মাতৃভাষায় কথা বলা, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। অথচ শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা মাতৃভাষার ওপর গুরুত্ব দিই। তাই আমরা মনে করি, আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকারের ইস্যুটি শুধু মৌসুমভিত্তিক না হয়ে সারা বছরই এটা নিয়ে কথা বলে যাওয়া উচিত
এবারের একুশ আমাদের কাছে ভিন্ন আঙ্গিকে এসেছে। বিগত সময়গুলোতে পয়লা ফেব্রুয়ারিতে একুশে বইমেলা শুরু হওয়া যেন রীতিতেই পরিণত হয়েছে। তাইতো ফেব্রুয়ারি মানেই মাসব্যাপী বইমেলা, নানা বইয়ের সমারোহে নিজের চেতনা, বিশ্বাস ও মনের খোরাক খুঁজে ফেরার মাস। কিন্তু এ বছর সেই রুটিনে ব্যত্যয় ঘটল। একুশের বইমেলা শুরু হবে ২০ ফেব্রুয়ারি। শীত শীত আমেজে পয়লা ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া বইমেলায় নতুন নতুন বইয়ের নতুন যে ঘ্রাণ থাকে, ফাল্গুনের হালকা উষ্ণতায় সেই ঘ্রাণে কিছুটা ভাটা পড়তে পারে!
আমরা যারা বাংলাভাষী নই, তারা সারা বছরই পেশাগত কারণে, অফিস-আদালতে আমাদের বাংলায় কথা বলতে হয়। বাংলায় হয়তো আমরা স্বচ্ছন্দে কথা বলি, কিন্তু মায়ের ভাষার মধুরতা, গভীরতা আমরা পরতে পরতে অনুভব করি। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলে তখন বাংলা ভিন্ন অন্য ভাষাগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুধাবন করি আমরা।
আমরা কথায় কথায় প্রায়ই বলে থাকি, মাতৃভাষায় কথা বলা, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। অথচ শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা মাতৃভাষার ওপর গুরুত্ব দিই। তাই আমরা মনে করি, আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকারের ইস্যুটি শুধু মৌসুমভিত্তিক না হয়ে সারা বছরই এটা নিয়ে কথা বলে যাওয়া উচিত। বর্তমানে সংবিধানে শুধু বাংলা ভাষাটি সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু বাংলা ভিন্ন আরো বহু ভাষা এদেশে আছে, সেসব ভাষার সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রশ্নেও আমাদের সোচ্চার থাকা দরকার। কারণ একেকটি জাতিসত্তার ভাষা একেক রকম। তাই সেসব ভাষার ব্যবহার, প্রয়োগ কম হলে বা ব্যবহার না থাকলে সেই ভাষাগুলো একদিন দাপুটে ভাষার কারণে হারিয়ে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকোর ৩০তম অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সাল থেকে বিশেষ মর্যাদা নিয়ে এই দিনটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলা ভাষার এই গৌরবে একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমরা যারা বাংলাভাষী নই তারাও আনন্দিত ও গর্বিত হয়েছি। কেননা এই গৌরব শুধু বাংলা ভাষার নয়, এ গৌরব এদেশের প্রতিটি মানুষের, প্রতিটি মাতৃভাষারও। মাতৃভাষার স্বীকৃতির জন্য এই জনপদ রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। তাই ভাষার মূল্য এ দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি আবেগের। ইউনেসকোর স্বীকৃতির পর এ দেশে ও বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া ভাষাগুলো সংগ্রহ করে সংরক্ষণ ও গবেষণার জন্য ২০১০ সালে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু এই ইনস্টিটিউট যতটা আড়ম্বরভাবে শুরু করা হয়েছিল, ঠিক সেভাবে এটি কাজ করতে পারেনি বলে অনেকে মনে করেন। আমাদের দেশে বাংলা ছাড়া আর কয়টি ভাষা আছে, সেটিও এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে নির্ণয় করা যায়নি। ২০১৪ সাল থেকে নৃ-ভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষার মতো এক প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল। সেই সমীক্ষা থেকে কী তথ্যপ্রাপ্তি ঘটেছে সেটিও জনগণ এখনো সঠিকভাবে অবগত নয়। এক সমীক্ষায়ই যদি বছরের পর বছর লেগে যায় তাহলে তত দিনে এ দেশের বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলো চিরতরে হারিয়ে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগ হিসেবে একটিমাত্র উদাহরণ আমাদের সামনে দৃশ্যমান, সেটা হলো—জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড থেকে (এনসিটিবি) পাঁচটি ভাষায় (চাকমা, মারমা, ককবরক, গারো ও সাদ্রি) প্রাথমিক স্তরে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বই ছাপা হয়েছে। কিন্তু বই ছাপানোই তো মুখ্য বিষয় নয়। এখানেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হয়ে আছে। যেসব ভাষায় বই ছাপা হয়েছে, সেসব ভাষার ওপর সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না থাকায় মাতৃভাষায় আদিবাসী শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের উদ্যোগটি মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। চাকমা ও মারমা ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা আছে। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই ভাষার বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত নন এবং এ বিষয়ে তাঁদের জন্য বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণের উদ্যোগও সরকারিভাবে নেওয়া হয়নি। ফলে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে গিয়ে শিশুদের পাঠদান করতে পারছেন না। এ বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারত পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থিত পিটিআই ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলো। কিন্তু পিটিআইও এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পায়নি বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। ফলে এসব আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার অধিকার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই জটিলতার বিষয়ে আমাদের প্রস্তাব হলো—প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্তির আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সময়টাতে যাঁরা চাকমা ও মারমা ভাষার বর্ণমালার ওপর দক্ষ, তাঁদের খণ্ডকালীনভাবে সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলোতে নিয়োগ দিয়ে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাদান গতিশীল রাখা যেতে পারে।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক স্থায়ী ফোরামের মতে, বিশ্বে ছয় হাজার ৭০০ ভাষার মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে। তার মধ্যে বেশির ভাগই আদিবাসীদের ভাষা। সারা বিশ্বে নানা কারণে, বিশেষত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক কারণে আদিবাসীদের ভাষা কোনো না কোনোভাবে পিছিয়ে রয়েছে। অথচ আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যই বিশ্বকে এতটা বৈচিত্র্যময় করে রেখেছে। তাই প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ঝুঁকিতে থাকা ভাষাগুলো সংরক্ষণের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।
২.
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করেছে। বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে নৃগোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই শান্তি স্থাপনে পারস্পরিক আস্থা বিনির্মাণ ও সামাজিক পুনর্গঠন কর্মসূচির ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোন প্রতিষ্ঠার কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিটিভিতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘বিএনপি এমন একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী, পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ থাকবে।’ বিএনপি চেয়ারম্যানের এই বক্তব্যে নিঃসন্দেহে এত দিন ধরে যাঁরা বৈষম্যের শিকার হয়ে আস্থাহীনতায় ভুগছিলেন, তাঁদের মধ্যে একটা আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে। আমরা এখন আস্থা তৈরির সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের কাছ থেকে প্রত্যাশা করছি। আমরা আরো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, নবরূপে আসীন বিএনপি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান সামনে রেখে আগামী দিনের বাংলাদেশকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশে পরিণত করবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে সব জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী, পাহাড়-সমতলের মানুষ একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তিনি আদিবাসী এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের উত্তরে এও বলেছেন, ‘আপনারা কি বাংলাদেশি নন? অবশ্যই আপনারাও রাষ্ট্র থেকে সমান অধিকার ও মর্যাদা পাবেন।’ আমরা এখন এসব প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দিনগুলোর অপেক্ষায় আছি।
সব শেষে একটি কথা বলে লেখাটি শেষ করতে চাই, পাহাড় ও সমতলের ভিন্ন সংস্কৃতির গুরুত্ব শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অনুধাবন করেছিলেন বলেই ১৯৭৭ সালে বিরিশিরিতে এবং ১৯৭৮ সালে রাঙামাটিতে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট গঠন করেছিলেন। এ দেশের ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিকে শুধু সংরক্ষণ নয়, বিকাশের পথ আরো প্রশস্ত করতে হবে। ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও রীতিকে যথাযথ মর্যাদায় সুসংহত রাখলে দেশ যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি দেশের সব মানুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
লেখক : কলাম লেখক ও কমিশনার
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন




