• ই-পেপার

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা
‘বিপর্যয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্য’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি বা সংকটকালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হওয়া এবং গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনায় আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসার প্রবণতা কম। এ ছাড়া চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবায় জনবল স্বল্পতা, রেফারেল ও বাজেট সমস্যাও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিপর্যয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্য শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অভিজ্ঞজনদের আলোচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সভাকক্ষে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে কালের কণ্ঠ। আয়োজনে সহায়তা করেছে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।  ক্রোড়পত্র গ্রন্থনা : শিমুল মাহমুদ ও মো. জুবায়ের

 

বেশির ভাগ সাইকিয়াট্রিস্ট নগরকেন্দ্রিক

ডা. মো. নিজামউদ্দিন

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদেশে এখন ৪০০ জনের মতো সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন, কিন্তু সবাই নগরকেন্দ্রিক এবং ঢাকায়ই বেশি। প্রান্তিক পর্যায়ে তেমন কেউ নেই। যদিও এখন শুক্রবার ঢাকার বাইরে গিয়ে সার্ভিস দেওয়ার ট্র্যাডিশন হয়েছে। ফলে কিছুটা হলেও সেবা পাওয়া যাচ্ছে। দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা

আমাদের বিশেষজ্ঞ সাইকিয়াট্রিস্টদের স্বল্পতার অনেক কারণের মধ্যে একটি পাগলের ডাক্তার তকমা। চিকিৎসা নেওয়া রোগী সংখ্যায় কম। চেম্বারগুলোতে কখনোই রোগীর ভিড় লেগে থাকে না। যে কারণে অনেকে সাইকিয়াট্রিস্ট হতে আগ্রহ দেখান না। যদিও এ অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে। মানুষের সচেতনতা কিছুটা বাড়ছে, কুসংস্কার কিছুটা দূর হচ্ছে। একই সঙ্গে আমাদের এই বিষয়ে সাইকিয়াট্রিস্টের সংখ্যাও বাড়ছে।

বর্তমানে চারটি প্রতিষ্ঠানে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন কোর্স চালু আছে। সেখানে প্রতিবছর মোটামুটি ৪৪-৪৫ জন পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ছাত্র ভর্তি হচ্ছে। ফলে প্রতিবছরই নতুন বিশেষজ্ঞ বের হচ্ছেন এবং এই সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়বে। এর বাইরেও তিনটি প্রতিষ্ঠানচট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও বগুড়া মেডিক্যাল কলেজ, যাদের কোর্সগুলো চালু করার দাবি জানিয়েছি।

প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এটি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়েই সব সময় সেবা দিতে হবেএমন নয়। একজন এমবিবিএস ডাক্তারও যদি দক্ষ হন, তবে তিনি সেবা দিতে পারেন। এ জন্য তাঁদের প্রশিক্ষিত করতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের প্রাইমারি হেলথকেয়ারের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ইন্টিগ্রেট করা গেলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

 

জনবল ও বাজেট সংকট

ডা. মো. মাহবুবুর রহমান

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদেশে বর্তমানে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মাত্র ০.২ জন সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নার্স আছেন মাত্র ০.৫ জন। অন্য যেসব সাইকোলজিস্ট আছেন যাঁরা এনজিও ও অন্যান্য জায়গায় কাজ করেন, তাঁরা মাত্র ০.৩ জন। সোশ্যাল ওয়ার্কার নেই বললেই চলে। মোট মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য ১.৪ জন। এ ছাড়া বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ০.৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ। দেশের জেলা সদর হাসপাতালে কোনো সাইকিয়াট্রিস্ট নেই। আগামী ১০ বছরেও আমরা উপজেলায় সাইকিয়াট্রিস্ট দিতে পারব কি না সন্দেহ। আমাদের দেশে মেন্টাল হেলথ অ্যাক্ট, মেন্টাল হেলথ পলিসি এবং মেন্টাল হেলথ স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান থাকলেও এখনো সুইসাইড প্রিভেনশন স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান নেই। আমরা সেটা করার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া অ্যান্টি-স্টিগমা স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান এখনো ন্যাশনাল পলিসিতে আনতে পারিনি। এই ব্যর্থতা স্বীকার করে আমাদের কাজ করতে হবে। প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে অন্তত একজন করে সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন। এই ৩৭টি মেডিক্যাল কলেজকে যদি আমরা দুর্যোগকালীন মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে যুক্ত করতে পারি, তাহলে তারা নিজেদের টিম নিয়ে দেশের যেকোনো প্রান্তে দ্রুত সেবা দিতে পারবেন। এই প্রস্তাব আমরা মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে যাচ্ছি।

 

বিপর্যয়ে অর্থসংকট বড় সমস্যা

ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদুর্ঘটনা বা দুর্যোগ-পরবর্তী আহত ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি মাইলস্টোনের ঘটনায় শিক্ষকদের সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম আমরা করেছি। সেখানে দু-একজন শিক্ষককে কান্না করে তাঁদের মানসিক সমস্যার কথা বলতে দেখা গেছে। এসব শিক্ষকের এখনো অনেকে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তবে সমস্যাটা যে এতটা গুরুতর, সেটা আমরা জানতাম না। তাঁদের চিকিৎসা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।

সরকার অতীতে বিভিন্ন বিপর্যয়ে প্রজেক্ট তৈরি করে আসছে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, করোনার সময়, রানাপ্লাজা ধসের ঘটনায় হয়েছে। কিন্তু এবারের বিপর্যয়ের মতো এতটা সাজানো-গোছানো ও পরিকল্পিতভাবে হয়নি। কিন্তু সমস্যা হলো অর্থনৈতিক কোনো সাহায্য ছিল না।

এমন পরিস্থিতিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ফান্ড থাকা প্রয়োজন। এটি সরকারি-বেসরকারি অথবা কোনো ট্রাস্টের মাধ্যমে হোক, আমাদের করা উচিত। কারণ তা না হলে দুর্যোগের পর সাইকোলজিক্যাল সাপোর্ট দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই সময়ে সাইকোলজিক্যাল সাপোর্ট ছাড়া মানুষ এই রোগ থেকে বের হতে পারে না।

 

চিকিৎসার বাইরে বেশি নারীরা

ডা. নাহিদ মাহজাবিন মোরশেদ

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাএকটি মেয়েশিশু ছোটবেলা থেকেই অনিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বড় হয়। তাকে সীমাবদ্ধতা শেখানো হয়, ধৈর্যধারণ করতে শেখানো হয়। আরো শেখানো হয়কী করা যাবে, কী করা যাবে না। এদের জীবন কাটে ট্রমার মধ্য দিয়ে। না-বলা কথা বহন করতে করতে কিশোরী বয়সে আসে। কিন্তু কখনো কাউকে বলতে পারে না। বললেও মা বলছেন, এটা বলা যাবে না, মানুষ খারাপ বলবে। কখনো বিয়ে দেওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে বাবারাও যেন কিছু বলতে চান না। বয়ঃসন্ধিকালে কিশোরীরা নানা রকম মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। আর হরমোনের নানা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার চাপ। তখন সে খিটখিটে মেজাজের হয়ে যায়। কথা শুনতে চায় না, বিরক্তিবোধ করে। মনের ও আবেগের নানা ধরনের সমস্যা হয়। কিন্তু তখন আমরা কেউ মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে যাই না। আমাদের এমনও অভিজ্ঞতা আছে, অনেক কিশোরী স্কুলে টিফিনের টাকা জমিয়ে চিকিৎসার জন্য আসে। তারা জানায়, বাসায় সমস্যার কথা বললে কেউ গুরুত্ব দিচ্ছে না। মূলত এভাবে আমাদের মেয়েরা চিকিৎসার বাইরে থাকছে। এই সংখ্যা নারীদের মধ্যে বেশি। কারণ তারা চাইলেও চিকিৎসা পায় না। কিংবা নিতে আসতে পারে না। অর্থের জন্য কারো প্রতি নির্ভরশীল হতে হয়। চিকিৎসার জন্য এলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শারীরিক সমস্যা নিয়ে আসেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন নারী চিকিৎসার আওতায় এলে পরিবার, সন্তান সবাই ভালো থাকবে।

 

এক-চতুর্থাংশ ভুগছেন গুরুতর বিষণ্নতায়

ডা. মুনতাসীর মারুফ

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাবাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানে সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার ভুক্তভোগীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস ডিস-অর্ডারসংক্রান্ত গবেষণায় হয়। এতে দেখা গেছে, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ গুরুতর বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে ভর্তি আহতদের এক-তৃতীয়াংশ গুরুতর মানসিক উদ্বেগ নিয়ে আসেন। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে এই হার ছিল ২১.৮ শতাংশ।

এসব রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে আমাদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভর্তি রোগীরা বিনামূল্যে কেবিনে থাকতে চাইতেন। সেটি করা সম্ভব হলেও এসব রোগীকে শারীরিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। রোগীর দেখাশোনার জন্য কোনো স্বজন ছিল না। অনেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়তে চাচ্ছিলেন না।

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এসব রোগী কথা বলতে চাননি। তাঁরা চাচ্ছিলেন উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হোক বা অর্থ সহায়তা দেওয়া হোক। এতে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

 

নির্বাচনী ইশতেহারে মানসিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে  

ডা. মো. জোবায়ের মিয়া

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাসাম্প্রতিক বিভিন্ন বিপর্যয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে পেরে আমরা গর্বিত। কারণ এ সময় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা দিয়েছে। দুটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। একজন শিক্ষার্থী যিনি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে অগ্নিকাণ্ডে অন্যদের উদ্ধার করতে গিয়ে শারীরিকভাবে অক্ষত থাকলেও মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং পরে ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন; আরেকটি ঘটনা সম্প্রতি মিরপুরে কেমিক্যাল বিস্ফোরণের পর উদ্ধারকাজে অতিরিক্ত জনসমাগমের কারণে বাধা সৃষ্টি হয়, যেখানে আমরা ব্যানারের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা সেবার তথ্য প্রচারের উদ্যোগ নিই।

আমার বিশ্বাস, এ ধরনের বিপর্যয়ে শুধু চিকিৎসক বা সাইকিয়াট্রিস্ট নয়, সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমনকি রাজনৈতিক কর্মীদেরও। কারণ ভবিষ্যতের নেতৃত্ব যেন মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে মানসিক স্বাস্থ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং জাতীয় বাজেটে এর জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব জোরালোভাবে তুলতে হবে।

 

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি : ৭১ শতাংশের ঘুমের সমস্যা

ডা. আরিফুজ্জামান

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, বিপর্যয় বা জরুরি পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি পাঁচজনে একজন মানসিক সমস্যায় ভুগে থাকেন। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনা-পরবর্তী ২৫৫ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের ওপর চালানো জরিপে দেখা গেছে, ৭১ শতাংশ ঘুমের সমস্যা, ২৯ শতাংশ খিটখিটে মেজাজ, ২৬ শতাংশ ফ্ল্যাশব্যাক, ২৬ শতাংশ ক্ষুধামান্দ্য, ২০ শতাংশ মনোযোগের ঘাটতি, ২০ শতাংশ কাজে অনাগ্রহএসব সমস্যায় ভুগছেন।

আমাদের দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগের তীব্রতা না বাড়লে চিকিৎসাসেবার আওতায় আসার প্রবণতা কম। এ সমস্যা ছাড়াও আরো চারটি সমস্যা রয়েছে। এগুলো হলো চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবায় জনবলস্বল্পতা, রেফারেল ও বাজেট সমস্যা। আমাদের বিভিন্ন বিপর্যয়ে মন্ত্রণালয় ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে শুধু মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নয়, সব খাতে উন্নয়ন সম্ভব।

 

প্রচারে জোর দিতে হবে

ডা. মো. আসাদ-উজ-জামান

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবামানসিক চিকিৎসা নিয়ে প্রচার কম। এতে সচেতনতাও বেশিদূর এগোয়নি। আমাদের প্রচার বাড়াতে হবে, মানুষ জানুক, যুক্ত হোক, একসঙ্গে কাজ করুক। আমরা আমাদের আশপাশের সবাইকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করব। যাঁরা সহযোগিতা করছেন তাঁদের শুধু ধন্যবাদ নয়, বরং আরো এনগেজ করতে হবে। যেমনআজ কালের কণ্ঠ যুক্ত হয়েছে, আমরাও তাদের সঙ্গে যৌথভাবে প্রোগ্রাম করতে পারি, অন্যান্য সম্পাদক ও বিভিন্ন সেক্টরের মানুষকে যদি যুক্ত করতে পারি, তাহলে আমাদের কাজের শক্তি আরো বাড়বে।

আমাদের সরকারের নীতিনির্ধারকস্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা, তাঁদেরও এই আলোচনায় আনা জরুরি। ২০০০ সালে আমি দেশে ফেরার সময় এখানে মাত্র ৩৯ জন সাইকিয়াট্রিস্ট ছিলেন, তখন কেউ আমাদের কথা শুনত না। এখন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ধীরে ধীরে জাতিকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস নতুনভাবে গঠিত হয়েছে।

 

মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে

ড. মো. শাহানূর হোসেন

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাবাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ৯২ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নেন না মূলত সামাজিক কলঙ্ক বা স্টিগমার কারণে। অনেকে ভাবেন, একবার মানসিক চিকিৎসা শুরু করলে সারা জীবন এর চিকিৎসা নিতে হবে। এতে বিয়েতে সমস্যা বা সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে। ফলে চিকিৎসা না নিয়ে বিষয়টি চেপে রাখেন।

বর্তমানে দেশে মাত্র ৫০০ জনের মতো ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট আছেন, অথচ প্রয়োজন ৩৫০০ থেকে ৪০০০ জন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর মাত্র ২০ জন শিক্ষার্থী এই বিষয়ে ভর্তি হন। গত ৩০ বছরে স্নাতক হয়েছেন মাত্র ৫২০ জন, যা সাড়ে তিন কোটি মানসিক রোগীর তুলনায় অত্যন্ত কম।

সাইকিয়াট্রিক ও সাইকোলজিক্যাল দুই চিকিৎসাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে পেশাটিকে এখনো জনপ্রিয় বা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মনে করা হয় না। তাই সরকারকে মানসিক স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, চাকরির সুযোগ ও মর্যাদা বাড়াতে হবে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ চালু করা এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজে ট্রেনিং কোর্স শুরু করা জরুরি।

 

ছাত্রদের চেয়ে শিক্ষকদের অবস্থা খারাপ

ক্যাপ্টেন (অব.) জাহাঙ্গীর আলম

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবামাইলস্টোন ট্র্যাজেডির মতো ঘটনায় কোন ধরনের মানসিক সমর্থন প্রয়োজন আমার জানা ছিল না। বিশেষজ্ঞরা যখন কাউন্সেলিং প্রোগ্রাম শুরু করলেন, তখন আমরা জানতে পারি। বিশেষ করে প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি সহায়ক থেরাপি দেওয়ায় ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। মনে হয়েছে, শিক্ষার্থী যেন ভুলে গেছে ওই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা। ওরা আগের মতো দৌড়াচ্ছে, খেলছে, ক্লাস করছে।

যেহেতু প্রাথমিক থেকে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট ছোট বাচ্চারা সরাসরি ঘটনাটি দেখেছে, তাদের মধ্যে কিছু শিক্ষার্থী এখনো ট্রমার মধ্যে রয়েছে। যারা স্বাভাবিকভাবে কথা বলে না, শুধু তাকিয়ে থাকে। আমার মনে হয়, শিক্ষকদের অবস্থা ছাত্রদের চেয়ে বেশি খারাপ।

তিনজন শিক্ষক তো মারাই গেলেন। এখনো ছয়জন শিক্ষক গুরুতর মানসিক রোগে ভুগছেন। তাঁদের একজন স্বাভাবিক কথা বলেন না। একজন ক্লাসে ফেরার চেষ্টা করেও পারেন না। তাঁদের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মতো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া এখনো সাতজন শিক্ষার্থী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। যারা চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরেছে তাদের অনেকে ক্লাস শুরু করেছে। তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও অংশ নিচ্ছে। এর বাইরে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে আসছে, ক্লাস করছে।

অভিভাবকদের একাংশ মানসিকভাবে এখনো বিপর্যস্ত। আরেক অংশ ছেলে-মেয়েদের চেয়ে আর্থিক প্রাপ্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। এটা নিয়ে তারা নানা কিছু করছে। এটিও মানসিক রোগ কি না আমার জানা নেই।

 

৯৯% ওষুধ বাংলাদেশে তৈরি হয়

আশরাফ উদ্দিন আহমেদ

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদেশের অনেক মানুষ জানে না কোনটা মানসিক রোগ। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সেমিনার ও কর্মশালার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা যেতে পারে। ইনসেপ্টা এসব উদ্যোগে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত এবং প্রচার ও সচেতনতা কর্মসূচিতে অংশ নিতে আগ্রহী। মানসিক স্বাস্থ্যজনিত প্রায় ৯৯ শতাংশ ওষুধ এখন বাংলাদেশেই তৈরি হয় এবং ইনসেপ্টা দেশে আধুনিক প্রযুক্তিতে নতুন ওষুধ উদ্ভাবন করছে, যেমন লেজার ড্রিল টেকনোলজিতে তৈরি পেরিপেরিডন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যেন মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার ওষুধ সহজলভ্য থাকে সে জন্য আমাদের একটি বিশেষ টিম কাজ করছে।

ইনসেপ্টা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সবচেয়ে আধুনিক ওষুধ সর্বনিম্ন দামে সরবরাহ করে দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় অব্যাহতভাবে ভূমিকা রাখবে।

 

অজ্ঞতা ও কুসংস্কার ভাঙতে হবে

হাসান হাফিজ

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাবিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আজকের এই গোলটেবিল বৈঠকের আলোচ্য বিষয় ঠিক করা হয় প্রতিপাদ্যকে ঘিরে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল বিপর্যয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যেন পায়। দেশের বেশির ভাগ মানসিক রোগী এখনো চিকিৎসার বাইরে থাকছে। এর অন্যতম কারণ প্রচার কম, সক্ষমতার অভাব, চিকিৎসক সংকট, বাজেট, অজ্ঞতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও অবৈজ্ঞানিক চিন্তা। বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো মান্ধাতার আমলে আটকে আছে। অনেকে এই সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে দ্বিধাবোধ করেন। কারণ মানসিক রোগকে সমাজে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়। মানসিক রোগীদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ব্রত নিয়ে আমাদের আজকের এই গোলটেবিল বৈঠক। আমাদের মানসিকভাবে সুস্থতা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে আমাদের সব অর্জন, কল্যাণ অর্থহীন হয়ে যাবে।

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
‘নারীর ক্ষমতায়ন : এন্ডোমেট্রিওসিস যত্নে বাধা দূর করুন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা। ছবি : লুৎফর রহমান

নারীর স্বাস্থ্য সমস্যার একটি এন্ডোমেট্রিওসিস। রোগটি যেহেতু পিরিয়ড বা মাসিকের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাই বেশির ভাগ নারী লজ্জা বা ভয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় না। এতে রোগটি শনাক্ত হতে একদিকে দেরি হচ্ছে, অন্যদিকে বন্ধ্যাত্ব রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লজ্জা নয়, প্রয়োজন জনসচেতনতা। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রবিবার রাজধানীর তেজগাঁও শিল্প এলাকায় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে এন্ডোমেট্রিওসিস সচেতনতা মাস উপলক্ষে নারীর ক্ষমতায়ন : এন্ডোমেট্রিওসিস যত্নে বাধা দূর করুন শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে এন্ডোমেট্রিওসিস-অ্যাডেনোমায়োসিস সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ইএসবি), প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন। গোলটেবিল বৈঠকের সায়েন্টিফিক পার্টনার ছিল ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, ইলেকট্রনিক মিডিয়া পার্টনার চ্যানেল আই ও প্রিন্ট মিডিয়া পার্টনার ছিল কালের কণ্ঠ

 

লক্ষণ বুঝে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে

অধ্যাপক সামিনা চৌধুরী

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাপিরিয়ড বা মাসিকের সময় নারীদের তলপেটে তীব্র ব্যথা হয়। এ সময় অনেক কিশোরী স্কুলে যেতে পারে না, কাজ করতে পারে না, বারবার টয়লেটে যায়। এটি এন্ডোমেট্রিওসিসের লক্ষণ। বাসাবাড়িতেও এই রোগটিকে মনে করা হয় লজ্জার, কাউকে বলা যাবে না। আমরা চাই সবাই বলুক তাদের কী কষ্ট।

পৃথিবীব্যাপী দুই শ মিলিয়ন কিশোরী ও প্রাপ্তবয়স্ক নারী এন্ডোমেট্রিওসিস রোগে ভুগছে। বলা হয়, প্রতি ১০ জন নারীর একজন এন্ডোমেট্রিওসিসের শিকার। বাংলাদেশে এই রোগের হার আরো বেশি। বাংলাদেশের এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালের গাইনি বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেওয়া নারীদের ৩০ শতাংশের এন্ডোমেট্রিওসিস উপসর্গ রয়েছে। ১০ শতাংশ এই রোগে আক্রান্ত। অর্থাৎ এন্ডোমেট্রিওসিস রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির জন্য এই রোগীদের বিশেষ সেবা প্রয়োজন। প্রয়োজন এন্ডোকেয়ার ক্লিনিক। একই সঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্র চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। তাহলেই আমরা রোগটি কমিয়ে আনতে পারব।

 

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতানারীর ক্ষমতায়ন, এন্ডোমেট্রিওসিস যত্নে

বাধা দূর করুন

অধ্যাপক সালেহা বেগম চৌধুরী

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাএন্ডো-মার্চ সচেতনতার অংশ হিসেবে প্রতিবছর এন্ডোমেট্রিওসিস-অ্যাডেনোমায়োসিস সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ইএএসবি) গোলটেবিল আলোচনাসভার আয়োজন করে থাকে। সারা পৃথিবীতে মার্চ মাস এন্ডো-মার্চ হিসেবে উদযাপিত হয়। এই উদযাপনের উদ্দেশ্য হলো, এন্ডোমেট্রিওসিস রোগীদের প্রতি সহমর্মিতা, তাদের চিকিৎসার অধিকারকে প্রতিষ্ঠা ও চিকিৎসাব্যবস্থা বিস্তৃত করা।

এন্ডোমেট্রিওসিস সচেতনতার মাসকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর আমাদের একটা স্লোগান থাকে, আমরা একটা থিম ঠিক করি। এটি পরে স্লোগান হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে থাকি। একই সঙ্গে আমরা আমাদের কাজগুলো এগিয়ে নিতে থাকি। এবারের স্লোগান, নারীর ক্ষমতায়ন : এন্ডোমেট্রিওসিস যত্নে বাধা দূর করুন

আবার আমরা নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গকে এন্ডোমেট্রিওসিস চিকিৎসার এবং এর অগ্রগতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য নারীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা, এন্ডোমেট্রিওসিস বিষয়ে তাদের জ্ঞান সমৃদ্ধ করা, তাদের চিকিৎসার অধিকারকে উপলব্ধি করা এবং গবেষণার মাধ্যমে এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণগুলো বের করে আরো অগ্রসর হওয়া।

 

সেবাদাতাকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি

অধ্যাপক ফারহানা দেওয়ান

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাএন্ডোমেট্রিওসিস রোগটি নিয়ে জনসচেতনতার বিকল্প নেই। শুধু দিবসকেন্দ্রিক নয়, সারা বছর বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। রাজধানীতে জাতীয় পর্যায়ের কেন্দ্র স্থাপন, সেখান থেকে একসঙ্গে সারা দেশে বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। প্রেজেন্টেশন, লিফলেট বিতরণ বা ওয়েবিনারের মাধ্যমেও একযোগে এই সচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে। এতে আরেকটি সুবিধা হলো, সবাই জানতে পারবে কোথায় গেলে তারা সঠিক সেবা পাবে।

আমাদের এন্ডোমেট্রিওসিস কর্নারগুলো সক্রিয় করতে হবে, সেবাদাতাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি। এ ক্ষেত্রে লালকুটি সেন্টারকে আমরা প্রশিক্ষণের জন্য কাজে লাগাতে পারি। একই সঙ্গে কারিকুলামে রোগটি সম্পর্কে নতুন সংযোজন প্রয়োজন। তাহলেই সচেতনতার কাজটি সহজ হবে।

ওজিএসবির তিন হাজারের বেশি সদস্য আছেন, যাঁরা সারা দেশে ১৯টি শাখায় কাজ করেন। প্রতিটি ব্রাঞ্চে একজন প্রধান রয়েছেন, ফলে কোনো কার্যক্রম পরিচালনায় আমাদের বেগ পেতে হয় না। সারা দেশে আমাদের অনেক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আছেন। তাঁদের কিভাবে সচেতন করা যায়, সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

অপারেশনের পর মেডিক্যাল চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ

অধ্যাপক গুলশান আরা

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাকিশোরী বা প্রাপ্তবয়স্ত নারীদের এন্ডোমেট্রিওসিসের ক্ষেত্রে প্রথম কাজটি হলো মেডিক্যাল চিকিৎসা। এই রোগটিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ব্যথানাশক নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি ড্রাগস বা এনএসআইডি। এটি একটি নিরাপদ ওষুধ, তবে বারবার খেতে হয়। এটি আবার অনেকের কাছে বড় সমস্যা। প্রায় সময়ই ডোজ মিস হয়ে যায়। তারপর যখন গুরুতর এন্ডোমেট্রিওসিস হয়, তখন এনএসআইডি কাজ করে না। তখন অতিরিক্ত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এর ক্ষতিকর দিক হলো, এসিডিটি বাড়িয়ে দেয়। ফলে এর জন্য আলাদা ওষুধ খেতে হয়। কিশোরী নারীদের এন্ডোমেট্রিওসিসের অপারেশনের পর মেডিক্যাল চিকিৎসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময় রোগী চিকিৎসা না পেলে রোগটির পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এতে কিশোরী নারীদের ইনফার্টিলিটি বেড়ে যায়। এই সময়ে ফলোআপ চিকিৎসা নিলে সুস্থতা নিশ্চিত করা যাবে।

 

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাযথাতথা অপারেশন রোগীর ক্ষতির কারণ

অধ্যাপক সালমা রউফ

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাএন্ডোমেট্রিওসিস চিকিৎসায় সার্জারি হলো চিকিৎসার শেষ ধাপ। যখন একজন গাইনোকোলজিস্ট সার্জারির দিকে যাবেন, তখন চিন্তা করতে হবে সার্জারি রোগীর জন্য কতটা জরুরি। এক. সার্জারি করার ফলে রোগীর উন্নতি কী হবে বা তার ফার্টিলিটি ইমপ্রুভমেন্ট হবে কি না। দুই. সার্জারির কারণে রোগীর কী কী সমস্যা হতে পারে। কারণ এতে রোগীর ডিম্বাণুর রিজার্ভ কমে গিয়ে বন্ধ্যাত্বের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। তিন. অস্ত্রোপচারের জটিলতা রোগীর জন্য সহনশীল কি না। এ ক্ষেত্রে সার্জারির আগে সাধারণ পরীক্ষাগুলো করে জানতে হবে কোন ধরনের এন্ডোমেট্রিওসিস; যেমনখাদ্যনালি, মূত্রথলি বা আশপাশের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে। চার. সার্জারি করার জন্য সার্জনের দক্ষতা কতখানি।

 

চিকিৎসার বাইরে থাকলে বাড়ে ক্যান্সারের ঝুঁকি

অধ্যাপক সাবেরা খাতুন

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাশারীরিক পরিশ্রম, শরীরচর্চা, চর্বিজাতীয় খাবার কম খাওয়া এবং ওজন বৃদ্ধির দিকে নজর রাখতে হবে। নারীদের ঋতুস্রাবের সময় খুব বেশি ব্যথা হলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। মনে রাখতে হবে, এন্ডোমেট্রিওসিস চিকিৎসা যত দ্রুত শুরু করা যায়, সুস্থতার সম্ভাবনা তত বেশি। গবেষণায় এন্ডোমেট্রিওসিসের সঙ্গে ক্যান্সারের সম্পর্ক বেরিয়ে এসেছে। জরায়ুমুখের ক্যান্সারে নির্দিষ্ট কারণ জানা গেলেও এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণ জানা যায়নি। যদিও ক্যান্সারের সঙ্গে এই রোগের কিছু মিল পাওয়া গেছে; যেমনদুটি রোগই শরীরের যেকোনো জায়গায় হতে পারে। অন্যটি হলো চকোলেট সিস্ট। এ ক্ষেত্রে ক্যান্সার নয়রোগীকে এমন আশ্বাস দিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে আলট্রাগ্রাফি বা টিভিএস পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি নির্ণয় করতে হয়।

 

ক্ষমতায়নের গুণাবলি অর্জনেই জীবন-সমাজ সুন্দর হবে

অধ্যাপক ফেরদৌসি বেগম

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতারোগীরা প্রায়ই একটি কথা বলে, ডাক্তাররা বলেছেন, আমার পক্ষে শিশু জন্ম দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তাদের অতীত থেকে জানা যায়, কিশোরীকাল থেকে তারা এন্ডোমেট্রিওসিস রোগে অনেক ভুগেছে। ওই সময় যদি তারা মুখ খুলতে পারত তাহলে হয়তো এমন দিন আসত না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্ষমতার অর্থ ব্যাপক। ক্ষমতা বলতে আমি তিনটি জিনিস বুঝি। এক. সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন, দুই. পুথিগত বিদ্যার বাইরে সুশিক্ষিত, এবং তিন. সম্পদের অধিকার। কারণ অর্থনৈতিক শক্তিই প্রধান ক্ষমতা। চাকরি বা ব্যবসা যেকোনো অর্থনৈতিক সচ্ছলতা থাকতে হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বা অন্যান্য যে ক্ষমতাই থাকুক, তা নিজে প্রয়োগ করতে পারাই আসল ক্ষমতা।

সচেতনতা শুরু করতে হবে পরিবার থেকে

অধ্যাপক কোহিনূর বেগম

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাএন্ডোমেট্রিওসিস শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নারীর রোগ নয়, এটি কিশোরী ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের ক্ষেত্রে হতে পারে। তবে রোগটি শুরু হয় কিশোরী বয়সে, অর্থাৎ ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সে। তবে রোগটি আরো আগেও শুরু হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের মাসিকের সময় তলপেটে তীব্র ব্যথা, কিন্তু সাধারণ ওষুধে কাজ হচ্ছে নাএই গ্রুপের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত এন্ডোমেট্রিওসিস হতে পারে।

রোগটি শনাক্ত করতে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ডায়াগনোসিস একটু দ্রুত হলেও কিশোরী মেয়েরা ডায়াগনোসিসের জন্য অনেক পরে আসে। এর অন্যতম কারণ অসচেতনতা। কারণ বেশির ভাগ মানুষ মনে করে, এটা প্রাপ্তবয়স্কদের হয়। আরেকটা গ্রুপ আছে, যারা লজ্জা বা ভয়ে চিকিৎসকের কাছে যায় না বা তাদের মা-বাবা যেতে দেন না। আরেকটি গ্রুপ আছে, যারা মাসিকের মৃদু ব্যথা ও এন্ডোমেট্রিওসিস ব্যথার পার্থক্য বুঝতে পারে না। এখানে মা-বাবার সচেতনতা জরুরি।

 

প্রয়োজন ছাড়া সার্জারি নয়

অধ্যাপক লায়লা আরজুমান্দ বানু

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাকিশোরী বয়স থেকে এন্ডোমেট্রিওসিসের সূত্রপাত হয়। যখন বাচ্চা মায়ের গর্ভে থাকে, তখনো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এন্ডোমেট্রিওসিস রোগীর ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে সিস্ট হতে পারে। আগে আমরা রোগীদের উপসর্গ দেখে বোঝার চেষ্টা করতাম এন্ডোমেট্রিওসিসের সিস্ট হতে পারে। সিস্ট অনেক রকম হয়। পানি ভরার থলির মতো হলে এটাকে চকোলেট সিস্ট বলি। এখন সিস্টের অনেক ধরনের চিকিৎসা এসেছে। ৫ সেন্টিমিটারের কম সিস্ট হলে ওষুধ খেলেই অনেক সময় তা ভালো হয়ে যাচ্ছে।

অনেক রোগী সিস্ট সার্জারিতে বেশ আগ্রহ প্রকাশ করে। তবে রোগী চাইলেই হবে না, চিকিৎসককে বুঝতে হবে সার্জারি করলে রোগীর ভালো হবে না ক্ষতি হবে।

 

এন্ডোকেয়ার ক্লিনিক থাকাটা অত্যন্ত জরুরি

অধ্যাপক ফাতেমা রহমান পিংকী

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাআমাদের দেশে রোগীর তুলনায় চিকিৎসকের স্বল্পতা আছে। বিশেষজ্ঞদের স্বল্পতা আরো বেশি। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সারাক্ষণ রোগীর ভিড় লেগে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পক্ষে রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, রোগ নির্ণয়, রোগীর ইতিহাস জানা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই এন্ডোমেট্রিওসিস রোগীদের জন্য স্বতন্ত্র এন্ডোকেয়ার ক্লিনিক থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা পেতে যেন রোগীদের ভোগান্তির সম্মুখীন হতে না হয়।

সরকারি হাসপাতালে যেসব রোগী মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্ত যাওয়া, বেশি ব্যথা অনুভব হওয়া, স্বামীর সঙ্গে মেলামেশার সময় ব্যথা বা বন্ধ্যাত্বের লক্ষণ নিয়ে আসে, তাদের যেন এন্ডোকেয়ার ক্লিনিকে পাঠিয়ে দিতে পারি। যাতে তাদের বিভিন্ন কাউন্টারে ঘুরে ঘুরে চিকিৎসা নিতে না হয়।

 

গর্ভধারণ ও স্তন্যপান রোগ নিরাময়ে সহায়ক

অধ্যাপক বেগম নাসরিন

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাএন্ডোমেট্রিওসিস একটি প্রগতিশীল রোগ। এর চারটি ধাপ আছে। রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীদের মধ্যে লক্ষণও বাড়তে থাকে। এটা এমন কোনো রোগ নয়, যেটা প্রতিকার করা যায়। এর কোনো টিকাও নেই। যত দ্রুত রোগ নির্ণয় করা যাবে, তত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে রোগের বিস্তার থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

অতিস্থূলতা ও বাড়তি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কফি, অ্যালকোহল ও ধূমপান যারা বেশি করে তাদের এই সমস্যা বেশি। এসব অভ্যাস বাদ দিতে হবে। গরুর মাংস ও চর্বিজাতীয় খাবার পরিত্যাগসহ কিছু খাবার বেছে চলতে হবে।

 

স্কুল থেকে সচেতনতা বাড়াতে হবে

অধ্যাপক শেহরিন এফ সিদ্দিকা

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাএন্ডোমেট্রিওসিস মারণব্যাধি না হলেও তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এন্ডোমেট্রিওসিস মানেই হলো ব্যথা, ব্যথা এবং ব্যথা। চলাফেরায় ব্যথা, মাসিকের ব্যথা, প্রস্রাব-পায়খানা করার সময় ব্যথা, স্বামীর সহবাসের সময় ব্যথা। একটা সময় এ রকম হয় যে ব্যথা নিয়েই তার জীবন চলছে। আমরা যদি এর ব্যাপকতা দেখি, বেশির ভাগ রোগীর ডায়াগনোসিস হয় অন্তত সাত বছর পর। তখন দেখা যায়, রোগীর অনেক বড় একটা সিস্ট হয়ে গেছে এবং এর ব্যাপকতা হিসেবে কিশোরী মেয়েটির সন্তানসম্ভাবনা হওয়ার সক্ষমতা কমে এসেছে। তার ইনফার্টিলিটি এরই মধ্যে বেশি হয়ে গেছে। সুতরাং আমার মনে হয়, স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি ও আক্রান্তদের আলাদা করা যেতে পারে।

গবেষণায় দেখা যায়, এই রোগে আক্রান্ত ৫০ শতাংশ নারী যথাযথভাবে যৌনজীবনে যেতে পারে না। ৪০ শতাংশ মেয়ে অফিস বা স্কুলে যাওয়ার মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না। ৩০ শতাংশ মেয়ের স্কুল ড্রপ হয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য স্কুল থেকে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

 

এন্ডোমেট্রিওসিস উইং চিকিৎসাব্যবস্থা সহজ করবে

অধ্যাপক নুরুন্নাহার খানম

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতামেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস অ্যান্ড গাইনি বিভাগে এন্ডোমেট্রিওসিস উইং চালু করা আমাদের স্বপ্ন। এটি যদি করা যায় তাহলে ভবিষ্যতে এন্ডোমেট্রিওসিস অনেক সহজ হয়ে যাবে। এ ছাড়া যদি আমরা এন্ডোকেয়ার ক্লিনিক করতে চাই তাহলে বহির্বিভাগে সপ্তাহে ছয় দিন চিকিৎসা দিতে হবে। এর জন্য বহির্বিভাগে আলাদা কক্ষ থাকতে হবে, আলাদা সেন্টার হতে হবে। কোনো রোগীর যদি বন্ধ্যাত্বের কারণে ল্যাপারোস্কোপির অথবা মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট দরকার হয়, তারপর তারা ইনফার্টিলিটিতে যাবে। যেগুলো বন্ধ্যাত্ব নয়, বিশেষ করে কিশোরী মেয়ে যারা সার্জারি করতে চায় না, তাদের জন্য কাউন্সেলিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে। এ জন্য আলাদা ওয়ার্ড রাখতে হবে। আলাদা চিকিৎসক দরকার। গাইনোকোলজিস্টদের বেশি বেশি প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

 

বহির্বিভাগের ৫০% রোগীর এন্ডোমেট্রিওসিস সমস্যা

ডা. ফারজানা দীবা

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাসচেতনতা তৈরি এন্ডোমেট্রিওসিস রোগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই রোগ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। আমরা বিএসএমএমইউতে বন্ধ্যাত্বের পাশাপাশি এন্ডোমেট্রিওসিসের চিকিৎসা করি। কিছু রোগী আসে শুধু মাসিকজনিত রোগ নিয়ে। আবার কিছু রোগী আসে বন্ধ্যাত্ব নিয়ে। এ সময় আমরা এন্ডোমেট্রিওসিস রোগী পেয়ে যাই। ৩০ শতাংশ রোগী আমরা আউটডোরে পাই। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ রোগীই এন্ডোমেট্রিওসিস সমস্যা নিয়ে আসে। দেখা যায়, প্রতি দুইজনের একজন এই রোগে ভুগছে। এখানে কিছু কিশোরীও আসে।

 

আইভিএফ সফলতা ৪০ শতাংশ

ডা. ফ্লোরিডা রহমান

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাপ্রথমে আমরা রোগীকে কাউন্সেলিং করি। এরপর প্রত্যেক রোগীর ট্রান্সভ্যাজাইনাল সনোগ্রাফি করি। জানার চেষ্টা করি সিস্টের পরিমাপ চার সেন্টিমিটারের বেশি না কম। একই সঙ্গে আলট্রাসনোগ্রাফ করে বোঝার চেষ্টা করি রোগী কোন পর্যায়ে রয়েছে। এরপর ডিম্বাশয়ের সক্ষমতা যাচাই, বড় ধরনের কোনো সমস্যা বা কোমরবিডিটিস আছে কি না দেখে নিই।

যদি রোগী স্টেজ-ওয়ান বা স্টেইজ-টুতে থাকে, যেটাকে বলে মাইল্ড এন্ডোমেট্রিওসিস।

স্টেজ-থ্রি বা স্টেজ-ফোর রোগীর ক্ষেত্রে সরাসরি আইভিএফ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা ছাড়া আইভিএফ করলে যেখানে স্টেজ-ওয়ান বা স্টেজ-টু সফলতার হার ৪০ শতাংশ, সেখানে স্টেজ-থ্রি বা স্টেজ-ফোর সফলতা ১২ থেকে ১৩ শতাংশ। এ জন্য আমেরিকান সোসাইটির গাইডলাইন অনুযায়ী যদি কারো ব্যথা থাকে, ডিম্বাশয়ের রিজার্ভ ভালো, এর সঙ্গে ডিম্বাশয়ের এন্ডোমেট্রিওমা আছে চার সেন্টিমিটারের বেশিএ ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কোপি করার কথা বলা আছে।

যাদের বয়স ৩৫ বছরের বেশি, ডিম্বাশয়ের রিজার্ভ অনেক কমএই রোগীদের আমরা বলি, আপনার বিকল্প চিকিৎসা হচ্ছে আইভিএফ।

 

টিভিএস এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্তে সহজ পদ্ধতি

ডা. মাহফুজা মাহমুদ চৈতি

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাএন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্তে ট্রান্স-অ্যাবডোমিনাল আলট্রাসাউন্ড, ট্রান্সভ্যাজাইনাল আলট্রাসাউন্ড ও এমআরআই করে থাকি। কিন্তু এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্তে যেসব পরীক্ষা পদ্ধতি আছে তার মধ্যে ট্রান্সভ্যাজাইনাল আলট্রাসাউন্ড বা টিভিএস একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে সংবেদনশীলতা ও সঠিক রোগ শনাক্তের হার ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ। একই সঙ্গে রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে পারি।

ট্রান্সভ্যাজাইনাল আলট্রাসাউন্ড খুবই সহজলভ্য। এটা যোনিতে একটি ছোট কাঠির মতো ডিভাইস (ট্রান্সডুসার) স্থাপন করে সঞ্চালিত হয়। ইউটেরাস, জরায়ু, ফেলোপেন টিউবসব ছবি নিয়ে আমরা পরীক্ষা করতে পারি। এ বিষয়ে দক্ষ না হলে শনাক্তকরণ ভুল হতে পারে।

টিভিএস পরীক্ষা এখন আমাদের অনেক বিশেষজ্ঞই করছেন। আমাদের উচিত যেসব জায়গায় ভালোভাবে পরীক্ষাটা হয় সেখানে এন্ডোমেট্রিওসিস রোগীকে পাঠানো। গাইনোকোলজিস্টরা বিশেষ প্রশিক্ষণ পেলে এন্ডোমেট্রিওসিস বা চকোলেট সিস্টএগুলো পরীক্ষা করতে পারে। এতে রোগটি দ্রুত শনাক্ত করতে পারব।

 

ঘর থেকে ক্ষমতায়নের যাত্রা শুরু করতে হবে

ডা. মো. মনজুর হোসেন

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আলোকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের চিকিৎসার যত প্রটোকল, গাইডলাইন, চেকলিস্টসব কিছু পেশাদার সংগঠনের থেকে নিয়ে বাস্তবায়ন করে থাকি। এন্ডোমেট্রিওসিস, অ্যাডেনোমায়োসিস, পিসিওএস প্রোগ্রাম কিন্তু আগে ছিল না। তবে কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য উন্নয়নে এর কৌশলগত উন্নয়ন যেটুকু করেছিলাম, সেখানেও প্রশিক্ষণ ছিল না। আপনারা জেনে খুশি হবেন, ওজিএসবির সহায়তায় সেবা প্রদানকারীদের প্রশিক্ষণের আওতায় এই তিন বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি।

নারীর ক্ষমতায়ন কারো একার পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা বলব, ঘর থেকে যাত্রা শুরু করো। আমি যদি আমার সমাজকে, আমার মেয়েকে ক্ষমতায়ন করতে চাই, আমার বাড়ি থেকে শুরু করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সুশিক্ষা, সুস্বাস্থ্য ও ক্ষমতায়ন। আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে। আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই তথ্য বেশির ভাগ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এ জন্য স্কুল হেলথ এডুকেশন প্রোগ্রামে পাঠ্যক্রম রয়েছে। সেখানে কিছু পাঠ আমরা যোগ করেছি। তবে বিদ্যমান কাঠামোতে আমরা এখনো এন্ডোমেট্রিওসিস ও অ্যাডেনোমায়োসিস যোগ করতে পারিনি। আজকে যেহেতু আমরা একত্র হয়েছি এবং এখানে এন্ডোমেট্রিওসিসকে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আমার বিদ্যমান কাঠামোতে এ বিষয়গুলো যুক্ত করতে।

 

নারীর ক্ষমতায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে এন্ডোমেট্রিওসিস

ডা. মো. সাঈদ বিন ফয়সল

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতাশুধু চিকিৎসা দিয়ে এন্ডোমেট্রিওসিস নিরাময় সম্ভব নয়। আমরা যদি সচেতনতা তৈরি করতে না পারি, আমাদের কোনো পরিশ্রমই অর্থবহ হবে না। স্কুল, পাঠ্যবই, শিক্ষক বা সরকারি কোনো সাহায্যের মাধ্যমে যদি সচেতনতা তৈরি করা যায় তাহলে দ্রুততম সময়ে শনাক্ত ও নিরাময় করতে পারব। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসা অর্থবহ হবে। অনেক রোগীকে সার্জারি পর্যন্ত যেতে না-ও হতে পারে।

নারীর ক্ষমতায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে এন্ডোমেট্রিওসিস। নতুন বাংলাদেশে এন্ডোমেট্রিওসিস নিরাময়ে আমাদের সবার প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হবে বলে আমি মনে করি। আমি ইনসেপ্টার পক্ষ থেকে বলব, এন্ডোমেট্রিওসিস নিরাময়ে সহজলভ্য ও স্বল্পমূল্যে বাজারে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। যেকোনো ধরনের সচেতনতা বা চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজে ইনসেপ্টা অত্যন্ত উৎসাহী। আমরা আপনাদের পাশে আছি এবং সব সময় থাকব।