মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট গত শুক্রবার জানিয়ে দিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প অর্থনৈতিক জরুরি আইন ব্যবহার করে যে শুল্ক আরোপ করেছেন তা অবৈধ। তবে এই শুল্ক কিভাবে ফেরত দেওয়া হবে, সে বিষয়ে আদালত কিছু বলেননি। এ পর্যন্ত কম্পানিগুলো থেকে আদায় করা শুল্কের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। অর্থ ফেরতের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এ নিয়ে আমরা সম্ভবত আগামী পাঁচ বছর আদালতেই থাকব।’
শুল্ক কিভাবে আদায় করা হয় : প্রায় সব ধরনের শুল্কযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানিকারকরা কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন সংস্থার কাছে একটি বন্ড জমা দেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য আনার সময় আনুমানিক শুল্ক পরিশোধ করেন। সরকার পরে ওই পণ্যের চূড়ান্ত শুল্ক নির্ধারণ করে, যা ‘লিকুইডেশন’ নামে পরিচিত এবং সাধারণত পণ্য প্রবেশের ৩১৪ দিন পর এটি সম্পন্ন হয়। অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করা হলে তা ফেরত দেওয়া হয়, আর কম পরিশোধ করা হলে আমদানিকারককে বাকি অর্থ দিতে হয়।
সুপ্রিম কোর্ট কি অর্থ ফেরতের পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে : মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অর্থ ফেরতের পদ্ধতি নির্ধারণ করেনি। ভিন্নমত পোষণকারী মতামতে বিচারপতি ব্রেট কাভানাফ বলেন, আদালতের এই রায় স্বল্পমেয়াদে গুরুতর বাস্তবিক প্রভাব ফেলতে পারে, যার মধ্যে অর্থ ফেরতও অন্তর্ভুক্ত। তিনি উল্লেখ করেন, মৌখিক শুনানিতে স্বীকার করা হয়েছিল যে অর্থ ফেরত বিতরণ করা সম্ভবত ‘একটি জটিল অবস্থা’ সৃষ্টি করবে। এখন মামলাটি আবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালতে ফিরে যাবে, যেখানে ফেরতের বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে।
কিভাবে অর্থ ফেরত দেওয়া হতে পারে : আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালতে এরই মধ্যে এক হাজারের বেশি মামলা দায়ের হয়েছে, যেখানে আমদানিকারকরা অর্থ ফেরত চেয়েছেন। আরো বহু নতুন মামলা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যেক আমদানিকারককে আলাদাভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালতে মামলা করতে হতে পারে। এত বিস্তৃতসংখ্যক কম্পানির জন্য একটি সমষ্টিগত মামলা (ক্লাস অ্যাকশন) করা সম্ভব হবে কি না তা স্পষ্ট নয়। মার্কিন বাণিজ্য আইনের অধীনে অর্থ ফেরতের দাবি জানাতে আমদানিকারকদের দুই বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে।
এই প্রক্রিয়া ছোট ব্যবসাগুলোর জন্য বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ তারা এরই মধ্যে বড় ও অর্থবিত্তশালী কম্পানির তুলনায় শুল্কের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমদানিকারকদের আইনজীবীরা বলেন, কিছু ছোট ব্যবসা হয়তো হাজার হাজার ডলার আইনি ও আদালত ফি দেওয়ার বদলে সম্ভাব্য ফেরত দাবি ছেড়ে দিতে পারে।
এ ধরনের ফেরতের কোনো নজির আছে কি : আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালত এর আগেও বড় আকারের অর্থ ফেরত প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করেছে। ১৯৮৬ সালে কংগ্রেস একটি ‘হারবার মেইনটেন্যান্স ট্যাক্স’ চালু করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরগুলোতে আসা-যাওয়া করা সব পণ্যের মূল্যের ওপর আরোপ করা হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে সর্বোচ্চ আদালত এই করের একটি অংশ অসাংবিধানিক বলে রায় দেয়। এরপর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালত এক লাখেরও বেশি দাবিদারের জন্য অর্থ ফেরত প্রক্রিয়া পরিচালনা করে।
অর্থ ফেরত প্রক্রিয়া কি জটিল হবে : বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার শুল্ক পরিশোধের রেকর্ড সংরক্ষণ করেছে এবং নথিপত্রব্যবস্থাও উন্নত করেছে, যা ফেরতের পরিমাণ নির্ধারণ সহজ করতে পারে। ছোট ব্যবসাগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ ফেরত দেওয়ার আহবান জানিয়েছে এবং আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে সরকার যদি আমদানির কাগজপত্র খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে, তাহলে প্রক্রিয়া ধীর হতে পারে। এমনকি অর্থ ফেরত দেওয়া হলেও কিছু কম্পানি হয়তো অর্থ না-ও পেতে পারে। কারণ তারা ‘ইমপোর্টার অব রেকর্ড’ না-ও হতে পারে, অর্থাৎ যে সত্তা আমদানি পণ্যের নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত করে এবং শুল্ক পরিশোধের দায়িত্ব বহন করে।
অর্থ ফেরত দেওয়ার পর শুল্ক পরিশোধকারী কম্পানি এবং ইমপোর্টার অব রেকর্ডের মধ্যে চুক্তির ওপর নির্ভর করবে কে শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ পাবে, যা আরেকটি সম্ভাব্য আইনি বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে। বাণিজ্য সংগঠনগুলোর সতর্কবার্তা অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
সূত্র : রয়টার্স




