• ই-পেপার

নিরাপদ নির্বাচনের নেপথ্যে সশস্ত্র বাহিনীর বলিষ্ঠ ভূমিকা

ট্রাম্পের চিঠি শুভেচ্ছা না কৌশল

জিল্লুর রহমান
ট্রাম্পের চিঠি শুভেচ্ছা না কৌশল

বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তার এই সময়টিকে একক কোনো ঘটনার ভিতরে বন্দি করা যায় না। বরং কয়েকটি আলাদা রেখা-কূটনীতি, বৈশ্বিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক আচরণ এবং সংস্কৃতির মানবিক ভিত্তি-একসঙ্গে এসে একটি বড় চিত্র তৈরি করছে। এই সপ্তাহে চারটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখা গেলেও, গভীরে গেলে বোঝা যায়-এগুলো একই গল্পের চারটি অধ্যায়।

১. ট্রাম্পের চিঠি : শুভেচ্ছা না কৌশল?
বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাঠানো চিঠি নিছক প্রোটোকল ছিল, এমন ভাবলে ভুল হবে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো চিঠি কখনোই শুধু শুভেচ্ছা নয়; প্রতিটি শব্দের ভিতরে থাকে অগ্রাধিকার, প্রত্যাশা, কখনো চাপ, কখনো সম্ভাবনা।

চিঠিতে ট্রাম্প বাণিজ্য সম্পর্কের গতি বজায় রাখার কথা বলেছেন, পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন-বিশেষ করে এমন চুক্তি যা বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে উচ্চমানের মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ দেবে। এই দুটি বিষয়, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা, একসঙ্গে উল্লেখ হওয়া কূটনীতির ভাষায় একটি স্পষ্ট বার্তা : অর্থনীতি ও নিরাপত্তা এখন একই ফ্রেমে।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী? প্রথমত যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে শুধু গার্মেন্টনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে দেখছে না; বরং ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে-চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র-সবাই নতুন করে অবস্থান নিচ্ছে। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের প্রতি একটি ‘ওপেনিং’ তৈরি হয়েছে-যা সুযোগও, আবার পরীক্ষাও।

বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গত এক দশকে দুই দেশের সম্পর্ক কখনো উষ্ণ, কখনো দূরত্বপূর্ণ ছিল। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের এই দ্রুত প্রতিক্রিয়া বোঝায়, বাংলাদেশকে তারা আবারও গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চায়।

এখানে একটু হাসির কথা বলা যায়। কূটনীতিতে ‘বন্ধুত্ব’ শব্দটি অনেকটা বাংলার আত্মীয়তার মতো-দূরের মামা হঠাৎ খুব খোঁজ নেয়, কারণ সামনে হয়তো কোনো দরকার আছে। রাষ্ট্রনীতিও প্রায় সেই রকম।

কূটনীতির ভাষা সব সময় নরম, কিন্তু তার ভিতরে শক্ত বাস্তবতা লুকিয়ে থাকে। কিন্তু এটাও সত্য, এই চিঠি নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি শক্তিশালী সংকেত।

২. বিশ্ব সম্পর্কের নতুন অধ্যায় : সম্ভাবনার দরজা
নতুন সরকার গঠনের পর বিভিন্ন দেশের নেতারা অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ‘পারস্পরিক নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির’ ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সপরিবার সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

বিশ্বনেতাদের অভিনন্দনবার্তা সাধারণত প্রোটোকলের অংশ। কিন্তু এবার লক্ষ্য করা গেছে, অভিনন্দনের পাশাপাশি দ্রুত দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগের ইঙ্গিত এসেছে। ভারত সফরের আমন্ত্রণ, ইউরোপীয় দেশগুলোর ইতিবাচক বার্তা, মধ্যপ্রাচ্যের আগ্রহ-সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশকে ঘিরে নতুন কূটনৈতিক গতি তৈরি হচ্ছে। এই প্রতিক্রিয়াগুলো দেখলে বোঝা যায়, বাংলাদেশ এখন ‘রিসেট মোমেন্টে’ আছে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন : ‘ব্যালান্সিং’। কারণ বিশ্ব রাজনীতি এখন ব্লকের রাজনীতি, কিন্তু বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে ভারসাম্যের রাজনীতি করেছে। বিশ্ব রাজনীতিতে এখন তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ : ১. ভূরাজনীতি ২. সরবরাহ শৃঙ্খল (supply chain) এবং ৩. প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা। বাংলাদেশ যদি এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য করতে পারে, তবে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক হবে বহুস্তরীয়- শুধু দাতা-গ্রহীতা সম্পর্ক নয়, বরং অংশীদারত্ব।

ভারতের আমন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। দিল্লি সব সময় ঢাকার রাজনৈতিক পরিবর্তনকে সতর্ক দৃষ্টিতে দেখে। নতুন সরকারকে দ্রুত আমন্ত্রণ মানে সম্পর্কের উষ্ণতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। একই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয়তা দেখায়-বাংলাদেশ এখন শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনীতি, শ্রমবাজার, সামুদ্রিক অবস্থান, রোহিঙ্গা সংকট-সব মিলিয়ে দেশটি এখন ‘কৌশলগত রাষ্ট্র’। এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো, কোনো পক্ষের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা না দেখিয়ে বহুমাত্রিক সম্পর্ক বজায় রাখা।

এখানে একটি সাহিত্যিক উপমা মনে পড়ে, রবীন্দ্রনাথের ‘পথের শেষ কোথায়’ প্রশ্ন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটা একই : আমরা কি শুধু পথ চলব, নাকি পথ নির্ধারণ করব? বিশ্ব নেতাদের অভিনন্দন তাই শুধু সৌজন্য নয়; এটি একটি সুযোগ, বাংলাদেশ নিজেকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার।

কূটনীতি আসলে রাজনীতির সম্প্রসারিত সংস্করণ। ভিতরের স্থিতিশীলতা ছাড়া বাইরের সম্পর্ক শক্ত হয় না। ফলে প্রথম আলোচনার বিষয়, ট্রাম্পের চিঠি, এখানেই এসে দ্বিতীয় আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

৩. ছোট আচরণ, বড় বার্তা : নেতৃত্বের রাজনৈতিক নৈতিকতা
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের কিছু প্রতীকী আচরণ আলোচনায় এসেছে-সরকারি বিলাসী গাড়ি ব্যবহার না করা, ব্যক্তিগত গাড়িতে চলা, নিয়মিত ট্রাফিক মেনে চলা।

রাজনীতিতে প্রতীক খুব শক্তিশালী। ইতিহাসে বহু সময় দেখা গেছে, একটি ছোট আচরণ মানুষের আস্থা তৈরি করে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন মানুষের অভিযোগ ছিল ক্ষমতা মানেই দূরত্ব। তাই যখন মানুষ দেখে প্রধানমন্ত্রী ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়ান-এটি শুধু একটি ছবি নয়, একটি রাজনৈতিক বার্তা।

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন : এটি কি ধারাবাহিক হবে? বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু ভালো হওয়া নতুন নয়; ধারাবাহিকতা বিরল। এই সরকার যদি আচরণগত সংস্কারকে প্রশাসনিক সংস্কারে রূপ দিতে পারে, তখনই পরিবর্তন বাস্তব হবে।

হাস্যরসের ভাষায় বলা যায়-বাংলাদেশের রাজনীতি অনেকটা নতুন বছরের জিম মেম্বারশিপের মতো। শুরুতে সবাই নিয়মিত যায়, পরে কার্ডটাই থাকে, মানুষ থাকে না। নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা সেখানেই। এই আচরণগুলো যদি নীতি, স্বচ্ছতা ও প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে সেটিই হবে প্রকৃত ‘নতুন রাজনীতি’।

এখানে আরেকটি মাত্রা আছে। বিশ্ব যখন নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে, তখন এই ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ইতিবাচক বার্তা দেয়-সরকার সাদামাটা, দায়িত্বশীল এবং জনগণের কাছে থাকতে চায়।

কূটনীতি ও আচরণ আসলে আলাদা নয়। একজন নেতার ব্যক্তিগত আচরণ কখনো কখনো রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করে। বাংলা সাহিত্যে বারবার এসেছে-ক্ষমতা মানুষকে দূরে নিয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাসে যাঁরা স্থায়ী হয়েছেন, তাঁরা দূরত্ব কমিয়েছেন।

৪. ফরিদুর রেজা সাগর: মানুষ, প্রতিষ্ঠান, আস্থা
রাজনীতি, কূটনীতি, রাষ্ট্র-সবশেষে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ এবং সংস্কৃতির ওপর। গতকাল ছিল ফরিদুর রেজা সাগরের জন্মদিন। বাংলাদেশের টেলিভিশন ও সংস্কৃতি জগতে তাঁর অবদান আলাদা করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হয় না। চ্যানেল আই এবং ইমপ্রেস টেলেফিল্মের কর্ণধার। ব্যক্তিগতভাবে আমার টেলিভিশন জীবনের সঙ্গে তাঁর নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

টেলিভিশন শুধু একটি মাধ্যম নয়; এটি আস্থা ও স্বাধীনতার জায়গা। আমার অনুষ্ঠান তৃতীয় মাত্রা দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলতে পেরেছে, এর পেছনে যে মানুষটির নীরব অবদান সবচেয়ে বড়, তিনি সাগর ভাই। তৃতীয় মাত্রার দীর্ঘ পথচলায় তিনি শুধু প্রতিষ্ঠানের প্রধান নন, তিনি আস্থার জায়গা। স্বাধীনতা দিয়েছেন, সৃজনশীল ঝুঁকি নিতে উৎসাহ দিয়েছেন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-মানুষ হিসেবে পাশে থেকেছেন। ২৩ বছরের বেশি সময়, আট হাজারের বেশি পর্ব-সংখ্যা দিয়ে এই যাত্রা বোঝানো যায়, কিন্তু এর ভিতরের সম্পর্ক সংখ্যার বাইরে।

একজন সম্পাদক, উদ্যোক্তা বা সাংস্কৃতিক সংগঠক অনেকেই হন। কিন্তু যিনি মানুষকে স্বাধীনতা দেন, তিনি বিরল। তিনি সেই বিরল মানুষের একজন। বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিশু সাহিত্য-সব জায়গায় তাঁর প্রভাব আছে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষকে বিশ্বাস করা।

আমি প্রায়ই বলি-কারও জীবনে যদি সাগর ভাই থাকেন, তবে তাঁর আলাদা করে বন্ধু, ভাই বা অভিভাবকের দরকার হয় না। এই বাক্য শুধু আবেগ নয়; এটি তাঁর ব্যক্তিত্বের সারাংশ। বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন যাঁরা আলোয় থাকেন না, কিন্তু আলো তৈরি করেন। ফরিদুর রেজা সাগর সেই ধরনের মানুষ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় আমরা নেতৃত্ব নিয়ে কথা বলি; কিন্তু সংস্কৃতির নেতৃত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনীতি সমাজকে চালায়, সংস্কৃতি সমাজকে বাঁচায়। রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে এই প্রসঙ্গ কেন যুক্ত? কারণ সংস্কৃতি ছাড়া রাষ্ট্রের আত্মা থাকে না। এবং রাজনীতি যদি মানবিক না হয়, তাহলে তা টেকসই হয় না।

চারটি প্রসঙ্গ, এক বাস্তবতা
এই চারটি বিষয় আলাদা মনে হলেও আসলে একই গল্পের অংশ। ট্রাম্পের চিঠি দেখায়-বিশ্ব বাংলাদেশকে নতুনভাবে দেখছে। বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া দেখায়-সম্পর্কের নতুন দরজা খুলছে। প্রধানমন্ত্রীর আচরণ দেখায়-নেতৃত্বের প্রতীকী পরিবর্তন সম্ভব। আর ফরিদুর রেজা সাগরের মতো মানুষ মনে করিয়ে দেন-প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে আস্থা ও স্বাধীনতায়।

রাষ্ট্র, কূটনীতি, নেতৃত্ব ও সংস্কৃতি-এই চারটি স্তম্ভ একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। একটিতে দুর্বলতা অন্যটিকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশ এখন সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে ‘ইমেজ’ ও ‘বাস্তবতা’ একসঙ্গে তৈরি হচ্ছে।

শেষ কথা
বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় প্রায়ই শুরু হয়, কিন্তু সব অধ্যায় সমান গুরুত্বপূর্ণ হয় না। এই মুহূর্তটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, তিনটি জিনিস একসঙ্গে ঘটছে  : নেতৃত্বের পরিবর্তন, বৈশ্বিক আগ্রহ এবং মানুষের প্রত্যাশা।

চিঠি আসবে, অভিনন্দন আসবে, প্রতীকী ছবি আসবে-এগুলো প্রয়োজনীয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতিহাস লিখবে ধারাবাহিকতা, নীতি ও প্রতিষ্ঠান। রাজনীতির ভাষায় বলা যায়-ক্ষমতা পাওয়া ঘটনা, আস্থা পাওয়া প্রক্রিয়া। আর ব্যক্তিগতভাবে আমি জানি-যেমন একটি অনুষ্ঠান দীর্ঘদিন চলতে পারে শুধু স্বাধীনতা ও আস্থার কারণে, তেমনি একটি রাষ্ট্রও এগোয় সেই একই নীতিতে।

বাংলাদেশের সামনে সুযোগ আছে। চ্যালেঞ্জও আছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আমরা কি এই সুযোগকে নীতিতে রূপ দিতে পারব? সময় উত্তর দেবে। কিন্তু ইতিহাস অপেক্ষা করছে।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

নির্বাচনে সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রশংসনীয়

আব্দুল্লাহ আল মামুন
নির্বাচনে সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রশংসনীয়
সংগৃহীত ছবি

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জনগণের আস্থা, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিপক্বতার প্রতিফলন। একটি নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে—তা নির্ভর করে প্রশাসনিক দক্ষতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণের ওপর। সাম্প্রতিক নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ও পেশাদার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাদের উপস্থিতি নির্বাচনী পরিবেশে স্থিতিশীলতা ও আস্থা জোরদার করেছে—এ কথা অনস্বীকার্য।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন অনেক সময়ই উত্তেজনা, সংঘাত বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করে। ভোটকেন্দ্র দখল, সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন কিংবা নাশকতার শঙ্কা—এসব বিষয় সাধারণ ভোটারের মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এমন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ ও সংযত উপস্থিতি ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ জাগিয়ে তোলে। বিশেষত দুর্গম বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তাদের টহল ও অবস্থান ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে নির্বিঘ্ন রাখতে সহায়ক হয়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পেশাদারি। সেনাবাহিনী সরাসরি নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনা না করলেও সিভিল প্রশাসনকে সহায়তা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের সমন্বিত ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তারা সংযম, শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষতার পরিচয় দিয়েছে—যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পক্ষপাতের অভিযোগ ছাড়া, কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করাই ছিল তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।

নির্বাচনী পরিবেশে আস্থা একটি মৌলিক উপাদান। ভোটার যদি নিরাপদ বোধ না করেন, তবে অংশগ্রহণ কমে যায়; আর অংশগ্রহণ কমলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বহু ক্ষেত্রে সেই আস্থার ঘাটতি পূরণ করেছে। গ্রামাঞ্চল থেকে শহর—সর্বত্র তাদের টহল ও প্রস্তুতি সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে  যে, ‘রাষ্ট্র পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেষ্ট।’

এটি মনে রাখা জরুরি যে, নির্বাচন কমিশনই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একমাত্র সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ। সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল সহায়ক ও সমর্থনমূলক। এই সহায়ক ভূমিকার সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে সিভিল প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর। সাম্প্রতিক নির্বাচনে সে সমন্বয় সন্তোষজনক ছিল বলেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। প্রশাসন, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার সক্ষমতা সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার প্রমাণ।

তবে প্রশংসার পাশাপাশি একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিও প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক কাঠামোয় বেসামরিক কর্তৃত্বের অধীনেই সব নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া উচিত। সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা যেন সর্বদা নির্দিষ্ট সময় ও দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে—এটি নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী বেসামরিক প্রতিষ্ঠানই গণতন্ত্রের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে। সেনাবাহিনীর ভূমিকা তখনই প্রশংসনীয় হয়, যখন তা পেশাদারি ও সাংবিধানিক সীমারেখার মধ্যে থেকে পরিচালিত হয়—যা সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় প্রতিফলিত হয়েছে।

নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা। ভোটারদের স্বাধীনভাবে কেন্দ্রে যাওয়া, ভোট দেওয়া এবং ফলাফল মেনে নেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করা—এসব ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা বাহিনীর সংযত আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্ব পালনের সময় অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগ এড়িয়ে চলা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ধৈর্য প্রদর্শন করা একটি পরিপক্ব বাহিনীর বৈশিষ্ট্য। এই দিক থেকেও সেনাবাহিনীর ভূমিকা ইতিবাচক বলে বিবেচিত হচ্ছে।

ভবিষ্যতের জন্য এখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও তথ্যভিত্তিক করা যেতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আগে থেকেই চিহ্নিত করে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া গেলে সেনা ও অন্যান্য বাহিনীর ওপর চাপ কমবে এবং কার্যকারিতা বাড়বে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা ও সমর্থকদের সংযত আচরণে উদ্বুদ্ধ করা।

সবশেষে বলা যায়, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল ভোটগ্রহণের দিনে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া, যার প্রতিটি ধাপে আস্থা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি। সেই প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাদের পেশাদারি ও নিরপেক্ষতা নির্বাচনী পরিবেশকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত থাকে জনগণের অংশগ্রহণ ও আস্থায়। সেই আস্থা অটুট রাখতে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হয়। সাম্প্রতিক নির্বাচনে সেনাবাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা সেই সমন্বিত প্রচেষ্টার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত—যা ভবিষ্যতের নির্বাচন ব্যবস্থাপনাতেও প্রেরণা জোগাবে।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

অনুরাগ ও বিরাগের ঊর্ধ্বে থাকুক নতুন সরকার

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
অনুরাগ ও বিরাগের ঊর্ধ্বে থাকুক নতুন সরকার
ফাইল ছবি

রাজনীতিবিদরা যদি সত্য বলেন, তাহলে বোধ হয় রাজনীতিতে সফল হতে পারেন না। পবিত্র ধর্মগ্রন্থাদি- কোরআন, গীতা বা বাইবেল স্পর্শ করে ‘যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বৈ মিথ্যা বলিব না’ উচ্চারণ করেও যে সমাজে অবলীলায় মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা প্রতিষ্ঠিত সত্যে পরিণত হয়, প্রকৃত দোষী নির্দোষ সাব্যস্ত হয়ে বেকসুর খালাস পায়, সে সমাজে রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে সদাচারের আশা দুরাশা মাত্র। দেশে যাঁরা প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন, তাঁদের শপথ উচ্চারণে ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করার বাধ্যবাধকতা নেই। তাঁদের শপথ পাঠ করতে হয় দেশের সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। তাঁরা যা উচ্চারণ করেন, তার মুখ্য বক্তব্য হচ্ছে : ‘আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সবার প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।’ যাঁরা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চপদে নিয়োগ লাভ করেন, তাঁদেরও কমবেশি একই ধরনের শব্দমালা উচ্চারণ করে শপথ গ্রহণ করতে হয়।

দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, শপথ গ্রহণকারী কেউ কেউ তাঁদের শপথকে কেবল এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতা বিবেচনা করেন এবং দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁরা যে ধরনের কার্যকলাপে নিয়োজিত হন, তার সঙ্গে তাঁদের শপথের কোনো সামঞ্জস্য থাকে না। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রায় দুই দশক পর সরকার গঠনের সুযোগ লাভ করেছে। প্রধানমন্ত্রী এবং অন্য মন্ত্রীরা ইতোমধ্যে শপথ গ্রহণ করে তাঁদের সরকারি দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সাফল্যে সাড়ে ১৫ বছর জাতির কাঁধে চেপে থাকা একটি ফ্যাসিবাদী শাসক গোষ্ঠীর পতন না হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো ২০২৯ সালে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সফলতাই সেই নির্বাচনকে তিন বছর এগিয়ে আনতে প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আন্দোলনে বিজয়ীরা দেশের ছোটবড় সব রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণয়ন করেছিল ‘জুলাই সনদ’ এবং ভবিষ্যতে কোনো সরকার যাতে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচসহ ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’ জারি করা হয়েছিল।

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুজাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে জুলাই সনদ আদেশের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটারদের রায় জানার জন্য গণভোটেরও ব্যবস্থা ছিল। গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে ভোটারদের বিপুল সম্মতি পাওয়া গেছে। কিন্তু দেশবাসী বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে যে ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করলেও বিএনপির সদস্যরা তাঁদের দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের’ শপথ পাঠ এড়িয়ে গেছেন। সাংবাদিকরা এ সম্পর্কে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কাছে জানতে চাইলে তাঁরা কোনো দ্বিধা না করেই বলেছেন যে ‘বিদ্যমান সংবিধানে এ ধরনের সংবিধান সংস্কারের জন্য শপথ নেওয়ার কোনো উল্লেখ নেই। তাঁরা শপথ নিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের শপথের বৈধতা নিয়ে আইনগত চ্যালেঞ্জ করা হতে পারে।’ তাদের কেউ কেউ বলেছেন, ‘সংবিধান সংস্কারের জন্য গণভোটে রাজি না হলে নির্বাচন দিত না, তাই রাজি হওয়া।’ বাংলায় একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে : কাজের বেলায় কাজি, কাজ ফুরালেই পাজি,’ যার সরল অর্থ হচ্ছে : ‘স্বার্থ হাসিলের আগে নানাভাবে খাতির-তোয়াজ করা, আর স্বার্থসিদ্ধি হয়ে গেলে আসল মূর্তি ধারণ করা।’ সংবিধানে কী আছে, আর কী নেই, তা শপথ গ্রহণ করার দিনেই তাদের মাথায় এসেছে, তা বিশ্বাস করা কঠিন। 

বিএনপি সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিশ্চিত করে সংবিধান ইচ্ছামতো কাটাছেঁড়া করার সুযোগ পেয়েছে। আওয়ামী লীগও ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চারটি সংসদে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে তাদের মর্জিমাফিক বহু আন্দোলনের পর সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত তত্ত্বাধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছিল, সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত করেছিল এবং সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ ২৫ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছিল। শেখ হাসিনার সরকারের এই সংবিধান সংশোধনীগুলোর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তাঁর ক্ষমতাকে নির্বিঘ্ন, স্থায়ী ও নিরঙ্কুশ করা। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার অর্থ জনমতকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক অসততা প্রদর্শন করা নয়। কিন্তু রাজনীতিবিদরা কবে কখন সততা প্রদর্শন করেছে এবং তাদের শপথের প্রতি সশ্রদ্ধ থেকেছে? আওয়ামী লীগ যে কখনো জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল না, তা তারা ১৯৭৩ সালে সংসদীয় সংবিধানের অধীনে নির্বাচনে সংসদীয় সরকাব্যবস্থার পক্ষে জনগণের ম্যান্ডেটের সঙ্গে প্রতারণা করে ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছে। শেখ হাসিনা সেই পথে হেঁটেছেন, যার ফলাফল তাঁর জন্য এবং দেশ ও জাতির জন্য শুভ হয়নি। বিএনপি দেশকে বাকশাল থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরিয়ে এনেছে এবং ক্ষমতায় থাকাকালে কখনো আওয়ামী ধাঁচের স্বৈরাচারী আচরণ করেনি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত বিএনপি তারেক রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামীসুলভ আচরণ করে তাদের ওপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতি অশ্রদ্ধা পোষণ করবে, এমন আশা করা যায় না। যেহেতু জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ওপর তাৎক্ষণিক গণভোট অনুষ্ঠানের প্রতি বিএনপির আস্থা ছিল না, তারা আগেই তাদের যুক্তি কার্যকারণসহ জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারত। তাহলে একদিকে তাদের রাজনৈতিক সততা ও সংবিধানের প্রতি বিএনপির অকুণ্ঠ আনুগত্য প্রমাণিত হতো এবং দেশের সর্ববৃহৎ দল হিসেবে বিএনপির জনপ্রিয়তা প্রশ্নের সম্মুখীন হতো বলে আমার মনে হয় না।

বিএনপির বর্তমান অবস্থানে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সফল রাজনীতিবিদ হওয়ার জন্য সম্ভবত এটাই জরুরি যে মনের ভিতর যা আছে তা প্রকাশ না করা এবং উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যাওয়ামাত্র নতুন সুরে কথা বলা। আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনে ব্যালটে বাক্স বোঝাই করেছিল নির্বাচনের আগের রাতেই। এটা কি তারা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে করেছিল? দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনার ফল ছিল তাদের ‘নিশিরাতের ভোট’। বিএনপির জুলাই সনদ বাস্তবায়নে শপথ গ্রহণ না করাও তাদের পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ছিল। তারা জনগণকে বিভ্রান্তির মধ্যে রেখে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ ও সরকার গঠন করে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের কৌশলে সফল হয়েছে।

রাজনীতি জটিল এক শাস্ত্র এবং রাজনীতিবিদরা সেই শাস্ত্রের অধ্যক্ষ ও মহাধ্যক্ষ। সাধারণ মানুষের কাজ ভোট দেওয়া এবং ‘তাদের দ্বারা নির্বাচিত’ শাসকদের দ্বারা শাসিত হওয়া। আমরা ধরেই নিতে পারি, ঘুরেফিরে দেশে পুরোনো রাজনীতিরই চর্চা হবে। সময়ের সঙ্গে দেশে কিছু উন্নয়ন হবে এবং উন্নয়নের সুফল ভোগ করবে হাতে গোনা কিছু মানুষ। ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নয়ন ও বিনিয়োগে ছিটেফোঁটা ভাগ পড়লে তা তাদের জন্য পরম সৌভাগ্যের হবে। পাকিস্তান আমল থেকে বাংলাদেশের জনগণ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে, গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা চেয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান আমলের ২৪ বছরে তারা কেবল শাসিতই হয়েছে, কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র পায়নি। পাকিস্তানি আমলের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ সময় পার করার পরও যদি ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ প্রতিষ্ঠার জন্য দাবি জানাতে হয়, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াইয়ে হাজারো তরুণকে জীবন দিতে হয়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখের আর কোনো কিছু হতে পারে না।

বিএনপি চেয়ারম্যান দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার নির্বাচিত অধিকারী তিনি তাঁর পরিবারের তৃতীয় ব্যক্তি, যিনি তাঁর বাবা-মার মতোই জনপ্রিয়। জনগণ তাঁর প্রতি যে ভালোবাসা প্রদর্শন করেছে, তা কেবল বাংলাদেশে নয়, বহু দেশের ইতিহাসেও বিরল। একটি অপশক্তিকে বিদায় করে বাংলাদেশের জনগণ তাঁর প্রতি দৃঢ় আস্থা স্থাপন করেছে এবং তারা আশাবাদী যে তিনি তাদের আস্থার মূল্য দেবেন।  তারা বিশ্বাস করে যে তিনি দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন, যা পরবর্তী সময়ে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তাদের জন্য অনুকরণীয় হবে। এজন্য তিনি তাঁর পারিষদবর্গের পরামর্শ অবশ্যই গ্রহণ করবেন, সেজন্য তো রয়েছে তাঁর মন্ত্রিপরিষদ ও উপদেষ্টামণ্ডলী। তা সত্ত্বেও একজন সুশাসক হওয়ার জন্য রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণের স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে তাঁর চিন্তাপ্রসূত বিচক্ষণতা প্রদর্শন করতে হবে। নৈতিক গুণাবলির বিকাশও রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর জন্য জরুরি, যা জনগণকে তাঁর প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ করে এবং দুর্যোগ মুহূর্তে তাঁর পাশে দাঁড়ায়।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক ও অনুবাদক

কেন অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডের শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত

অদিতি করিম
কেন অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডের শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত
ড. ইউনূস। ফাইল ছবি

যেকোনো সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। একটি সরকার যেভাবেই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করুক না কেন, তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। কারণ জনগণই প্রজাতন্ত্রের মালিক। নির্বাচিত সরকারের জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। সংসদীয় পদ্ধতির সরকারে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় সরকার। সংসদ হয় জবাবদিহির জায়গা। সংসদে বিরোধী দল এবং স্বাধীন গণমাধ্যম সরকারের সব কার্যক্রম নজরে রাখে। যখন সরকার কোনো জনবিরোধী কাজ করে তখন বিরোধী দল সংসদে কিংবা সংসদের বাইরে সেটা তুলে ধরে। গণমাধ্যম সহজেই নির্বাচিত সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরতে পারে। এভাবেই একটি নির্বাচিত সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।

কিন্তু অনির্বাচিত সরকারের ক্ষেত্রে জবাবদিহির সুযোগ থাকে না। অনির্বাচিত সরকারের সময় সংসদ থাকে না, কিংবা থাকলেও সেখানে বিরোধী দল থাকে প্রায় অস্তিত্বহীন। সংসদের বাইরে বিরোধী দলের কণ্ঠ রোধ করে রাখা হয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ করা হয়। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তী সরকার ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। একটি গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল। তাই এ সরকার জনগণের নির্বাচিত ছিল না বটে, কিন্তু তারা জোর করেও ক্ষমতা দখল করেনি। তারা জবরদখলকারী সরকার হিসেবে বিবেচিত হবে না। বরং জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী ড. ইউনূসের অন্তর্র্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল। আরও সহজ করে বললে, জনগণের আকাঙ্ক্ষার ফসল ছিল বিদায়ি অন্তর্র্বর্তী সরকার। তাই অন্য অনির্বাচিত সরকারের চেয়ে এই সরকার সম্পূর্ণ আলাদা। অনির্বাচিত সরকারগুলো যেমন জবাবদিহির তোয়াক্কা করে না, কিংবা জবাবদিহি করতে অপছন্দ করে, এ সরকারের বেলায় তেমনটি হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। জনগণই সরকারকে যেহেতু ক্ষমতায় বসিয়েছে, কাজেই ড. ইউনূস সরকারের জনগণের কাছে জবাবদিহির নৈতিক বাধ্যবাধকতা ছিল।

কিন্তু ১৮ মাসে অন্তর্র্বর্তী সরকারের অনেক কার্যক্রম, চুক্তি এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কিন্তু সরকার এসব অভিযোগ আমলে নেয়নি। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো জবাবদিহিও ছিল না গত ১৮ মাস। ড. ইউনূস সরকার জন আন্দোলনের ফসল হলেও এ সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পেত গণমাধ্যম। সরকারের সমালোচনা করলেই নানানরকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হতো। সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এসব সমালোচনার জবাব দেওয়া হয়নি অন্তর্র্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে। নাগরিক সমাজ এক বছর পর সরকারের বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্তের সমালোচনা শুরু করেছিল বটে, কিন্তু সদ্য বিদায়ি অন্তর্র্বর্তী সরকারের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য ছিল সব সমালোচনা উপেক্ষা করা। সরকার সুশীল সমাজের সমালোচনাগুলোর কোনো জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।

ফলে ১৮ মাস মেয়াদি অন্তর্র্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ থাকলেও তার কতটুকু সত্য আর কতটা মিথ্যা, তা যাচাই করা প্রয়োজন। দেশের স্বার্থে এটা জরুরি। কারণ তারা জনগণের করের টাকায় বেতন ও বিভিন্ন সুযোগসুবিধা নিয়েছে। তাদের কাজের মূল্যায়ন জনগণের স্বার্থে দরকার। প্রধান উপদেষ্টাসহ একাধিক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সুযোগসুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ কতটা সত্য তা যাচাই করা দরকার। ড. ইউনূস তাঁর এবং তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য কর মওকুফসহ নানান সুযোগসুবিধা নিয়েছেন। তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা উচিত। গত ১৮ মাসে একাধিক উপদেষ্টা এবং তাঁদের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অন্তত ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে বলে জানা গেছে। এঁদের মধ্যে তিনজন সাবেক উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগগুলোর তদন্ত থমকে আছে। এসব দুর্নীতির তদন্ত দ্রুত জনস্বার্থে শেষ করা উচিত। এ ধরনের অভিযোগ জিইয়ে রেখে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হওয়া যাবে না। এ ছাড়া বিদায়ি সরকারের অনেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। একজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তিনি পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সম্পদ দেখভাল করছেন এবং সেসব বিক্রি করতে সহায়তা করেছেন। স্বচ্ছতার স্বার্থে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা উচিত। কারণ অন্তর্র্বর্তী সরকারে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা সবাই সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁদের জন্য এবং সুশীল সমাজ সম্পর্কে জনগণের মূল্যায়ন নির্মোহ রাখার জন্য একটি তদন্ত করা প্রয়োজন।

অন্তর্র্বর্তী সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পাদন করেছে তাদের মেয়াদে। এসব চুক্তি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। অন্তর্র্বর্তী সরকার বিদেশের সঙ্গে যেসব জানা-অজানা চুক্তি করেছে, সেগুলো খতিয়ে দেখতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে সেসব সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটা যাচাই করা দরকার। এমনকি প্রয়োজনে বাদ দেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি। অনেকেই কয়েকটি চুক্তি দেশের স্বার্থবিরোধী বলেও মন্তব্য করেছেন। অন্তর্র্বর্তী সরকারের এ ধরনের চুক্তি করার এখতিয়ার আছে কি না তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে।

এসব তদন্ত ড. ইউনূস কিংবা তাঁর সুশীল উপদেষ্টাদের চরিত্রহননের জন্য নয়, বরং দেশের স্বার্থে করা দরকার। কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত আবারও নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে এনেছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১৪তম) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে। অন্তর্র্বর্তী সরকারও একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলেই গঠিত হয়েছিল। তাই অন্তর্র্বর্তী সরকারের ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং ত্রুটিবিচ্যুতি থেকে আগামীর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপকাঠামো তৈরি করা যায়। ড. ইউনূস সরকার কোন কোন ক্ষেত্রে ভুল করেছে, সীমা অতিক্রম করেছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। যেন আগামীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সময় এসব বিষয়ে নজর দেওয়া যায়।

আমাদের দেশে এখন থেকে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব পালন করবে। তাই ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তী সরকার আমলের একটি নির্মোহ ময়নাতদন্ত হওয়া উচিত। এটি শুধু বিদায়ি সরকারের জবাবদিহির বিষয় নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সীমারেখা সুনির্দিষ্ট করার জন্যও জরুরি। আগামীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে যেন সীমা লঙ্ঘন করতে না পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে যেন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ না ওঠে, সেজন্য একটি রূপরেখা প্রণয়ন করার জন্য ইউনূস সরকারের ওপর কমিশন গঠন করা উচিত। অন্তর্র্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের কর্মকাণ্ড তদন্ত হলে ড. ইউনূস এবং তাঁর উপদেষ্টাদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।