• ই-পেপার

ট্রাম্পের চিঠি শুভেচ্ছা না কৌশল

ট্যাগ:ট্রাম্প

নিরাপদ নির্বাচনের নেপথ্যে সশস্ত্র বাহিনীর বলিষ্ঠ ভূমিকা

ড. মো. মিজানুর রহমান
নিরাপদ নির্বাচনের নেপথ্যে সশস্ত্র বাহিনীর বলিষ্ঠ ভূমিকা
সংগৃহীত ছবি

নির্বাচন কেবলমাত্র ভোট গ্রহণের একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, আস্থা এবং ভবিষ্যৎ পথচলার পরীক্ষা। গণতন্ত্রের প্রাণ হলো ভোটাধিকার, আর সেই ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ যদি নিরাপদ না হয়, তবে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায়। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ যে শান্ত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ প্রত্যক্ষ করেছে, তা নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক সময়ের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এই অধ্যায়ের নেপথ্যে যে শক্তি নীরবে, সংযতভাবে এবং দৃঢ় হাতে নিরাপত্তার বলয় রচনা করেছে, তারা হলো আমাদের গর্বিত সশস্ত্র বাহিনী—বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী।

নির্বাচনকে ঘিরে আমাদের জাতীয় স্মৃতিতে রয়েছে অস্থিরতার বহু দৃশ্য—কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, মারামারি, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও। নির্বাচন মানেই যেন উত্তেজনা, শঙ্কা, অনিশ্চয়তা—এমন একটি ধারণা বহু বছর ধরে আমাদের সমাজে গেঁথে ছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচন সেই ধারণাকে অন্তত একটি দিনের জন্য হলেও চ্যালেঞ্জ করেছে। ভোটকেন্দ্রের ভেতর-বাইরে শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ, ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং দিনব্যাপী শান্ত অবস্থা—এসবের পেছনে ছিল এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী নিরাপত্তা ছায়া। সেই ছায়া ছিল সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি, যাদের কাঁধে গত দেড় বছর ধরেই নানা দায়িত্বের ভার ছিল, আর তার ওপর যোগ হয়েছিল নির্বাচন নিরাপত্তার অতিরিক্ত চাপ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় নির্বাচন একটি “হাই-রিস্ক ইভেন্ট”—এমন একটি সময়, যখন রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা সক্ষমতা কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। ‘স্টেট ক্যাপাসিটি’ বা রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখানে নির্ধারণ করে দেয়, জনগণ তাদের অধিকার প্রয়োগে কতটা নিশ্চিন্ত থাকবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাস্তবতায় দেখা যায়, যখন বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা কাঠামো চাপে থাকে বা জনআস্থার সংকটে ভোগে, তখন সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়ক শক্তি হিসেবে এগিয়ে আসতে হয়। এই সহায়তা নিয়ন্ত্রণমূলক নয়; বরং এটি স্থিতিশীলতা রক্ষার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। এবারের নির্বাচনেও আমরা সেই সহায়ক শক্তির একটি পরিণত রূপ দেখেছি।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বশেষ নির্বাচনটি এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হলো। এটি কেবল ভোটের ফলাফলের প্রতিফলন নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক আস্থা এবং আইনশৃঙ্খলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক নজিরবিহীন উদাহরণ। এবারের নির্বাচনের ভেতর দিয়ে আমরা দেখেছি যে কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রশাসনিক সংস্থা এককভাবে এটি বাস্তবায়ন করতে পারত না। বরং এই সফলতার পেছনে যে ভূমিকা ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও দৃঢ়, তা হল বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী—যারা মানবিক ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করেছেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস প্রায়শই দেখিয়েছে যে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জনজীবন ভয়াবহভাবে বিপন্ন হয়। পুলিশ ও প্রশাসনিক সংস্থা প্রায়শই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে জনগণের আস্থা হারায়। সেই সময়, স্বেচ্ছাচারী কার্যক্রম, জনমতের অবমাননা এবং সহিংসতা দেশে একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে ওঠে। কিন্তু ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর জুলাই বিপ্লবের মতো এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনার পর, দেশের সামনে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়।

একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসে—যার নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক দল নেই, এবং পুলিশ ও প্রশাসনের অনেক অংশ কার্যত অচল। এই ফাঁক পূরণ করে সেনাবাহিনী দেড় বছর রাতদিন কঠোর পরিশ্রম করে দেশের আইনশৃঙ্খলা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। তারা শুধু রাষ্ট্রের “রক্ষাকারী” হিসেবে নয়, বরং মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে জরুরি সহায়তা প্রদান করেছেন। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, বা ত্রাণ কার্যক্রম—যেখানে সাধারণ মানুষ সহায়তার জন্য অপেক্ষা করছিল—সেনাবাহিনী দ্রুত পৌঁছে সাহায্য করেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে প্রশাসনের উপস্থিতি ছিল না, তারা খাদ্য, পানি, ও চিকিৎসা পৌঁছে জনগণের জীবন রক্ষা করেছে।

গত দেড় বছর দেশের নানা সংকটময় মুহূর্তে সশস্ত্র বাহিনী মাঠে ছিল। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অবকাঠামোগত সহায়তা, সংকট ব্যবস্থাপনা—সবখানেই তাদের উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। দীর্ঘ সময় ধরে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা কোনো বাহিনীর জন্য সহজ কাজ নয়। শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি মানসিক চাপও থাকে সমান তীব্র। পরিবার থেকে দূরে থাকা, অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে কাজ করা, জনমতের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকা—এসবই একজন সৈনিকের প্রতিদিনের বাস্তবতা। এর ওপর যখন জাতীয় নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর দায়িত্ব অর্পিত হয়, তখন সেই চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। তবু আমরা দেখেছি, সেই অতিরিক্ত চাপের ভার বহন করেও তারা শৃঙ্খলা ও ধৈর্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

এবার নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী কেবল একটি নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে কাজ করেনি, বরং মানবিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রশাসক হিসেবে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। দেশের কোনো অংশে নিরাপত্তাহীনতা, ভোটচুরি, কেন্দ্র দখল, মারামারি, বা ব্যালট বাক্স ছিনতাই—যা অতীতের নির্বাচনে প্রায়শই ঘটত—একটিও ঘটেনি। এর পেছনে সশস্ত্র বাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা, দায়িত্ববোধ, পেশাদারিত্ব এবং দৃঢ় নৈতিকতা ছিল মূল চালিকা শক্তি। তারা শুধু কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি, বরং নির্বাচনী কেন্দ্রে ভোটগ্রহণের প্রতিটি ধাপ সুসংহত করেছেন।

ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় পুলিশের অনেক কর্মকর্তার অপরাধ, রাজনৈতিক দমন এবং জনমতের প্রতি সহিংস আচরণ—যেমন নিরপরাধ মানুষের হত্যা, থানায় আগুন দেওয়া, এবং জনসাধারণের ভিডিও প্রকাশ—জনগণের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই অভিজ্ঞতার কারণে, পুলিশের অনেকেই এবারের নির্বাচনে কার্যকর ভূমিকা নিতে সাহস পাননি। ফলে, নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব এককভাবে সেনাবাহিনীর কাঁধে আসে। তারা নির্বাচনী কেন্দ্রে শুধু স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নয়, বরং কেন্দ্রের ভেতরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে রেখে নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও অবাধ করেছেন।

এবার নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীকে কেবল স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; তাদেরকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাও প্রদান করা হয়েছিল। এর ফলে তারা প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়েছে। একটি সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলাকারী গোষ্ঠী জানে, কেবল প্রতিরোধ নয়, প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে রয়েছে। ফলে সহিংসতার আগ্রহ অনেকাংশেই স্তিমিত হয়ে যায়।

নির্বাচনের দিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আমরা যে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছি, তা ছিল কঠোর পরিশ্রমের এক নিরবচ্ছিন্ন কাহিনি। গ্রাম থেকে শহর, দুর্গম অঞ্চল থেকে মহানগর—প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক দৃষ্টিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। অনেক স্থানে তারা কেন্দ্রের ভেতর পর্যন্ত প্রবেশ করে দায়িত্ব পালন করেছেন, যাতে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন থাকে। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা, টহল দেওয়া, গরমে-ধুলায় নিরলস কাজ করা—এসবের মধ্যে কোনো অভিযোগের সুর শোনা যায়নি। বরং তাদের আচরণে ছিল সংযম, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর।

এই নির্বাচনকে ঘিরে যে আশঙ্কা ছিল, তা অমূলক ছিল না। রাজনৈতিক উত্তেজনা, সামাজিক বিভাজন, পূর্ব অভিজ্ঞতার স্মৃতি—সব মিলিয়ে অনেকেই শঙ্কিত ছিলেন। এমন প্রেক্ষাপটে সশস্ত্র বাহিনীর দৃঢ় উপস্থিতি ভোটারদের মনে এক ধরনের মানসিক নিরাপত্তা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে নারী ভোটার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তাবোধের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন একজন সাধারণ মানুষ জানেন যে ভোটকেন্দ্রে কোনো ধরনের সন্ত্রাস, ভয়ভীতি বা বলপ্রয়োগের সুযোগ নেই, তখন তিনি নির্ভয়ে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। এবারের নির্বাচনে সেই নির্ভয় পরিবেশ নিশ্চিত হয়েছে।

কিছু সমালোচনাও রয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে নানা বিতর্ক রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা কাঠামোকেই শক্তিশালী করা উচিত। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে পুলিশ ও প্রশাসনই হবে প্রথম সারির নিরাপত্তা ভরসা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করলে রাষ্ট্রকে তার সব প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে হয়। এবারের নির্বাচন সেই সমন্বয়ের একটি বাস্তব উদাহরণ। এখানে সশস্ত্র বাহিনী কোনো রাজনৈতিক শক্তির পক্ষ নয়; তারা রাষ্ট্রের পক্ষে, সংবিধানের পক্ষে, শৃঙ্খলার পক্ষে দাঁড়িয়েছে।

একজন সৈনিকও একজন মানুষের সন্তান, কারও স্বামী, কারও পিতা। নির্বাচনের দিন যখন দেশের মানুষ উৎসবের আমেজে ভোট দিতে গেছে, তখন অসংখ্য সৈনিক তাদের পরিবারের সান্নিধ্য থেকে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল ভোটকেন্দ্রের প্রহরায়। দিনের পর দিন প্রস্তুতি, মহড়া, ব্রিফিং—সবকিছুর পরে সেই একদিনের দায়িত্ব যেন ছিল এক পরীক্ষার মুহূর্ত। সেই পরীক্ষায় তারা উত্তীর্ণ হয়েছে বলেই আজ আমরা একটি সহিংসতামুক্ত নির্বাচনের কথা বলতে পারছি।

এছাড়াও, তাদের সংযত আচরণও প্রশংসনীয়। ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা তা বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। কোথাও অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের অভিযোগ শোনা যায়নি; বরং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। একটি শক্তিশালী বাহিনীর প্রকৃত শক্তি কেবল তার অস্ত্রে নয়, তার সংযমে। এবারের নির্বাচনে আমরা সেই সংযমের শক্তিই দেখেছি।

ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষাও স্পষ্ট। নির্বাচন নিরাপত্তায় সশস্ত্র বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয় যে বেসামরিক কাঠামোকেও সমানভাবে শক্তিশালী করতে হবে। পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সশস্ত্র বাহিনী সবসময়ই সহায়ক শক্তি হিসেবে প্রস্তুত থাকবে, কিন্তু একটি সুসংহত গণতন্ত্রের ভিত্তি হবে শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও আস্থাভাজন বেসামরিক প্রতিষ্ঠান।

এবারের নির্বাচন আমাদের দেখিয়েছে—শক্তি ও সংযম যখন একসঙ্গে কাজ করে, তখনই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্ষমতা প্রয়োগের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সংযম থাকা একটি বড় শক্তি। সশস্ত্র বাহিনী সেই সংযমের পরিচয় দিয়েছে। তারা ছিল দৃশ্যমান, কিন্তু প্রাধান্য বিস্তারকারী নয়; কঠোর, কিন্তু অযথা আক্রমণাত্মক নয়। এই ভারসাম্যই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখার জন্য প্রয়োজনীয়।

আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি—ভোটকেন্দ্রে কোনো বড় ধরনের সংঘর্ষের খবর নেই, ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের অভিযোগ নেই, কেন্দ্র দখলের নাটকীয় দৃশ্য নেই। এই অনুপস্থিতিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। কারণ নিরাপত্তার সার্থকতা তখনই, যখন বিপর্যয় ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা যায়। এবারের নির্বাচন সেই প্রতিরোধমূলক সাফল্যের একটি বাস্তব উদাহরণ।

রাষ্ট্রের ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা ভবিষ্যতের মানদণ্ড নির্ধারণ করে। এবারের শান্তিপূর্ণ নির্বাচন তেমন একটি মুহূর্ত হতে পারে, যদি আমরা এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করি। সশস্ত্র বাহিনীর এই বলিষ্ঠ ভূমিকা প্রমাণ করেছে, সঠিক সমন্বয়, স্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন এবং প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতা থাকলে একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়াকেও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।

সবশেষে বলা যায়, নিরাপদ নির্বাচনের নেপথ্যে সশস্ত্র বাহিনীর বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল এক নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রহরার কাহিনি। তারা শিরোনামে আসার জন্য কাজ করেনি; তারা কাজ করেছে দায়িত্ববোধ থেকে। তাদের সেই দায়িত্ববোধই গণতন্ত্রকে স্বস্তির নিঃশ্বাস দিতে সাহায্য করেছে। সীমান্তের প্রহরী যখন ভোটকেন্দ্রের প্রহরায় দাঁড়ায়, তখন সে কেবল নিরাপত্তা দেয় না; জাতির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতেরও প্রহরা দেয়।

নির্বাচনের দিনগুলোতে সেনাবাহিনী যে আন্তরিকতা প্রদর্শন করেছে তা কেবল পেশাগত দায়িত্বের কারণে নয়, বরং দেশ ও জনগণের প্রতি তাদের অন্তর্ভুক্ত হৃদয় এবং নাগরিক দায়বদ্ধতার ফল। তারা ভোটগ্রহণের প্রতিটি ধাপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করেছে, যাতে জনগণ ভয়মুক্তভাবে ভোট দিতে পারে। তাদের এই নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা দেশের গণতন্ত্রকে সুসংহত করেছে এবং নির্বাচনী স্থিতিশীলতার প্রতি জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় করেছে।

সশস্ত্র বাহিনী প্রমাণ করেছে যে তারা শুধু দেশের রক্ষাকর্তা নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব, শান্তি এবং গণতন্ত্রের একটি স্থায়ী অঙ্গ—যার উপর দেশ নির্ভর করতে পারে। তাদের দায়িত্বশীল ও সংযত ভূমিকা ভবিষ্যতেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

নির্বাচনে সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রশংসনীয়

আব্দুল্লাহ আল মামুন
নির্বাচনে সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রশংসনীয়
সংগৃহীত ছবি

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জনগণের আস্থা, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপক্বতার প্রতিফলন। একটি নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে—তা নির্ভর করে প্রশাসনিক দক্ষতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণের ওপর। সাম্প্রতিক নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ও পেশাদার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাদের উপস্থিতি নির্বাচনী পরিবেশে স্থিতিশীলতা ও আস্থা জোরদার করেছে—এ কথা অনস্বীকার্য।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন অনেক সময়ই উত্তেজনা, সংঘাত বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করে। ভোটকেন্দ্র দখল, সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন কিংবা নাশকতার শঙ্কা—এসব বিষয় সাধারণ ভোটারের মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এমন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ ও সংযত উপস্থিতি ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ জাগিয়ে তোলে। বিশেষত দুর্গম বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তাদের টহল ও অবস্থান ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে নির্বিঘ্ন রাখতে সহায়ক হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পেশাদারি। সেনাবাহিনী সরাসরি নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনা না করলেও সিভিল প্রশাসনকে সহায়তা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের সমন্বিত ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তারা সংযম, শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষতার পরিচয় দিয়েছে—যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পক্ষপাতের অভিযোগ ছাড়া, কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করাই ছিল তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।

নির্বাচনী পরিবেশে আস্থা একটি মৌলিক উপাদান। ভোটার যদি নিরাপদ বোধ না করেন, তবে অংশগ্রহণ কমে যায়; আর অংশগ্রহণ কমলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বহু ক্ষেত্রে সেই আস্থার ঘাটতি পূরণ করেছে। গ্রামাঞ্চল থেকে শহর—সর্বত্র তাদের টহল ও প্রস্তুতি সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে  যে, ‘রাষ্ট্র পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেষ্ট।’

এটি মনে রাখা জরুরি যে, নির্বাচন কমিশনই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একমাত্র সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ। সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল সহায়ক ও সমর্থনমূলক। এই সহায়ক ভূমিকার সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে সিভিল প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর। সাম্প্রতিক নির্বাচনে সে সমন্বয় সন্তোষজনক ছিল বলেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। প্রশাসন, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার সক্ষমতা সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার প্রমাণ।

তবে প্রশংসার পাশাপাশি একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিও প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক কাঠামোয় বেসামরিক কর্তৃত্বের অধীনেই সব নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া উচিত। সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা যেন সর্বদা নির্দিষ্ট সময় ও দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে—এটি নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী বেসামরিক প্রতিষ্ঠানই গণতন্ত্রের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে। সেনাবাহিনীর ভূমিকা তখনই প্রশংসনীয় হয়, যখন তা পেশাদারি ও সাংবিধানিক সীমারেখার মধ্যে থেকে পরিচালিত হয়—যা সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় প্রতিফলিত হয়েছে।

নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা। ভোটারদের স্বাধীনভাবে কেন্দ্রে যাওয়া, ভোট দেওয়া এবং ফলাফল মেনে নেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা—এসব ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা বাহিনীর সংযত আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্ব পালনের সময় অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ এড়িয়ে চলা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ধৈর্য প্রদর্শন করা একটি পরিপক্ব বাহিনীর বৈশিষ্ট্য। এই দিক থেকেও সেনাবাহিনীর ভূমিকা ইতিবাচক বলে বিবেচিত হচ্ছে।

ভবিষ্যতের জন্য এখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও তথ্যভিত্তিক করা যেতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আগে থেকেই চিহ্নিত করে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া গেলে সেনা ও অন্যান্য বাহিনীর ওপর চাপ কমবে এবং কার্যকারিতা বাড়বে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা ও সমর্থকদের সংযত আচরণে উদ্বুদ্ধ করা।

সবশেষে বলা যায়, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল ভোটগ্রহণের দিনে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া, যার প্রতিটি ধাপে আস্থা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি। সেই প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাদের পেশাদারি ও নিরপেক্ষতা নির্বাচনী পরিবেশকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত থাকে জনগণের অংশগ্রহণ ও আস্থায়। সেই আস্থা অটুট রাখতে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হয়। সাম্প্রতিক নির্বাচনে সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা সেই সমন্বিত প্রচেষ্টার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত—যা ভবিষ্যতের নির্বাচন ব্যবস্থাপনাতেও প্রেরণা জোগাবে।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

অনুরাগ ও বিরাগের ঊর্ধ্বে থাকুক নতুন সরকার

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
অনুরাগ ও বিরাগের ঊর্ধ্বে থাকুক নতুন সরকার
ফাইল ছবি

রাজনীতিবিদরা যদি সত্য বলেন, তাহলে বোধ হয় রাজনীতিতে সফল হতে পারেন না। পবিত্র ধর্মগ্রন্থাদি- কোরআন, গীতা বা বাইবেল স্পর্শ করে ‘যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বৈ মিথ্যা বলিব না’ উচ্চারণ করেও যে সমাজে অবলীলায় মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হয়, প্রকৃত দোষী নির্দোষ সাব্যস্ত হয়ে বেকসুর খালাস পায়, সে সমাজে রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে সদাচারের আশা দুরাশা মাত্র। দেশে যাঁরা প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন, তাঁদের শপথ উচ্চারণে ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করার বাধ্যবাধকতা নেই। তাঁদের শপথ পাঠ করতে হয় দেশের সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। তাঁরা যা উচ্চারণ করেন, তার মুখ্য বক্তব্য হচ্ছে : ‘আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সবার প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।’ যাঁরা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চপদে নিয়োগ লাভ করেন, তাঁদেরও কমবেশি একই ধরনের শব্দমালা উচ্চারণ করে শপথ গ্রহণ করতে হয়।

দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, শপথ গ্রহণকারী কেউ কেউ তাঁদের শপথকে কেবল এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতা বিবেচনা করেন এবং দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁরা যে ধরনের কার্যকলাপে নিয়োজিত হন, তার সঙ্গে তাঁদের শপথের কোনো সামঞ্জস্য থাকে না। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রায় দুই দশক পর সরকার গঠনের সুযোগ লাভ করেছে। প্রধানমন্ত্রী এবং অন্য মন্ত্রীরা ইতোমধ্যে শপথ গ্রহণ করে তাঁদের সরকারি দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সাফল্যে সাড়ে ১৫ বছর জাতির কাঁধে চেপে থাকা একটি ফ্যাসিবাদী শাসক গোষ্ঠীর পতন না হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো ২০২৯ সালে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সফলতাই সেই নির্বাচনকে তিন বছর এগিয়ে আনতে প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আন্দোলনে বিজয়ীরা দেশের ছোটবড় সব রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণয়ন করেছিল ‘জুলাই সনদ’ এবং ভবিষ্যতে কোনো সরকার যাতে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচসহ ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ জারি করা হয়েছিল।

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুজাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে জুলাই সনদ আদেশের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারদের রায় জানার জন্য গণভোটেরও ব্যবস্থা ছিল। গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে ভোটারদের বিপুল সম্মতি পাওয়া গেছে। কিন্তু দেশবাসী বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে যে ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করলেও বিএনপির সদস্যরা তাঁদের দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের’ শপথ পাঠ এড়িয়ে গেছেন। সাংবাদিকরা এ সম্পর্কে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কাছে জানতে চাইলে তাঁরা কোনো দ্বিধা না করেই বলেছেন যে ‘বিদ্যমান সংবিধানে এ ধরনের সংবিধান সংস্কারের জন্য শপথ নেওয়ার কোনো উল্লেখ নেই। তাঁরা শপথ নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের শপথের বৈধতা নিয়ে আইনগত চ্যালেঞ্জ করা হতে পারে।’ তাদের কেউ কেউ বলেছেন, ‘সংবিধান সংস্কারের জন্য গণভোটে রাজি না হলে নির্বাচন দিত না, তাই রাজি হওয়া।’ বাংলায় একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে : কাজের বেলায় কাজি, কাজ ফুরালেই পাজি,’ যার সরল অর্থ হচ্ছে : ‘স্বার্থ হাসিলের আগে নানাভাবে খাতির-তোয়াজ করা, আর স্বার্থসিদ্ধি হয়ে গেলে আসল মূর্তি ধারণ করা।’ সংবিধানে কী আছে, আর কী নেই, তা শপথ গ্রহণ করার দিনেই তাদের মাথায় এসেছে, তা বিশ্বাস করা কঠিন। 

বিএনপি সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিশ্চিত করে সংবিধান ইচ্ছামতো কাটাছেঁড়া করার সুযোগ পেয়েছে। আওয়ামী লীগও ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চারটি সংসদে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে তাদের মর্জিমাফিক বহু আন্দোলনের পর সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত তত্ত্বাধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছিল, সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত করেছিল এবং সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ ২৫ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছিল। শেখ হাসিনার সরকারের এই সংবিধান সংশোধনীগুলোর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তাঁর ক্ষমতাকে নির্বিঘ্ন, স্থায়ী ও নিরঙ্কুশ করা। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার অর্থ জনমতকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক অসততা প্রদর্শন করা নয়। কিন্তু রাজনীতিবিদরা কবে কখন সততা প্রদর্শন করেছে এবং তাদের শপথের প্রতি সশ্রদ্ধ থেকেছে? আওয়ামী লীগ যে কখনো জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল না, তা তারা ১৯৭৩ সালে সংসদীয় সংবিধানের অধীনে নির্বাচনে সংসদীয় সরকাব্যবস্থার পক্ষে জনগণের ম্যান্ডেটের সঙ্গে প্রতারণা করে ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছে। শেখ হাসিনা সেই পথে হেঁটেছেন, যার ফলাফল তাঁর জন্য এবং দেশ ও জাতির জন্য শুভ হয়নি। বিএনপি দেশকে বাকশাল থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরিয়ে এনেছে এবং ক্ষমতায় থাকাকালে কখনো আওয়ামী ধাঁচের স্বৈরাচারী আচরণ করেনি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত বিএনপি তারেক রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামীসুলভ আচরণ করে তাদের ওপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতি অশ্রদ্ধা পোষণ করবে, এমন আশা করা যায় না। যেহেতু জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ওপর তাৎক্ষণিক গণভোট অনুষ্ঠানের প্রতি বিএনপির আস্থা ছিল না, তারা আগেই তাদের যুক্তি কার্যকারণসহ জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারত। তাহলে একদিকে তাদের রাজনৈতিক সততা ও সংবিধানের প্রতি বিএনপির অকুণ্ঠ আনুগত্য প্রমাণিত হতো এবং দেশের সর্ববৃহৎ দল হিসেবে বিএনপির জনপ্রিয়তা প্রশ্নের সম্মুখীন হতো বলে আমার মনে হয় না।

বিএনপির বর্তমান অবস্থানে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সফল রাজনীতিবিদ হওয়ার জন্য সম্ভবত এটাই জরুরি যে মনের ভিতর যা আছে তা প্রকাশ না করা এবং উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যাওয়ামাত্র নতুন সুরে কথা বলা। আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনে ব্যালটে বাক্স বোঝাই করেছিল নির্বাচনের আগের রাতেই। এটা কি তারা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে করেছিল? দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনার ফল ছিল তাদের ‘নিশিরাতের ভোট’। বিএনপির জুলাই সনদ বাস্তবায়নে শপথ গ্রহণ না করাও তাদের পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ছিল। তারা জনগণকে বিভ্রান্তির মধ্যে রেখে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ ও সরকার গঠন করে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের কৌশলে সফল হয়েছে।

রাজনীতি জটিল এক শাস্ত্র এবং রাজনীতিবিদরা সেই শাস্ত্রের অধ্যক্ষ ও মহাধ্যক্ষ। সাধারণ মানুষের কাজ ভোট দেওয়া এবং ‘তাদের দ্বারা নির্বাচিত’ শাসকদের দ্বারা শাসিত হওয়া। আমরা ধরেই নিতে পারি, ঘুরেফিরে দেশে পুরোনো রাজনীতিরই চর্চা হবে। সময়ের সঙ্গে দেশে কিছু উন্নয়ন হবে এবং উন্নয়নের সুফল ভোগ করবে হাতে গোনা কিছু মানুষ। ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নয়ন ও বিনিয়োগে ছিটেফোঁটা ভাগ পড়লে তা তাদের জন্য পরম সৌভাগ্যের হবে। পাকিস্তান আমল থেকে বাংলাদেশের জনগণ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে, গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা চেয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরে তারা কেবল শাসিতই হয়েছে, কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র পায়নি। পাকিস্তানি আমলের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ সময় পার করার পরও যদি ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ প্রতিষ্ঠার জন্য দাবি জানাতে হয়, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াইয়ে হাজারো তরুণকে জীবন দিতে হয়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখের আর কোনো কিছু হতে পারে না।

বিএনপি চেয়ারম্যান দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার নির্বাচিত অধিকারী তিনি তাঁর পরিবারের তৃতীয় ব্যক্তি, যিনি তাঁর বাবা-মার মতোই জনপ্রিয়। জনগণ তাঁর প্রতি যে ভালোবাসা প্রদর্শন করেছে, তা কেবল বাংলাদেশে নয়, বহু দেশের ইতিহাসেও বিরল। একটি অপশক্তিকে বিদায় করে বাংলাদেশের জনগণ তাঁর প্রতি দৃঢ় আস্থা স্থাপন করেছে এবং তারা আশাবাদী যে তিনি তাদের আস্থার মূল্য দেবেন।  তারা বিশ্বাস করে যে তিনি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন, যা পরবর্তী সময়ে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তাদের জন্য অনুকরণীয় হবে। এজন্য তিনি তাঁর পারিষদবর্গের পরামর্শ অবশ্যই গ্রহণ করবেন, সেজন্য তো রয়েছে তাঁর মন্ত্রিপরিষদ ও উপদেষ্টামণ্ডলী। তা সত্ত্বেও একজন সুশাসক হওয়ার জন্য রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণের স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে তাঁর চিন্তাপ্রসূত বিচক্ষণতা প্রদর্শন করতে হবে। নৈতিক গুণাবলির বিকাশও রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর জন্য জরুরি, যা জনগণকে তাঁর প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ করে এবং দুর্যোগ মুহূর্তে তাঁর পাশে দাঁড়ায়।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক ও অনুবাদক

কেন অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডের শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত

অদিতি করিম
কেন অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডের শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত
ড. ইউনূস। ফাইল ছবি

যেকোনো সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। একটি সরকার যেভাবেই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করুক না কেন, তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। কারণ জনগণই প্রজাতন্ত্রের মালিক। নির্বাচিত সরকারের জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। সংসদীয় পদ্ধতির সরকারে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় সরকার। সংসদ হয় জবাবদিহির জায়গা। সংসদে বিরোধী দল এবং স্বাধীন গণমাধ্যম সরকারের সব কার্যক্রম নজরে রাখে। যখন সরকার কোনো জনবিরোধী কাজ করে তখন বিরোধী দল সংসদে কিংবা সংসদের বাইরে সেটা তুলে ধরে। গণমাধ্যম সহজেই নির্বাচিত সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরতে পারে। এভাবেই একটি নির্বাচিত সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।

কিন্তু অনির্বাচিত সরকারের ক্ষেত্রে জবাবদিহির সুযোগ থাকে না। অনির্বাচিত সরকারের সময় সংসদ থাকে না, কিংবা থাকলেও সেখানে বিরোধী দল থাকে প্রায় অস্তিত্বহীন। সংসদের বাইরে বিরোধী দলের কণ্ঠ রোধ করে রাখা হয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করা হয়। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তী সরকার ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। একটি গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল। তাই এ সরকার জনগণের নির্বাচিত ছিল না বটে, কিন্তু তারা জোর করেও ক্ষমতা দখল করেনি। তারা জবরদখলকারী সরকার হিসেবে বিবেচিত হবে না। বরং জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী ড. ইউনূসের অন্তর্র্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল। আরও সহজ করে বললে, জনগণের আকাঙ্ক্ষার ফসল ছিল বিদায়ি অন্তর্র্বর্তী সরকার। তাই অন্য অনির্বাচিত সরকারের চেয়ে এই সরকার সম্পূর্ণ আলাদা। অনির্বাচিত সরকারগুলো যেমন জবাবদিহির তোয়াক্কা করে না, কিংবা জবাবদিহি করতে অপছন্দ করে, এ সরকারের বেলায় তেমনটি হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। জনগণই সরকারকে যেহেতু ক্ষমতায় বসিয়েছে, কাজেই ড. ইউনূস সরকারের জনগণের কাছে জবাবদিহির নৈতিক বাধ্যবাধকতা ছিল।

কিন্তু ১৮ মাসে অন্তর্র্বর্তী সরকারের অনেক কার্যক্রম, চুক্তি এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কিন্তু সরকার এসব অভিযোগ আমলে নেয়নি। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো জবাবদিহিও ছিল না গত ১৮ মাস। ড. ইউনূস সরকার জন আন্দোলনের ফসল হলেও এ সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পেত গণমাধ্যম। সরকারের সমালোচনা করলেই নানানরকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হতো। সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এসব সমালোচনার জবাব দেওয়া হয়নি অন্তর্র্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে। নাগরিক সমাজ এক বছর পর সরকারের বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্তের সমালোচনা শুরু করেছিল বটে, কিন্তু সদ্য বিদায়ি অন্তর্র্বর্তী সরকারের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল সব সমালোচনা উপেক্ষা করা। সরকার সুশীল সমাজের সমালোচনাগুলোর কোনো জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।

ফলে ১৮ মাস মেয়াদি অন্তর্র্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ থাকলেও তার কতটুকু সত্য আর কতটা মিথ্যা, তা যাচাই করা প্রয়োজন। দেশের স্বার্থে এটা জরুরি। কারণ তারা জনগণের করের টাকায় বেতন ও বিভিন্ন সুযোগসুবিধা নিয়েছে। তাদের কাজের মূল্যায়ন জনগণের স্বার্থে দরকার। প্রধান উপদেষ্টাসহ একাধিক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সুযোগসুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ কতটা সত্য তা যাচাই করা দরকার। ড. ইউনূস তাঁর এবং তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য কর মওকুফসহ নানান সুযোগসুবিধা নিয়েছেন। তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা উচিত। গত ১৮ মাসে একাধিক উপদেষ্টা এবং তাঁদের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অন্তত ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে বলে জানা গেছে। এঁদের মধ্যে তিনজন সাবেক উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগগুলোর তদন্ত থমকে আছে। এসব দুর্নীতির তদন্ত দ্রুত জনস্বার্থে শেষ করা উচিত। এ ধরনের অভিযোগ জিইয়ে রেখে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হওয়া যাবে না। এ ছাড়া বিদায়ি সরকারের অনেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। একজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তিনি পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সম্পদ দেখভাল করছেন এবং সেসব বিক্রি করতে সহায়তা করেছেন। স্বচ্ছতার স্বার্থে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা উচিত। কারণ অন্তর্র্বর্তী সরকারে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা সবাই সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁদের জন্য এবং সুশীল সমাজ সম্পর্কে জনগণের মূল্যায়ন নির্মোহ রাখার জন্য একটি তদন্ত করা প্রয়োজন।

অন্তর্র্বর্তী সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পাদন করেছে তাদের মেয়াদে। এসব চুক্তি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। অন্তর্র্বর্তী সরকার বিদেশের সঙ্গে যেসব জানা-অজানা চুক্তি করেছে, সেগুলো খতিয়ে দেখতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে সেসব সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটা যাচাই করা দরকার। এমনকি প্রয়োজনে বাদ দেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি। অনেকেই কয়েকটি চুক্তি দেশের স্বার্থবিরোধী বলেও মন্তব্য করেছেন। অন্তর্র্বর্তী সরকারের এ ধরনের চুক্তি করার এখতিয়ার আছে কি না তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে।

এসব তদন্ত ড. ইউনূস কিংবা তাঁর সুশীল উপদেষ্টাদের চরিত্রহননের জন্য নয়, বরং দেশের স্বার্থে করা দরকার। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত আবারও নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে এনেছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১৪তম) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। অন্তর্র্বর্তী সরকারও একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলেই গঠিত হয়েছিল। তাই অন্তর্র্বর্তী সরকারের ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং ত্রুটিবিচ্যুতি থেকে আগামীর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপকাঠামো তৈরি করা যায়। ড. ইউনূস সরকার কোন কোন ক্ষেত্রে ভুল করেছে, সীমা অতিক্রম করেছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। যেন আগামীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সময় এসব বিষয়ে নজর দেওয়া যায়।

আমাদের দেশে এখন থেকে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব পালন করবে। তাই ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তী সরকার আমলের একটি নির্মোহ ময়নাতদন্ত হওয়া উচিত। এটি শুধু বিদায়ি সরকারের জবাবদিহির বিষয় নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সীমারেখা সুনির্দিষ্ট করার জন্যও জরুরি। আগামীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে যেন সীমা লঙ্ঘন করতে না পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে যেন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ না ওঠে, সেজন্য একটি রূপরেখা প্রণয়ন করার জন্য ইউনূস সরকারের ওপর কমিশন গঠন করা উচিত। অন্তর্র্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কর্মকাণ্ড তদন্ত হলে ড. ইউনূস এবং তাঁর উপদেষ্টাদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।