সেই সহায়ক শক্তির একটি পরিণত রূপ দেখেছি।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বশেষ নির্বাচনটি এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হলো। এটি কেবল ভোটের ফলাফলের প্রতিফলন নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক আস্থা এবং আইনশৃঙ্খলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক নজিরবিহীন উদাহরণ। এবারের নির্বাচনের ভেতর দিয়ে আমরা দেখেছি যে কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রশাসনিক সংস্থা এককভাবে এটি বাস্তবায়ন করতে পারত না। বরং এই সফলতার পেছনে যে ভূমিকা ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও দৃঢ়, তা হল বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী—যারা মানবিক ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করেছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস প্রায়শই দেখিয়েছে যে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জনজীবন ভয়াবহভাবে বিপন্ন হয়। পুলিশ ও প্রশাসনিক সংস্থা প্রায়শই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে জনগণের আস্থা হারায়। সেই সময়, স্বেচ্ছাচারী কার্যক্রম, জনমতের অবমাননা এবং সহিংসতা দেশে একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে ওঠে। কিন্তু ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর জুলাই বিপ্লবের মতো এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনার পর, দেশের সামনে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়।
একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসে—যার নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক দল নেই, এবং পুলিশ ও প্রশাসনের অনেক অংশ কার্যত অচল। এই ফাঁক পূরণ করে সেনাবাহিনী দেড় বছর রাতদিন কঠোর পরিশ্রম করে দেশের আইনশৃঙ্খলা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। তারা শুধু রাষ্ট্রের “রক্ষাকারী” হিসেবে নয়, বরং মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে জরুরি সহায়তা প্রদান করেছেন। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, বা ত্রাণ কার্যক্রম—যেখানে সাধারণ মানুষ সহায়তার জন্য অপেক্ষা করছিল—সেনাবাহিনী দ্রুত পৌঁছে সাহায্য করেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে প্রশাসনের উপস্থিতি ছিল না, তারা খাদ্য, পানি, ও চিকিৎসা পৌঁছে জনগণের জীবন রক্ষা করেছে।
গত দেড় বছর দেশের নানা সংকটময় মুহূর্তে সশস্ত্র বাহিনী মাঠে ছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অবকাঠামোগত সহায়তা, সংকট ব্যবস্থাপনা—সবখানেই তাদের উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। দীর্ঘ সময় ধরে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা কোনো বাহিনীর জন্য সহজ কাজ নয়। শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি মানসিক চাপও থাকে সমান তীব্র। পরিবার থেকে দূরে থাকা, অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কাজ করা, জনমতের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকা—এসবই একজন সৈনিকের প্রতিদিনের বাস্তবতা। এর ওপর যখন জাতীয় নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর দায়িত্ব অর্পিত হয়, তখন সেই চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। তবু আমরা দেখেছি, সেই অতিরিক্ত চাপের ভার বহন করেও তারা শৃঙ্খলা ও ধৈর্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
এবার নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী কেবল একটি নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে কাজ করেনি, বরং মানবিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রশাসক হিসেবে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। দেশের কোনো অংশে নিরাপত্তাহীনতা, ভোটচুরি, কেন্দ্র দখল, মারামারি, বা ব্যালট বাক্স ছিনতাই—যা অতীতের নির্বাচনে প্রায়শই ঘটত—একটিও ঘটেনি। এর পেছনে সশস্ত্র বাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা, দায়িত্ববোধ, পেশাদারিত্ব এবং দৃঢ় নৈতিকতা ছিল মূল চালিকা শক্তি। তারা শুধু কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি, বরং নির্বাচনী কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের প্রতিটি ধাপ সুসংহত করেছেন।
ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় পুলিশের অনেক কর্মকর্তার অপরাধ, রাজনৈতিক দমন এবং জনমতের প্রতি সহিংস আচরণ—যেমন নিরপরাধ মানুষের হত্যা, থানায় আগুন দেওয়া, এবং জনসাধারণের ভিডিও প্রকাশ—জনগণের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই অভিজ্ঞতার কারণে, পুলিশের অনেকেই এবারের নির্বাচনে কার্যকর ভূমিকা নিতে সাহস পাননি। ফলে, নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব এককভাবে সেনাবাহিনীর কাঁধে আসে। তারা নির্বাচনী কেন্দ্রে শুধু স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নয়, বরং কেন্দ্রের ভেতরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে রেখে নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও অবাধ করেছেন।
এবার নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীকে কেবল স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; তাদেরকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাও প্রদান করা হয়েছিল। এর ফলে তারা প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়েছে। একটি সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলাকারী গোষ্ঠী জানে, কেবল প্রতিরোধ নয়, প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে রয়েছে। ফলে সহিংসতার আগ্রহ অনেকাংশেই স্তিমিত হয়ে যায়।
নির্বাচনের দিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আমরা যে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছি, তা ছিল কঠোর পরিশ্রমের এক নিরবচ্ছিন্ন কাহিনি। গ্রাম থেকে শহর, দুর্গম অঞ্চল থেকে মহানগর—প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক দৃষ্টিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। অনেক স্থানে তারা কেন্দ্রের ভেতর পর্যন্ত প্রবেশ করে দায়িত্ব পালন করেছেন, যাতে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন থাকে। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা, টহল দেওয়া, গরমে-ধুলায় নিরলস কাজ করা—এসবের মধ্যে কোনো অভিযোগের সুর শোনা যায়নি। বরং তাদের আচরণে ছিল সংযম, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর।
এই নির্বাচনকে ঘিরে যে আশঙ্কা ছিল, তা অমূলক ছিল না। রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামাজিক বিভাজন, পূর্ব অভিজ্ঞতার স্মৃতি—সব মিলিয়ে অনেকেই শঙ্কিত ছিলেন। এমন প্রেক্ষাপটে সশস্ত্র বাহিনীর দৃঢ় উপস্থিতি ভোটারদের মনে এক ধরনের মানসিক নিরাপত্তা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে নারী ভোটার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তাবোধের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন একজন সাধারণ মানুষ জানেন যে ভোটকেন্দ্রে কোনো ধরনের সন্ত্রাস, ভয়ভীতি বা বলপ্রয়োগের সুযোগ নেই, তখন তিনি নির্ভয়ে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। এবারের নির্বাচনে সেই নির্ভয় পরিবেশ নিশ্চিত হয়েছে।
কিছু সমালোচনাও রয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে নানা বিতর্ক রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা কাঠামোকেই শক্তিশালী করা উচিত। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে পুলিশ ও প্রশাসনই হবে প্রথম সারির নিরাপত্তা ভরসা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করলে রাষ্ট্রকে তার সব প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে হয়। এবারের নির্বাচন সেই সমন্বয়ের একটি বাস্তব উদাহরণ। এখানে সশস্ত্র বাহিনী কোনো রাজনৈতিক শক্তির পক্ষ নয়; তারা রাষ্ট্রের পক্ষে, সংবিধানের পক্ষে, শৃঙ্খলার পক্ষে দাঁড়িয়েছে।
একজন সৈনিকও একজন মানুষের সন্তান, কারও স্বামী, কারও পিতা। নির্বাচনের দিন যখন দেশের মানুষ উৎসবের আমেজে ভোট দিতে গেছে, তখন অসংখ্য সৈনিক তাদের পরিবারের সান্নিধ্য থেকে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল ভোটকেন্দ্রের প্রহরায়। দিনের পর দিন প্রস্তুতি, মহড়া, ব্রিফিং—সবকিছুর পরে সেই একদিনের দায়িত্ব যেন ছিল এক পরীক্ষার মুহূর্ত। সেই পরীক্ষায় তারা উত্তীর্ণ হয়েছে বলেই আজ আমরা একটি সহিংসতামুক্ত নির্বাচনের কথা বলতে পারছি।
এছাড়াও, তাদের সংযত আচরণও প্রশংসনীয়। ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা তা বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। কোথাও অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের অভিযোগ শোনা যায়নি; বরং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। একটি শক্তিশালী বাহিনীর প্রকৃত শক্তি কেবল তার অস্ত্রে নয়, তার সংযমে। এবারের নির্বাচনে আমরা সেই সংযমের শক্তিই দেখেছি।
ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষাও স্পষ্ট। নির্বাচন নিরাপত্তায় সশস্ত্র বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয় যে বেসামরিক কাঠামোকেও সমানভাবে শক্তিশালী করতে হবে। পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সশস্ত্র বাহিনী সবসময়ই সহায়ক শক্তি হিসেবে প্রস্তুত থাকবে, কিন্তু একটি সুসংহত গণতন্ত্রের ভিত্তি হবে শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও আস্থাভাজন বেসামরিক প্রতিষ্ঠান।
এবারের নির্বাচন আমাদের দেখিয়েছে—শক্তি ও সংযম যখন একসঙ্গে কাজ করে, তখনই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্ষমতা প্রয়োগের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সংযম থাকা একটি বড় শক্তি। সশস্ত্র বাহিনী সেই সংযমের পরিচয় দিয়েছে। তারা ছিল দৃশ্যমান, কিন্তু প্রাধান্য বিস্তারকারী নয়; কঠোর, কিন্তু অযথা আক্রমণাত্মক নয়। এই ভারসাম্যই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখার জন্য প্রয়োজনীয়।
আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি—ভোটকেন্দ্রে কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষের খবর নেই, ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের অভিযোগ নেই, কেন্দ্র দখলের নাটকীয় দৃশ্য নেই। এই অনুপস্থিতিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। কারণ নিরাপত্তার সার্থকতা তখনই, যখন বিপর্যয় ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা যায়। এবারের নির্বাচন সেই প্রতিরোধমূলক সাফল্যের একটি বাস্তব উদাহরণ।
রাষ্ট্রের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা ভবিষ্যতের মানদণ্ড নির্ধারণ করে। এবারের শান্তিপূর্ণ নির্বাচন তেমন একটি মুহূর্ত হতে পারে, যদি আমরা এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করি। সশস্ত্র বাহিনীর এই বলিষ্ঠ ভূমিকা প্রমাণ করেছে, সঠিক সমন্বয়, স্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন এবং প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতা থাকলে একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়াকেও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, নিরাপদ নির্বাচনের নেপথ্যে সশস্ত্র বাহিনীর বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল এক নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রহরার কাহিনি। তারা শিরোনামে আসার জন্য কাজ করেনি; তারা কাজ করেছে দায়িত্ববোধ থেকে। তাদের সেই দায়িত্ববোধই গণতন্ত্রকে স্বস্তির নিঃশ্বাস দিতে সাহায্য করেছে। সীমান্তের প্রহরী যখন ভোটকেন্দ্রের প্রহরায় দাঁড়ায়, তখন সে কেবল নিরাপত্তা দেয় না; জাতির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতেরও প্রহরা দেয়।
নির্বাচনের দিনগুলোতে সেনাবাহিনী যে আন্তরিকতা প্রদর্শন করেছে তা কেবল পেশাগত দায়িত্বের কারণে নয়, বরং দেশ ও জনগণের প্রতি তাদের অন্তর্ভুক্ত হৃদয় এবং নাগরিক দায়বদ্ধতার ফল। তারা ভোটগ্রহণের প্রতিটি ধাপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করেছে, যাতে জনগণ ভয়মুক্তভাবে ভোট দিতে পারে। তাদের এই নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা দেশের গণতন্ত্রকে সুসংহত করেছে এবং নির্বাচনী স্থিতিশীলতার প্রতি জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় করেছে।
সশস্ত্র বাহিনী প্রমাণ করেছে যে তারা শুধু দেশের রক্ষাকর্তা নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব, শান্তি এবং গণতন্ত্রের একটি স্থায়ী অঙ্গ—যার উপর দেশ নির্ভর করতে পারে। তাদের দায়িত্বশীল ও সংযত ভূমিকা ভবিষ্যতেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট




