• ই-পেপার

লজ্জা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি
মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার বিষয়ক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা। ছবি : লুতফর রহমান

হাত-পা কাঁপছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে, দাঁড়াতে গিয়ে আচমকা পড়ে যাচ্ছেন অথবা স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাচলা করতে পারেন না—দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে এমন রোগীর সংখ্যা। এ ধরনের রোগকে বলা হয় মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার।
রোগের উপসর্গ নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা এবং অপ্রতুল চিকিৎসাব্যবস্থার কারণে বেশির ভাগ রোগীই থেকে যাচ্ছেন চিকিৎসার বাইরে। এই রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুলও, সে কারণেও অনেকে চিকিৎসা নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। বিশ্ব মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার দিবস [২৯ নভেম্বর] উপলক্ষে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও অভিজ্ঞজনদের গোলটেবিল আলোচনায় উঠে এসেছে এসব তথ্য। ৩ ডিসেম্বর বুধবার দুপুরে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের (নিনস) আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় গোলটেবিল বৈঠকটি। এই আয়োজনের সায়েন্টিফিক পার্টনার এসিআই পিএলসি, মিডিয়া পার্টনার কালের কণ্ঠ। ক্রোড়পত্র গ্রন্থনায় এস এম তাহমিদ

 

অন্য রোগেও হয় মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার

অধ্যাপক ডা. কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরিস্ট্রোক-পরবর্তী জটিলতা হিসেবে দেখা দিতে পারে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার। মস্তিষ্কের কিছু বিশেষ জায়গা, যেমন—ব্যাসাল গ্যাংলিয়া যদি স্ট্রোক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সে ক্ষেত্রে দেহে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরিঅনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া হতে পারে। স্ট্রোক ছাড়াও অন্যান্য রোগ থেকেও হতে পারে মস্তিষ্কের ক্ষতি। বিশেষ করে ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে ব্লাড সুগার বেড়ে গেলে হঠাৎ করে শুরু হয় অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া। এটি চট করে সব বিশেষজ্ঞ ধরতে পারেন না। ডায়াগনস্টিক ইমেজিং করে যদি দেখা যায়, ব্যাসাল গ্যাংলিয়াতে হাইপার ডেন্স লিশন তৈরি হয়েছে, সে ক্ষেত্রে হয়তো রেডিওলজিস্ট কমেন্ট করে দেবেন যে এটা হেমারেজ। অথচ মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার বিশেষজ্ঞ সেটিকে হেমারেজ হিসেবে শনাক্ত না করে দ্রুত সুগার টেস্ট করাবেন, তখন ধরা পড়বে এটি হেমারেজ নয় বরং সুগার স্পাইকজনিত স্ট্রাইটোপ্যাথি, যা চিকিৎসাযোগ্য। আবার বেশির ভাগ মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার রোগীর আমরা পারকিনসন্স ডিজিজে আক্রান্ত হিসেবে চিন্তা করি, সেটিও ভুল হতে পারে। হতে পারে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অ্যান্টি-সাইকোটিক ওষুধ সেবন করছেন, সেটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এটি। এ ধরনের ভুল ডায়াগনোসিস প্রতিরোধে প্রথমে প্রয়োজন দেশের প্রত্যেক চিকিৎসককে এ বিষয়ে সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া। দ্বিতীয়ত, আমরা টেলিমেডিসিন কাজে লাগাতে পারি। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রোগীর নড়াচড়া দেখেও কিছু কিছু মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার সঙ্গে সঙ্গে শনাক্ত করা যায়।

 

রোগ শনাক্তে তৈরি হচ্ছে আধুনিক ল্যাব

অধ্যাপক ডা. মোঃ বদরুল আলম

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরিমুভমেন্ট ডিস-অর্ডার চিকিৎসায় আমাদের এক নম্বর চ্যালেঞ্জ রোগীদের কাছে পৌঁছানো। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে রোগীদের উৎসাহিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য তাদের হাসপাতালমুখী করা বাংলাদেশে বেশ কঠিন। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ, যত ধরনের মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার আছে এর প্রতিটিই ডায়াগনোসিস করাতে লাগে—সিটি স্ক্যান অথবা এমআরআই। তাই এসব পরীক্ষা সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে হবে। তৃতীয় চ্যালেঞ্জ, ওষুধ সরবরাহ ও সঠিক মাত্রায় গ্রহণ নিশ্চিত করা।  দীর্ঘদিন ওষুধ গ্রহণ করতে হয় বেশিরভাগ রোগীর, আজীবনও ওষুধ চালাতে হতে পারে। রোগীদের মধ্যে সারা জীবন ওষুধ সেবনের রুটিন ধরে রাখা এবং সুলভ মূল্যে ওষুধের প্রাপ্তি নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। চতুর্থ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, চিকিৎসক, নার্স বা টেকনিশিয়ান তথা সামগ্রিক ম্যানপাওয়ার দক্ষ করে তোলা এবং দেশের প্রতিটি অংশে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা। পঞ্চম চ্যালেঞ্জ, দেশে অত্যাধুনিক নিউরোসার্জিক্যাল চিকিৎসাব্যবস্থা তৈরি করা। সরকারের প্রতি বলতে চাই, মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ এবং ডিভাইসের পাশাপাশি শনাক্তকরণের উপকরণ ট্যাক্স ফ্রি করে দিলে সবার নাগালের মধ্যে পৌঁছে যাবে এ রোগের চিকিৎসা। নিনস-এ একটি অত্যাধুনিক ল্যাব তৈরি হচ্ছে। এটির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এরই মধ্যে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি। এই ল্যাবটি হবে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার চিকিৎসায় বাংলাদেশের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

 

জেনেটিক পরীক্ষা ও কাউন্সেলিং জরুরি

অধ্যাপক ডা. আফজাল মমিন

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরিমুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের বেশির ভাগই বংশানুক্রমে সঞ্চারিত হয়। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ‘এসেনশিয়াল ট্রেমরস’। রোগীরা প্রায়ই বলে থাকে, ‘আমার দাদা/বাবা/ভাই-এর হাত-পা/মাথা কাঁপত।’ দেশে অনেক উইলসন্স ডিজিজ রোগীও আছে, সেটিও বংশগত রোগ। এ ছাড়াও রয়েছে হান্টিংস কোরিয়া, হেরিডিটারি ডিস্টোনিয়া, ফ্যামিলিয়াল পারকিনসন্স ডিজিজ। এসব রোগের কারণ জিনগত ত্রুটি, তাই পুরোপুরি নিরাময় অসম্ভব। ফলে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ করা বেশি জরুরি। জেনেটিক কাউন্সেলিং অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ। রোগী ও তার আত্মীয়-স্বজনকে বোঝাতে হবে, জেনেটিক টেস্টের প্রয়োজনীয়তা কী। পরবর্তী প্রজন্মে যাতে রোগগুলো সঞ্চারিত না হয় সে জন্য পদক্ষেপ নেওয়া বা প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত করার প্রস্তুতি নেওয়াও জরুরি। উইলসন ডিজিজের চিকিৎসা আগেভাগে শুরু করলে স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনযাপন করতে পারে রোগী। এটি দুঃখজনক যে আমরা এখনো জেনেটিক ল্যাব সব জায়গায় তৈরি করতে পারিনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করছে নিনস। একই মানের চিকিৎসাসেবা অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজ এবং জেলা-উপজেলার হাসপাতালে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। নিনসে প্রতি সপ্তাহে বসছে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার ক্লিনিক। চিকিৎসার পাশাপাশি গবেষনার জন্য রোগীদের তথ্যও সংগ্রহ করার কাজও চলছে।

 

চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা হবে

অধ্যাপক ডা. মাহমুদুল ইসলাম

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরিমুভমেন্ট ডিস-অর্ডার সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সদস্যসচিব হিসেবে আমার বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার সংক্রান্ত শিক্ষাদান কার্যক্রম এবং গবেষণা চালিয়ে যাওয়া। নিয়মিত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং ওয়ার্কশপের মাধ্যমে চিকিৎসকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত করতে পারি আমরা। দ্বিতীয়ত, প্রাইমারি ফিজিশিয়ানদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করব, পাশাপাশি গবেষণার অর্থায়নের জন্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করব। তিন নম্বরে আছে রোগীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো। মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারকে অভিশাপ মনে করে অনেকে, ধরে নেয় এর কোনো চিকিৎসা নেই। এসব বিভ্রান্তি দূর করা আমাদের দায়িত্ব। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে মিলে চিকিৎসকদের মাস্টার ক্লাস ও ফেলোশিপের আয়োজন করা। সরকারি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য থাকবে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের ওষুধ এবং চিকিৎসার সরঞ্জামের অপ্রতুলতা দূর করে সেগুলো সুলভ মূল্যে রোগীদের কাছে পৌঁছানো। জেনেটিক টেস্টিং ফ্যাসিলিটি বা অ্যাডভান্সড ইলেক্ট্রোফিজিওলজি সুবিধা নিনস-এর বাইরে নেই বলা যায়। আশার কথা, নিনস-এ প্রতি মঙ্গলবার বসে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার ক্লিনিক। এখানে প্রতি সপ্তাহে ৬০-৭০ জনকে আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি। বোটক্স ইনজেকশনও পাচ্ছে ১০-১৫ জন। শিগগিরই হয়তো আমরা ফেলোশিপ প্রোগ্রামেও পাঠাব চিকিৎসকদের।

 

সব মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার পারকিনসন্স নয়

অধ্যাপক ডা. মোঃ আব্দুল আলীম (নাদিম)

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরিমুভমেন্ট ডিস-অর্ডার বুঝতে হলে দেহের অঙ্গগুলো কিভাবে নড়ে সেটি জানতে হবে। দুটো প্রক্রিয়া পাশাপাশি কাজ করে—একটি নিউরোনাল সার্কিট, যা মস্তিষ্ক থেকে পেশি পর্যন্ত সংকেত পৌঁছায়, অন্যটি নিউরোকেমিক্যাল মিডিয়েটরস। একটি সিস্টেমেও গণ্ডগোল হলে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার তৈরি হয়। পারকিনসনিজম বা পারকিনসন্স ডিজিজের পাশাপাশি আরো কিছু মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার আমরা হরহামেশা দেখতে পাই, যেমন—ট্রেমর। এসেনশিয়াল ট্রেমর বা কাঁপুনির পেছনে কিছু জেনেটিক বা বংশগত কারণ থাকে। এ ছাড়াও আছে ডিস্টোনিয়া, অর্থাৎ রোগী দেহের ভারসাম্য বা স্থিরতা ধরে রাখতে পারে না। এর পেছনে রয়েছে স্নায়ুতন্ত্রে অনিয়ন্ত্রিতভাবে নড়াচড়ার সংকেত তৈরি হওয়া। প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ১৫ থেকে ৩০ জন এ সমস্যায় ভুগছে। টিক নামেও একটি সমস্যা রয়েছে, যা ছোটদের বেশি হয়। অবচেতনেই অনেকে ঘাড় ঘুরানো বা চোখ পিটপিট করে মজা পায়, একসময় এটি অনিয়ন্ত্রিত টিক-এ পরিণত হয়। কিছু সাইকিয়াট্রিক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় হতে পারে ড্রাগ ইনডিউসড মুভমেন্ট। রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম, অর্থাৎ ঘুমের মধ্যে হাত-পা ছোড়ার সমস্যাও রয়েছে অনেকের।

 

আধুনিক চিকিৎসা দেশেই সম্ভব

অধ্যাপক ডা. মোঃ মাহবুবুল আলম

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরিপারকিনসন্স ডিজিজের মূল লক্ষণের বাইরেও বেশ কয়েকটি উপসর্গ আছে।  যেমন—হাঁটাচলায় অসুবিধা, ছোট ছোট কদমে হাঁটা বা ফেস্টিনেশন, হাঁটতে গেলে পা জড়িয়ে যাওয়া, ‘এক্সপ্রেশনলেস ফেস’, অর্থাৎ রোগীর মুখে কোনো অভিব্যক্তি থাকে না, আবার অনেকের মুখ দিয়ে লালা ঝরে। এর মধ্যে আছে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যাওয়া, অর্থাৎ হাইপোটেনশন। কোষ্ঠকাঠিন্য ও সেক্সুয়াল ডিসফাংশনও দেখা দিতে পারে। আমরা দেখেছি কোনো রোগীর হয়তো রাতে প্রচুর পরিমাণ প্রস্রাব হচ্ছে বা রোগী অতিরিক্ত ঘেমে যাচ্ছে। আবার অনেকের ঘাম কমেও যায়। রোগীর অনিদ্রা দেখা দেয়, ক্রাম্পিং পেইন বা পেশিতে টান ধরার ব্যথা হয়। নিউরোসাইকিয়াট্রিক সিম্পটমও হতে পারে, যেমন—রোগী ডিপ্রেসড ও হতাশ হয়ে যায়, কাজকর্মে অনীহা বা অ্যাপাথিও থাকতে পারে। শুরুতে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসার চেষ্টা করা হয়। অনেক পারকিনসন্স রোগীর হঠাৎ করে পুরোপুরি নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে আমরা নতুন ওষুধ অ্যাপোমরফিন ইনজেকশন দিচ্ছি। তবে মনে রাখা জরুরি, শুধু ওষুধের ওপর ভরসা করলে হবে না। ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি এবং প্রয়োজনে সার্জারিও করতে হতে পারে। ডিবিএস বা ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন সার্জারি প্রয়োজন হলে নিনস-এ করা সম্ভব।

 

ভ্রান্ত ধারণায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা

অধ্যাপক ডা. শামীম রশিদ

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরিদেশের বেশির ভাগ রোগীর পারকিনসন্স ডিজিজ প্রথম শনাক্ত হয় হাত-পায়ের কাঁপুনি বা ট্রেমর দেখে। ট্রেমর ছাড়াও দ্বিতীয় উপসর্গ হিসেবে চলাফেরার ধীরগতি বা ব্রাডিকাইনেসিয়াও হয়ে থাকে। এটি দেখা দিলে হাঁটার ছন্দের সঙ্গে রোগীর হাত স্বাভাবিক গতিতে দোলে না, হাঁটার গতিও থাকে কম। তৃতীয় উপসর্গ বলা যায় রিজিডিটি বা জড়তা, চলাফেরার সময় রোগী স্বাভাবিকভাবে হাত-পা নাড়াতে পারে না। চতুর্থ যে উপসর্গ দেখা যায়, সেটি হচ্ছে ভারসাম্যহীনতা। রোগী দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পড়ে যায়, হাঁটার সময় তাল হারিয়ে ফেলে। এ চার ধরনের লক্ষণ দেখেই আমরা বুঝে নিই, পারকিনসন্স দেখা দিয়েছে। পারকিনসন্স বা অন্যান্য মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের উপসর্গ বা কারণ সম্পর্কে এখনো খুব কম মানুষই জানে। আর যখন কোনো বিষয়ে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থাকে, তখনই এটা নিয়ে বিভ্রান্তি শুরু হয়, ছড়াতে শুরু করে নানাবিধ কুসংস্কার।  কাঁপুনির কথাই ধরি, অনেকের ভ্রান্ত ধারণা আছে যে এটি স্ট্রোকের লক্ষণ। কালো জাদু, জ্বিনের আছরের মতো কুসংস্কারও দেখা যায়। এ ধরনের রোগ কখনো ভালো হয় না, চিকিৎসা ঠিকমতো হয় না এবং এই রোগ শুধু বয়স্কদের হয়—এমন ভ্রান্ত ধারণাও বেশ প্রচলিত।

 

চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হবে

ডা. জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরিমুভমেন্ট ডিস-অর্ডার চিকিৎসায় প্রথম ২০১৭ সালে দেশে দুটি নিউরোসার্জারি করা হয়। এরপর ২০২৩ সালে আমরা তিন দিনে পর পর পাঁচটা সার্জারি করেছিলাম। এ বছর (২০২৫) করেছি দুটো অপারেশন। সব মিলিয়ে দেশেই আমরা ৯ জন রোগীকে সফলভাবে সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসা দিয়েছি। এর মধ্যে সাতটি সার্জারি হয়েছে পারকিনসন্স ডিজিজ রোগীর, আর দুটি অপারেশন হয়েছে ডিস্টোনিয়া রোগীর। ৯ জনের জন্যই করা হয়েছে ডিবিএস (ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন) সার্জারি, অর্থাৎ রোগীর বুকের চামড়ার নিচে একটা পেসমেকার বসিয়েছি এবং সেই পেসমেকার থেকে ইলেকট্রিক সংযোগ দেওয়া হয়েছে মস্তিষ্কের গভীরে দুটি জায়গায়। ডলার বিনিময়ের হার বাড়ার পর ডিভাইসের দাম অনেক বেড়ে গেছে। এখন দাম ২৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা। সরকার শুধু ডিভাইসের মূল্যের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ ভর্তুকি দেয়, এর পরও সার্জারিতে রোগীদের মোট খরচ হয় ১৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা। অনেক রোগীর পক্ষেই সেটি বহন করা সম্ভব হয় না। রোগীদের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে আমরা পেসমেকার না বসিয়ে লেইসন সার্জারি করতে পারি। লেজারের মাধমে মস্তিষ্কে এ সার্জারি করা হয়।

 

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার হয় দুই ধরনের

ডা. ইমরান সরকার

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরিমোটা দাগে আমরা দুই ধরনে ভাগ করি মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারকে—নড়াচড়া কমে যাওয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া। এর মধ্যে আড়ষ্টতাজনিত সমস্যাগুলোর প্রাদুর্ভাবই বেশি দেখা যায়। আড়ষ্ট মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের মধ্যে পারকিনসন্স সবচেয়ে বেশি দেখি। অতিরিক্ত নড়াচড়ার মধ্যে বেশি দেখা যায় ট্রেমর বা কাঁপুনি। দেহের এক পাশ বেঁকে যেতে পারে, ফলে ভারসাম্য রক্ষায় সমস্যা হয়—এটিকে আমরা বলি ডিস্টোনিয়া। এ ছাড়াও দেখা যায় হাত-পায়ে আচমকা ঝাঁকুনি দেওয়ার রোগ হেমিব্যালিসমাস, নাচের মতো করে ছন্দে ছন্দে অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়ার রোগ কোরিও-অ্যাথিটোসিস এবং টার্ডিভ ডিসকাইনেশিয়া। উইলসন ডিজিজের প্রাদুর্ভাবও আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে। সারা বিশ্বেই মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের বিষয়ে সচেতনতা এখনো কম, তাই ২০২২ সাল থেকে বিশ্ব মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার দিবস পালন শুরু করে আন্তর্জাতিক পারকিনসন্স এবং মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার সোসাইটি। দেশে ২০২৩ সাল থেকে আমরা (নিনস) দিবসটি পালন করছি—সচেতনতা শোভাযাত্রা এবং বিভিন্ন সায়েন্টিফিক ও অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম পরিচালনার মাধ্যমে।

 

দেশেই হচ্ছে সফল নিউরোসার্জারি

ডা. মোহাম্মদ রাকিব-উল-হক

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরিসার্জারির মাধ্যমেও এখন মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার চিকিৎসা করা যায়। যে রোগীদের মধ্যে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স দেখা যায়, অর্থাৎ ওষুধ গ্রহণের পরও তাদের উপসর্গের উন্নতি নেই, অথবা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট জটিলতা রোগীর পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না, এ ধরনের রোগীদের আমরা সার্জারির জন্য বেছে নিই। পারকিনসন্স রোগের চিকিৎসায় সার্জারি অত্যন্ত কার্যকর। এমআরআই, সিটি স্ক্যান ইমেজ এবং স্টেরিওট্যাকটিক ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে আমরা রোগীর মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু জায়গা বেছে নিই। মস্তিষ্কের গভীরের সেসব স্থানে সার্জারির মাধ্যমে আমরা ইলেকট্রোড স্থাপন করি। এর সঙ্গে সংযুক্ত করা হয় ব্যাটারিচালিত একটি পালস জেনারেটর ডিভাইস। রোগীর বুকের চামড়ার নিচে এটি স্থাপন করা হয়। এটি দেহের বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর মাধ্যমে আমরা নিয়ন্ত্রণ করি রোগীর মস্তিষ্কের অ্যাবনরমাল ইলেকট্রিক্যাল অ্যাক্টিভিটি। ডিভাইসটি ব্যবহারে চলাফেরার ধীরগতি ঠিক হয়ে যায় এবং ট্রেমরও কম হয়। এখন নিনস—এই নিউরোসার্জারি ডিপার্টমেন্টের একটি সাবডিভিশন রয়েছে যার নাম ফাংশনাল নিউরোসার্জারি ইউনিট। আমরা এ ধরনের সার্জারি সফলতার সঙ্গে করে যাচ্ছি।

 

রোগী ও চিকিৎসকদের পাশে এসিআই

ডা. রুমানা দৌলা

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরিএসিআই-এর প্রধান লক্ষ্য বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জীবনের মান উন্নত করা।  আমরা সব সময় নিনসের  পাশে আছি। ২০২৩ সাল থেকে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার দিবস ঘিরে নানাবিধ আয়োজন করছি, সামনেও করব। এ বছর ১৩টি জেলায় আমরা প্রোগ্রাম করেছি। এর মধ্যে আছে চিটাগং মেডিক্যাল কলেজ, বিএমইউ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ তথা মিডফোর্ড হাসপাতাল, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ, সিলেট মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ, নিনস, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ, সিলেটে নর্থ ইস্ট মেডিক্যাল কলেজ ও জালালাবাদ রাগিব-রাবেয়া মেডিক্যাল অ্যান্ড হাসপাতাল। একজন প্যালেটিভ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে বলতে চাই, মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের সঠিক চিকিৎসা জীবনের মান উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। জীবনযাপনে বাধা সৃষ্টি করে এমন উপসর্গগুলো অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এ লক্ষ্যে রোগী ও চিকিৎসকদের পাশে আমরা থাকতে চাই সব সময়। দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যার জরিপ ও গবেষণার ক্ষেত্রে আমরা নিনসের সঙ্গে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আমাদের প্রয়াস সফল করতে সরকারের নীতিনির্ধারকরা এগিয়ে আসবেন—এটিও আমরা আশা করছি।

 

এসিআই দিচ্ছে সুলভ মূল্যে ওষুধ

ডা. আবুল বাশার হাওলাদার

মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরিএসিআই-এর পক্ষ থেকে আমরা সব সময় চেষ্টা করে থাকি ওষুধের মূল্য যেন নাগালের মধ্যে থাকে। তবে মানের সঙ্গে কখনোই আপস করা হয় না। মান না কমিয়ে যতটা সম্ভব মূল্য কমিয়ে ওষুধ বিক্রি করি আমরা। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারি নীতিমালা অনেক বড় বাধা। আপনারা জানেন যে ওষুধ শিল্পে আমাদের পাইকারি বা উৎপাদক মূল্যের ওপর প্রায় ১৬.৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয়। কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে সরকার ভ্যাট মওকুফ করে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধে এমন উচ্চহারের করের বোঝা বহন করা অনেক রোগীর পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর। সরকার যদি এই উচ্চহারের ভ্যাট কমানোর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বাংলাদেশের জনসাধারণের জন্য আমরা আরো সুলভ মূল্যে ওষুধগুলো সরবরাহ করতে পারব। এর ফলে অসচ্ছল রোগীদের মধ্যে কিছু সময় পর চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমবে, স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবেন তাঁরা। মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের জন্য আমরা বিশ্বমানের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ওষুধ তৈরি করে থাকি, যেমন—লেভেডোপা-কার্বিডোপা। এই ওষুধগুলো যেন প্রতিটি রোগী সুলভে কিনতে পারেন, সে বিষয়ে আমরা সব সময়ই সচেষ্ট থাকি।

 

 

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা
‘বিপর্যয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্য’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি বা সংকটকালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হওয়া এবং গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনায় আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসার প্রবণতা কম। এ ছাড়া চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবায় জনবল স্বল্পতা, রেফারেল ও বাজেট সমস্যাও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিপর্যয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্য শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অভিজ্ঞজনদের আলোচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সভাকক্ষে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে কালের কণ্ঠ। আয়োজনে সহায়তা করেছে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।  ক্রোড়পত্র গ্রন্থনা : শিমুল মাহমুদ ও মো. জুবায়ের

 

বেশির ভাগ সাইকিয়াট্রিস্ট নগরকেন্দ্রিক

ডা. মো. নিজামউদ্দিন

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদেশে এখন ৪০০ জনের মতো সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন, কিন্তু সবাই নগরকেন্দ্রিক এবং ঢাকায়ই বেশি। প্রান্তিক পর্যায়ে তেমন কেউ নেই। যদিও এখন শুক্রবার ঢাকার বাইরে গিয়ে সার্ভিস দেওয়ার ট্র্যাডিশন হয়েছে। ফলে কিছুটা হলেও সেবা পাওয়া যাচ্ছে। দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা

আমাদের বিশেষজ্ঞ সাইকিয়াট্রিস্টদের স্বল্পতার অনেক কারণের মধ্যে একটি পাগলের ডাক্তার তকমা। চিকিৎসা নেওয়া রোগী সংখ্যায় কম। চেম্বারগুলোতে কখনোই রোগীর ভিড় লেগে থাকে না। যে কারণে অনেকে সাইকিয়াট্রিস্ট হতে আগ্রহ দেখান না। যদিও এ অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে। মানুষের সচেতনতা কিছুটা বাড়ছে, কুসংস্কার কিছুটা দূর হচ্ছে। একই সঙ্গে আমাদের এই বিষয়ে সাইকিয়াট্রিস্টের সংখ্যাও বাড়ছে।

বর্তমানে চারটি প্রতিষ্ঠানে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন কোর্স চালু আছে। সেখানে প্রতিবছর মোটামুটি ৪৪-৪৫ জন পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ছাত্র ভর্তি হচ্ছে। ফলে প্রতিবছরই নতুন বিশেষজ্ঞ বের হচ্ছেন এবং এই সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়বে। এর বাইরেও তিনটি প্রতিষ্ঠানচট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও বগুড়া মেডিক্যাল কলেজ, যাদের কোর্সগুলো চালু করার দাবি জানিয়েছি।

প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এটি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়েই সব সময় সেবা দিতে হবেএমন নয়। একজন এমবিবিএস ডাক্তারও যদি দক্ষ হন, তবে তিনি সেবা দিতে পারেন। এ জন্য তাঁদের প্রশিক্ষিত করতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের প্রাইমারি হেলথকেয়ারের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ইন্টিগ্রেট করা গেলে ভালো ফল পাওয়া যাবে।

 

জনবল ও বাজেট সংকট

ডা. মো. মাহবুবুর রহমান

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদেশে বর্তমানে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মাত্র ০.২ জন সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নার্স আছেন মাত্র ০.৫ জন। অন্য যেসব সাইকোলজিস্ট আছেন যাঁরা এনজিও ও অন্যান্য জায়গায় কাজ করেন, তাঁরা মাত্র ০.৩ জন। সোশ্যাল ওয়ার্কার নেই বললেই চলে। মোট মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য ১.৪ জন। এ ছাড়া বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ০.৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ। দেশের জেলা সদর হাসপাতালে কোনো সাইকিয়াট্রিস্ট নেই। আগামী ১০ বছরেও আমরা উপজেলায় সাইকিয়াট্রিস্ট দিতে পারব কি না সন্দেহ। আমাদের দেশে মেন্টাল হেলথ অ্যাক্ট, মেন্টাল হেলথ পলিসি এবং মেন্টাল হেলথ স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান থাকলেও এখনো সুইসাইড প্রিভেনশন স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান নেই। আমরা সেটা করার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া অ্যান্টি-স্টিগমা স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান এখনো ন্যাশনাল পলিসিতে আনতে পারিনি। এই ব্যর্থতা স্বীকার করে আমাদের কাজ করতে হবে। প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে অন্তত একজন করে সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন। এই ৩৭টি মেডিক্যাল কলেজকে যদি আমরা দুর্যোগকালীন মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে যুক্ত করতে পারি, তাহলে তারা নিজেদের টিম নিয়ে দেশের যেকোনো প্রান্তে দ্রুত সেবা দিতে পারবেন। এই প্রস্তাব আমরা মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে যাচ্ছি।

 

বিপর্যয়ে অর্থসংকট বড় সমস্যা

ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদুর্ঘটনা বা দুর্যোগ-পরবর্তী আহত ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি মাইলস্টোনের ঘটনায় শিক্ষকদের সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম আমরা করেছি। সেখানে দু-একজন শিক্ষককে কান্না করে তাঁদের মানসিক সমস্যার কথা বলতে দেখা গেছে। এসব শিক্ষকের এখনো অনেকে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তবে সমস্যাটা যে এতটা গুরুতর, সেটা আমরা জানতাম না। তাঁদের চিকিৎসা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।

সরকার অতীতে বিভিন্ন বিপর্যয়ে প্রজেক্ট তৈরি করে আসছে। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, করোনার সময়, রানাপ্লাজা ধসের ঘটনায় হয়েছে। কিন্তু এবারের বিপর্যয়ের মতো এতটা সাজানো-গোছানো ও পরিকল্পিতভাবে হয়নি। কিন্তু সমস্যা হলো অর্থনৈতিক কোনো সাহায্য ছিল না।

এমন পরিস্থিতিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ফান্ড থাকা প্রয়োজন। এটি সরকারি-বেসরকারি অথবা কোনো ট্রাস্টের মাধ্যমে হোক, আমাদের করা উচিত। কারণ তা না হলে দুর্যোগের পর সাইকোলজিক্যাল সাপোর্ট দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই সময়ে সাইকোলজিক্যাল সাপোর্ট ছাড়া মানুষ এই রোগ থেকে বের হতে পারে না।

 

চিকিৎসার বাইরে বেশি নারীরা

ডা. নাহিদ মাহজাবিন মোরশেদ

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাএকটি মেয়েশিশু ছোটবেলা থেকেই অনিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বড় হয়। তাকে সীমাবদ্ধতা শেখানো হয়, ধৈর্যধারণ করতে শেখানো হয়। আরো শেখানো হয়কী করা যাবে, কী করা যাবে না। এদের জীবন কাটে ট্রমার মধ্য দিয়ে। না-বলা কথা বহন করতে করতে কিশোরী বয়সে আসে। কিন্তু কখনো কাউকে বলতে পারে না। বললেও মা বলছেন, এটা বলা যাবে না, মানুষ খারাপ বলবে। কখনো বিয়ে দেওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে বাবারাও যেন কিছু বলতে চান না। বয়ঃসন্ধিকালে কিশোরীরা নানা রকম মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। আর হরমোনের নানা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার চাপ। তখন সে খিটখিটে মেজাজের হয়ে যায়। কথা শুনতে চায় না, বিরক্তিবোধ করে। মনের ও আবেগের নানা ধরনের সমস্যা হয়। কিন্তু তখন আমরা কেউ মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে যাই না। আমাদের এমনও অভিজ্ঞতা আছে, অনেক কিশোরী স্কুলে টিফিনের টাকা জমিয়ে চিকিৎসার জন্য আসে। তারা জানায়, বাসায় সমস্যার কথা বললে কেউ গুরুত্ব দিচ্ছে না। মূলত এভাবে আমাদের মেয়েরা চিকিৎসার বাইরে থাকছে। এই সংখ্যা নারীদের মধ্যে বেশি। কারণ তারা চাইলেও চিকিৎসা পায় না। কিংবা নিতে আসতে পারে না। অর্থের জন্য কারো প্রতি নির্ভরশীল হতে হয়। চিকিৎসার জন্য এলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শারীরিক সমস্যা নিয়ে আসেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন নারী চিকিৎসার আওতায় এলে পরিবার, সন্তান সবাই ভালো থাকবে।

 

এক-চতুর্থাংশ ভুগছেন গুরুতর বিষণ্নতায়

ডা. মুনতাসীর মারুফ

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাবাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানে সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার ভুক্তভোগীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস ডিস-অর্ডারসংক্রান্ত গবেষণায় হয়। এতে দেখা গেছে, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ গুরুতর বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে ভর্তি আহতদের এক-তৃতীয়াংশ গুরুতর মানসিক উদ্বেগ নিয়ে আসেন। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে এই হার ছিল ২১.৮ শতাংশ।

এসব রোগীর চিকিৎসা করতে গিয়ে আমাদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভর্তি রোগীরা বিনামূল্যে কেবিনে থাকতে চাইতেন। সেটি করা সম্ভব হলেও এসব রোগীকে শারীরিক সমস্যাগুলো মোকাবেলা করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। রোগীর দেখাশোনার জন্য কোনো স্বজন ছিল না। অনেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়তে চাচ্ছিলেন না।

জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এসব রোগী কথা বলতে চাননি। তাঁরা চাচ্ছিলেন উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হোক বা অর্থ সহায়তা দেওয়া হোক। এতে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

 

নির্বাচনী ইশতেহারে মানসিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে  

ডা. মো. জোবায়ের মিয়া

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাসাম্প্রতিক বিভিন্ন বিপর্যয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে পেরে আমরা গর্বিত। কারণ এ সময় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা দিয়েছে। দুটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। একজন শিক্ষার্থী যিনি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে অগ্নিকাণ্ডে অন্যদের উদ্ধার করতে গিয়ে শারীরিকভাবে অক্ষত থাকলেও মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং পরে ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন; আরেকটি ঘটনা সম্প্রতি মিরপুরে কেমিক্যাল বিস্ফোরণের পর উদ্ধারকাজে অতিরিক্ত জনসমাগমের কারণে বাধা সৃষ্টি হয়, যেখানে আমরা ব্যানারের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা সেবার তথ্য প্রচারের উদ্যোগ নিই।

আমার বিশ্বাস, এ ধরনের বিপর্যয়ে শুধু চিকিৎসক বা সাইকিয়াট্রিস্ট নয়, সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমনকি রাজনৈতিক কর্মীদেরও। কারণ ভবিষ্যতের নেতৃত্ব যেন মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে মানসিক স্বাস্থ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং জাতীয় বাজেটে এর জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব জোরালোভাবে তুলতে হবে।

 

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি : ৭১ শতাংশের ঘুমের সমস্যা

ডা. আরিফুজ্জামান

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, বিপর্যয় বা জরুরি পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি পাঁচজনে একজন মানসিক সমস্যায় ভুগে থাকেন। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনা-পরবর্তী ২৫৫ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের ওপর চালানো জরিপে দেখা গেছে, ৭১ শতাংশ ঘুমের সমস্যা, ২৯ শতাংশ খিটখিটে মেজাজ, ২৬ শতাংশ ফ্ল্যাশব্যাক, ২৬ শতাংশ ক্ষুধামান্দ্য, ২০ শতাংশ মনোযোগের ঘাটতি, ২০ শতাংশ কাজে অনাগ্রহএসব সমস্যায় ভুগছেন।

আমাদের দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগের তীব্রতা না বাড়লে চিকিৎসাসেবার আওতায় আসার প্রবণতা কম। এ সমস্যা ছাড়াও আরো চারটি সমস্যা রয়েছে। এগুলো হলো চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবায় জনবলস্বল্পতা, রেফারেল ও বাজেট সমস্যা। আমাদের বিভিন্ন বিপর্যয়ে মন্ত্রণালয় ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে শুধু মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নয়, সব খাতে উন্নয়ন সম্ভব।

 

প্রচারে জোর দিতে হবে

ডা. মো. আসাদ-উজ-জামান

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবামানসিক চিকিৎসা নিয়ে প্রচার কম। এতে সচেতনতাও বেশিদূর এগোয়নি। আমাদের প্রচার বাড়াতে হবে, মানুষ জানুক, যুক্ত হোক, একসঙ্গে কাজ করুক। আমরা আমাদের আশপাশের সবাইকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করব। যাঁরা সহযোগিতা করছেন তাঁদের শুধু ধন্যবাদ নয়, বরং আরো এনগেজ করতে হবে। যেমনআজ কালের কণ্ঠ যুক্ত হয়েছে, আমরাও তাদের সঙ্গে যৌথভাবে প্রোগ্রাম করতে পারি, অন্যান্য সম্পাদক ও বিভিন্ন সেক্টরের মানুষকে যদি যুক্ত করতে পারি, তাহলে আমাদের কাজের শক্তি আরো বাড়বে।

আমাদের সরকারের নীতিনির্ধারকস্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা, তাঁদেরও এই আলোচনায় আনা জরুরি। ২০০০ সালে আমি দেশে ফেরার সময় এখানে মাত্র ৩৯ জন সাইকিয়াট্রিস্ট ছিলেন, তখন কেউ আমাদের কথা শুনত না। এখন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ধীরে ধীরে জাতিকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টস নতুনভাবে গঠিত হয়েছে।

 

মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে

ড. মো. শাহানূর হোসেন

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাবাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ৯২ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নেন না মূলত সামাজিক কলঙ্ক বা স্টিগমার কারণে। অনেকে ভাবেন, একবার মানসিক চিকিৎসা শুরু করলে সারা জীবন এর চিকিৎসা নিতে হবে। এতে বিয়েতে সমস্যা বা সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে। ফলে চিকিৎসা না নিয়ে বিষয়টি চেপে রাখেন।

বর্তমানে দেশে মাত্র ৫০০ জনের মতো ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট আছেন, অথচ প্রয়োজন ৩৫০০ থেকে ৪০০০ জন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর মাত্র ২০ জন শিক্ষার্থী এই বিষয়ে ভর্তি হন। গত ৩০ বছরে স্নাতক হয়েছেন মাত্র ৫২০ জন, যা সাড়ে তিন কোটি মানসিক রোগীর তুলনায় অত্যন্ত কম।

সাইকিয়াট্রিক ও সাইকোলজিক্যাল দুই চিকিৎসাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে পেশাটিকে এখনো জনপ্রিয় বা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মনে করা হয় না। তাই সরকারকে মানসিক স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, চাকরির সুযোগ ও মর্যাদা বাড়াতে হবে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ চালু করা এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজে ট্রেনিং কোর্স শুরু করা জরুরি।

 

ছাত্রদের চেয়ে শিক্ষকদের অবস্থা খারাপ

ক্যাপ্টেন (অব.) জাহাঙ্গীর আলম

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবামাইলস্টোন ট্র্যাজেডির মতো ঘটনায় কোন ধরনের মানসিক সমর্থন প্রয়োজন আমার জানা ছিল না। বিশেষজ্ঞরা যখন কাউন্সেলিং প্রোগ্রাম শুরু করলেন, তখন আমরা জানতে পারি। বিশেষ করে প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি সহায়ক থেরাপি দেওয়ায় ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। মনে হয়েছে, শিক্ষার্থী যেন ভুলে গেছে ওই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা। ওরা আগের মতো দৌড়াচ্ছে, খেলছে, ক্লাস করছে।

যেহেতু প্রাথমিক থেকে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছোট ছোট বাচ্চারা সরাসরি ঘটনাটি দেখেছে, তাদের মধ্যে কিছু শিক্ষার্থী এখনো ট্রমার মধ্যে রয়েছে। যারা স্বাভাবিকভাবে কথা বলে না, শুধু তাকিয়ে থাকে। আমার মনে হয়, শিক্ষকদের অবস্থা ছাত্রদের চেয়ে বেশি খারাপ।

তিনজন শিক্ষক তো মারাই গেলেন। এখনো ছয়জন শিক্ষক গুরুতর মানসিক রোগে ভুগছেন। তাঁদের একজন স্বাভাবিক কথা বলেন না। একজন ক্লাসে ফেরার চেষ্টা করেও পারেন না। তাঁদের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মতো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া এখনো সাতজন শিক্ষার্থী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। যারা চিকিৎসা শেষে বাসায় ফিরেছে তাদের অনেকে ক্লাস শুরু করেছে। তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও অংশ নিচ্ছে। এর বাইরে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে আসছে, ক্লাস করছে।

অভিভাবকদের একাংশ মানসিকভাবে এখনো বিপর্যস্ত। আরেক অংশ ছেলে-মেয়েদের চেয়ে আর্থিক প্রাপ্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। এটা নিয়ে তারা নানা কিছু করছে। এটিও মানসিক রোগ কি না আমার জানা নেই।

 

৯৯% ওষুধ বাংলাদেশে তৈরি হয়

আশরাফ উদ্দিন আহমেদ

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাদেশের অনেক মানুষ জানে না কোনটা মানসিক রোগ। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সেমিনার ও কর্মশালার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা যেতে পারে। ইনসেপ্টা এসব উদ্যোগে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত এবং প্রচার ও সচেতনতা কর্মসূচিতে অংশ নিতে আগ্রহী। মানসিক স্বাস্থ্যজনিত প্রায় ৯৯ শতাংশ ওষুধ এখন বাংলাদেশেই তৈরি হয় এবং ইনসেপ্টা দেশে আধুনিক প্রযুক্তিতে নতুন ওষুধ উদ্ভাবন করছে, যেমন লেজার ড্রিল টেকনোলজিতে তৈরি পেরিপেরিডন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যেন মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসার ওষুধ সহজলভ্য থাকে সে জন্য আমাদের একটি বিশেষ টিম কাজ করছে।

ইনসেপ্টা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সবচেয়ে আধুনিক ওষুধ সর্বনিম্ন দামে সরবরাহ করে দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় অব্যাহতভাবে ভূমিকা রাখবে।

 

অজ্ঞতা ও কুসংস্কার ভাঙতে হবে

হাসান হাফিজ

দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাবিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আজকের এই গোলটেবিল বৈঠকের আলোচ্য বিষয় ঠিক করা হয় প্রতিপাদ্যকে ঘিরে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল বিপর্যয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যেন পায়। দেশের বেশির ভাগ মানসিক রোগী এখনো চিকিৎসার বাইরে থাকছে। এর অন্যতম কারণ প্রচার কম, সক্ষমতার অভাব, চিকিৎসক সংকট, বাজেট, অজ্ঞতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও অবৈজ্ঞানিক চিন্তা। বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো মান্ধাতার আমলে আটকে আছে। অনেকে এই সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে দ্বিধাবোধ করেন। কারণ মানসিক রোগকে সমাজে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়। মানসিক রোগীদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ব্রত নিয়ে আমাদের আজকের এই গোলটেবিল বৈঠক। আমাদের মানসিকভাবে সুস্থতা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে আমাদের সব অর্জন, কল্যাণ অর্থহীন হয়ে যাবে।