কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশে বর্তমানে সৌরবিদ্যুতের সামগ্রিক চিত্রটা কেমন? এর কতটুকু সম্ভাবনা আমরা কাজে লাগাতে পারছি?
মাসুদুর রহিম : সৌরবিদ্যুতের কিছু ভাগ আছে। এর মধ্যে আমাদের এখানে সবচেয়ে কম আলোচিত বোধ হয় ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র বা ফ্লোটিং সোলার। ভাসমান সোলার সেসব বড় লেক, নদী বা জলাধারের জন্য আদর্শ যেখানে স্রোত অনেক কম বা পানি স্থির থাকে। বাংলাদেশে এটার একটা সুযোগ আছে। যেমন—রাজধানীর হাতিরঝিল লেকে ভাসমান সোলারের একটা বড় সুযোগ রয়েছে। সেখানে যেসব নৌকা বা জলযান চলে তার জন্য একটা লেন বা পথ রেখে লেকের বাকি অংশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটা আমি একটা উদাহরণ হিসেবে বললাম। অর্থাৎ আমাদের শহরেও আরো জলাধার আছে, যেগুলোতে এভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
এরপর আসি তুলনামূলকভাবে অধিক পরিচিত ও বহুল প্রচলিত রুফটপ সোলার প্রসঙ্গে। আমাদের দেশে রুফটপ সোলার বা ছাদে স্থাপিত সোলার প্যানেলের বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের কারখানাগুলোর ছাদ অব্যবহৃত। যদিও কিছু কিছু কারখানায় এখন সোলার প্যানেল বসানো হচ্ছে। এর একটি বড় কারণ হলো বিদেশি ক্রেতাদের পক্ষ থেকে কারখানায় জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার করে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের একটা চাহিদা থাকে। ফলে পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি বা সবুজ কারখানা করতে গিয়ে অনেকেই এখন ছাদে সোলার প্যানেল বসাচ্ছে। তাই আমরা বলতে পারি, দেশে রুফটপ সোলার এখন ক্রমবর্ধমান অবস্থায় আছে।
আরেকটি হচ্ছে গ্রাউন্ড মাউন্টেড সোলার বা ভূমিতে স্থাপিত সোলার প্যানেল। আমাদের তো আসলে অকৃষি জমির স্বল্পতা রয়েছে। এ ছাড়া একফসলি কিছু জমিতে আমরা সোলার প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি। বর্তমান সরকার এখন এতে সোলার প্রকল্প করার অনুমতি দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আরো কিছু নীতি সহায়তা পেলে প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
কালের কণ্ঠ : সরকারের নীতি সহায়তা কেন প্রয়োজন? কী ধরনের নীতি সহায়তার কথা বলছেন?
মাসুদুর রহিম : সরকারের নীতি সহায়তা লাগবে, কারণ এখানে বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। এ ধরনের প্রকল্পে বিরাট অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। এ রকম একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে স্বাভাবিকভাবেই দেশি উদ্যোক্তারা ব্যাংকের কাছে যাবে। আমাদের ব্যাংকগুলো এই ধরনের খাতে অর্থায়নে কতটা সক্ষম, সেটা এখানে বিবেচনা করতে হবে। কারণ ব্যাংক সেসব শিল্প বা ব্যবসাকেই সহায়তা করবে, যেখানে তাদের লাভটা নিশ্চিত থাকবে এবং ঝুঁকি কম থাকবে। একটা ১০০ মেগাওয়াটের গ্রাউন্ড মাউন্টেড প্রজেক্ট করতে গেলে প্রতি মেগাওয়াটে ন্যূনতম ছয়-সাত কোটি টাকা করে খরচ আছে। তার মানে ১০০ মেগাওয়াটের একটি প্রকল্পে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন। লোকাল ব্যাংকের পক্ষে একটি প্রজেক্টে ৭০০ কোটি টাকা অর্থায়ন অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। এ জন্যই বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। এর সঙ্গে স্থানীয়রাও থাকবে, দুই পক্ষ মিলেই করবে। এ জন্য বিদেশি বিনিয়োগ তখনই আকৃষ্ট হবে যখন বিনিয়োগকারীরা তাদের পেমেন্ট নিশ্চিয়তা সরকার থেকে পাবে। এ জন্য এ ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ (Implementation Agreement).
কালের কণ্ঠ : বিদেশি বিনিয়োগকারী আনার জন্য যে পরিবেশ ও উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন তা কি আছে?
মাসুদুর রহিম : একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যখন আমাদের দেশে এসে বিনিয়োগ করবে তখন সে প্রথমেই দেখবে তার লাভ বা টাকা ওঠানোর নিশ্চয়তাটা কী। এই নিশ্চয়তা কে দেবে? যে বিদ্যুৎ কিনবে, সেই তো দেবে। বিদ্যুৎ কে কিনবে? সরকার কিনবে। সরকারের কাছ থেকে পরে আমরা কিনি। এ জন্য সরকারের কাছ থেকে নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
এখন স্থানীয় কম্পানির কাছ থেকে কোনো কিছু কিনলে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইনের মাধ্যমে কিনতে পারে। আর যদি বিদেশি বিনিয়োগ আসে, তার জন্য তো পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন যথেষ্ট নয়। সে চাইবে সভারেন গ্যারান্টি, যেটা ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যাগ্রিমেন্ট বা আইএ। এর মানে আমি আপনার এখানে যে বিনিয়োগ করেছি, আমি একটা নির্দিষ্ট লাভ বা রিটার্ন পাব এখান থেকে। এর মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারে। এই নিশ্চয়তা সরকার দেবে। কারণ বিদ্যুৎ সরকার কিনবে। এরপর আমাকে দেবে। এ জন্য বিদেশি বিনিয়োগে নীতি সহায়তা খুব জরুরি, যেটাকে আমরা পেমেন্ট গ্যারান্টি বলি। রিপেট্রিয়েশন ফ্যাসিলিটি লাগবে, অর্থাৎ যে সরকারই আসুক বিনিয়োগকারী লাভ নিতে পারবে, সেই গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা থাকতে হবে। আগে যারা মেগাপ্রজেক্ট বা বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে সবারই ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যাগ্রিমেন্ট ছিল। বর্তমানে এটা না থাকার কারণে অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
কালের কণ্ঠ : দেশে সৌরবিদ্যুতের প্রসারে মূল চ্যালেঞ্জ বা সীমাবদ্ধতা কি তাহলে নীতি সহায়তার ঘাটতি?
মাসুদুর রহিম : হ্যাঁ, তাই প্রতীয়মান এবং এটাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। আরেকটা বিষয় আছে এখানে। একজন ব্যবসায়ী দিনশেষে লাভ চান। এখন যেটা করেছে, আপনি একটি প্রজেক্ট করবেন ২০ বছরের জন্য। ২০ বছর আপনি আপনার শেয়ার কাউকে বিক্রি করতে পারবেন না। মানে মালিকানা পরিবর্তন হতে পারবে না। এটা একটা বড় প্রতিবন্ধকতা মনে করি। এতে ব্যাবসায়িক ক্যাপিটাল ব্লক বা মূলধন আটকা পড়ে যায়। এটারও পরিবর্তন দরকার। বিদেশিরা বসে আছে বাংলাদেশে সোলারে বিনিয়োগ করার জন্য। সরকার যদি বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নেয়, এক বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ কয়েক গিগাওয়াট হয়ে যাবে বলে মনে করি।
কালের কণ্ঠ : আপনি বলছেন, দেশে রুফটপ সোলারের বাজার ক্রমবর্ধমান। এর পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন?
মাসুদুর রহিম : সরকারের পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপ নিলে এ ক্ষেত্রে আশানুরূপ সাফল্য আসবে বলে মনে করি। এখানে কর সুবিধা দেওয়া যায়। যেমন—কোনো কম্পানি বা কারখানা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করলে তাকে, যেমন কোনো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী কারখানা যাদের চিহ্নিত করে বার্ষিক ২-৩ শতাংশ বা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কর প্রণোদনা (ট্যাক্স ইনসেনটিভ) নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য দেওয়া যেতে পারে। এতে তারা উৎসাহিত হবে এবং সরকারের সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি। আবার রুফটপ সোলারের জন্য আমাদের বিভিন্ন সরঞ্জাম আমদানি করতে হয়, প্যানেল ছাড়া সব কটির ওপরই শুল্ক অনেক বেশি। ফলে নির্দিষ্ট ঐঝ ঈড়ফব-এর অধীনে রুফটপ সোলার প্রকল্পের জন্য আনীত সরঞ্জামাদির ওপর কর ও শুল্ক সুবিধা থাকলে রুফটপ সোলার খুব দ্রুত বিকাশ লাভ করবে। আমি আপনাকে বলছি, এই দুটি বিষয় সমাধান করলে এক বছরের মধ্যেই শুধু রুফটপ সোলারেই দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে মনে করি।
কালের কণ্ঠ : সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে ও ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল বসানোর নির্দেশ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। সোলার প্যানেল বসানোর কাজটি বেসরকারি উদ্যোগে করা যায় কি না, সেটাও বিবেচনা করতে বলেছেন তিনি।
মাসুদুর রহিম : এটা নিঃসন্দেহে খুব ভালো উদ্যোগ। এই ঘোষণা অনেককেই অনুপ্রাণিত করবে সৌরশক্তিতে আসার জন্য। কিন্তু এখানেও চ্যালেঞ্জ থাকবে। আমি আগেই বলেছি, বেসরকারি খাত বা উদ্যোক্তারা সবার আগে চিন্তা করবে তারা বিনিয়োগ ওঠাতে পারবে কি না। এখানে তাই সরকারকে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিগুলো ভালো করে যাচাই-বাছাই করতে হবে। যে উদ্যোক্তা এগিয়ে আসবে, সে ওই ঝুঁকিগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে কতটুকু সহায়তা ও সমর্থন পাবে বা আদৌ পাবে কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। আমরা (ব্যবসায়ীরা) অনেক ক্ষেত্রেই ইনসিকিউরড (অনিরাপদ) বোধ করি। কেননা দেশে যেকোনো পরিবর্তনের কারণে কিন্তু আমরা বলি বা ভুক্তভোগী হয়ে যেতে পারি। সেটা আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছিও।
কালের কণ্ঠ : পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় সৌরবিদ্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?
মাসুদুর রহিম : পার্শ্ববর্তী দেশ, যেমন—ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এমনকি পাকিস্তানের চেয়েও অনেক পিছিয়ে আমরা। সমস্যাগুলো সম্পর্কে আমি এরই মধ্যে বলেছি। বড় ও বিদেশি বিনিয়োগের অভাব, ভূমিস্বল্পতা এবং একটি সুসংহত, দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের অভাব এ ক্ষেত্রে বড় কারণ।
কালের কণ্ঠ : আপনারা তো বেসরকারি খাতে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে কাজ করছেন। ইস্ট কোস্ট গ্রুপ আসলে কী ধরনের কাজ করছে এ ক্ষেত্রে?
মাসুদুর রহিম : আমাদের ইস্ট কোস্ট গ্রুপের ওমেরা সোলার এখন বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতের একটি শীর্ষস্থানীয় ও নির্ভরযোগ্য নাম। ওমেরা সোলার বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এরই মধ্যে ৭০ মেগাওয়াটেরও বেশি রুফটপ সোলার প্রকল্প স্থাপন করেছে, যা জাতীয় গ্রিডে নেট মিটারিং পদ্ধতিতে সংযুক্ত। ২০১১ সাল থেকে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের অধীনে বিদ্যুৎবিহীন পরিবারগুলোকে সৌর হোম সিস্টেম সরবরাহ করে আসছি আমরা। কৃষি খাতে সেচকাজের জন্য সৌরবিদ্যুত্চালিত পাম্প স্থাপনেও সহায়তা করছে ওমেরা সোলার, যা ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণে ভূমিকা রাখছে।
এ ছাড়া ইস্ট কোস্ট গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রেডিয়েন্ট অ্যালায়েন্স লিমিটেড সম্প্রতি নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমে আধুনিক ও অটোমেটিক সোলার প্যানেল উৎপাদন কারখানা স্থাপন করেছে, যা থেকে এরই মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম চালান পাঠিয়েছে, যেখানে ৬৪.৬০ মেগাওয়াট সৌর পিভি মডিউলের ক্রয়াদেশ আছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সৌর প্যানেল রপ্তানি শুরু করেছে, যা আমি মনে করি একটা বড় অর্জন। এরই মধ্যে দেশীয় রুফটপ প্রকল্পের জন্যও বিভিন্ন আকারের সোলার প্যানেল উৎপাদন শুরু করেছে।
কালের কণ্ঠ : সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী হওয়া উচিত?
মাসুদুর রহিম : দেখুন, আমরা জানি জীবাশ্ম জ্বালানি পরিবেশবান্ধব নয়। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রেখে তাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সৌরবিদ্যুতকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের অনেকেই এই ব্যবসায় আসতে চায়। সুতরাং সৌরবিদ্যুতে আমাদের বড় সম্ভাবনা আছে নিঃসন্দেহে। আমাদের শুধু সঠিক পরিকল্পনা করতে হবে এবং তা বাস্তবায়নের পথে সীমাবদ্ধতাগুলো একে একে দূর করতে হবে।
কালের কণ্ঠ : আপনাকে ধন্যবাদ।
মাসুদুর রহিম : কালের কণ্ঠকেও অনেক ধন্যবাদ।