সের্খিও রোদ্রিগেজ মার্তিন স্পেনের নাগরিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বাংলা ভাষা শিখছেন এবং স্প্যানিশ ভাষা শেখাচ্ছেন। চার বছর ধরে এখানে বাংলা শিখছেন তিনি। ভাষা শেখা ও শেখানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে জানতে চাইলে জানান, সবই ভালো। বর্ণের ভিন্নতার কারণে উচ্চারণে একটু কষ্ট হয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা বাংলা শিখতে আসেন। জীবিকার প্রয়োজনে, বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ থেকে ভাষা শিখতে আসেন তাঁরা। বাংলা ভাষা শেখায় তাঁদের অভিজ্ঞতা, বাংলা ভাষা শেখার চ্যালেঞ্জসমূহ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানিয়েছেন উচ্চারণের দিকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার কথা। তবে ইনস্টিটিউটের শিক্ষকরাও অনেক যত্নসহকারে বাংলা ভাষা শেখানোর চেষ্টা করেন।
ঢাবিতে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে চলতি শিক্ষাবর্ষে বাংলা ভাষা শিখছেন বিভিন্ন দেশের ২১ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে রয়েছে চীন, জাপান, ভারত, পাকিস্তান, স্পেন, নাইজেরিয়া, তুরস্কের নাগরিক। চারজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাঁদের বাংলা ভাষা শেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা হয়েছে। বিভিন্নজনের অভিজ্ঞতা আলাদা আলাদা এবং তাঁদের বাংলা ভাষা শেখার ক্ষেত্রে যে জায়গা সবচেয়ে কঠিন মনে হয় সেটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন ভিন্ন।
কেউ কেউ জানান, তাঁদের বাংলা ভাষা শেখার ক্ষেত্রে উচ্চারণের দিকটি কঠিন মনে হয়, কারো কারো মতে বর্ণ ও লেখার দিকটি একটু কঠিন। আবার একজন বলেছেন, পুরো ভাষা শেখা প্রক্রিয়াটিই তাঁর কাছে কঠিন লাগছে। তবে বারবার অনুশীলন ও ক্লাসের মাধ্যমে তাঁরা এই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে বাংলা ভাষা শিখে যাচ্ছেন। এদিকে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট বলছে, বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ভাষা শেখার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বিষয় কঠিন মনে হয়। সেইসব বিষয়কে এক জায়গায় করেই নতুন করে সবার জন্য সহজভাবে বাংলা ভাষা শেখানোর চেষ্টা করেন ইনস্টিটিউটের শিক্ষকরা।
জাপানি নাগরিক তোমো ২০২০ সাল থেকে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বাংলা ভাষা শিখছেন। এলিমেন্টারি, ইন্টারমিডিয়েট পেরিয়ে তিনি এখন ডিপ্লোমা কোর্সে আছেন। তিনি বলেন, ‘প্রথম বছর বর্ণ শেখা থেকে শুরু করে বাক্য গঠন শিখেছিলাম। দ্বিতীয় বছর আমরা বর্তমান কাল, অতীত কাল ইত্যাদি কিভাবে পরিবর্তন হয়, এগুলো শিখেছিলাম। তৃতীয় বছর থেকে বাংলা কবিতা বা ইতিহাসের বিষয় নিয়ে একটু শিখতে শুরু করেছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি কোরিয়ান ভাষা, ইংরেজি শিখেছি; এখন বাংলা ভাষা শিখছি। মাতৃভাষার বাইরে আমি যে ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করতে পছন্দ পারি সেটা আসলে বাংলা ভাষা। ভাষা শিখতে কঠিন কোন জায়গা সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জাপানি ভাষায় প শুধু একটা, কিন্তু বাংলা ভাষায় প এবং ব। একটু বেশি জোরে বলতে হয়। খ, শ এগুলোও এই ভাষায় আছে। হয়তো উচ্চারণ মিল থাকতে পারে। কিন্তু বর্ণগুলো লেখা আছে শ, স, ষ এরকম। ওগুলো লিখতে একটু কষ্ট হয়। এগুলো বারবার লিখতে হয়, লিখতে লিখতে শিখছি।’
সের্খিও রোদ্রিগেজ মার্তিন স্পেনের নাগরিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে বাংলা ভাষা শিখছেন এবং স্প্যানিশ ভাষা শেখাচ্ছেন। চার বছর ধরে এখানে বাংলা শিখছেন তিনি। ভাষা শেখা ও শেখানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে জানতে চাইলে জানান, সবই ভালো। বাংলা ভাষা শেখার ক্ষেত্রে কোন দিকটি কঠিন জানতে চাইলে একটু হেসে উত্তর দেন, বর্ণের ভিন্নতার কারণে উচ্চারণে একটু কষ্ট হয়। আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের বাংলা ভাষার সর্বোচ্চ পর্যায় উচ্চতর ডিপ্লোমাতে আছেন। এ বছর তিনি বাংলা ভাষায় সাহিত্য, ইতিহাস, ঐতিহ্য—এসব বিষয় নিয়ে পড়তে পারছেন এবং এ জন্য তিনি অনেক খুশি বলে জানিয়েছেন। আগে ভারতে একসময় দিল্লিতে থেকে হিন্দি শিখেছিলেন। তবে বাংলা ভাষার সাহিত্যে আগ্রহী থাকার কারণে পরে বাংলা শিখতে বাংলাদেশে আসেন।
উচ্চারণ একটু কঠিন লাগে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষায় অল্পপ্রাণ, মহাপ্রাণ ধ্বনি রয়েছে। গ, ঘ, দ, ধ—এমন ধ্বনি রয়েছে। এসব বর্ণ উচ্চারণে একটু সমস্যা হয়। আমাদের ইউরোপে এসব ধ্বনি নেই। আমি সহজভাবে বাংলা ভাষার বই পড়তে পারি। তবে বিভিন্ন সময় যখন রাস্তায় মানুষ কথা বলে, তখন বুঝতে একটু সমস্যা হয়।’
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্প্যানিশ ভাষা শেখানোর অভিজ্ঞতা কেমন, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পড়ানোর অভিজ্ঞতা অনেক ভালো। অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের যখন স্প্যানিশ শেখাতাম তখন শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অনেক সময় কথা বলতে চাইত না, ভুল হতে পারে এটা ভেবে একপ্রকার লজ্জা পেত। তবে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা এমন না। তারা কথা বলতে পছন্দ করে ক্লাসরুমে। ভুল হোক, শুদ্ধ হোক তারা ক্লাসে কথা বলে। এর মাধ্যমেই আসলে ভাষা শেখা সহজ হয়।’
চীনা শিক্ষার্থী ইয়াং ও জাপানি শিক্ষার্থী সাকি দুজনই জানান, ভাষা শিখতে তাঁদের একটু কঠিন লাগছে। সাকি বলেন, ‘কোনো কিছুর অনুভূতি প্রকাশ করতে জাপানি ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় অনেক সহজ। অনেক সহজভাবে অনুভূতিগুলো প্রকাশ করা যায় বাংলা ভাষায়।’
আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের বাংলা ভাষার শিক্ষক পায়েল ব্যানার্জি বলেন, ‘ভাষা শেখা আসলেই কঠিন বিষয়। ভাষা শেখার সহজ কোনো উপায় নেই। ভাষা শেখা জটিল একটি বিষয়। ভাষা শিখতে হলে অনেকগুলো ধাপ পূরণ করতে হয়। বিভিন্ন দেশ থেকে যাঁরা বাংলা শিখছেন, এখানে তাঁদের দেশ ও ভৌগোলিক অবস্থা এবং তাঁদের মাতৃভাষা অনুযায়ী তাঁদের মধ্যে সমস্যা আলাদা আলাদা। সমস্যাগুলো বহুমাত্রিক। আমরা চেষ্টা করি সমস্যাগুলো এক জায়গায় এনে নতুন করে শুরু করতে। চারটি স্কিলের কোর্স প্ল্যান করি আমরা। পড়া, শোনা, লেখা ও বলা। আমরা সবচেয়ে বেশি জোর দিই শোনা ও বলার ক্ষেত্রে। এর মধ্যে কথা বলাটাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিই। কারণ যাঁরা এখানে শিখতে আসেন, তাঁদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় কথা বলে যোগাযোগ করার বিষয়। কারণ ভাষা শেখার একটি মূল লক্ষ্যই হলো যোগাযোগ করা। আবার শোনার ক্ষেত্রটিও যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। তবে আমরা চেষ্টা করি ধাপে ধাপে অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভাষা শিক্ষায় পারদর্শী করে তুলতে।’



