• ই-পেপার

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলা ভাষা

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় বিদেশিদের অবদান

<li>সাইমন জাকারিয়া</li>

বিদেশি শিক্ষার্থীদের বাংলা শেখা

উচ্চারণই বড় চ্যালেঞ্জ

মানজুর হোছাঈন মাহি

উচ্চারণই বড় চ্যালেঞ্জ

সের্খিও রোদ্রিগেজ মার্তিন স্পেনের নাগরিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বাংলা ভাষা শিখছেন এবং স্প্যানিশ ভাষা শেখাচ্ছেন। চার বছর ধরে এখানে বাংলা শিখছেন তিনি। ভাষা শেখা ও শেখানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে জানতে চাইলে জানান, সবই ভালো। বর্ণের ভিন্নতার কারণে উচ্চারণে একটু কষ্ট হয়

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা বাংলা শিখতে আসেন। জীবিকার প্রয়োজনে, বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ থেকে ভাষা শিখতে আসেন তাঁরা। বাংলা ভাষা শেখায় তাঁদের অভিজ্ঞতা, বাংলা ভাষা শেখার চ্যালেঞ্জসমূহ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানিয়েছেন উচ্চারণের দিকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার কথা। তবে ইনস্টিটিউটের শিক্ষকরাও অনেক যত্নসহকারে বাংলা ভাষা শেখানোর চেষ্টা করেন।

ঢাবিতে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে চলতি শিক্ষাবর্ষে বাংলা ভাষা শিখছেন বিভিন্ন দেশের ২১ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে রয়েছে চীন, জাপান, ভারত, পাকিস্তান, স্পেন, নাইজেরিয়া, তুরস্কের নাগরিক। চারজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাঁদের বাংলা ভাষা শেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা হয়েছে। বিভিন্নজনের অভিজ্ঞতা আলাদা আলাদা এবং তাঁদের বাংলা ভাষা শেখার ক্ষেত্রে যে জায়গা সবচেয়ে কঠিন মনে হয় সেটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন।

কেউ কেউ জানান, তাঁদের বাংলা ভাষা শেখার ক্ষেত্রে উচ্চারণের দিকটি কঠিন মনে হয়, কারো কারো মতে বর্ণ ও লেখার দিকটি একটু কঠিন। আবার একজন বলেছেন, পুরো ভাষা শেখা প্রক্রিয়াটিই তাঁর কাছে কঠিন লাগছে। তবে বারবার অনুশীলন ও ক্লাসের মাধ্যমে তাঁরা এই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে বাংলা ভাষা শিখে যাচ্ছেন। এদিকে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট বলছে, বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ভাষা শেখার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বিষয় কঠিন মনে হয়। সেইসব বিষয়কে এক জায়গায় করেই নতুন করে সবার জন্য সহজভাবে বাংলা ভাষা শেখানোর চেষ্টা করেন ইনস্টিটিউটের শিক্ষকরা।

জাপানি নাগরিক তোমো ২০২০ সাল থেকে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বাংলা ভাষা শিখছেন। এলিমেন্টারি, ইন্টারমিডিয়েট পেরিয়ে তিনি এখন ডিপ্লোমা কোর্সে আছেন। তিনি বলেন, ‘প্রথম বছর বর্ণ শেখা থেকে শুরু করে বাক্য গঠন শিখেছিলাম। দ্বিতীয় বছর আমরা বর্তমান কাল, অতীত কাল ইত্যাদি কিভাবে পরিবর্তন হয়, এগুলো শিখেছিলাম। তৃতীয় বছর থেকে বাংলা কবিতা বা ইতিহাসের বিষয় নিয়ে একটু শিখতে শুরু করেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি কোরিয়ান ভাষা, ইংরেজি শিখেছি; এখন বাংলা ভাষা শিখছি। মাতৃভাষার বাইরে আমি যে ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করতে পছন্দ পারি সেটা আসলে বাংলা ভাষা। ভাষা শিখতে কঠিন কোন জায়গা সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জাপানি ভাষায় প শুধু একটা, কিন্তু বাংলা ভাষায় প এবং ব। একটু বেশি জোরে বলতে হয়। খ, শ এগুলোও এই ভাষায় আছে। হয়তো উচ্চারণ মিল থাকতে পারে। কিন্তু বর্ণগুলো লেখা আছে শ, স, ষ এরকম। ওগুলো লিখতে একটু কষ্ট হয়। এগুলো বারবার লিখতে হয়, লিখতে লিখতে শিখছি।’

সের্খিও রোদ্রিগেজ মার্তিন স্পেনের নাগরিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বাংলা ভাষা শিখছেন এবং স্প্যানিশ ভাষা শেখাচ্ছেন। চার বছর ধরে এখানে বাংলা শিখছেন তিনি। ভাষা শেখা ও শেখানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে জানতে চাইলে জানান, সবই ভালো। বাংলা ভাষা শেখার ক্ষেত্রে কোন দিকটি কঠিন জানতে চাইলে একটু হেসে উত্তর দেন, বর্ণের ভিন্নতার কারণে উচ্চারণে একটু কষ্ট হয়। আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের বাংলা ভাষার সর্বোচ্চ পর্যায় উচ্চতর ডিপ্লোমাতে আছেন। এ বছর তিনি বাংলা ভাষায় সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য—এসব বিষয় নিয়ে পড়তে পারছেন এবং এ জন্য তিনি অনেক খুশি বলে জানিয়েছেন। আগে ভারতে একসময় দিল্লিতে থেকে হিন্দি শিখেছিলেন। তবে বাংলা ভাষার সাহিত্যে আগ্রহী থাকার কারণে পরে বাংলা শিখতে বাংলাদেশে আসেন।

উচ্চারণ একটু কঠিন লাগে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষায় অল্পপ্রাণ, মহাপ্রাণ ধ্বনি রয়েছে। গ, ঘ, দ, ধ—এমন ধ্বনি রয়েছে। এসব বর্ণ উচ্চারণে একটু সমস্যা হয়। আমাদের ইউরোপে এসব ধ্বনি নেই। আমি সহজভাবে বাংলা ভাষার বই পড়তে পারি। তবে বিভিন্ন সময় যখন রাস্তায় মানুষ কথা বলে, তখন বুঝতে একটু সমস্যা হয়।’

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্প্যানিশ ভাষা শেখানোর অভিজ্ঞতা কেমন, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পড়ানোর অভিজ্ঞতা অনেক ভালো। অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের যখন স্প্যানিশ শেখাতাম তখন শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অনেক সময় কথা বলতে চাইত না, ভুল হতে পারে এটা ভেবে একপ্রকার লজ্জা পেত। তবে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা এমন না। তারা কথা বলতে পছন্দ করে ক্লাসরুমে। ভুল হোক, শুদ্ধ হোক তারা ক্লাসে কথা বলে। এর মাধ্যমেই আসলে ভাষা শেখা সহজ হয়।’

চীনা শিক্ষার্থী ইয়াং ও জাপানি শিক্ষার্থী সাকি দুজনই জানান, ভাষা শিখতে তাঁদের একটু কঠিন লাগছে। সাকি বলেন, ‘কোনো কিছুর অনুভূতি প্রকাশ করতে জাপানি ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় অনেক সহজ। অনেক সহজভাবে অনুভূতিগুলো প্রকাশ করা যায় বাংলা ভাষায়।’

আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের বাংলা ভাষার শিক্ষক পায়েল ব্যানার্জি বলেন, ‘ভাষা শেখা আসলেই কঠিন বিষয়। ভাষা শেখার সহজ কোনো উপায় নেই। ভাষা শেখা জটিল একটি বিষয়। ভাষা শিখতে হলে অনেকগুলো ধাপ পূরণ করতে হয়। বিভিন্ন দেশ থেকে যাঁরা বাংলা শিখছেন, এখানে তাঁদের দেশ ও ভৌগোলিক অবস্থা এবং তাঁদের মাতৃভাষা অনুযায়ী তাঁদের মধ্যে সমস্যা আলাদা আলাদা। সমস্যাগুলো বহুমাত্রিক। আমরা চেষ্টা করি সমস্যাগুলো এক জায়গায় এনে নতুন করে শুরু করতে। চারটি স্কিলের কোর্স প্ল্যান করি আমরা। পড়া, শোনা, লেখা ও বলা। আমরা সবচেয়ে বেশি জোর দিই শোনা ও বলার ক্ষেত্রে। এর মধ্যে কথা বলাটাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিই। কারণ যাঁরা এখানে শিখতে আসেন, তাঁদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় কথা বলে যোগাযোগ করার বিষয়। কারণ ভাষা শেখার একটি মূল লক্ষ্যই হলো যোগাযোগ করা। আবার শোনার ক্ষেত্রটিও যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। তবে আমরা চেষ্টা করি ধাপে ধাপে অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভাষা শিক্ষায় পারদর্শী করে তুলতে।’

 

 

একুশের চেতনায় ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির অবস্থা

ইলিরা দেওয়ান

একুশের চেতনায় ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির অবস্থা

মাতৃভাষায় কথা বলা, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। অথচ শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা মাতৃভাষার ওপর গুরুত্ব দিই। তাই আমরা মনে করি, আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকারের ইস্যুটি শুধু মৌসুমভিত্তিক না হয়ে সারা বছরই এটা নিয়ে কথা বলে যাওয়া উচিত

 

এবারের একুশ আমাদের কাছে ভিন্ন আঙ্গিকে এসেছে। বিগত সময়গুলোতে পয়লা ফেব্রুয়ারিতে একুশে বইমেলা শুরু হওয়া যেন রীতিতেই পরিণত হয়েছে। তাইতো ফেব্রুয়ারি মানেই মাসব্যাপী বইমেলা, নানা বইয়ের সমারোহে নিজের চেতনা, বিশ্বাস ও মনের খোরাক খুঁজে ফেরার মাস। কিন্তু এ বছর সেই রুটিনে ব্যত্যয় ঘটল। একুশের বইমেলা শুরু হবে ২০ ফেব্রুয়ারি। শীত শীত আমেজে পয়লা ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া বইমেলায় নতুন নতুন বইয়ের নতুন যে ঘ্রাণ থাকে, ফাল্গুনের হালকা উষ্ণতায় সেই ঘ্রাণে কিছুটা ভাটা পড়তে পারে!

আমরা যারা বাংলাভাষী নই, তারা সারা বছরই পেশাগত কারণে, অফিস-আদালতে আমাদের বাংলায় কথা বলতে হয়। বাংলায় হয়তো আমরা স্বচ্ছন্দে কথা বলি, কিন্তু মায়ের ভাষার মধুরতা, গভীরতা আমরা পরতে পরতে অনুভব করি। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলে তখন বাংলা ভিন্ন অন্য ভাষাগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুধাবন করি আমরা।

আমরা কথায় কথায় প্রায়ই বলে থাকি, মাতৃভাষায় কথা বলা, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার। অথচ শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমরা মাতৃভাষার ওপর গুরুত্ব দিই। তাই আমরা মনে করি, আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকারের ইস্যুটি শুধু মৌসুমভিত্তিক না হয়ে সারা বছরই এটা নিয়ে কথা বলে যাওয়া উচিত। বর্তমানে সংবিধানে শুধু বাংলা ভাষাটি সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু বাংলা ভিন্ন আরো বহু ভাষা এদেশে আছে, সেসব ভাষার সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রশ্নেও আমাদের সোচ্চার থাকা দরকার। কারণ একেকটি জাতিসত্তার ভাষা একেক রকম। তাই সেসব ভাষার ব্যবহার, প্রয়োগ কম হলে বা ব্যবহার না থাকলে সেই ভাষাগুলো একদিন দাপুটে ভাষার কারণে হারিয়ে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেসকোর ৩০তম অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সাল থেকে বিশেষ মর্যাদা নিয়ে এই দিনটি আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলা ভাষার এই গৌরবে একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমরা যারা বাংলাভাষী নই তারাও আনন্দিত ও গর্বিত হয়েছি। কেননা এই গৌরব শুধু বাংলা ভাষার নয়, এ গৌরব এদেশের প্রতিটি মানুষের, প্রতিটি মাতৃভাষারও। মাতৃভাষার স্বীকৃতির জন্য এই জনপদ রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। তাই ভাষার মূল্য এ দেশের মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি আবেগের। ইউনেসকোর স্বীকৃতির পর এ দেশে ও বিশ্বের হারিয়ে যাওয়া ভাষাগুলো সংগ্রহ করে সংরক্ষণ ও গবেষণার জন্য ২০১০ সালে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু এই ইনস্টিটিউট যতটা আড়ম্বরভাবে শুরু করা হয়েছিল, ঠিক সেভাবে এটি কাজ করতে পারেনি বলে অনেকে মনে করেন। আমাদের দেশে বাংলা ছাড়া আর কয়টি ভাষা আছে, সেটিও এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে নির্ণয় করা যায়নি। ২০১৪ সাল থেকে নৃ-ভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষার মতো এক প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল। সেই সমীক্ষা থেকে কী তথ্যপ্রাপ্তি ঘটেছে সেটিও জনগণ এখনো সঠিকভাবে অবগত নয়। এক সমীক্ষায়ই যদি বছরের পর বছর লেগে যায় তাহলে তত দিনে এ দেশের বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলো চিরতরে হারিয়ে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ভাষা সংরক্ষণের উদ্যোগ হিসেবে একটিমাত্র উদাহরণ আমাদের সামনে দৃশ্যমান, সেটা হলোজাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড থেকে (এনসিটিবি) পাঁচটি ভাষায় (চাকমা, মারমা, ককবরক, গারো ও সাদ্রি) প্রাথমিক স্তরে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বই ছাপা হয়েছে। কিন্তু বই ছাপানোই তো মুখ্য বিষয় নয়। এখানেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হয়ে আছে। যেসব ভাষায় বই ছাপা হয়েছে, সেসব ভাষার ওপর সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না থাকায় মাতৃভাষায় আদিবাসী শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের উদ্যোগটি মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। চাকমা ও মারমা ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা আছে। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই ভাষার বর্ণমালার সঙ্গে পরিচিত নন এবং এ বিষয়ে তাঁদের জন্য বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণের উদ্যোগও সরকারিভাবে নেওয়া হয়নি। ফলে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে গিয়ে শিশুদের পাঠদান করতে পারছেন না। এ বিষয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারত পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থিত পিটিআই ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলো। কিন্তু পিটিআইও এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পায়নি বলে দায়িত্ব এড়িয়ে যায়। ফলে এসব আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার অধিকার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই জটিলতার বিষয়ে আমাদের প্রস্তাব হলোপ্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্তির আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সময়টাতে যাঁরা চাকমা ও মারমা ভাষার বর্ণমালার ওপর দক্ষ, তাঁদের খণ্ডকালীনভাবে সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলোতে নিয়োগ দিয়ে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাদান গতিশীল রাখা যেতে পারে।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক স্থায়ী ফোরামের মতে, বিশ্বে ছয় হাজার ৭০০ ভাষার মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে। তার মধ্যে বেশির ভাগই আদিবাসীদের ভাষা। সারা বিশ্বে নানা কারণে, বিশেষত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক কারণে আদিবাসীদের ভাষা কোনো না কোনোভাবে পিছিয়ে রয়েছে। অথচ আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যই বিশ্বকে এতটা বৈচিত্র্যময় করে রেখেছে। তাই প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ঝুঁকিতে থাকা ভাষাগুলো সংরক্ষণের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।

 

২.

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করেছে। বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে নৃগোষ্ঠী উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে টেকসই শান্তি স্থাপনে পারস্পরিক আস্থা বিনির্মাণ ও সামাজিক পুনর্গঠন কর্মসূচির ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোন প্রতিষ্ঠার কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিটিভিতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেছিলেন, বিএনপি এমন একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী, পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ থাকবে। বিএনপি চেয়ারম্যানের এই বক্তব্যে নিঃসন্দেহে এত দিন ধরে যাঁরা বৈষম্যের শিকার হয়ে আস্থাহীনতায় ভুগছিলেন, তাঁদের মধ্যে একটা আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে। আমরা এখন আস্থা তৈরির সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের কাছ থেকে প্রত্যাশা করছি। আমরা আরো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, নবরূপে আসীন বিএনপি সবার আগে বাংলাদেশ স্লোগান সামনে রেখে আগামী দিনের বাংলাদেশকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশে পরিণত করবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে সব জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী, পাহাড়-সমতলের মানুষ একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তিনি আদিবাসী এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের উত্তরে এও বলেছেন, আপনারা কি বাংলাদেশি নন? অবশ্যই আপনারাও রাষ্ট্র থেকে সমান অধিকার ও মর্যাদা পাবেন। আমরা এখন এসব প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দিনগুলোর অপেক্ষায় আছি।

সব শেষে একটি কথা বলে লেখাটি শেষ করতে চাই, পাহাড় ও সমতলের ভিন্ন সংস্কৃতির গুরুত্ব শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান অনুধাবন করেছিলেন বলেই ১৯৭৭ সালে বিরিশিরিতে এবং ১৯৭৮ সালে রাঙামাটিতে উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট গঠন করেছিলেন। এ দেশের ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিকে শুধু সংরক্ষণ নয়, বিকাশের পথ আরো প্রশস্ত করতে হবে। ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও রীতিকে যথাযথ মর্যাদায় সুসংহত রাখলে দেশ যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি দেশের সব মানুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

লেখক : কলাম লেখক ও কমিশনার

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

 

 

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলা ভাষা

বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার প্রভাব নেই কেন?

আহমাদ মাযহার

বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার প্রভাব নেই কেন?
প্রচ্ছদ : তানভীর মালেক

বাংলাভাষীর সংখ্যা পৃথিবীতে ২৫ কোটিরও বেশি। সেই অর্থে বাংলা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ভাষা। কিন্তু এত সংখ্যক মানুষের ভাষা হয়েও ভাষাটি যে তেমন প্রভাবশালী নয়, তা আমরা জানি। সবাই জানেন, ভাষার প্রভাব নির্ধারিত হয় কয়েকটি কাঠামোগত শক্তি দ্বারা। তার একটি রাষ্ট্রীয় ও ভূ-রাজনৈতিক শক্তি

 

উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ বাংলায় কথা বললেও বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার প্রভাব নেই কেন? এই প্রশ্নটি শুধু ভাষাতাত্ত্বিক নয়; এটি সাংস্কৃতিক ক্ষমতা, জ্ঞান উৎপাদন ও বিশ্বরাজনীতির প্রশ্ন। এর পটভূমি বিবেচনা করলে দেখা যাবে, এর গভীরে রয়েছে সংস্কৃতি, জ্ঞান নির্মাণ ও অভিবাসী জীবনবোধের পরিসর।

বাংলাভাষীর সংখ্যা পৃথিবীতে ২৫ কোটিরও বেশি। সেই অর্থে বাংলা পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ভাষা। কিন্তু এত সংখ্যক মানুষের ভাষা হয়েও ভাষাটি যে তেমন প্রভাবশালী নয়, তা আমরা জানি। সবাই জানেন, ভাষার প্রভাব নির্ধারিত হয় কয়েকটি কাঠামোগত শক্তি দ্বারা। তার একটি রাষ্ট্রীয় ও ভূ-রাজনৈতিক শক্তি। প্রসঙ্গত আমরা ধরে নিতে পারি, ইংরেজি বিশ্বভাষা হয়েছে শুধু ভাষাগত উৎকর্ষের কারণে নয়; বরং ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ ও পরে মার্কিন অর্থনৈতিক-সামরিক আধিপত্যের কারণে। যেমন United Kingdom I United States

এ দুই রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক প্রভাব ইংরেজিকে বিশ্ব-ব্যবসা, বিজ্ঞান ও কূটনীতির ভাষা করেছে। এতগুলো ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষাটি চর্চিত হয়েছে বছরের পর বছর ধরে। যাপিত জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে আছে ইংরেজি ভাষা। ফলে কিছু ভাবতে গেলে আমাদের মনে বাংলা ভাষাটি ডিঙিয়ে ইংরেজি চলে আসে।

বিশ্বজুড়ে বাংলা ভাষার প্রধান রাষ্ট্র বাংলাদেশ। ভারতের প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গও বাংলা ভাষা প্রধান। কিন্তু এর কোনোটিই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বা সামরিক শক্তির কেন্দ্র নয়। ফলে ভাষাটিও ক্ষমতার ভাষা হয়ে উঠতে পারেনি। অন্যদিকে জ্ঞান উৎপাদন ও গবেষণার ভাষার দিক বিবেচনা করলে আমরা দেখতে পাব, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, প্রযুক্তি, বিজ্ঞানএসব ক্ষেত্রের প্রধান ভাষা হিসেবে বাংলার তেমন স্থান নেই। এর বাহন ইংরেজি।

বাংলায় গবেষণা হয়, কিন্তু তা বিশ্বের জ্ঞানপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে না। যেমনজাদুঘরে জাদুঘরে ঘুরতে গিয়ে কিউরেশন প্রসঙ্গে আমার মনে হয়েছিল, নির্বাচনই ক্ষমতা। অথচ বৈশ্বিক জার্নাল, র্যাংকিং, উদ্ধৃতি প্রথাএই সবই ইংরেজি ভাষা কেন্দ্রিক। ফলে বাংলা ভাষা জ্ঞান উৎপাদন করলেও তা বৈশ্বিক আর্কাইভে ঢুকতে পারে না। কারণ ক্ষমতা-কাঠামোর স্বভাবের কারণে বাংলা ভাষার সামগ্রী বৈশ্বিক আর্কাইভে নির্বাচিত হতে পারে না!

আরো একটি দিক থেকে বিবেচনা করতে গেলে বলা যায়, ভাষা তখনই প্রভাবশালী হয়, যখন তা আন্তর্জাতিক বাজারের ভাষা হয়ে ওঠে। এখন চীনা ভাষা (ম্যান্ডারিন) যেমন চীনদেশের অর্থনৈতিক উত্থানের কারণে বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু বাংলাভাষী মানুষ বিপুল হলেও কখনো তারা বিশ্ববাজারের কেন্দ্রীয় ক্রেতা বা বিনিয়োগশক্তি নয়।

অন্যদিকে আমরা দেখছি যে, জাপানি বা কোরীয় সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এর কারণ, তারা সাংস্কৃতিক পণ্য (যেমনচলচ্চিত্র, এনিমেশন, পপসংস্কৃতি) বিশ্ববাজারে রপ্তানি করে চলছে। বাংলা ভাষায় এত মানুষ কথা বললেও বাংলার সংস্কৃতি বিশ্বপরিসরে কতটাই বা স্থান নিতে পারে!

একবার যদি ভেবে দেখি, বাংলা সাহিত্য বিশ্বে কতটা অনূদিত? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেলজয়ী হলেও তাঁর পরবর্তী বাংলা সাহিত্য ধারাবাহিকভাবে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করতে পারেনি। এর একটা কারণ আমাদের অনুবাদ-অবকাঠামো অত্যন্ত দুর্বল। আমি নিজে অভিবাসী জীবন যাপন করতে গিয়ে লক্ষ করেছি, এটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অভিবাসী বাংলাভাষীরা সংখ্যায় বড় হলেও প্রভাব-রাজনীতিতে তারা তুলনামূলকভাবে কম সংগঠিত। লক্ষ করেছি যে, ভারতীয় ডায়াসপোরা ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে করপোরেট ও প্রযুক্তি জগতে প্রভাব ফেলেছে। পক্ষান্তরে বাংলা ডায়াসপোরা এখনো সেই মাত্রায় নীতিনির্ধারণী পরিসরের ধারেকাছে দৃশ্যমান নয়।

সংখ্যাগতভাবে বাংলা হয়তো একেবারে অপ্রভাবশালী নয়। যেমননিউ ইয়র্কের মতো মহামহানগরীতে সরকারি নানা নির্দেশনা এখন ইংরেজি, স্প্যানিশ, চীনা ভাষার পাশাপাশি বাংলায়ও লেখা থাকছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক গভীরতায় বৈশ্বিক ক্ষমতা পরিসরে বাংলার প্রভাব সামান্য তো বটেই, খুব সীমাবদ্ধও। সংস্কৃতি, রুচি, জ্ঞানচর্চা ও শুভবুদ্ধির অভাব নিয়ে ভাবতে গেলে আমাদের মনে প্রশ্নটি আরো গভীর হয়ে ওঠেআমরা কি ভাষাকে শুধু আবেগের পরিচয় হিসেবে দেখি, নাকি জ্ঞান উৎপাদনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করতে পারি? এতসব দিক পর্যালোচনার পর আমরা যদি নিজেদেরই প্রশ্ন করি, কোনো ভাষার প্রভাব কি বিশ্ববাজারে দৃশ্যমানতা দিয়ে মাপা হবে? নাকি মাপা হবে ভাষার ভেতরে সৃষ্ট বৌদ্ধিক ঘনত্ব দিয়ে? মাতৃভাষার প্রয়োগে বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে দেশীয় ও বৈশ্বিক পরিসরে এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে হবে। তাহলে হয়তো কোনো এক দিন বাংলা ভাষাও বিশ্বের প্রভাবশালী ভাষা হয়ে উঠবে; হয়ে থাকবে না হীনম্মন্য এক মাতৃভাষা মাত্র!

 

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলা ভাষা

বিদেশে বাংলার চৌকাঠ

শামীম আজাদ

বিদেশে বাংলার চৌকাঠ
প্রচ্ছদ : তানভীর মালেক

তিন দশকের বেশি সময় হলো আমি বিদেশে আছি। আমি ইংরেজিতেই পড়াই, লেখাই, দুনিয়া দেখাই আর নিজে লেখালেখি করি ইংরেজির সঙ্গে বাংলায়ই। সেই কবে পূর্বাচল ছাড়িয়ে বাইরে যাত্রা করার সময় আমার আঁচলে কী বেঁধে দিয়েছিলেন মা? বাংলা বর্ণমালা। আজ উপলব্ধি করি; মাতৃভাষাটা মননে জাগিয়ে রাখলে যতটা যাওয়ার ততটাই যাওয়া যায়

 

আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙ্গালী বলেছিলেন জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। মনীষী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের একজন স্মরণীয় বাঙালি ব্যক্তিত্ব, ভাষাবিজ্ঞানী, বহুভাষাবিদ, শিক্ষক ও ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ।

আমি সেই বাঙালি-চোখে বিশ্ব দেখি। ভিনদেশে বসবাস করা মানুষের দৃষ্টি যেমন বৈশ্বিক হয়ে উঠতে পারে, তেমনি তার ভাষা, যৌনতা, জীবন, জগৎ, জাত ও ধর্ম নিয়ে কুটোর মতো হলেও কিছু অন্তর্জ্বালা থাকতেই পারে। আর এর সবই নির্ধারণ করে দিয়েছেন তাদের পূর্বে আসা পুরুষ ও পুরোহিতরা। পূর্বপুরুষ ও নাড়ির ভাষাসূত্রেই তারপর তা হয় সংগঠিত।

ইংরেজিই বিলেতে লিঙ্গুয়াফ্রাংকা। তিন দশকের বেশি সময় হলো আমি বিদেশে আছি। আমি ইংরেজিতেই পড়াই, লেখাই, দুনিয়া দেখাই আর নিজে লেখালেখি করি ইংরেজির সঙ্গে বাংলায়ই। সেই কবে পূর্বাচল ছাড়িয়ে বাইরে যাত্রা করার সময় আমার আঁচলে কী বেঁধে দিয়েছিলেন মা? বাংলা বর্ণমালা। আজ উপলব্ধি করি; মাতৃভাষাটা মননে জাগিয়ে রাখলে যতটা যাওয়ার ততটাই যাওয়া যায়। বৈরী আবহাওয়ায়ও নিজ ভাষাই হতে পারে তার সংস্থান, জোগান ও পরিচয়।

বিলেতে বাংলাদেশি বাঙালির অভিবাসন সেই অবিভক্ত ভারতের কাল থেকেই। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে তা দৃশ্যমান হয়। মি কোরাইশী ১৯৩৯ সালে প্রথম স্থাপন করেন বাংলা কারি রেস্তোরাঁ। বন্ধু ও লেখক ক্যারোলাইন অ্যাডামসের অ্যাক্রোস সেভেন সিজ অ্যান্ড থার্টিন রিভার্স পড়েই আমাদের সেইসব অবিস্মরণীয় বাঙালি স্থাপনাকারীর লড়াই নিয়ে জ্ঞাত হই। মুক্তিযুদ্ধের সময় উনিশবর্ষিয়া তরুণী ক্যারোলাইন ভারতে বাংলাদেশের শরণার্থীশিবিরে শিশু-কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে কাজ করেছেন। সেই থেকে তাঁর বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা প্রেম। এদিকে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের পর ইংল্যান্ডই ছিল বাংলাদেশের তৃতীয় ঘাঁটি। আজ পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকতার হয়নি ব্যত্যয়। জনসংখ্যার দিক থেকেও বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার পরই এখানে অধিকসংখ্যক বাঙালির আবাস। বিলেতের প্রবাদ ব্যক্তিত্ব তসাদ্দুক আহমেদ এমবিইর অনুপ্রেরণায় বাঙালি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসের ব্রিকলেনের রাস্তার নামফলকে ইংরেজির পাশাপাশি এসেছে বাংলা।

১৯৯০-এ বিলেতে পড়াতে এসে স্কুলের নাম কবি নজরুল, বঙ্গবন্ধু, ওসমানী ও শাপলা শুনে বিস্মিত ও বিহ্বল হয়ে যাই। নারী সংগঠন চালনার দালানটার নাম ছিল জাগো নারী! দেখি স্কুলে বিলেতি কারিকুলম পাঠ শেষে ছেলেমেয়েরা যায় বাংলা স্কুলে। ক্রমে সরকারের শিক্ষা বোর্ডের সমর্থনে এ দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকেও ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে বাংলা যুক্ত হয়েছে। জনগণের অর্থে ও কাউন্সিলের জায়গায় হোয়াইট চ্যাপেল সড়কে, পূর্ব লন্ডনে ও ম্যানচেস্টারের ওল্ডহ্যামে নির্মিত হয়েছে ভাষাশহীদ স্মৃতি স্মারক শহীদ মিনার। আজ পর্যন্ত বিলেতে বাঙালির দ্রোহ, দাহ, শ্রদ্ধা ও আনন্দ প্রকাশের অন্যতম বেদিস্থান এই শহীদ মিনার। বাংলাদেশের ৫০ বছর পালনের সময় হোয়াইট চ্যাপেল আইডিয়া স্টোর লাইব্রেরি ও লার্নিং সেন্টারে বাংলা শব্দের এক যে অভাবিত আলোকসজ্জা শুরু হয়েছিল, তা এখনো জ্বলজ্বল করছে।

দুই বছর আগে ওয়াপিংয়ের একটি ভবনের নাম দেওয়া হয় বর্ণ দাঙ্গায় শহীদ আলতাব আলীর নামে। শেকসপিয়ারের বাড়ির উঠানে, স্ট্রাটফোর্ড আপ অন এভনে আছে রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ স্থাপত্য। বাংলা টাউন গেটের পাশে ব্রিকলেনে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা হোপ টাউনের (আশানগর) সঙ্গে দেয়ালে ব্রিটিশ বাংলাদেশি শিল্পী মোহাম্মদ আলী এমবিই করেছেন মাটির টানে ম্যুরাল। তাতে বাংলাদেশের নৌকা, মাঝি, চা-বাগান, সিলেটের ঐতিহাসিক কিন ব্রিজ স্থান পেয়েছে। মেয়র জন বিগস টাওয়ার হ্যামলেটসের হোয়াইট চ্যাপেল স্টেশনে ইংরেজির নামের পাশে বাংলায় সাইন পোস্ট করা হয়েছে। কোনো কারণে তা উৎপাটন না করলে থাকবে শত বছর।

আমরা বাঙালিরা কোনো রকম অর্থব্যয়, পারিতোষিক, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা ট্রেনিং ছাড়াই জন্মসূত্রে পেয়ে গেছি এন্তার সম্ভাবনাময় বাংলা ভাষার মধুর হাঁড়ি। এই ভাষা টিকিয়ে রাখতে আজ আমাদের চর্চা ছাড়া আর কিছুই করতে হচ্ছে না। তাই এত সহজলভ্য ও অনায়াস বলেই কি বাংলাদেশে আমাদের কাছে বাংলা ভাষার দাম কমে যাচ্ছে? দেশে গেলে দেখি, সেখানেই অনেক পরিবার ও সামাজিক মাধ্যমে চালু হয়েছে অদ্ভুত এক অশ্রাব্য ভাষা। আসলে ধর্মের মতো গুরুত্ব দিয়ে সন্তানকে নিজের সংস্কৃতি শেখাতে হয়। রুচি শেখানো যায় না, রুচির মধ্যে বেড়ে উঠতে দিতে হয়।

এই পরিযায়ী জীবনে, রাতে, শীতে, ঘামে, প্রীতে, বিনয়ে, দুর্বিনয়ে এক দিনের জন্যও আমার জন্মদেশ ও জন্মভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন হইনি। হইনি নিজ স্বার্থেই। অ্যানড্রয়েড থেকে ডিজিটাল যুগে এসে ইঞ্চি ইঞ্চি করে বেড়েছে আমার সম্পৃক্ততা। আজ বৈশ্বিক বিশ্ব আর দৈহিক ভূগোল বা মানচিত্রের মধ্যে আটকে নেই। তাই সীমানার বাইরের মানুষদের বাংলা ভাষার সব অর্জনও সঞ্চিত হয় বাংলাদেশেই, দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে।