• ই-পেপার

একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি

বিমানবন্দরে নেমেই উপদেষ্টার তালিকায় কাটছাঁট করেন ইউনূস

<li>ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করার সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন ছাত্ররা</li>

একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি

দেড় বছরের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা কাটিয়ে এখন আমি নির্ভার

হায়দার আলী ও জয়নাল আবেদীন
দেড় বছরের শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা কাটিয়ে এখন আমি নির্ভার
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ছবি: সংগৃহীত

সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণকারী হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেছেন, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মানুষ এক ধরনের মুক্তি অনুভব করেছে এবং সহিংস মব সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। 

গত শুক্রবার রাতে বঙ্গভবনে নিজ কার্যালয়ে কালের কণ্ঠকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। তাঁর ভাষায়, মানুষ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চেয়েছিল এবং মিথ্যার সংস্কৃতি ও একে অপরের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ থেকে মুক্তি চাইছিল। 

নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে মূল্যায়নে রাষ্ট্রপতি বলেন, অল্প সময়ের পরিচয়ে তিনি রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণাবলী লক্ষ্য করেছেন। সাম্প্রতিক কার্যক্রমে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এই পরিবারে মুক্তিযুদ্ধের রক্ত রয়েছে। ফলে দেশ বড় কোনো দুর্যোগে পড়বে না বলেই আমি বিশ্বাস করি।’ 

নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজের অবস্থান প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, আমি এখন সম্পূর্ণ চাপমুক্ত। দেড় বছর ধরে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বঙ্গভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল আমার প্রধান উদ্বেগ। সেই শ্বাসরুদ্ধকর সময় পার করে এখন আমি মানসিকভাবে অনেকটাই স্বস্তিতে আছি। 

সারা দেশে মব সন্ত্রাসের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ওই সময় পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অশান্ত। তখন কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারত বলে তিনি মনে করেন। শান্ত পরিবেশ বজায় রাখতে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে বলেও স্বীকার করেন তিনি। 

অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নে রাষ্ট্রপতি জানান, মব সন্ত্রাসে তারা নীরব ছিল। ইন্ধন ছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন বলেও জানান। তিনি বলেন, সে সময় তিনি নিজেও কার্যত অসহায় ছিলেন এবং প্রকাশ্যে কিছু বললে পরিস্থিতি বুমেরাং হতে পারে-এই আশঙ্কায় নীরব থাকাই তিনি শ্রেয় মনে করেছিলেন।

বর্তমান সরকারের মব সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থানকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, মব কালচার রাষ্ট্রে ঘুণের মতো ধরে বসেছিল। সেটি বন্ধে সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান দেশকে স্থিতিশীল করতে সহায়ক হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। 

রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন নিয়ে চলমান আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি মানসিক চাপ ও অপমানের অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। তবে সাংবিধানিকভাবে তাঁর মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বলেই তিনি স্পষ্ট করেন। 

তবে তিনি এটাও বলেন, যদি একটি নির্বাচিত সরকার মনে করে যে তাঁর না থাকাই ভালো, তাহলে তিনি সম্মানজনকভাবে স্বেচ্ছায় সরে যেতে প্রস্তুত। সংসদের অভিশংসন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতির মন্তব্য, তিনি একজন সচেতন মানুষ এবং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যেতে দেবেন না। সরকার চাইলে থাকবেন, আর না চাইলে নিজেই দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন।

একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি

প্রতিবিপ্লব ও সামরিক শাসন থেকে দেশকে রক্ষা করেছি

তিন বাহিনী প্রধান অভয় দিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ক্ষমতার মোহ ছিল না জরুরি অবস্থা দিতে আমাকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করা হয়েছিল

হায়দার আলী ও জয়নাল আবেদীন
প্রতিবিপ্লব ও সামরিক শাসন থেকে দেশকে রক্ষা করেছি
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ছবি: সংগৃহীত

ছাত্র-জনতার তীব্র গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে সাংবিধানিক সংকটের মুখে পড়ে দেশ। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে বিলম্ব হওয়ার প্রেক্ষিতে দেশে সামরিক শাসন বা প্রতিবিপ্লব হতে পারে বলে ব্যাপক আশঙ্কা দেখা দেয়। সেই প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নিজে দেশকে রক্ষা করেছেন বলে দাবি করেছেন। গত শুক্রবার রাতে বঙ্গভবনে নিজ কার্যালয়ে কালের কণ্ঠকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ বিষয়ে মুখ খোলেন। 

রাষ্ট্রপতি জানান, প্রকাশ্যে বা গোপনে সামরিক শাসন জারির কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা না হলেও তাঁকে জরুরি অবস্থা জারির জন্য বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রবলভাবে চাপ দেওয়া হয়েছিল। সংবিধান অনুযায়ী কেবল রাষ্ট্রপতিরই জরুরি অবস্থা জারি করার এখতিয়ার রয়েছে। সেই কারণেই তাঁকে টার্গেট করে নানা দিক থেকে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালানো হয়। 

তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জরুরি অবস্থা বা সামরিক আইন জারির বিষয়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ ছিল না।

রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় দেশের ভেতরে একটি প্রতিবিপ্লব ঘটানোর উদ্যোগও ছিল। সাধারণত এ ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন সুযোগসন্ধানী পক্ষ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এসব পক্ষ অসাংবিধানিক কোনো পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করেছিল বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। 

সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি জানান, সেনাবাহিনীপ্রধান, নৌবাহিনীপ্রধান ও বিমানবাহিনীপ্রধান, তিন বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বই জরুরি অবস্থা, সামরিক আইন কিংবা জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করেন। তাঁদের অবস্থান ছিল, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই নির্বাচন পর্যন্ত অগ্রসর হওয়া সম্ভব।

রাষ্ট্রপতির দাবি, স্বশস্ত্র বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের পথ তৈরি করা। সে লক্ষ্যেই সেনাবাহিনীপ্রধান ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন দেখতে চাওয়ার কথা বলেছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সেনাপ্রধানের মধ্যে ক্ষমতা দখলের কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিল না।

রাষ্ট্রপতি আরো বলেন, অতীতে ওয়ান-ইলেভেনের সময় জরুরি অবস্থা জারি করে দীর্ঘ সময় সেনাবাহিনীর ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতা জনগণের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই সেনাবাহিনী এবার কোনোভাবেই সে পথে হাঁটেনি। 

নিজের অবস্থানের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁকেই মূলত জরুরি অবস্থা জারির জন্য টার্গেট করা হয়েছিল এবং তাঁর ওপর চরমভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়। তবে আল্লাহর রহমত এবং নিজের দৃঢ় মনোবলের কারণেই তিনি সে চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম হন এবং দেশকে একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।

একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি

জীবনবাজি রেখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি

হায়দার আলী ও জয়নাল আবেদীন
জীবনবাজি রেখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি
বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী। ছবি : কালের কণ্ঠ

আওয়ামী লীগ  সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের আগষ্টে বিশেষ পরিস্থিতিতে গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সাংবিধানিক জটিলতার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সবমিলে তখন সরকার গঠন প্রক্রিয়াটি ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং। সেই সময়ের অনেক অজানা কথা উঠে এসেছে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কথায়। গত শুক্রবার রাতে বঙ্গভবনে নিজ কার্যালয়ে কালের কণ্ঠকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে আসে এসব কথা। 

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন বঙ্গভবনের পরিবেশ কেমন ছিল, এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, স্বাভাবিকভাবে ওই আন্দোলনটা জনবিস্ফোরণে রূপ নেয়। যখন বিক্ষোভকারীরা গণভবন অভিমুখে, তখন আমাকে জানানো হলো যে, যেকোনো মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী (তৎকালীন) বঙ্গভবনে আসবেন। ১২টার সময় আমাকে জানানো হলো যে, উনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন বঙ্গভবনে আসার।  

রাষ্ট্রপতি বলেন, আমরা আঁচই করতে পারিনি যে, আসলে ঘটনা কী ঘটতে যাচ্ছে। তবে উনি (শেখ হাসিনা) যখন এখানে আসবেন বলছেন এবং হেলিকপ্টারও রেডি, তখন আমরা ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। এখানে সিকিউরিটি যারা ছিল, সবাই পজিশন নিয়ে নিল। 

রাষ্ট্রপতি জানান, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাঁকে জানানো হলো যে, শেখ হাসিনা বঙ্গভবনে আসছেন না। এর কিছুক্ষণ পর হাসিনার দেশত্যাগের খবর আসে। ততক্ষণে বঙ্গভবনে নিরাপত্তা বাহিনী আরও সতর্ক হয়ে যায়। সবমিলিয়ে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহের খুব দ্রুত পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছিলেন বলে জানান তিনি। 

রাষ্ট্রপতি মো. সাহবুদ্দিন বলেন, সেদিন (৫ আগস্ট ২০২৪) বিকেল ৩টার দিকে প্রথমে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আমাকে টেলিফোনে সমস্ত ঘটনা অবহিত করেন। সশস্ত্র বিভাগ থেকেও আমাকে জানানো হয়। পরবর্তীতে জানানো হলো যে, ওয়াকার সাহেব সাংবাদিকদের সামনে সম্পূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে একটা ব্রিফিং দেবেন। 

উনি ব্রিফিং দিলেন, আমরা টেলিভিশনে দেখলাম। উনি বললেন যে, প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগ করেছেন। তো দেশবাসী আশ্বস্ত হলো যে, উনি অলরেডি দেশান্তরী হয়েছেন। তারপর আমাকে সেনাপ্রধান ফোন করে জানালেন যে, তারা আসছেন। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীপ্রধান তিনজনই বঙ্গভবনে এলেন। এসে আমার সঙ্গে উদ্ভূত সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় বসলেন।

তখন আমাদের প্রায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। কী করা যায়, কীভাবে কী হবে-এইসব নিয়ে আমরা আলোচনা করলাম প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা। সিদ্ধান্ত হলো, সবগুলো রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে ডাকা হবে। এই কাজে সেনাবাহিনীর টিম নিযুক্ত ছিল। তারপর উনারা চলে গেলেন। সেনাসদরে দেশের রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে একত্র করা হলো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের মধ্যেও কেউ কেউ ছিলেন। তখন যাদের পাওয়া গেছে, তাদেরকে নিয়ে আসা হয়েছে। 

বঙ্গভবনের ওই বৈঠকে তখন দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন,  ‘কীভাবে, কোন ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে দেশের মানুষকে স্বস্তি ফিরিয়ে দেওয়া যায়, সে বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। আমার সভাপতিত্বে এখানে সভা হলো। আর সেনাপ্রধান সঞ্চালনা করলেন। সেখানে তিনি পুরো পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিলেন। সেখানে সম্মিলিতভাবে কয়েকটি প্রস্তাব আসে।’ 

রাষ্ট্রপতি জানান, বিশেষ করে, তিনটি প্রস্তাব উত্থাপন হয়। এগুলো হলো- তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সর্বদলীয় বা জাতীয় সরকার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কিন্তু অভিন্ন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বললে হয়তো ওয়ান ইলেভেনের মতো শোনায়। আবার সর্বদলীয় বা জাতীয় সরকার বললে দীর্ঘমেয়াদী সরকারও হয়ে যেতে পারে। 

তিনি বলেন, ‘নানান বিবেচনায় আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ্গণ এই মর্মে সিদ্ধান্ত নেন যে, যথাসম্ভব অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা উচিত। এই সিদ্ধান্ত হলো আর আমার ওপর দায়িত্ব পড়ল জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে জাতিকে আশ্বস্ত করার। আর তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সব ঠিক করবেন সরকারের গঠন প্রণালীটা। এই সিদ্ধান্ত হওয়ার পর প্রফেসর আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের কাছে পরিস্থিতির অগ্রগতি তুলে ধরেন। আমাকে ভাষণ দিতে হলো রাত ১১টার সময়। আর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন প্রক্রিয়া তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হলো। সেনাবাহিনী এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আলাপ করে এটা করবেন। সেনাবাহিনী থাকবে, সহায়তা করবে সবকিছু।’ 

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়টি সংবিধানে ছিল না। ফলে ওই সময় একটি সাংবিধানিক সংকটের মুখে পড়েছিল দেশ। সে পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দিয়েছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, যখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলো, তখন কথা উঠল-এটা তো আমাদের সংবিধানে নাই। আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ এবং ৭-ক অনুযায়ী, সংবিধানের কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন করাটা শাস্তিমূলক অপরাধ এবং এই অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এটি হবে বিদ্রোহ বা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। এটা তো আমি জানি। কিন্তু আমরা যে কাজটা করতে যাচ্ছি, সরকার গঠন করতে যাচ্ছি, এটা তো সংবিধানে নাই। 

জীবনবাজি রেখে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন দাবি করে রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের এই সংকটময় অবস্থায় আমি নিজে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট তৎকালীন প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলি। তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করি-এই অবস্থায় কী করা যায়। আমরা আলোচনা করলাম-এই সংবিধানের আলোকেই কীভাবে সরকার গঠন করা যায়। সংবিধানের আর্টিকেল ১০৬-এর বিধানমতে আপিল বিভাগের কাছে আমি তাদের মতামত চাইলাম। বললাম যে, এই অবস্থায় আপনারা আমাকে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেন। এটা আমাদের আইনে আছে। একটা আইনের সাপোর্ট থাকলে আমি তো ৭ ও ৭-ক অনুচ্ছেদ সংক্রান্ত জটিলতা থেকে বাঁচি। তখন ওনারা আপিল বিভাগের আদালত বসাল। 

তিনি বলেন, সেই সময় সুপ্রিম কোর্ট ঘেরাও আন্দোলন চলছিল। আমার তৎকালীন আইন সচিব আমার চিঠি কোর্টে নিয়ে যায়। ওনারা তখন দুজন ছিলেন এজলাসে, আর বাকি কয়েকজন ছিলেন বাড়িতে। তাদেরকে ওনারা ভার্চুয়ালি সংযুক্ত করেন। এর আগে ৬ আগস্ট আমি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাবলে যথোপযুক্ত মনে করে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামানকে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দিই। 

যেহেতু তখন দেশে সরকার নাই, আইনে বলা আছে- রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দান করবেন। সেই ক্ষমতাবলে তিনি এই নিয়োগ দেন। ৮ আগস্টের শুনানিতে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল। পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে সেদিন শুনানি হয়। 

তাদের মতামতের প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতির ভাষায়, ‘তাদের ওই মতামত আমার জন্য রক্ষাকবচ হয়ে উঠল। আমার সামনে আর কোনো বাধা থাকল না।’ 

ওই মতামতের ওপর ভিত্তি করেই আমি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পরামর্শ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি। সেখানে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সম্পূর্ণ রকম সমর্থন ছিল।

একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি

চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রপতিকে বিদেশ সফরেও বাধা দেয় অন্তর্বর্তী সরকার!

নিজস্ব প্রতিবেদক
চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রপতিকে বিদেশ সফরেও বাধা দেয় অন্তর্বর্তী সরকার!
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ছবি: সংগৃহীত

চিকিৎসার জন্য বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। গত শুক্রবার রাতে বঙ্গভবনে নিজ কার্যালয়ে কালের কণ্ঠকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী ও বিশেষ প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীন রাষ্ট্রপতির এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। 

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সিঙ্গাপুরে আমার একটি বাইপাস সার্জারি হয়েছিল। সেখানকার হাসপাতালে সার্জারির এক বছর আমার ফলোআপের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। সময়মতো আমি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিই। প্রত্যুত্তরে আমাকে সরাসরি নিষেধ করে দেওয়া হয়।’ 

রাষ্ট্রপতি জানান, একইভাবে লন্ডনস্থ ক্যামব্রিজ পার্কওয়ে হসপিটালেও আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। সেখানেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় অন্তর্বর্তী সরকার। প্রতিবারই আমাকে জানানো হয়, যদি প্রয়োজন হয়, বিদেশ থেকে চিকিৎসক আনার ব্যবস্থা করবেন, তবু বিদেশে যাওয়া যাবে না। 

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত দেড় বছরে প্রধান উপদেষ্টা ১৪ বার বিদেশে গেছেন, অথচ আমি চিকিৎসার জন্য যেতে পারিনি। মূলত আমি যেন মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভেঙে পড়ি, এটাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য; আমি ভেঙে গিয়ে যাতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করি।’ 

বঙ্গভবনে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রসঙ্গ টেনে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসে মূল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান বঙ্গভবনেই হয়ে থাকে। দীর্ঘদিনের রেওয়াজ অনুযায়ী আমরা এই দিবসগুলো বঙ্গভবনে  আয়োজন করি, জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান হয়। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধান উপদেষ্টাকে দাওয়াত দিয়েছি। কিন্তু তিনি আসেননি।’

এর আগে সরকারপ্রধানরা প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন বলে জানান তিনি। যদিও সাংবিধানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো ধরাবাধা নেই, তবে এটি সৌজন্যবোধের বিষয়। 

রাষ্ট্রপতির ভাষায়, ‘আমাকে সরিয়ে দিতে পারলে তারা অসাংবিধানিকভাবে পছন্দের কাউকে বসাতে পারবে। আর এটা করতে পারলেই নির্বাচন বিলম্ব  করানো বা নিজেদের ক্ষমতা বেশিদিন ধরে রাখা যেতো। নিজেদের মনমতো রাষ্ট্রপতি হলে যা ইচ্ছে তাই করা যায়- এই ভাবনা থেকেই আমার ওপর মানসিক পীড়ন চালিয়েছেন তাঁরা।’

রাষ্ট্রপতি বলেন, মূলত আমি যেন মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভেঙে পড়ি, এটাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। আমি ভেঙে গিয়ে যাতে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করি। এতে তারা অসাংবিধানিকভাবে পছন্দের কাউকে বসাতে পারবে। বসাতে পারলে ওই নির্বাচন বিলম্ব বা নিজেদের ক্ষমতা বেশিদিন ধরে রাখা যেতো। নিজেদের রাষ্ট্রপতি হলে যা ইচ্ছে তাই করা যায়। এই ভাবনা থেকে।