• ই-পেপার

সৌরশক্তির টেকসই প্রসার

উদ্ভাবনী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রয়োজন

<li>কাজী সুস্মিতা জাহান</li>

সৌরবিদ্যুৎ

সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের উদ্যোগ ভেস্তে যেতে পারে

দুর্বল পর্যবেক্ষণ, ভূমি অধিগ্রহণ এবং আর্থিক সক্ষমতার অভাব মূল কারণ

কেয়া আক্তার
সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের উদ্যোগ ভেস্তে যেতে পারে

সাড়ে চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সরকারের নবায়নযোগ্য শক্তি সম্প্রসারণের প্রধান পরিকল্পনাটি বাধার মুখে পড়তে পারে। স্থানীয় বিনিয়োগকারী এবং দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগের উদ্যোগের মাধ্যমে এটি করা হবে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্বল পর্যবেক্ষণ, ভূমিসংক্রান্ত ছাড়পত্রে জালিয়াতি এবং অংশগ্রহণকারীদের সঠিক আর্থিক সক্ষমতা যাচাইকরণের অবর্তমানে এই উদ্যোগগুলো বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুতের জন্য কম্পানি বার্ষিক টার্নওভার চাওয়া হয়েছে ৮.২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল চাওয়া হয়েছে ৫৭.২০ মিলিয়ন ডলার এবং প্রতি মেগাওয়াটের জন্য পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার টেন্ডার সিকিউরিটি চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভূমির জন্য স্থানীয় এসি ল্যান্ড এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার ছাড়পত্র চাওয়া হয়েছে। এই কারণে সরকারের উচিত প্রতিটি প্রকল্পের জন্য আগ্রহী উদ্যোক্তার আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রযোজ্য ছাড়পত্রগুলো আলাদাভাবে যাচাই করা। যোগ্যতা অনুযায়ী প্রতিটি টেন্ডারে অংশগ্রহণের জন্য অংশগ্রহণকারীর প্রতি মেগাওয়াট অনুযায়ী অর্থায়নের বিষয়টি নিবিড় তদারকি করতে হবে।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর অনিয়মের অভিযোগে বিগত আওয়ামী লীগ আমলে নেওয়া ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প স্থগিত করেছে। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল। একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করার অনুমোদন পাওয়ার পর যাতে সক্ষমতার অভাব দেখা না দেয় এ জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা তদারক দরকার এবং নতুন দরপত্রে তাই উল্লিখিত আছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, অনেকগুলো কম্পানি দরপত্রে অংশ নিয়েছে। আমরা ইভ্যালুয়েশনের কাজ শুরু করেছি। একটি কম্পানি একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতে কোনো বাধা নেই। যাচাই-বাছাইয়ে বোঝা যাবে, কে কাজ করতে পারবে আর কে পারবে না।

জানা গেছে, পাঁচ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াটের ৫৫টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে চারটি টেন্ডার প্যাকেজ আহবান করা হয়। প্রথম ধাপের টেন্ডার দুর্বল সাড়া পেয়েছিল, দ্বিতীয় ধাপেও ১০টি প্লান্টের জন্য মাত্র ২১টি দরপত্র পাওয়া গেছে। অপেক্ষাকৃত কম সাড়ার কারণে টেন্ডার জমা দেওয়ার সময়সীমা পাঁচবার বাড়ানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রথম টেন্ডার প্যাকেজে দুর্বল সাড়ার পর দ্বিতীয়টিও যথেষ্ট আগ্রহ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপের জন্য বিপিডিবি ৪৬টি দরপত্রের নথি বিক্রির পর ১০টি প্রস্তাবিত সৌর প্লান্টের জন্য মাত্র ২১টি দরপত্র পেয়েছে। দ্বিতীয় প্যাকেজের অধীনে বিপিডিবি দেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১০টি গ্রিড সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে চায়, যার মোট ক্ষমতা ৫০০ মেগাওয়াট।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিদেশি বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর বিনিয়োগ থাকা সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো স্থগিত করা হয়। এর ফলে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগে আস্থা পাচ্ছে না বিনিয়োগকারীরা। পাশাপাশি এবারের দরপত্রে জমিসংক্রান্ত শর্তে বলা হয়, জমির মালিকানাসংক্রান্ত বিষয়ে স্থানীয় এসি ল্যান্ডের সনদ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মুদ্রার ঝুঁকি। দরপত্রে বলা হয়েছে, ৭০ শতাংশ অর্থ মার্কিন ডলারে এবং ৩০ শতাংশ বাংলাদেশি টাকায় পরিশোধ করা হবে, কিন্তু স্থানীয় অংশের জন্য কোনো মুদ্রাস্ফীতি অ্যাডজাস্টমেন্ট নেই। এসব বিবেচনায় যেসব উদ্যোক্তারা দরপত্রে অংশগ্রহণ করেছে, তাদের প্রস্তাবগুলো সঠিকভাবে যাচাই না হলে এই উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।

এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) বাংলাদেশের জ্বালানি খাতবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্পে অতীতে এমনও দেখা গেছে যে কাজ পাওয়ার অনেক বছর পরও কিছু প্রতিষ্ঠান জমি সংকুলান করতে পারেনি সক্ষমতার অভাবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণে এ ধরনের সমস্যা বিষয় বিবেচনায় নেওয়া খুবই প্রয়োজন।

রুফটপ সোলারে আসবে তিন হাজার মেগাওয়াট

বাস্তবায়নের লক্ষ্য আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাড়াহুড়ায় রুফটপ সোলার প্রকল্পের কেনাকাটায় অনিয়ম হতে পারে তাড়াহুড়া নয়, সঠিক পরিকল্পনায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরামর্শ

সজীব আহমেদ
রুফটপ সোলারে আসবে তিন হাজার মেগাওয়াট
ছবি : শেখ হাসান

অন্তর্বর্তী সরকার সারা দেশের সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদ ব্যবহার করে তিন হাজার মেগাওয়াটের ছাদভিত্তিক (রুফটপ) সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, যা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পে ব্যয় হতে পারে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। মূলত সরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ, হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল (রুফটপ সোলার প্যানেল) স্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় অর্থায়নের আশ্বাস দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক সহায়তা নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে মন্ত্রিসভা সচিব এবং অন্যান্য সব সচিবকে ১০০টিরও বেশি ডিও লেটার পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া বাস্তবায়ন কৌশল উপস্থাপন এবং স্থানীয় পর্যায়ে পাইলট প্রকল্প শুরু করার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ শিগগির জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) সঙ্গে সমন্বয় সভা করবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারজানা মমতাজ জানিয়েছেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে প্রতি মেগাওয়াটে ব্যয় হবে আনুমানিক সাড়ে তিন কোটি টাকা, যেখানে জমিভিত্তিক সৌর প্রকল্পের ব্যয় এরই মধ্যে ছয় কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, বাস্তবায়ন করা কঠিন। ডিসেম্বরের সময়সীমা বেঁধে না দিয়ে সময় নিয়ে এটি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। তাড়াহুড়ার কারণে কেনাকাটায় অনিয়ম হতে পারে, নিম্নমানের পণ্য দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের ঝুঁকি থাকে।

জানা গেছে, ২০১০ সালে বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য চাহিদার ৩ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়। এতে সংযোগ পেতে নামমাত্র সৌরবিদ্যুৎ বসানো হয়েছে। এটা একটা ব্যবসায় পরিণত হয়েছিল। নিম্নমানের সৌর প্যানেল বসানো হয়েছে, যা কোনো কাজে আসেনি। সেখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে। তাড়াহুড়ার ফলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, রুফটপ সোলার শুধু জ্বালানি নিরাপত্তা নয়, বরং বিশ্ববাজারে গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি গড়তেও সাহায্য করবে। আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এই রূপান্তরে অংশ নিতে গর্ববোধ করি।

মোস্তফা আল মাহমুদ আরো বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদ ব্যবহার করে স্বল্প সময়ের মধ্যে তিন হাজার মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি সাহসী ও উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ। অতীতের মতো যাতে ধ্বংস না হয়, সতর্ক থাকা জরুরি। তাড়াহুড়া করে ছয় মাসের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অনেক ভুঁইফোড় কম্পানি কাজ নিতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এর আগে বাসাবাড়িতে লোক-দেখানো সৌরবিদ্যুৎ বসানো হয়েছে। এতে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে একটা নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। সে জায়গায় যেন বর্তমান কর্মসূচি না যায়, তাই সতর্ক থাকতে হবে। তিনি আরো বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তিন হাজার মেগাওয়াট স্থাপন করতে চায় সরকার। তারা হয়তো তাদের মেয়াদের মধ্যে এটি করে দেখাতে তাড়াহুড়া করছে। যদিও এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। দ্রুত করতে গেলে নানা সমস্যা হতে পারে। সরকারের ক্রয় প্রক্রিয়ায় ত্রুটি দেখা দিতে পারে। ক্রয় প্রক্রিয়া নয়ছয় করে কারো পকেট ভারী যেন না হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২৬ জুন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি শীর্ষক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবন, স্কুল-কলেজ-মাদরাসা ও সব সরকারি হাসপাতালের ছাদে রুফটপ সোলার স্থাপনের নির্দেশ দেন প্রধান উপদেষ্টা। পরে গত ২৯ জুন উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।

নীতি সহায়তা অভাবে বিদেশি কম্পানি আসতে চায় না

দেশে বেসরকারি পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন ও উৎপাদন নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই কাজ করছে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ওমেরা সোলার। চলতি বছরের জুনে প্রথম কোনো দেশীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে সোলার প্যানেল রপ্তানি করেছে এই গ্রুপেরই সহযোগী প্রতিষ্ঠান রেডিয়েন্ট অ্যালায়েন্স লিমিটেড। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের বর্তমান অবস্থা, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা নিয়ে সম্প্রতি কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেছেন রেডিয়েন্ট অ্যালায়েন্স লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী মাসুদুর রহিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খায়রুল কবির চৌধুরী

নীতি সহায়তা অভাবে বিদেশি কম্পানি আসতে চায় না
মাসুদুর রহিম

কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশে বর্তমানে সৌরবিদ্যুতের সামগ্রিক চিত্রটা কেমন? এর কতটুকু সম্ভাবনা আমরা কাজে লাগাতে পারছি?

মাসুদুর রহিম : সৌরবিদ্যুতের কিছু ভাগ আছে। এর মধ্যে আমাদের এখানে সবচেয়ে কম আলোচিত বোধ হয় ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র বা ফ্লোটিং সোলার। ভাসমান সোলার সেসব বড় লেক, নদী বা জলাধারের জন্য আদর্শ যেখানে স্রোত অনেক কম বা পানি স্থির থাকে। বাংলাদেশে এটার একটা সুযোগ আছে। যেমনরাজধানীর হাতিরঝিল লেকে ভাসমান সোলারের একটা বড় সুযোগ রয়েছে। সেখানে যেসব নৌকা বা জলযান চলে তার জন্য একটা লেন বা পথ রেখে লেকের বাকি অংশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটা আমি একটা উদাহরণ হিসেবে বললাম। অর্থাৎ আমাদের শহরেও আরো জলাধার আছে, যেগুলোতে এভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

নীতি সহায়তা অভাবে বিদেশি কম্পানি আসতে চায় না এরপর আসি তুলনামূলকভাবে অধিক পরিচিত ও বহুল প্রচলিত রুফটপ সোলার প্রসঙ্গে। আমাদের দেশে রুফটপ সোলার বা ছাদে স্থাপিত সোলার প্যানেলের বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের কারখানাগুলোর ছাদ অব্যবহৃত। যদিও কিছু কিছু কারখানায় এখন সোলার প্যানেল বসানো হচ্ছে। এর একটি বড় কারণ হলো বিদেশি ক্রেতাদের পক্ষ থেকে কারখানায় জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার করে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের একটা চাহিদা থাকে। ফলে পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি বা সবুজ কারখানা করতে গিয়ে অনেকেই এখন ছাদে সোলার প্যানেল বসাচ্ছে। তাই আমরা বলতে পারি, দেশে রুফটপ সোলার এখন ক্রমবর্ধমান অবস্থায় আছে।

আরেকটি হচ্ছে গ্রাউন্ড মাউন্টেড সোলার বা ভূমিতে স্থাপিত সোলার প্যানেল। আমাদের তো আসলে অকৃষি জমির স্বল্পতা রয়েছে। এ ছাড়া একফসলি কিছু জমিতে আমরা সোলার প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি। বর্তমান সরকার এখন এতে সোলার প্রকল্প করার অনুমতি দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আরো কিছু নীতি সহায়তা পেলে প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

 

কালের কণ্ঠ : সরকারের নীতি সহায়তা কেন প্রয়োজন? কী ধরনের নীতি সহায়তার কথা বলছেন?

মাসুদুর রহিম : সরকারের নীতি সহায়তা লাগবে, কারণ এখানে বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। এ ধরনের প্রকল্পে বিরাট অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। এ রকম একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে স্বাভাবিকভাবেই দেশি উদ্যোক্তারা ব্যাংকের কাছে যাবে। আমাদের ব্যাংকগুলো এই ধরনের খাতে অর্থায়নে কতটা সক্ষম, সেটা এখানে বিবেচনা করতে হবে। কারণ ব্যাংক সেসব শিল্প বা ব্যবসাকেই সহায়তা করবে, যেখানে তাদের লাভটা নিশ্চিত থাকবে এবং ঝুঁকি কম থাকবে। একটা ১০০ মেগাওয়াটের গ্রাউন্ড মাউন্টেড প্রজেক্ট করতে গেলে প্রতি মেগাওয়াটে ন্যূনতম ছয়-সাত কোটি টাকা করে খরচ আছে। তার মানে ১০০ মেগাওয়াটের একটি প্রকল্পে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন। লোকাল ব্যাংকের পক্ষে একটি প্রজেক্টে ৭০০ কোটি টাকা অর্থায়ন অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। এ জন্যই বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। এর সঙ্গে স্থানীয়রাও থাকবে, দুই পক্ষ মিলেই করবে। এ জন্য বিদেশি বিনিয়োগ তখনই আকৃষ্ট হবে যখন বিনিয়োগকারীরা তাদের পেমেন্ট নিশ্চিয়তা সরকার থেকে পাবে। এ জন্য এ ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ (Implementation Agreement).

 

কালের কণ্ঠ : বিদেশি বিনিয়োগকারী আনার জন্য যে পরিবেশ ও উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন তা কি আছে?

মাসুদুর রহিম : একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যখন আমাদের দেশে এসে বিনিয়োগ করবে তখন সে প্রথমেই দেখবে তার লাভ বা টাকা ওঠানোর নিশ্চয়তাটা কী। এই নিশ্চয়তা কে দেবে? যে বিদ্যুৎ কিনবে, সেই তো দেবে। বিদ্যুৎ কে কিনবে? সরকার কিনবে। সরকারের কাছ থেকে পরে আমরা কিনি। এ জন্য সরকারের কাছ থেকে নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

এখন স্থানীয় কম্পানির কাছ থেকে কোনো কিছু কিনলে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইনের মাধ্যমে কিনতে পারে। আর যদি বিদেশি বিনিয়োগ আসে, তার জন্য তো পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন যথেষ্ট নয়। সে চাইবে সভারেন গ্যারান্টি, যেটা ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যাগ্রিমেন্ট বা আইএ। এর মানে আমি আপনার এখানে যে বিনিয়োগ করেছি, আমি একটা নির্দিষ্ট লাভ বা রিটার্ন পাব এখান থেকে। এর মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারে। এই নিশ্চয়তা সরকার দেবে। কারণ বিদ্যুৎ সরকার কিনবে। এরপর আমাকে দেবে। এ জন্য বিদেশি বিনিয়োগে নীতি সহায়তা খুব জরুরি, যেটাকে আমরা পেমেন্ট গ্যারান্টি বলি। রিপেট্রিয়েশন ফ্যাসিলিটি লাগবে, অর্থাৎ যে সরকারই আসুক বিনিয়োগকারী লাভ নিতে পারবে, সেই গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা থাকতে হবে। আগে যারা মেগাপ্রজেক্ট বা বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে সবারই ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যাগ্রিমেন্ট ছিল। বর্তমানে এটা না থাকার কারণে অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

 

কালের কণ্ঠ : দেশে সৌরবিদ্যুতের প্রসারে মূল চ্যালেঞ্জ বা সীমাবদ্ধতা কি তাহলে নীতি সহায়তার ঘাটতি?

মাসুদুর রহিম : হ্যাঁ, তাই প্রতীয়মান এবং এটাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। আরেকটা বিষয় আছে এখানে। একজন ব্যবসায়ী দিনশেষে লাভ চান। এখন যেটা করেছে, আপনি একটি প্রজেক্ট করবেন ২০ বছরের জন্য। ২০ বছর আপনি আপনার শেয়ার কাউকে বিক্রি করতে পারবেন না। মানে মালিকানা পরিবর্তন হতে পারবে না। এটা একটা বড় প্রতিবন্ধকতা মনে করি। এতে ব্যাবসায়িক ক্যাপিটাল ব্লক বা মূলধন আটকা পড়ে যায়। এটারও পরিবর্তন দরকার। বিদেশিরা বসে আছে বাংলাদেশে সোলারে বিনিয়োগ করার জন্য। সরকার যদি বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নেয়, এক বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ কয়েক গিগাওয়াট হয়ে যাবে বলে মনে করি।

 

কালের কণ্ঠ : আপনি বলছেন, দেশে রুফটপ সোলারের বাজার ক্রমবর্ধমান। এর পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন?

মাসুদুর রহিম : সরকারের পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপ নিলে এ ক্ষেত্রে আশানুরূপ সাফল্য আসবে বলে মনে করি। এখানে কর সুবিধা দেওয়া যায়। যেমনকোনো কম্পানি বা কারখানা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করলে তাকে, যেমন কোনো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী কারখানা যাদের চিহ্নিত করে বার্ষিক ২-৩ শতাংশ বা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কর প্রণোদনা (ট্যাক্স ইনসেনটিভ) নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য দেওয়া যেতে পারে। এতে তারা উৎসাহিত হবে এবং সরকারের সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি। আবার রুফটপ সোলারের জন্য আমাদের বিভিন্ন সরঞ্জাম আমদানি করতে হয়, প্যানেল ছাড়া সব কটির ওপরই শুল্ক অনেক বেশি। ফলে নির্দিষ্ট ঐঝ ঈড়ফব-এর অধীনে রুফটপ সোলার প্রকল্পের জন্য আনীত সরঞ্জামাদির ওপর কর ও শুল্ক সুবিধা থাকলে রুফটপ সোলার খুব দ্রুত বিকাশ লাভ করবে। আমি আপনাকে বলছি, এই দুটি বিষয় সমাধান করলে এক বছরের মধ্যেই শুধু রুফটপ সোলারেই দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে মনে করি।

 

কালের কণ্ঠ : সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে ও ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল বসানোর নির্দেশ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। সোলার প্যানেল বসানোর কাজটি বেসরকারি উদ্যোগে করা যায় কি না, সেটাও বিবেচনা করতে বলেছেন তিনি।

মাসুদুর রহিম : এটা নিঃসন্দেহে খুব ভালো উদ্যোগ। এই ঘোষণা অনেককেই অনুপ্রাণিত করবে সৌরশক্তিতে আসার জন্য। কিন্তু এখানেও চ্যালেঞ্জ থাকবে। আমি আগেই বলেছি, বেসরকারি খাত বা উদ্যোক্তারা সবার আগে চিন্তা করবে তারা বিনিয়োগ ওঠাতে পারবে কি না। এখানে তাই সরকারকে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিগুলো ভালো করে যাচাই-বাছাই করতে হবে। যে উদ্যোক্তা এগিয়ে আসবে, সে ওই ঝুঁকিগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে কতটুকু সহায়তা ও সমর্থন পাবে বা আদৌ পাবে কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। আমরা (ব্যবসায়ীরা) অনেক ক্ষেত্রেই ইনসিকিউরড (অনিরাপদ) বোধ করি। কেননা দেশে যেকোনো পরিবর্তনের কারণে কিন্তু আমরা বলি বা ভুক্তভোগী হয়ে যেতে পারি। সেটা আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছিও।

 

কালের কণ্ঠ : পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় সৌরবিদ্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?

মাসুদুর রহিম : পার্শ্ববর্তী দেশ, যেমনভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এমনকি পাকিস্তানের চেয়েও অনেক পিছিয়ে আমরা। সমস্যাগুলো সম্পর্কে আমি এরই মধ্যে বলেছি। বড় ও বিদেশি বিনিয়োগের অভাব, ভূমিস্বল্পতা এবং একটি সুসংহত, দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের অভাব এ ক্ষেত্রে বড় কারণ।

 

কালের কণ্ঠ : আপনারা তো বেসরকারি খাতে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে কাজ করছেন। ইস্ট কোস্ট গ্রুপ আসলে কী ধরনের কাজ করছে এ ক্ষেত্রে?

মাসুদুর রহিম : আমাদের ইস্ট কোস্ট গ্রুপের ওমেরা সোলার এখন বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতের একটি শীর্ষস্থানীয় ও নির্ভরযোগ্য নাম। ওমেরা সোলার বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এরই মধ্যে ৭০ মেগাওয়াটেরও বেশি রুফটপ সোলার প্রকল্প স্থাপন করেছে, যা জাতীয় গ্রিডে নেট মিটারিং পদ্ধতিতে সংযুক্ত। ২০১১ সাল থেকে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের অধীনে বিদ্যুৎবিহীন পরিবারগুলোকে সৌর হোম সিস্টেম সরবরাহ করে আসছি আমরা। কৃষি খাতে সেচকাজের জন্য সৌরবিদ্যুত্চালিত পাম্প স্থাপনেও সহায়তা করছে ওমেরা সোলার, যা ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখছে।

এ ছাড়া ইস্ট কোস্ট গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রেডিয়েন্ট অ্যালায়েন্স লিমিটেড সম্প্রতি নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমে আধুনিক ও অটোমেটিক সোলার প্যানেল উৎপাদন কারখানা স্থাপন করেছে, যা থেকে এরই মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম চালান পাঠিয়েছে, যেখানে ৬৪.৬০ মেগাওয়াট সৌর পিভি মডিউলের ক্রয়াদেশ আছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সৌর প্যানেল রপ্তানি শুরু করেছে, যা আমি মনে করি একটা বড় অর্জন। এরই মধ্যে দেশীয় রুফটপ প্রকল্পের জন্যও বিভিন্ন আকারের সোলার প্যানেল উৎপাদন শুরু করেছে।

 

কালের কণ্ঠ : সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী হওয়া উচিত?

মাসুদুর রহিম : দেখুন, আমরা জানি জীবাশ্ম জ্বালানি পরিবেশবান্ধব নয়। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রেখে তাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সৌরবিদ্যুতকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের অনেকেই এই ব্যবসায় আসতে চায়। সুতরাং সৌরবিদ্যুতে আমাদের বড় সম্ভাবনা আছে নিঃসন্দেহে। আমাদের শুধু সঠিক পরিকল্পনা করতে হবে এবং তা বাস্তবায়নের পথে সীমাবদ্ধতাগুলো একে একে দূর করতে হবে।

 

কালের কণ্ঠ : আপনাকে ধন্যবাদ।

মাসুদুর রহিম : কালের কণ্ঠকেও অনেক ধন্যবাদ।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন করতে হবে

জ্বালানি সংকটের এই সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে কিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে পারি? নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের করণীয় বিষয়ে একান্ত আলাপ করেছেন বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)-এর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইদ শাহীন ও সজীব আহমেদ

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন করতে হবে
মোস্তফা আল মাহমুদ

কালের কণ্ঠ : বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামের দাম কমছে, তবু আমরা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকে পিছিয়ে কেন?

মোস্তফা আল মাহমুদ : বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামের দাম ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সুযোগ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশ এখনো তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে নীতিগত অস্পষ্টতা ও ধারাবাহিকতার অভাব আমাদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও অনেক সময় তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেরি হয় বা মাঝপথে থেমে যায়। উদাহরণস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাতিল হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত মান নিশ্চিত না হওয়া। নেট মিটারিং গাইডলাইন পুরোপুরি অনুসরণ না করা বা যাচাই-বাছাই ছাড়া নামসর্বস্ব কম্পানিকে সুযোগ দেওয়াএসব ভুলে জনগণের আস্থা ও সরকারের রপ্তানিমুখী স্বপ্নও বাধাগ্রস্ত হয়। সুবিধাজনক ফাইন্যান্সিং ও সাবসিডির অভাবও বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে সরকার লাখ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানিতে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উদ্যোক্তারা কার্যকর প্রণোদনা পাচ্ছেন না। এটা কৌশলগতভাবে ভুল।

আমরা চাই সরকার সাহসিকতার সঙ্গে বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেবে এবং আমাদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবে। কারণ এই লড়াইটা শুধুই বিদ্যুতের না, এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন রক্ষার লড়াই। এই কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করতে হলে রুফটপ সোলার দ্রুত বাস্তবায়ন গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। নেট মিটারিং ও সংযোগ প্রক্রিয়া সহজ ও ডিজিটাল করতে হবে। মানসম্পন্ন ও অভিজ্ঞ কম্পানিকে কাজ দিতে হবে, নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান নয়। ব্যাংক ফাইন্যান্স সহজ করতে হবে এবং প্রকৃত গ্রিন ফাইন্যান্স চালু করতে হবে। বিএসআরইএ ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। সোলারের বিষয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত, সঠিক পরিকল্পনা ও গুণগত বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

 

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন করতে হবেকালের কণ্ঠ : ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের এলওআই বাতিল দেশের জন্য কি ভালো হলো?

মোস্তফা আল মাহমুদ : অন্তর্বর্তী সরকার ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের এলওআই বাতিল নিঃসন্দেহে একটি হতাশাজনক এবং অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত। এটির প্রভাব এই খাতে দীর্ঘ মেয়াদে মারাত্মক হতে পারে। এর মাধ্যমে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে ভয়াবহ আঘাত হেনেছে। বহু দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে এবং আরো বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিয়েছিল। এখন এসব প্রকল্প বাতিল করে তাদের প্রতি অসম্মান দেখানো হয়েছে, যা ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি খারাপ গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে।

এই খাতে বহু উদ্যোক্তা, কম্পানি এবং প্রকৌশলী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রকল্প উন্নয়নে তাঁরা অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছেন, এখন সেই ক্ষতিপূরণের কে দায় নেবে? যে বা যিনি এই যাচাই-বাছাই ছাড়াই একতরফা বাতিলের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তাঁকে অবশ্যই দায় নিতে হবে। আমি স্পষ্টভাবে বলছি, এই খাত কোনো পরীক্ষামূলক খেলা নয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি আমাদের জাতীয় স্বার্থ, আমাদের ভবিষ্যৎ। তাই সরকারের উচিত এই সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিবেচনা করা, প্রকল্পগুলোর মূল্যায়ন পেশাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করানো এবং প্রকৃৃত বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছানো।

 

কালের কণ্ঠ : এই খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে কী পদক্ষেপ প্রয়োজন।

মোস্তফা আল মাহমুদ : আমরা বিএসআরইএর পক্ষ থেকে এই খাতের স্বার্থে ও দেশের ভাবমূর্তির প্রশ্নে জোরালোভাবে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বিদেশি বিনিয়োগ পেতে হলে সরকারকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নীতির ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করুন এলওআই বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত বিনিয়োগ নিরুৎসাহ করে। ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করতে হবে। অনুমোদন, ট্যাক্স, সংযোগ সব সেবা এক জায়গায় দিতে হবে। রিনিউয়েবল এনার্জি স্পেশাল ইকোনমিক জোন গঠন করা অতীব প্রয়োজন। এটি করতে পারলে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব। উৎপাদন কারখানার জন্য জমি ও সুবিধা দিতে হবে। ট্যাক্স ইনসেনটিভ, প্রযুক্তি আমদানিতে শুল্ক ও করছাড় নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের চুক্তি করতে হবে। বিশেষ বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে প্রস্তুত দেখাতে হবে। বিএসআরইএ স্রেডার যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ ফোরাম গঠন করতে হবে। সরকার সাহসিকতার সঙ্গে এগোলে বাংলাদেশ শিগগিরই রিনিউয়েবল ইনভেস্টমেন্ট হাবে পরিণত হবে।

 

কালের কণ্ঠ : নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে চ্যালেঞ্জগুলো কী কী? সেগুলো কিভাবে সমাধান করা যায়?

মোস্তফা আল মাহমুদ : এই খাতে নীতির অস্পষ্টতা ও অস্থিরতা রয়েছে। এলওআই বাতিল, অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগ নিরুৎসাহ করছে। তাই স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। ফাইন্যান্সিং ও ব্যাংক সহায়তার সংকট সমাধান করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া বেশ কঠিন। জন্য গ্রিন ফাইন্যান্সে বাধ্যতামূলক ব্যাংক অংশগ্রহণ, সুদ কমানো এবং কর অবকাশ দেওয়া। নেট মিটারিং ও সংযোগে জটিলতা রয়েছে। সিস্টেম সংযোগ পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এ জন্য ডিজিটাইজড ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। গুণগত মান ও মনিটরিংয়ের ঘাটতি ও অনেক স্থানে নিম্নমানের সিস্টেম বসানো হয়। এ জন্য ইউটিলিটি প্রতিনিধি দ্বারা যৌথ ইন্সপেকশন বাধ্যতামূলক করতে হবে। দক্ষ জনবলের ঘাটতি ও প্রশিক্ষণের অভাব ও কারিগরি জ্ঞান ছাড়া সিস্টেম বসানো হয়। এ জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, টেকনিক্যাল সেন্টার ও সার্টিফিকেশন চালু করা। ভূমি ও নেটওয়ার্ক সাপোর্টের সীমাবদ্ধতা ও জমিসংকট ও গ্রিড লিমিটেশন বড় বাধা। রুফটপ, ফ্লোটিং ও আগাম পরিকল্পনায় গ্রিড উন্নয়ন করতে হবে।

 

কালের কণ্ঠ : রুফটপ সোলার থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে কী করা প্রয়োজন?

মোস্তফা আল মাহমুদ : এটি করতে কারখানা পর্যায়ে এনার্জি অডিট বাধ্যতামূলক করতে হবে। এতে ছাদের সম্ভাব্য ব্যবহার ও অপচয় রোধ করে সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত হবে। সোলার পারফরম্যান্স মনিটরিং সিস্টেম (এসপিএমএস) চালু করা। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে নিজেদের উৎপাদন রিয়েল টাইমে পর্যালোচনা করতে পারে। কারখানার ছাদ উপযোগী স্ট্রাকচার ডিজাইন ও স্ট্যান্ডার্ড নিশ্চিত করা। অনেক কারখানায় ছাদ পুরনো বা ভার বহনে দুর্বল, এগুলোর জন্য আলাদা গাইডলাইন থাকা উচিত। দীর্ঘমেয়াদি অ্যানুয়াল মেইনটেনেন্সে কন্ট্রাক্ট চালু করার বাধ্যবাধকতা। রুফটপ সিস্টেম ইনস্টল করেই দায়িত্ব শেষ নয়চলমান রক্ষণাবেক্ষণ সুনিশ্চিত করতে হবে। পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানির সঙ্গে সমঝোতা সহজ করা, যাতে গ্রিডে সোলার সাপ্লাই দিতে গেলে বাড়তি বাধার মুখে না পড়তে হয়।

শিল্প খাতে রুফটপ সোলার শুধু জ্বালানি নিরাপত্তা নয়, বরং বিশ্ববাজারে গ্রিন এনার্জি শিল্প হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি গড়তেও সাহায্য করবে। আমরা বিএসআরইএর পক্ষ থেকে এই রূপান্তরে অংশ নিতে গর্ববোধ করি এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের পাশে আছি সব সময়। ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানির নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। কিন্তু আজও এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা সোলার প্যানেল ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের উচ্চমূল্য। বর্তমানে প্যানেল, ইনভার্টার, স্ট্রাকচার, ওয়্যারিং, ব্যাটারিসব কিছুরই দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বিশেষ করে যাঁদের বাড়ি গ্রামাঞ্চলে, অফ-গ্রিড এলাকায় তাঁরা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

 

কালের কণ্ঠ : সোলার উন্নয়নে বাধা দূর করতে কী কী করণীয় রয়েছে?

মোস্তফা আল মাহমুদ : এই খাতের উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা সরকারকে নিতে হবে। আমদানি শুল্ক ও ভ্যাটে রেয়াত দেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক উপকরণে ৩০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত ডিউটি ও ভ্যাট আছে। তা হ্রাস পেলে দাম অনেক কমবে। স্থানীয় উৎপাদনে সহায়তা ও প্রণোদনা প্রয়োজন। দেশেই প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি উৎপাদনের জন্য সরকার ট্যাক্স হলিডে ও বিনিয়োগ সুবিধা দিলে দীর্ঘ মেয়াদে দাম কমে আসবে। ঘরভিত্তিক সাবসিডি বা সহজ কিস্তিতে সোলার প্যাকেজ সরকার নির্দিষ্ট শ্রেণির (গ্রামীণ কৃষক, শিক্ষার্থী পরিবার) জন্য ইনস্টলমেন্টভিত্তিক সোলার প্যাকেজ চালু করতে পারে। বিএসআরইএ ইডকল ও ব্যাংকসমূহকে যুক্ত করে হোম সোলার ফাইন্যান্স স্কিম চালু করতে হবে। যাতে ৩৫ বছর মেয়াদে সহজ শর্তে ঘরে ঘরে সোলার ইনস্টল সম্ভব হয়। সরকার যদি এগিয়ে না আসে, তবে ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুৎ শুধু পোস্টারে থাকবে, বাস্তবে নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য, জলবায়ু নিরাপত্তার জন্য এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য এখনই সময় সরকারের সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার।