কালের কণ্ঠ : বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামের দাম কমছে, তবু আমরা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন থেকে পিছিয়ে কেন?
মোস্তফা আল মাহমুদ : বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামের দাম ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সুযোগ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশ এখনো তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে নীতিগত অস্পষ্টতা ও ধারাবাহিকতার অভাব আমাদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও অনেক সময় তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেরি হয় বা মাঝপথে থেমে যায়। উদাহরণস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাতিল হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত মান নিশ্চিত না হওয়া। নেট মিটারিং গাইডলাইন পুরোপুরি অনুসরণ না করা বা যাচাই-বাছাই ছাড়া নামসর্বস্ব কম্পানিকে সুযোগ দেওয়া—এসব ভুলে জনগণের আস্থা ও সরকারের রপ্তানিমুখী স্বপ্নও বাধাগ্রস্ত হয়। সুবিধাজনক ফাইন্যান্সিং ও সাবসিডির অভাবও বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে সরকার লাখ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানিতে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উদ্যোক্তারা কার্যকর প্রণোদনা পাচ্ছেন না। এটা কৌশলগতভাবে ভুল।
আমরা চাই সরকার সাহসিকতার সঙ্গে বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেবে এবং আমাদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবে। কারণ এই লড়াইটা শুধুই বিদ্যুতের না, এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন রক্ষার লড়াই। এই কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করতে হলে রুফটপ সোলার দ্রুত বাস্তবায়ন ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। নেট মিটারিং ও সংযোগ প্রক্রিয়া সহজ ও ডিজিটাল করতে হবে। মানসম্পন্ন ও অভিজ্ঞ কম্পানিকে কাজ দিতে হবে, নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান নয়। ব্যাংক ফাইন্যান্স সহজ করতে হবে এবং প্রকৃত গ্রিন ফাইন্যান্স চালু করতে হবে। বিএসআরইএ ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। সোলারের বিষয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত, সঠিক পরিকল্পনা ও গুণগত বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
কালের কণ্ঠ : ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের এলওআই বাতিল দেশের জন্য কি ভালো হলো?
মোস্তফা আল মাহমুদ : অন্তর্বর্তী সরকার ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের এলওআই বাতিল নিঃসন্দেহে একটি হতাশাজনক এবং অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত। এটির প্রভাব এই খাতে দীর্ঘ মেয়াদে মারাত্মক হতে পারে। এর মাধ্যমে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশে ভয়াবহ আঘাত হেনেছে। বহু দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে এবং আরো বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিয়েছিল। এখন এসব প্রকল্প বাতিল করে তাদের প্রতি অসম্মান দেখানো হয়েছে, যা ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একটি খারাপ গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে।
এই খাতে বহু উদ্যোক্তা, কম্পানি এবং প্রকৌশলী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রকল্প উন্নয়নে তাঁরা অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছেন, এখন সেই ক্ষতিপূরণের কে দায় নেবে? যে বা যিনি এই যাচাই-বাছাই ছাড়াই একতরফা বাতিলের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তাঁকে অবশ্যই দায় নিতে হবে। আমি স্পষ্টভাবে বলছি, এই খাত কোনো পরীক্ষামূলক খেলা নয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি আমাদের জাতীয় স্বার্থ, আমাদের ভবিষ্যৎ। তাই সরকারের উচিত এই সিদ্ধান্তগুলো পুনর্বিবেচনা করা, প্রকল্পগুলোর মূল্যায়ন পেশাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করানো এবং প্রকৃৃত বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে সম্মানজনক সমাধানে পৌঁছানো।
কালের কণ্ঠ : এই খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে কী পদক্ষেপ প্রয়োজন।
মোস্তফা আল মাহমুদ : আমরা বিএসআরইএর পক্ষ থেকে এই খাতের স্বার্থে ও দেশের ভাবমূর্তির প্রশ্নে জোরালোভাবে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বিদেশি বিনিয়োগ পেতে হলে সরকারকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নীতির ধারাবাহিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করুন এলওআই বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত বিনিয়োগ নিরুৎসাহ করে। ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করতে হবে। অনুমোদন, ট্যাক্স, সংযোগ সব সেবা এক জায়গায় দিতে হবে। রিনিউয়েবল এনার্জি স্পেশাল ইকোনমিক জোন গঠন করা অতীব প্রয়োজন। এটি করতে পারলে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব। উৎপাদন কারখানার জন্য জমি ও সুবিধা দিতে হবে। ট্যাক্স ইনসেনটিভ, প্রযুক্তি আমদানিতে শুল্ক ও করছাড় নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের চুক্তি করতে হবে। বিশেষ বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন করে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে প্রস্তুত দেখাতে হবে। বিএসআরইএ স্রেডার যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ ফোরাম গঠন করতে হবে। সরকার সাহসিকতার সঙ্গে এগোলে বাংলাদেশ শিগগিরই রিনিউয়েবল ইনভেস্টমেন্ট হাবে পরিণত হবে।
কালের কণ্ঠ : নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে চ্যালেঞ্জগুলো কী কী? সেগুলো কিভাবে সমাধান করা যায়?
মোস্তফা আল মাহমুদ : এই খাতে নীতির অস্পষ্টতা ও অস্থিরতা রয়েছে। এলওআই বাতিল, অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগ নিরুৎসাহ করছে। তাই স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। ফাইন্যান্সিং ও ব্যাংক সহায়তার সংকট সমাধান করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া বেশ কঠিন। এ জন্য গ্রিন ফাইন্যান্সে বাধ্যতামূলক ব্যাংক অংশগ্রহণ, সুদ কমানো এবং কর অবকাশ দেওয়া। নেট মিটারিং ও সংযোগে জটিলতা রয়েছে। সিস্টেম সংযোগ পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এ জন্য ডিজিটাইজড ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। গুণগত মান ও মনিটরিংয়ের ঘাটতি ও অনেক স্থানে নিম্নমানের সিস্টেম বসানো হয়। এ জন্য ইউটিলিটি প্রতিনিধি দ্বারা যৌথ ইন্সপেকশন বাধ্যতামূলক করতে হবে। দক্ষ জনবলের ঘাটতি ও প্রশিক্ষণের অভাব ও কারিগরি জ্ঞান ছাড়া সিস্টেম বসানো হয়। এ জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, টেকনিক্যাল সেন্টার ও সার্টিফিকেশন চালু করা। ভূমি ও নেটওয়ার্ক সাপোর্টের সীমাবদ্ধতা ও জমিসংকট ও গ্রিড লিমিটেশন বড় বাধা। রুফটপ, ফ্লোটিং ও আগাম পরিকল্পনায় গ্রিড উন্নয়ন করতে হবে।
কালের কণ্ঠ : রুফটপ সোলার থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে কী করা প্রয়োজন?
মোস্তফা আল মাহমুদ : এটি করতে কারখানা পর্যায়ে এনার্জি অডিট বাধ্যতামূলক করতে হবে। এতে ছাদের সম্ভাব্য ব্যবহার ও অপচয় রোধ করে সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত হবে। সোলার পারফরম্যান্স মনিটরিং সিস্টেম (এসপিএমএস) চালু করা। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে নিজেদের উৎপাদন রিয়েল টাইমে পর্যালোচনা করতে পারে। কারখানার ছাদ উপযোগী স্ট্রাকচার ডিজাইন ও স্ট্যান্ডার্ড নিশ্চিত করা। অনেক কারখানায় ছাদ পুরনো বা ভার বহনে দুর্বল, এগুলোর জন্য আলাদা গাইডলাইন থাকা উচিত। দীর্ঘমেয়াদি অ্যানুয়াল মেইনটেনেন্সে কন্ট্রাক্ট চালু করার বাধ্যবাধকতা। রুফটপ সিস্টেম ইনস্টল করেই দায়িত্ব শেষ নয়—চলমান রক্ষণাবেক্ষণ সুনিশ্চিত করতে হবে। পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানির সঙ্গে সমঝোতা সহজ করা, যাতে গ্রিডে সোলার সাপ্লাই দিতে গেলে বাড়তি বাধার মুখে না পড়তে হয়।
শিল্প খাতে রুফটপ সোলার শুধু জ্বালানি নিরাপত্তা নয়, বরং বিশ্ববাজারে গ্রিন এনার্জি শিল্প হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি গড়তেও সাহায্য করবে। আমরা বিএসআরইএর পক্ষ থেকে এই রূপান্তরে অংশ নিতে গর্ববোধ করি এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের পাশে আছি সব সময়। ‘ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুৎ’ হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানির নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। কিন্তু আজও এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা সোলার প্যানেল ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের উচ্চমূল্য। বর্তমানে প্যানেল, ইনভার্টার, স্ট্রাকচার, ওয়্যারিং, ব্যাটারি—সব কিছুরই দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বিশেষ করে যাঁদের বাড়ি গ্রামাঞ্চলে, অফ-গ্রিড এলাকায় তাঁরা এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
কালের কণ্ঠ : সোলার উন্নয়নে বাধা দূর করতে কী কী করণীয় রয়েছে?
মোস্তফা আল মাহমুদ : এই খাতের উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা সরকারকে নিতে হবে। আমদানি শুল্ক ও ভ্যাটে রেয়াত দেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক উপকরণে ৩০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত ডিউটি ও ভ্যাট আছে। তা হ্রাস পেলে দাম অনেক কমবে। স্থানীয় উৎপাদনে সহায়তা ও প্রণোদনা প্রয়োজন। দেশেই প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি উৎপাদনের জন্য সরকার ট্যাক্স হলিডে ও বিনিয়োগ সুবিধা দিলে দীর্ঘ মেয়াদে দাম কমে আসবে। ঘরভিত্তিক সাবসিডি বা সহজ কিস্তিতে সোলার প্যাকেজ সরকার নির্দিষ্ট শ্রেণির (গ্রামীণ কৃষক, শিক্ষার্থী পরিবার) জন্য ইনস্টলমেন্টভিত্তিক সোলার প্যাকেজ চালু করতে পারে। বিএসআরইএ ইডকল ও ব্যাংকসমূহকে যুক্ত করে হোম সোলার ফাইন্যান্স স্কিম চালু করতে হবে। যাতে ৩৫ বছর মেয়াদে সহজ শর্তে ঘরে ঘরে সোলার ইনস্টল সম্ভব হয়। সরকার যদি এগিয়ে না আসে, তবে ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুৎ শুধু পোস্টারে থাকবে, বাস্তবে নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য, জলবায়ু নিরাপত্তার জন্য এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য এখনই সময় সরকারের সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার।