• ই-পেপার

বিদেশি শিক্ষার্থীদের বাংলা শেখা

উচ্চারণই বড় চ্যালেঞ্জ

<li>মানজুর হোছাঈন মাহি</li>

একুশের চেতনায় ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির অবস্থা

ইলিরা দেওয়ান

একুশের চেতনায় ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির অবস্থা

মাতৃভাষায় কথা বলা, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। অথচ শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা মাতৃভাষার ওপর গুরুত্ব দিই। তাই আমরা মনে করি, আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকারের ইস্যুটি শুধু মৌসুমভিত্তিক না হয়ে সারা বছরই এটা নিয়ে কথা বলে যাওয়া উচিত

 

এবারের একুশ আমাদের কাছে ভিন্ন আঙ্গিকে এসেছে। বিগত সময়গুলোতে পয়লা ফেব্রুয়ারিতে একুশে বইমেলা শুরু হওয়া যেন রীতিতেই পরিণত হয়েছে। তাইতো ফেব্রুয়ারি মানেই মাসব্যাপী বইমেলা, নানা বইয়ের সমারোহে নিজের চেতনা, বিশ্বাস ও মনের খোরাক খুঁজে ফেরার মাস। কিন্তু এ বছর সেই রুটিনে ব্যত্যয় ঘটল। একুশের বইমেলা শুরু হবে ২০ ফেব্রুয়ারি। শীত শীত আমেজে পয়লা ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া বইমেলায় নতুন নতুন বইয়ের নতুন যে ঘ্রাণ থাকে, ফাল্গুনের হালকা উষ্ণতায় সেই ঘ্রাণে কিছুটা ভাটা পড়তে পারে!

আমরা যারা বাংলাভাষী নই, তারা সারা বছরই পেশাগত কারণে, অফিস-আদালতে আমাদের বাংলায় কথা বলতে হয়। বাংলায় হয়তো আমরা স্বচ্ছন্দে কথা বলি, কিন্তু মায়ের ভাষার মধুরতা, গভীরতা আমরা পরতে পরতে অনুভব করি। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলে তখন বাংলা ভিন্ন অন্য ভাষাগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুধাবন করি আমরা।

আমরা কথায় কথায় প্রায়ই বলে থাকি, মাতৃভাষায় কথা বলা, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। অথচ শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা মাতৃভাষার ওপর গুরুত্ব দিই। তাই আমরা মনে করি, আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকারের ইস্যুটি শুধু মৌসুমভিত্তিক না হয়ে সারা বছরই এটা নিয়ে কথা বলে যাওয়া উচিত। বর্তমানে সংবিধানে শুধু বাংলা ভাষাটি সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু বাংলা ভিন্ন আরো বহু ভাষা এদেশে আছে, সেসব ভাষার সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রশ্নেও আমাদের সোচ্চার থাকা দরকার। কারণ একেকটি জাতিসত্তার ভাষা একেক রকম। তাই সেসব ভাষার ব্যবহার, প্রয়োগ কম হলে বা ব্যবহার না থাকলে সেই ভাষাগুলো একদিন দাপুটে ভাষার কারণে হারিয়ে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকোর ৩০তম অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সাল থেকে বিশেষ মর্যাদা নিয়ে এই দিনটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলা ভাষার এই গৌরবে একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমরা যারা বাংলাভাষী নই তারাও আনন্দিত ও গর্বিত হয়েছি। কেননা এই গৌরব শুধু বাংলা ভাষার নয়, এ গৌরব এদেশের প্রতিটি মানুষের, প্রতিটি মাতৃভাষারও। মাতৃভাষার স্বীকৃতির জন্য এই জনপদ রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। তাই ভাষার মূল্য এ দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি আবেগের। ইউনেসকোর স্বীকৃতির পর এ দেশে ও বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া ভাষাগুলো সংগ্রহ করে সংরক্ষণ ও গবেষণার জন্য ২০১০ সালে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু এই ইনস্টিটিউট যতটা আড়ম্বরভাবে শুরু করা হয়েছিল, ঠিক সেভাবে এটি কাজ করতে পারেনি বলে অনেকে মনে করেন। আমাদের দেশে বাংলা ছাড়া আর কয়টি ভাষা আছে, সেটিও এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে নির্ণয় করা যায়নি। ২০১৪ সাল থেকে নৃ-ভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষার মতো এক প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল। সেই সমীক্ষা থেকে কী তথ্যপ্রাপ্তি ঘটেছে সেটিও জনগণ এখনো সঠিকভাবে অবগত নয়। এক সমীক্ষায়ই যদি বছরের পর বছর লেগে যায় তাহলে তত দিনে এ দেশের বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলো চিরতরে হারিয়ে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগ হিসেবে একটিমাত্র উদাহরণ আমাদের সামনে দৃশ্যমান, সেটা হলোজাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড থেকে (এনসিটিবি) পাঁচটি ভাষায় (চাকমা, মারমা, ককবরক, গারো ও সাদ্রি) প্রাথমিক স্তরে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বই ছাপা হয়েছে। কিন্তু বই ছাপানোই তো মুখ্য বিষয় নয়। এখানেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হয়ে আছে। যেসব ভাষায় বই ছাপা হয়েছে, সেসব ভাষার ওপর সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না থাকায় মাতৃভাষায় আদিবাসী শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের উদ্যোগটি মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। চাকমা ও মারমা ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা আছে। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই ভাষার বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত নন এবং এ বিষয়ে তাঁদের জন্য বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণের উদ্যোগও সরকারিভাবে নেওয়া হয়নি। ফলে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে গিয়ে শিশুদের পাঠদান করতে পারছেন না। এ বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারত পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থিত পিটিআই ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলো। কিন্তু পিটিআইও এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পায়নি বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। ফলে এসব আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার অধিকার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই জটিলতার বিষয়ে আমাদের প্রস্তাব হলোপ্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্তির আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সময়টাতে যাঁরা চাকমা ও মারমা ভাষার বর্ণমালার ওপর দক্ষ, তাঁদের খণ্ডকালীনভাবে সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলোতে নিয়োগ দিয়ে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাদান গতিশীল রাখা যেতে পারে।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক স্থায়ী ফোরামের মতে, বিশ্বে ছয় হাজার ৭০০ ভাষার মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে। তার মধ্যে বেশির ভাগই আদিবাসীদের ভাষা। সারা বিশ্বে নানা কারণে, বিশেষত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক কারণে আদিবাসীদের ভাষা কোনো না কোনোভাবে পিছিয়ে রয়েছে। অথচ আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যই বিশ্বকে এতটা বৈচিত্র্যময় করে রেখেছে। তাই প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ঝুঁকিতে থাকা ভাষাগুলো সংরক্ষণের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।

 

২.

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করেছে। বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে নৃগোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই শান্তি স্থাপনে পারস্পরিক আস্থা বিনির্মাণ ও সামাজিক পুনর্গঠন কর্মসূচির ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোন প্রতিষ্ঠার কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিটিভিতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেছিলেন, বিএনপি এমন একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী, পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ থাকবে। বিএনপি চেয়ারম্যানের এই বক্তব্যে নিঃসন্দেহে এত দিন ধরে যাঁরা বৈষম্যের শিকার হয়ে আস্থাহীনতায় ভুগছিলেন, তাঁদের মধ্যে একটা আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে। আমরা এখন আস্থা তৈরির সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের কাছ থেকে প্রত্যাশা করছি। আমরা আরো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, নবরূপে আসীন বিএনপি সবার আগে বাংলাদেশ স্লোগান সামনে রেখে আগামী দিনের বাংলাদেশকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশে পরিণত করবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে সব জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী, পাহাড়-সমতলের মানুষ একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তিনি আদিবাসী এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের উত্তরে এও বলেছেন, আপনারা কি বাংলাদেশি নন? অবশ্যই আপনারাও রাষ্ট্র থেকে সমান অধিকার ও মর্যাদা পাবেন। আমরা এখন এসব প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দিনগুলোর অপেক্ষায় আছি।

সব শেষে একটি কথা বলে লেখাটি শেষ করতে চাই, পাহাড় ও সমতলের ভিন্ন সংস্কৃতির গুরুত্ব শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অনুধাবন করেছিলেন বলেই ১৯৭৭ সালে বিরিশিরিতে এবং ১৯৭৮ সালে রাঙামাটিতে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট গঠন করেছিলেন। এ দেশের ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিকে শুধু সংরক্ষণ নয়, বিকাশের পথ আরো প্রশস্ত করতে হবে। ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও রীতিকে যথাযথ মর্যাদায় সুসংহত রাখলে দেশ যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি দেশের সব মানুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

লেখক : কলাম লেখক ও কমিশনার

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

 

 

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলা ভাষা

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় বিদেশিদের অবদান

সাইমন জাকারিয়া

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় বিদেশিদের অবদান
প্রচ্ছদ : তানভীর মালেক

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বঙ্গবিদ্যার চর্চা ও বিকাশে যেমন দেশীয় গবেষকদের ধারাবাহিক শ্রম আছে, তেমনি আছে বহু অবাঙালি বিদেশি গবেষক ও অনুবাদকের দীর্ঘমেয়াদি নিবেদন ও অবদান, যাঁরা বাংলার ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির বহুমাত্রিক পাঠকে জাতীয় সীমানার বাইরে নিয়ে গিয়ে বিশ্বমানচিত্রে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন

 

বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা আজ একটি আন্তর্জাতিক বিদ্যাক্ষেত্র, যেখানে ভাষাতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব, পারফরম্যান্স স্টাডিজ, লোকসংস্কৃতি, অনুবাদবিদ্যা ও ইতিহাসচর্চা একসূত্রে মিশেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বঙ্গবিদ্যার চর্চা ও বিকাশে যেমন দেশীয় গবেষকদের ধারাবাহিক শ্রম আছে, তেমনি আছে বহু অবাঙালি বিদেশি গবেষক ও অনুবাদকের দীর্ঘমেয়াদি নিবেদন ও অবদান, যাঁরা বাংলার ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির বহুমাত্রিক পাঠকে জাতীয় সীমানার বাইরে নিয়ে গিয়ে বিশ্বমানচিত্রে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন। এই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বঙ্গবিদ্যাচর্চার ইতিহাসকে যদি পর্যায়ক্রমে দেখা যায়, তাহলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়প্রথমে ভাষা সমীক্ষা ও উপভাষা নথিভুক্তিকরণ, পরে ধর্মসাহিত্য ও মধ্যযুগীয় কাব্যতত্ত্বের গভীর পাঠ, তার পরে লোকধর্ম-সাধকসংস্কৃতি-ওয়াজ মাহফিলের মতো জনপ্রিয় ধর্মভাষ্য বিশ্লেষণ, এবং একই সঙ্গে আধুনিক কবিতা-উপন্যাস-অনুবাদের মাধ্যমে বাংলার জ্ঞানবিদ্যার অধ্যয়ন একটি বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক জ্ঞানক্ষেত্রে উন্নীত হয়েছে।

ঔপনিবেশিক যুগে বাংলা ভাষাকে বৈজ্ঞানিক ভাষাতাত্ত্বিক কাঠামোতে হাজির করার একটি বড় নজির জর্জ এ গিয়ারসনের Linguistic Survey of India ধারাটি। উপভাষা, ভাষাবৈচিত্র্য, ধ্বনিরূপ এবং ঐতিহাসিক বিবর্তনএইসব বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগ তৈরি হওয়ার ফলে বাংলা শুধু একটি সাহিত্যভাষা হিসেবে নয়, একটি গবেষণাযোগ্য ভাষাতাত্ত্বিক বাস্তবতা হিসেবে আন্তর্জাতিক পাঠে উপস্থিত হতে থাকে। একই সময়ে সাংস্কৃতিক সংযোগের আরেকটি প্রবাহে রুশ পণ্ডিত গেরাসিম লেবেদেফ বাংলা নাট্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন, কলকাতায় ইউরোপীয় প্রোসেনিয়াম ধাঁচে বাংলা নাট্য মঞ্চায়নের অগ্রপথিক হিসেবে তাঁকে বহু প্রামাণ্য আলোচনায় স্মরণ করা হয় বিশেষত ১৭৯৫ সালের থিয়েটার পর্বের প্রাসঙ্গিকতায়। উল্লেখ্য, তিনি নাট্যচর্চার পাশাপাশি রুশ ভাষায় ভরতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যের একটি অংশের অনুবাদ সম্পন্ন করেন। তাঁর পরবর্তীকালে আরো কয়েকজন রুশ পণ্ডিত বাংলা ব্যাকরণ ও অভিধান প্রণয়ন থেকে শুরু করে নানামুখী গবেষণা, অনুবাদ সম্পন্ন করেছেন। প্রথম পর্বে প্রত্যক্ষ করা যায়, একদিকে ভাষার নথিভুক্তিকরণ ও শ্রেণিবিন্যাস, অন্যদিকে নগর নাট্যচর্চা, অনুবাদ ও সাংস্কৃতিক আধুনিকতার প্রাথমিক ইতিহাসের পথ ধরেই বাংলার জ্ঞানবিদ্যার বিষয়সমূহ আন্তর্জাতিক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করে।

এই পর্যায়ে একটি ব্যতিক্রমী ও অত্যন্ত ঐতিহাসিক অবদান হিসেবে উঠে আসে ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট জেমস ড্রামন্ড অ্যান্ডারসনের (১৮৫২-১৯২০) কাজ। সংক্ষেপে জে ডি অ্যান্ডারসন নামে পরিচিত এই গবেষকের উদ্যোগে চট্টগ্রামী উপভাষা ও লোকজ প্রবাদচর্চা প্রথমবারের মতো গ্রন্থাকারে প্রামাণ্যভাবে হাজির হয়। তাঁর সংকলন-সম্পাদিত গ্রন্থ  Some Chittagong Proverbs (উপশিরোনাম : As an Example of the Dialect of the Chittagong District)

নিছক প্রবাদ-সংগ্রহ নয়; এটি চট্টগ্রাম জেলার উপভাষাগত বৈশিষ্ট্য, ধ্বনিগত রূপ এবং বাক্যরীতির একটি প্রাথমিক ভাষাতাত্ত্বিক দলিলও। গ্রন্থটি কলকাতার ৪৬ বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটের হেয়ার প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়; মুদ্রক-প্রকাশক ছিলেন আর দত্ত। এই কাজের গুরুত্ব সমকালেই স্বীকৃতি পায়মাঘ ১৩১২ বঙ্গাব্দে (১৯০৫ খ্রি.) বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকায় আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ তাঁর চট্টগ্রামী ছেলে ঠকান ধাঁধা প্রবন্ধে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, চট্টগ্রামী প্রবাদ বিষয়ে অ্যান্ডারসনের গ্রন্থই পথিকৃৎ; তিনি গ্রন্থটির প্রশংসা করে লিখেছেন, লোকমুখ থেকে সংগ্রহ করেই অ্যান্ডারসন সাহেব এই সুন্দর গ্রন্থ বঙ্গসাহিত্য ভাণ্ডারে উপহার দিয়ে গেছেন। এই গ্রন্থটিতে চট্টগ্রামী উপভাষা ও প্রবাদচর্চার একটি মৌলিক দলিল আন্তর্জাতিক গবেষণা পরিসরে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

ঔপনিবেশিক ভাষা-সমীক্ষার পরবর্তী ধারায় বাংলা অধ্যয়নের কেন্দ্রভূমি ধীরে ধীরে মধ্যযুগীয় ধর্মসাহিত্য, লোকধর্ম এবং পাঠ-ব্যাখ্যার তাত্ত্বিক স্তরে প্রসারিত হয়। এই ক্ষেত্রে আমেরিকান পণ্ডিত এডওয়ার্ড সি ডিমোক  (Edward C Dimock Jr.) বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর The Place of the Hidden Moon: Erotic Mysticism in the Vaisnava-Sahaji‚ a Cult of Bengal-G বৈষ্ণব সহজিয়া ধারার দেহতত্ত্ব, আধ্যাত্মিক অনুশীলন এবং ভাববাদী কাঠামোর গভীর বিশ্লেষণ পাওয়া যায়, যা বাংলার মধ্যযুগীয় ধর্মসাহিত্যকে শুধু ভক্তি বা সংস্কার-এর সরল পাঠ থেকে তুলে এনে জটিল ধর্মতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক তত্ত্বালোচনার পরিসরে স্থাপন করে। ডিমোকের আরেকটি বড় অবদান The Thief of Love: Bengali Tales from Court and Village, যেখানে বাংলা আখ্যান-ঐতিহ্যকে ইংরেজি পাঠে সুসম্পাদিতভাবে হাজির করে তিনি লোক-আখ্যান ও দরবারি-গ্রামীণ কথনধারাকে বিশ্বপাঠে দৃশ্যমান করেন। ফলে বাংলা সাহিত্যকে শুধু অনুবাদের বস্তু নয়, বিশ্বসাহিত্যের আলোচনায় তর্কযোগ্য টেক্সট হিসেবে দাঁড় করানোর ভিত্তি আরো মজবুত হয়।

মধ্যবাংলা কাব্য ও বহুভাষিক সাহিত্য-পরিবেশ বিশ্লেষণে ফরাসি গবেষক ড. থিবো দুবের বিদ্যাবিনোদ-এর কাজ এই আন্তর্জাতিক পাঠভূমিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাঁর মনোগ্রাফ In the Shade of the Golden Palace: Alaol and Middle Bengali Poetics in Arakan-এ আলাওলকে কেন্দ্র করে আরাকান রাজসভা, অনুবাদপ্রক্রিয়া, এবং মধ্যবাংলা কাব্যতত্ত্বের সূক্ষ্ম পাঠ হাজির করা হয়েছে। এর ফলে আরাকান পর্বকে প্রান্তিক ইতিহাস হিসেবে না দেখে মধ্যবাংলা সাহিত্যের বহুভাষিক ও আন্তঃসাংস্কৃতিক নির্মাণপ্রক্রিয়ার এক কেন্দ্রীয় পরিসর হিসেবে বোঝা যায়।

এর পরের পর্যায়ে লোকধর্ম, সাধকসংস্কৃতি ও পারফরম্যান্সএই ত্রয়ীকে কেন্দ্র করে বাংলা অধ্যয়নের আন্তর্জাতিকতা আরো বহুমাত্রিক হয়। ইতালির গবেষক ড. ক্যারোলা এরিকা লোরেয়া বাংলার সাধক-গান ও লোকধর্মকে পারফরম্যান্স এবং সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বের রাজনীতির আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর পিএইচডিভিত্তিক গ্রন্থ  Folklore, Religion and the Songs of a Bengali Madman

 ভবা পাগলার গানের রেপার্টরি, সামাজিক অবস্থান এবং লোকধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত, যা দেখায় পাগলামি বা মরমি পরিচয় আসলে কিভাবে সমাজে অর্থ পায়, এবং গান কিভাবে একাধারে নন্দন, ধর্মাচরণ ও পরিচয় প্রকাশের মাধ্যম হয়ে ওঠে। পাশাপাশি মতুয়া সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, স্থানচাতি/পরিচয়-ইতিহাস ও ধর্মীয় জীবন নিয়ে তাঁর গবেষণা Oxford Research Encyclopedia- ‘Religion, Caste, and Displacement: The Matua Community’

নিবন্ধে বিস্তৃতভাবে ধরা পড়ে, সীমান্তাঞ্চল/দ্বীপাঞ্চলের বর্ডারল্যান্ড অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর আলোচনা

 Kzoto Review of Southeast Asia-তেও প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হিসেবে পাওয়া যায়।

গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ ও সাধকদের জীবনী গবেষণায় আমেরিকার ড. রেবেকা জে মানরিংয়ের কাজ বাংলা ধর্ম-ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা খুলে দেয়। তিনি অদ্বৈত আচার্যকে ঘিরে জীবনীগাথা, পরম্পরাগ্রন্থ এবং আধুনিক কালে ঐতিহ্য পুনর্গঠনের রাজনীতি বিশ্লেষণ করেছেন, যার প্রতিফলন

Reconstructing Tradition: Advaita Acarya and Gaudi ‚a Vaisnavis...

এবং The Fading Light of Advaita Acarya-‰র মতো গ্রন্থে স্পষ্ট। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ধর্মীয় পরম্পরা শুধু অতীতের উত্তরাধিকার নয়; এটি আধুনিক সময়েও নানা সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ভেতর দিয়ে পুনর্গঠিত হয়, এই ধারণা বাংলা বৈষ্ণব ইতিহাসকে নতুন দৃষ্টিতে পড়তে সাহায্য করে।

বাংলাদেশের সমকালীন জনপরিসরের ধর্মভাষ্যকে আন্তর্জাতিক গবেষণায় তোলার ক্ষেত্রে জার্মান গবেষক ড. ম্যাক্স স্টিলের কাজ উল্লেখযোগ্য। তাঁর গ্রন্থ Islamic Sermons and Public Piety in Bangladesh: The Poetics of Popular Preaching

 ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে মাঠ সমীক্ষা, সাক্ষাৎকার এবং বয়ান-আর্কাইভ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখায় কিভাবে ওয়াজ মাহফিল জনপ্রিয় ধর্মচর্চা, আবেগ, নীতিশিক্ষা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক জনপরিসর নির্মাণে ভূমিকা রাখে।

একই সময়ে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক পাঠ নির্মাণে অনুবাদ ও জীবনী-সমালোচনার মাধ্যমে বড় ভূমিকা পালন করেছেন ক্লিন্টন বি সিলি। জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে তাঁর সাহিত্যজীবনী A Poet Apart: A Literary Biography of the Bengali Poet Jibanananda Das  আধুনিক বাংলা কবিতাকে বিশ্বসাহিত্যের আলোচনায় আরো দৃঢ়ভাবে স্থাপন করে। পাশাপাশি তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য ইংরেজিতে অনুবাদ করেন Oxford University Press

-এর The Slaying of Meghanada হিসেবে। তাঁর গবেষণার মাধ্যমে একদিকে আধুনিক কবিতার প্রামাণ্য ধারার পরিচয়, অন্যদিকে বাংলা রেনেসাঁর মহাকাব্যিক প্রকল্প বিশ্বভাষায় প্রবেশ করে দুই স্তরেই আন্তর্জাতিক পরিসর বিস্তৃত হয়।

রবীন্দ্র সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদ ও বাংলা সাহিত্য পরিচিতিতে উইলিয়াম রাদিচির ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরে বিশেষভাবে আলোচিত। তিনি রবীন্দ্র অনুবাদে সুপরিচিত; পাশাপাশি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্যের অনুবাদ  The Poem of the Killing of Meghnad (Penguin India, 2010 )-এর মাধ্যমে এই ক্লাসিককেও বিশ্বপাঠে পৌঁছে দেন। অনুবাদ এখানে শুধু ভাষান্তর নয়, এটি পাঠপ্রথা নির্মাণ, ব্যাখ্যামূলক সিদ্ধান্ত এবং সাহিত্যরুচির আন্তর্জাতিক বিনিময়এইসবের সমষ্টি। তাই রাদিচির মতো অনুবাদকরা বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বপরিসরে পাঠযোগ্য করে তোলার সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো নির্মাণে অংশ নেন।

এই ধারাবাহিক ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, অবাঙালি গবেষকদের অবদান বাংলা অধ্যয়নকে শুধু ভাষাশিক্ষা বা অনুবাদ-এর সীমায় আটকে রাখেনি; বরং তারা বাংলা পাঠকে তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী করেছে, আন্তর্জাতিক আর্কাইভে দলিল হিসেবে স্থাপন করেছে এবং সমকালীন জনপরিসর থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় ধর্মসাহিত্যসব ক্ষেত্রেই নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ফলে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক পরিসর একটি একমুখী বিদেশি আগ্রহ নয়এটি যুগপৎ গবেষণা, অনুবাদ, আর্কাইভ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পারফরম্যান্স-পরম্পরার দীর্ঘ আন্ত সংযোগে গড়ে ওঠা এক সক্রিয় বিশ্বজ্ঞানক্ষেত্র।

 

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলা ভাষা

বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার প্রভাব নেই কেন?

আহমাদ মাযহার

বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার প্রভাব নেই কেন?
প্রচ্ছদ : তানভীর মালেক

বাংলাভাষীর সংখ্যা পৃথিবীতে ২৫ কোটিরও বেশি। সেই অর্থে বাংলা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ভাষা। কিন্তু এত সংখ্যক মানুষের ভাষা হয়েও ভাষাটি যে তেমন প্রভাবশালী নয়, তা আমরা জানি। সবাই জানেন, ভাষার প্রভাব নির্ধারিত হয় কয়েকটি কাঠামোগত শক্তি দ্বারা। তার একটি রাষ্ট্রীয় ও ভূ-রাজনৈতিক শক্তি

 

উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ বাংলায় কথা বললেও বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার প্রভাব নেই কেন? এই প্রশ্নটি শুধু ভাষাতাত্ত্বিক নয়; এটি সাংস্কৃতিক ক্ষমতা, জ্ঞান উৎপাদন ও বিশ্বরাজনীতির প্রশ্ন। এর পটভূমি বিবেচনা করলে দেখা যাবে, এর গভীরে রয়েছে সংস্কৃতি, জ্ঞান নির্মাণ ও অভিবাসী জীবনবোধের পরিসর।

বাংলাভাষীর সংখ্যা পৃথিবীতে ২৫ কোটিরও বেশি। সেই অর্থে বাংলা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ভাষা। কিন্তু এত সংখ্যক মানুষের ভাষা হয়েও ভাষাটি যে তেমন প্রভাবশালী নয়, তা আমরা জানি। সবাই জানেন, ভাষার প্রভাব নির্ধারিত হয় কয়েকটি কাঠামোগত শক্তি দ্বারা। তার একটি রাষ্ট্রীয় ও ভূ-রাজনৈতিক শক্তি। প্রসঙ্গত আমরা ধরে নিতে পারি, ইংরেজি বিশ্বভাষা হয়েছে শুধু ভাষাগত উৎকর্ষের কারণে নয়; বরং ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ও পরে মার্কিন অর্থনৈতিক-সামরিক আধিপত্যের কারণে। যেমন United Kingdom I United States

এ দুই রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক প্রভাব ইংরেজিকে বিশ্ব-ব্যবসা, বিজ্ঞান ও কূটনীতির ভাষা করেছে। এতগুলো ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষাটি চর্চিত হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। যাপিত জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে আছে ইংরেজি ভাষা। ফলে কিছু ভাবতে গেলে আমাদের মনে বাংলা ভাষাটি ডিঙিয়ে ইংরেজি চলে আসে।

বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার প্রধান রাষ্ট্র বাংলাদেশ। ভারতের প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গও বাংলা ভাষা প্রধান। কিন্তু এর কোনোটিই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বা সামরিক শক্তির কেন্দ্র নয়। ফলে ভাষাটিও ক্ষমতার ভাষা হয়ে উঠতে পারেনি। অন্যদিকে জ্ঞান উৎপাদন ও গবেষণার ভাষার দিক বিবেচনা করলে আমরা দেখতে পাব, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, প্রযুক্তি, বিজ্ঞানএসব ক্ষেত্রের প্রধান ভাষা হিসেবে বাংলার তেমন স্থান নেই। এর বাহন ইংরেজি।

বাংলায় গবেষণা হয়, কিন্তু তা বিশ্বের জ্ঞানপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে না। যেমনজাদুঘরে জাদুঘরে ঘুরতে গিয়ে কিউরেশন প্রসঙ্গে আমার মনে হয়েছিল, নির্বাচনই ক্ষমতা। অথচ বৈশ্বিক জার্নাল, র্যাংকিং, উদ্ধৃতি প্রথাএই সবই ইংরেজি ভাষা কেন্দ্রিক। ফলে বাংলা ভাষা জ্ঞান উৎপাদন করলেও তা বৈশ্বিক আর্কাইভে ঢুকতে পারে না। কারণ ক্ষমতা-কাঠামোর স্বভাবের কারণে বাংলা ভাষার সামগ্রী বৈশ্বিক আর্কাইভে নির্বাচিত হতে পারে না!

আরো একটি দিক থেকে বিবেচনা করতে গেলে বলা যায়, ভাষা তখনই প্রভাবশালী হয়, যখন তা আন্তর্জাতিক বাজারের ভাষা হয়ে ওঠে। এখন চীনা ভাষা (ম্যান্ডারিন) যেমন চীনদেশের অর্থনৈতিক উত্থানের কারণে বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু বাংলাভাষী মানুষ বিপুল হলেও কখনো তারা বিশ্ববাজারের কেন্দ্রীয় ক্রেতা বা বিনিয়োগশক্তি নয়।

অন্যদিকে আমরা দেখছি যে, জাপানি বা কোরীয় সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এর কারণ, তারা সাংস্কৃতিক পণ্য (যেমনচলচ্চিত্র, এনিমেশন, পপসংস্কৃতি) বিশ্ববাজারে রপ্তানি করে চলছে। বাংলা ভাষায় এত মানুষ কথা বললেও বাংলার সংস্কৃতি বিশ্বপরিসরে কতটাই বা স্থান নিতে পারে!

একবার যদি ভেবে দেখি, বাংলা সাহিত্য বিশ্বে কতটা অনূদিত? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেলজয়ী হলেও তাঁর পরবর্তী বাংলা সাহিত্য ধারাবাহিকভাবে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করতে পারেনি। এর একটা কারণ আমাদের অনুবাদ-অবকাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। আমি নিজে অভিবাসী জীবন যাপন করতে গিয়ে লক্ষ করেছি, এটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অভিবাসী বাংলাভাষীরা সংখ্যায় বড় হলেও প্রভাব-রাজনীতিতে তারা তুলনামূলকভাবে কম সংগঠিত। লক্ষ করেছি যে, ভারতীয় ডায়াসপোরা ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে করপোরেট ও প্রযুক্তি জগতে প্রভাব ফেলেছে। পক্ষান্তরে বাংলা ডায়াসপোরা এখনো সেই মাত্রায় নীতিনির্ধারণী পরিসরের ধারেকাছে দৃশ্যমান নয়।

সংখ্যাগতভাবে বাংলা হয়তো একেবারে অপ্রভাবশালী নয়। যেমননিউ ইয়র্কের মতো মহামহানগরীতে সরকারি নানা নির্দেশনা এখন ইংরেজি, স্প্যানিশ, চীনা ভাষার পাশাপাশি বাংলায়ও লেখা থাকছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক গভীরতায় বৈশ্বিক ক্ষমতা পরিসরে বাংলার প্রভাব সামান্য তো বটেই, খুব সীমাবদ্ধও। সংস্কৃতি, রুচি, জ্ঞানচর্চা ও শুভবুদ্ধির অভাব নিয়ে ভাবতে গেলে আমাদের মনে প্রশ্নটি আরো গভীর হয়ে ওঠেআমরা কি ভাষাকে শুধু আবেগের পরিচয় হিসেবে দেখি, নাকি জ্ঞান উৎপাদনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করতে পারি? এতসব দিক পর্যালোচনার পর আমরা যদি নিজেদেরই প্রশ্ন করি, কোনো ভাষার প্রভাব কি বিশ্ববাজারে দৃশ্যমানতা দিয়ে মাপা হবে? নাকি মাপা হবে ভাষার ভেতরে সৃষ্ট বৌদ্ধিক ঘনত্ব দিয়ে? মাতৃভাষার প্রয়োগে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে দেশীয় ও বৈশ্বিক পরিসরে এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে হবে। তাহলে হয়তো কোনো এক দিন বাংলা ভাষাও বিশ্বের প্রভাবশালী ভাষা হয়ে উঠবে; হয়ে থাকবে না হীনম্মন্য এক মাতৃভাষা মাত্র!

 

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলা ভাষা

বিদেশে বাংলার চৌকাঠ

শামীম আজাদ

বিদেশে বাংলার চৌকাঠ
প্রচ্ছদ : তানভীর মালেক

তিন দশকের বেশি সময় হলো আমি বিদেশে আছি। আমি ইংরেজিতেই পড়াই, লেখাই, দুনিয়া দেখাই আর নিজে লেখালেখি করি ইংরেজির সঙ্গে বাংলায়ই। সেই কবে পূর্বাচল ছাড়িয়ে বাইরে যাত্রা করার সময় আমার আঁচলে কী বেঁধে দিয়েছিলেন মা? বাংলা বর্ণমালা। আজ উপলব্ধি করি; মাতৃভাষাটা মননে জাগিয়ে রাখলে যতটা যাওয়ার ততটাই যাওয়া যায়

 

আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙ্গালী বলেছিলেন জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। মনীষী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের একজন স্মরণীয় বাঙালি ব্যক্তিত্ব, ভাষাবিজ্ঞানী, বহুভাষাবিদ, শিক্ষক ও ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ।

আমি সেই বাঙালি-চোখে বিশ্ব দেখি। ভিনদেশে বসবাস করা মানুষের দৃষ্টি যেমন বৈশ্বিক হয়ে উঠতে পারে, তেমনি তার ভাষা, যৌনতা, জীবন, জগৎ, জাত ও ধর্ম নিয়ে কুটোর মতো হলেও কিছু অন্তর্জ্বালা থাকতেই পারে। আর এর সবই নির্ধারণ করে দিয়েছেন তাদের পূর্বে আসা পুরুষ ও পুরোহিতরা। পূর্বপুরুষ ও নাড়ির ভাষাসূত্রেই তারপর তা হয় সংগঠিত।

ইংরেজিই বিলেতে লিঙ্গুয়াফ্রাংকা। তিন দশকের বেশি সময় হলো আমি বিদেশে আছি। আমি ইংরেজিতেই পড়াই, লেখাই, দুনিয়া দেখাই আর নিজে লেখালেখি করি ইংরেজির সঙ্গে বাংলায়ই। সেই কবে পূর্বাচল ছাড়িয়ে বাইরে যাত্রা করার সময় আমার আঁচলে কী বেঁধে দিয়েছিলেন মা? বাংলা বর্ণমালা। আজ উপলব্ধি করি; মাতৃভাষাটা মননে জাগিয়ে রাখলে যতটা যাওয়ার ততটাই যাওয়া যায়। বৈরী আবহাওয়ায়ও নিজ ভাষাই হতে পারে তার সংস্থান, জোগান ও পরিচয়।

বিলেতে বাংলাদেশি বাঙালির অভিবাসন সেই অবিভক্ত ভারতের কাল থেকেই। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে তা দৃশ্যমান হয়। মি কোরাইশী ১৯৩৯ সালে প্রথম স্থাপন করেন বাংলা কারি রেস্তোরাঁ। বন্ধু ও লেখক ক্যারোলাইন অ্যাডামসের অ্যাক্রোস সেভেন সিজ অ্যান্ড থার্টিন রিভার্স পড়েই আমাদের সেইসব অবিস্মরণীয় বাঙালি স্থাপনাকারীর লড়াই নিয়ে জ্ঞাত হই। মুক্তিযুদ্ধের সময় উনিশবর্ষিয়া তরুণী ক্যারোলাইন ভারতে বাংলাদেশের শরণার্থীশিবিরে শিশু-কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে কাজ করেছেন। সেই থেকে তাঁর বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা প্রেম। এদিকে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের পর ইংল্যান্ডই ছিল বাংলাদেশের তৃতীয় ঘাঁটি। আজ পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকতার হয়নি ব্যত্যয়। জনসংখ্যার দিক থেকেও বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার পরই এখানে অধিকসংখ্যক বাঙালির আবাস। বিলেতের প্রবাদ ব্যক্তিত্ব তসাদ্দুক আহমেদ এমবিইর অনুপ্রেরণায় বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসের ব্রিকলেনের রাস্তার নামফলকে ইংরেজির পাশাপাশি এসেছে বাংলা।

১৯৯০-এ বিলেতে পড়াতে এসে স্কুলের নাম কবি নজরুল, বঙ্গবন্ধু, ওসমানী ও শাপলা শুনে বিস্মিত ও বিহ্বল হয়ে যাই। নারী সংগঠন চালনার দালানটার নাম ছিল জাগো নারী! দেখি স্কুলে বিলেতি কারিকুলম পাঠ শেষে ছেলেমেয়েরা যায় বাংলা স্কুলে। ক্রমে সরকারের শিক্ষা বোর্ডের সমর্থনে এ দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকেও ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে বাংলা যুক্ত হয়েছে। জনগণের অর্থে ও কাউন্সিলের জায়গায় হোয়াইট চ্যাপেল সড়কে, পূর্ব লন্ডনে ও ম্যানচেস্টারের ওল্ডহ্যামে নির্মিত হয়েছে ভাষাশহীদ স্মৃতি স্মারক শহীদ মিনার। আজ পর্যন্ত বিলেতে বাঙালির দ্রোহ, দাহ, শ্রদ্ধা ও আনন্দ প্রকাশের অন্যতম বেদিস্থান এই শহীদ মিনার। বাংলাদেশের ৫০ বছর পালনের সময় হোয়াইট চ্যাপেল আইডিয়া স্টোর লাইব্রেরি ও লার্নিং সেন্টারে বাংলা শব্দের এক যে অভাবিত আলোকসজ্জা শুরু হয়েছিল, তা এখনো জ্বলজ্বল করছে।

দুই বছর আগে ওয়াপিংয়ের একটি ভবনের নাম দেওয়া হয় বর্ণ দাঙ্গায় শহীদ আলতাব আলীর নামে। শেকসপিয়ারের বাড়ির উঠানে, স্ট্রাটফোর্ড আপ অন এভনে আছে রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ স্থাপত্য। বাংলা টাউন গেটের পাশে ব্রিকলেনে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা হোপ টাউনের (আশানগর) সঙ্গে দেয়ালে ব্রিটিশ বাংলাদেশি শিল্পী মোহাম্মদ আলী এমবিই করেছেন মাটির টানে ম্যুরাল। তাতে বাংলাদেশের নৌকা, মাঝি, চা-বাগান, সিলেটের ঐতিহাসিক কিন ব্রিজ স্থান পেয়েছে। মেয়র জন বিগস টাওয়ার হ্যামলেটসের হোয়াইট চ্যাপেল স্টেশনে ইংরেজির নামের পাশে বাংলায় সাইন পোস্ট করা হয়েছে। কোনো কারণে তা উৎপাটন না করলে থাকবে শত বছর।

আমরা বাঙালিরা কোনো রকম অর্থব্যয়, পারিতোষিক, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা ট্রেনিং ছাড়াই জন্মসূত্রে পেয়ে গেছি এন্তার সম্ভাবনাময় বাংলা ভাষার মধুর হাঁড়ি। এই ভাষা টিকিয়ে রাখতে আজ আমাদের চর্চা ছাড়া আর কিছুই করতে হচ্ছে না। তাই এত সহজলভ্য ও অনায়াস বলেই কি বাংলাদেশে আমাদের কাছে বাংলা ভাষার দাম কমে যাচ্ছে? দেশে গেলে দেখি, সেখানেই অনেক পরিবার ও সামাজিক মাধ্যমে চালু হয়েছে অদ্ভুত এক অশ্রাব্য ভাষা। আসলে ধর্মের মতো গুরুত্ব দিয়ে সন্তানকে নিজের সংস্কৃতি শেখাতে হয়। রুচি শেখানো যায় না, রুচির মধ্যে বেড়ে উঠতে দিতে হয়।

এই পরিযায়ী জীবনে, রাতে, শীতে, ঘামে, প্রীতে, বিনয়ে, দুর্বিনয়ে এক দিনের জন্যও আমার জন্মদেশ ও জন্মভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হইনি। হইনি নিজ স্বার্থেই। অ্যানড্রয়েড থেকে ডিজিটাল যুগে এসে ইঞ্চি ইঞ্চি করে বেড়েছে আমার সম্পৃক্ততা। আজ বৈশ্বিক বিশ্ব আর দৈহিক ভূগোল বা মানচিত্রের মধ্যে আটকে নেই। তাই সীমানার বাইরের মানুষদের বাংলা ভাষার সব অর্জনও সঞ্চিত হয় বাংলাদেশেই, দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে।