হাত-পা কাঁপছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে, দাঁড়াতে গিয়ে আচমকা পড়ে যাচ্ছেন অথবা স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাচলা করতে পারেন না—দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে এমন রোগীর সংখ্যা। এ ধরনের রোগকে বলা হয় মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার।
রোগের উপসর্গ নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা এবং অপ্রতুল চিকিৎসাব্যবস্থার কারণে বেশির ভাগ রোগীই থেকে যাচ্ছেন চিকিৎসার বাইরে। এই রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুলও, সে কারণেও অনেকে চিকিৎসা নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। বিশ্ব মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার দিবস [২৯ নভেম্বর] উপলক্ষে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও অভিজ্ঞজনদের গোলটেবিল আলোচনায় উঠে এসেছে এসব তথ্য। ৩ ডিসেম্বর বুধবার দুপুরে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের (নিনস) আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় গোলটেবিল বৈঠকটি। এই আয়োজনের সায়েন্টিফিক পার্টনার এসিআই পিএলসি, মিডিয়া পার্টনার কালের কণ্ঠ। ক্রোড়পত্র গ্রন্থনায় এস এম তাহমিদ
অন্য রোগেও হয় মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার
অধ্যাপক ডা. কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ
স্ট্রোক-পরবর্তী জটিলতা হিসেবে দেখা দিতে পারে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার। মস্তিষ্কের কিছু বিশেষ জায়গা, যেমন—ব্যাসাল গ্যাংলিয়া যদি স্ট্রোক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সে ক্ষেত্রে দেহে
অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া হতে পারে। স্ট্রোক ছাড়াও অন্যান্য রোগ থেকেও হতে পারে মস্তিষ্কের ক্ষতি। বিশেষ করে ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে ব্লাড সুগার বেড়ে গেলে হঠাৎ করে শুরু হয় অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া। এটি চট করে সব বিশেষজ্ঞ ধরতে পারেন না। ডায়াগনস্টিক ইমেজিং করে যদি দেখা যায়, ব্যাসাল গ্যাংলিয়াতে হাইপার ডেন্স লিশন তৈরি হয়েছে, সে ক্ষেত্রে হয়তো রেডিওলজিস্ট কমেন্ট করে দেবেন যে এটা হেমারেজ। অথচ মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার বিশেষজ্ঞ সেটিকে হেমারেজ হিসেবে শনাক্ত না করে দ্রুত সুগার টেস্ট করাবেন, তখন ধরা পড়বে এটি হেমারেজ নয় বরং সুগার স্পাইকজনিত স্ট্রাইটোপ্যাথি, যা চিকিৎসাযোগ্য। আবার বেশির ভাগ মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার রোগীর আমরা পারকিনসন্স ডিজিজে আক্রান্ত হিসেবে চিন্তা করি, সেটিও ভুল হতে পারে। হতে পারে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অ্যান্টি-সাইকোটিক ওষুধ সেবন করছেন, সেটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এটি। এ ধরনের ভুল ডায়াগনোসিস প্রতিরোধে প্রথমে প্রয়োজন দেশের প্রত্যেক চিকিৎসককে এ বিষয়ে সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া। দ্বিতীয়ত, আমরা টেলিমেডিসিন কাজে লাগাতে পারি। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রোগীর নড়াচড়া দেখেও কিছু কিছু মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার সঙ্গে সঙ্গে শনাক্ত করা যায়।
রোগ শনাক্তে তৈরি হচ্ছে আধুনিক ল্যাব
অধ্যাপক ডা. মোঃ বদরুল আলম
মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার চিকিৎসায় আমাদের এক নম্বর চ্যালেঞ্জ রোগীদের কাছে পৌঁছানো। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে রোগীদের উৎসাহিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য তাদের হাসপাতালমুখী করা বাংলাদেশে বেশ কঠিন। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ, যত ধরনের মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার আছে এর প্রতিটিই ডায়াগনোসিস করাতে লাগে—সিটি স্ক্যান অথবা এমআরআই। তাই এসব পরীক্ষা সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে হবে। তৃতীয় চ্যালেঞ্জ, ওষুধ সরবরাহ ও সঠিক মাত্রায় গ্রহণ নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ওষুধ গ্রহণ করতে হয় বেশিরভাগ রোগীর, আজীবনও ওষুধ চালাতে হতে পারে। রোগীদের মধ্যে সারা জীবন ওষুধ সেবনের রুটিন ধরে রাখা এবং সুলভ মূল্যে ওষুধের প্রাপ্তি নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। চতুর্থ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, চিকিৎসক, নার্স বা টেকনিশিয়ান তথা সামগ্রিক ম্যানপাওয়ার দক্ষ করে তোলা এবং দেশের প্রতিটি অংশে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা। পঞ্চম চ্যালেঞ্জ, দেশে অত্যাধুনিক নিউরোসার্জিক্যাল চিকিৎসাব্যবস্থা তৈরি করা। সরকারের প্রতি বলতে চাই, মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ এবং ডিভাইসের পাশাপাশি শনাক্তকরণের উপকরণ ট্যাক্স ফ্রি করে দিলে সবার নাগালের মধ্যে পৌঁছে যাবে এ রোগের চিকিৎসা। নিনস-এ একটি অত্যাধুনিক ল্যাব তৈরি হচ্ছে। এটির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এরই মধ্যে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি। এই ল্যাবটি হবে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার চিকিৎসায় বাংলাদেশের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
জেনেটিক পরীক্ষা ও কাউন্সেলিং জরুরি
অধ্যাপক ডা. আফজাল মমিন
মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের বেশির ভাগই বংশানুক্রমে সঞ্চারিত হয়। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ‘এসেনশিয়াল ট্রেমরস’। রোগীরা প্রায়ই বলে থাকে, ‘আমার দাদা/বাবা/ভাই-এর হাত-পা/মাথা কাঁপত।’ দেশে অনেক উইলসন্স ডিজিজ রোগীও আছে, সেটিও বংশগত রোগ। এ ছাড়াও রয়েছে হান্টিংস কোরিয়া, হেরিডিটারি ডিস্টোনিয়া, ফ্যামিলিয়াল পারকিনসন্স ডিজিজ। এসব রোগের কারণ জিনগত ত্রুটি, তাই পুরোপুরি নিরাময় অসম্ভব। ফলে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ করা বেশি জরুরি। জেনেটিক কাউন্সেলিং অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ। রোগী ও তার আত্মীয়-স্বজনকে বোঝাতে হবে, জেনেটিক টেস্টের প্রয়োজনীয়তা কী। পরবর্তী প্রজন্মে যাতে রোগগুলো সঞ্চারিত না হয় সে জন্য পদক্ষেপ নেওয়া বা প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত করার প্রস্তুতি নেওয়াও জরুরি। উইলসন ডিজিজের চিকিৎসা আগেভাগে শুরু করলে স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনযাপন করতে পারে রোগী। এটি দুঃখজনক যে আমরা এখনো জেনেটিক ল্যাব সব জায়গায় তৈরি করতে পারিনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে কাজ করছে নিনস। একই মানের চিকিৎসাসেবা অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজ এবং জেলা-উপজেলার হাসপাতালে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। নিনসে প্রতি সপ্তাহে বসছে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার ক্লিনিক। চিকিৎসার পাশাপাশি গবেষনার জন্য রোগীদের তথ্যও সংগ্রহ করার কাজও চলছে।
চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা হবে
অধ্যাপক ডা. মাহমুদুল ইসলাম
মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রস্তাবিত সদস্যসচিব হিসেবে আমার বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার সংক্রান্ত শিক্ষাদান কার্যক্রম এবং গবেষণা চালিয়ে যাওয়া। নিয়মিত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং ওয়ার্কশপের মাধ্যমে চিকিৎসকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত করতে পারি আমরা। দ্বিতীয়ত, প্রাইমারি ফিজিশিয়ানদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করব, পাশাপাশি গবেষণার অর্থায়নের জন্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা করব। তিন নম্বরে আছে রোগীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো। মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারকে অভিশাপ মনে করে অনেকে, ধরে নেয় এর কোনো চিকিৎসা নেই। এসব বিভ্রান্তি দূর করা আমাদের দায়িত্ব। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে মিলে চিকিৎসকদের মাস্টার ক্লাস ও ফেলোশিপের আয়োজন করা। সরকারি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য থাকবে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের ওষুধ এবং চিকিৎসার সরঞ্জামের অপ্রতুলতা দূর করে সেগুলো সুলভ মূল্যে রোগীদের কাছে পৌঁছানো। জেনেটিক টেস্টিং ফ্যাসিলিটি বা অ্যাডভান্সড ইলেক্ট্রোফিজিওলজি সুবিধা নিনস-এর বাইরে নেই বলা যায়। আশার কথা, নিনস-এ প্রতি মঙ্গলবার বসে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার ক্লিনিক। এখানে প্রতি সপ্তাহে ৬০-৭০ জনকে আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি। বোটক্স ইনজেকশনও পাচ্ছে ১০-১৫ জন। শিগগিরই হয়তো আমরা ফেলোশিপ প্রোগ্রামেও পাঠাব চিকিৎসকদের।
সব মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার পারকিনসন্স নয়
অধ্যাপক ডা. মোঃ আব্দুল আলীম (নাদিম)
মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার বুঝতে হলে দেহের অঙ্গগুলো কিভাবে নড়ে সেটি জানতে হবে। দুটো প্রক্রিয়া পাশাপাশি কাজ করে—একটি নিউরোনাল সার্কিট, যা মস্তিষ্ক থেকে পেশি পর্যন্ত সংকেত পৌঁছায়, অন্যটি নিউরোকেমিক্যাল মিডিয়েটরস। একটি সিস্টেমেও গণ্ডগোল হলে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার তৈরি হয়। পারকিনসনিজম বা পারকিনসন্স ডিজিজের পাশাপাশি আরো কিছু মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার আমরা হরহামেশা দেখতে পাই, যেমন—ট্রেমর। এসেনশিয়াল ট্রেমর বা কাঁপুনির পেছনে কিছু জেনেটিক বা বংশগত কারণ থাকে। এ ছাড়াও আছে ডিস্টোনিয়া, অর্থাৎ রোগী দেহের ভারসাম্য বা স্থিরতা ধরে রাখতে পারে না। এর পেছনে রয়েছে স্নায়ুতন্ত্রে অনিয়ন্ত্রিতভাবে নড়াচড়ার সংকেত তৈরি হওয়া। প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ১৫ থেকে ৩০ জন এ সমস্যায় ভুগছে। টিক নামেও একটি সমস্যা রয়েছে, যা ছোটদের বেশি হয়। অবচেতনেই অনেকে ঘাড় ঘুরানো বা চোখ পিটপিট করে মজা পায়, একসময় এটি অনিয়ন্ত্রিত টিক-এ পরিণত হয়। কিছু সাইকিয়াট্রিক ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় হতে পারে ড্রাগ ইনডিউসড মুভমেন্ট। রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম, অর্থাৎ ঘুমের মধ্যে হাত-পা ছোড়ার সমস্যাও রয়েছে অনেকের।
আধুনিক চিকিৎসা দেশেই সম্ভব
অধ্যাপক ডা. মোঃ মাহবুবুল আলম
পারকিনসন্স ডিজিজের মূল লক্ষণের বাইরেও বেশ কয়েকটি উপসর্গ আছে। যেমন—হাঁটাচলায় অসুবিধা, ছোট ছোট কদমে হাঁটা বা ফেস্টিনেশন, হাঁটতে গেলে পা জড়িয়ে যাওয়া, ‘এক্সপ্রেশনলেস ফেস’, অর্থাৎ রোগীর মুখে কোনো অভিব্যক্তি থাকে না, আবার অনেকের মুখ দিয়ে লালা ঝরে। এর মধ্যে আছে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যাওয়া, অর্থাৎ হাইপোটেনশন। কোষ্ঠকাঠিন্য ও সেক্সুয়াল ডিসফাংশনও দেখা দিতে পারে। আমরা দেখেছি কোনো রোগীর হয়তো রাতে প্রচুর পরিমাণ প্রস্রাব হচ্ছে বা রোগী অতিরিক্ত ঘেমে যাচ্ছে। আবার অনেকের ঘাম কমেও যায়। রোগীর অনিদ্রা দেখা দেয়, ক্রাম্পিং পেইন বা পেশিতে টান ধরার ব্যথা হয়। নিউরোসাইকিয়াট্রিক সিম্পটমও হতে পারে, যেমন—রোগী ডিপ্রেসড ও হতাশ হয়ে যায়, কাজকর্মে অনীহা বা অ্যাপাথিও থাকতে পারে। শুরুতে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসার চেষ্টা করা হয়। অনেক পারকিনসন্স রোগীর হঠাৎ করে পুরোপুরি নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে আমরা নতুন ওষুধ অ্যাপোমরফিন ইনজেকশন দিচ্ছি। তবে মনে রাখা জরুরি, শুধু ওষুধের ওপর ভরসা করলে হবে না। ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি এবং প্রয়োজনে সার্জারিও করতে হতে পারে। ডিবিএস বা ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন সার্জারি প্রয়োজন হলে নিনস-এ করা সম্ভব।
ভ্রান্ত ধারণায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা
অধ্যাপক ডা. শামীম রশিদ
দেশের বেশির ভাগ রোগীর পারকিনসন্স ডিজিজ প্রথম শনাক্ত হয় হাত-পায়ের কাঁপুনি বা ট্রেমর দেখে। ট্রেমর ছাড়াও দ্বিতীয় উপসর্গ হিসেবে চলাফেরার ধীরগতি বা ব্রাডিকাইনেসিয়াও হয়ে থাকে। এটি দেখা দিলে হাঁটার ছন্দের সঙ্গে রোগীর হাত স্বাভাবিক গতিতে দোলে না, হাঁটার গতিও থাকে কম। তৃতীয় উপসর্গ বলা যায় রিজিডিটি বা জড়তা, চলাফেরার সময় রোগী স্বাভাবিকভাবে হাত-পা নাড়াতে পারে না। চতুর্থ যে উপসর্গ দেখা যায়, সেটি হচ্ছে ভারসাম্যহীনতা। রোগী দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পড়ে যায়, হাঁটার সময় তাল হারিয়ে ফেলে। এ চার ধরনের লক্ষণ দেখেই আমরা বুঝে নিই, পারকিনসন্স দেখা দিয়েছে। পারকিনসন্স বা অন্যান্য মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের উপসর্গ বা কারণ সম্পর্কে এখনো খুব কম মানুষই জানে। আর যখন কোনো বিষয়ে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা থাকে, তখনই এটা নিয়ে বিভ্রান্তি শুরু হয়, ছড়াতে শুরু করে নানাবিধ কুসংস্কার। কাঁপুনির কথাই ধরি, অনেকের ভ্রান্ত ধারণা আছে যে এটি স্ট্রোকের লক্ষণ। কালো জাদু, জ্বিনের আছরের মতো কুসংস্কারও দেখা যায়। এ ধরনের রোগ কখনো ভালো হয় না, চিকিৎসা ঠিকমতো হয় না এবং এই রোগ শুধু বয়স্কদের হয়—এমন ভ্রান্ত ধারণাও বেশ প্রচলিত।
চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হবে
ডা. জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি
মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার চিকিৎসায় প্রথম ২০১৭ সালে দেশে দুটি নিউরোসার্জারি করা হয়। এরপর ২০২৩ সালে আমরা তিন দিনে পর পর পাঁচটা সার্জারি করেছিলাম। এ বছর (২০২৫) করেছি দুটো অপারেশন। সব মিলিয়ে দেশেই আমরা ৯ জন রোগীকে সফলভাবে সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসা দিয়েছি। এর মধ্যে সাতটি সার্জারি হয়েছে পারকিনসন্স ডিজিজ রোগীর, আর দুটি অপারেশন হয়েছে ডিস্টোনিয়া রোগীর। ৯ জনের জন্যই করা হয়েছে ডিবিএস (ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন) সার্জারি, অর্থাৎ রোগীর বুকের চামড়ার নিচে একটা পেসমেকার বসিয়েছি এবং সেই পেসমেকার থেকে ইলেকট্রিক সংযোগ দেওয়া হয়েছে মস্তিষ্কের গভীরে দুটি জায়গায়। ডলার বিনিময়ের হার বাড়ার পর ডিভাইসের দাম অনেক বেড়ে গেছে। এখন দাম ২৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকা। সরকার শুধু ডিভাইসের মূল্যের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ ভর্তুকি দেয়, এর পরও সার্জারিতে রোগীদের মোট খরচ হয় ১৫ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা। অনেক রোগীর পক্ষেই সেটি বহন করা সম্ভব হয় না। রোগীদের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করে আমরা পেসমেকার না বসিয়ে লেইসন সার্জারি করতে পারি। লেজারের মাধমে মস্তিষ্কে এ সার্জারি করা হয়।
মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার হয় দুই ধরনের
ডা. ইমরান সরকার
মোটা দাগে আমরা দুই ধরনে ভাগ করি মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারকে—নড়াচড়া কমে যাওয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়া। এর মধ্যে আড়ষ্টতাজনিত সমস্যাগুলোর প্রাদুর্ভাবই বেশি দেখা যায়। আড়ষ্ট মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের মধ্যে পারকিনসন্স সবচেয়ে বেশি দেখি। অতিরিক্ত নড়াচড়ার মধ্যে বেশি দেখা যায় ট্রেমর বা কাঁপুনি। দেহের এক পাশ বেঁকে যেতে পারে, ফলে ভারসাম্য রক্ষায় সমস্যা হয়—এটিকে আমরা বলি ডিস্টোনিয়া। এ ছাড়াও দেখা যায় হাত-পায়ে আচমকা ঝাঁকুনি দেওয়ার রোগ হেমিব্যালিসমাস, নাচের মতো করে ছন্দে ছন্দে অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়ার রোগ কোরিও-অ্যাথিটোসিস এবং টার্ডিভ ডিসকাইনেশিয়া। উইলসন ডিজিজের প্রাদুর্ভাবও আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে। সারা বিশ্বেই মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের বিষয়ে সচেতনতা এখনো কম, তাই ২০২২ সাল থেকে বিশ্ব মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার দিবস পালন শুরু করে আন্তর্জাতিক পারকিনসন্স এবং মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার সোসাইটি। দেশে ২০২৩ সাল থেকে আমরা (নিনস) দিবসটি পালন করছি—সচেতনতা শোভাযাত্রা এবং বিভিন্ন সায়েন্টিফিক ও অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম পরিচালনার মাধ্যমে।
দেশেই হচ্ছে সফল নিউরোসার্জারি
ডা. মোহাম্মদ রাকিব-উল-হক
সার্জারির মাধ্যমেও এখন মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার চিকিৎসা করা যায়। যে রোগীদের মধ্যে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স দেখা যায়, অর্থাৎ ওষুধ গ্রহণের পরও তাদের উপসর্গের উন্নতি নেই, অথবা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট জটিলতা রোগীর পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না, এ ধরনের রোগীদের আমরা সার্জারির জন্য বেছে নিই। পারকিনসন্স রোগের চিকিৎসায় সার্জারি অত্যন্ত কার্যকর। এমআরআই, সিটি স্ক্যান ইমেজ এবং স্টেরিওট্যাকটিক ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে আমরা রোগীর মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু জায়গা বেছে নিই। মস্তিষ্কের গভীরের সেসব স্থানে সার্জারির মাধ্যমে আমরা ইলেকট্রোড স্থাপন করি। এর সঙ্গে সংযুক্ত করা হয় ব্যাটারিচালিত একটি পালস জেনারেটর ডিভাইস। রোগীর বুকের চামড়ার নিচে এটি স্থাপন করা হয়। এটি দেহের বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর মাধ্যমে আমরা নিয়ন্ত্রণ করি রোগীর মস্তিষ্কের অ্যাবনরমাল ইলেকট্রিক্যাল অ্যাক্টিভিটি। ডিভাইসটি ব্যবহারে চলাফেরার ধীরগতি ঠিক হয়ে যায় এবং ট্রেমরও কম হয়। এখন নিনস—এই নিউরোসার্জারি ডিপার্টমেন্টের একটি সাবডিভিশন রয়েছে যার নাম ফাংশনাল নিউরোসার্জারি ইউনিট। আমরা এ ধরনের সার্জারি সফলতার সঙ্গে করে যাচ্ছি।
রোগী ও চিকিৎসকদের পাশে এসিআই
ডা. রুমানা দৌলা
এসিআই-এর প্রধান লক্ষ্য বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জীবনের মান উন্নত করা। আমরা সব সময় নিনসের পাশে আছি। ২০২৩ সাল থেকে মুভমেন্ট ডিস-অর্ডার দিবস ঘিরে নানাবিধ আয়োজন করছি, সামনেও করব। এ বছর ১৩টি জেলায় আমরা প্রোগ্রাম করেছি। এর মধ্যে আছে চিটাগং মেডিক্যাল কলেজ, বিএমইউ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ তথা মিডফোর্ড হাসপাতাল, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ, সিলেট মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ, নিনস, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ, সিলেটে নর্থ ইস্ট মেডিক্যাল কলেজ ও জালালাবাদ রাগিব-রাবেয়া মেডিক্যাল অ্যান্ড হাসপাতাল। একজন প্যালেটিভ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে বলতে চাই, মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের সঠিক চিকিৎসা জীবনের মান উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। জীবনযাপনে বাধা সৃষ্টি করে এমন উপসর্গগুলো অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এ লক্ষ্যে রোগী ও চিকিৎসকদের পাশে আমরা থাকতে চাই সব সময়। দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যার জরিপ ও গবেষণার ক্ষেত্রে আমরা নিনসের সঙ্গে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আমাদের প্রয়াস সফল করতে সরকারের নীতিনির্ধারকরা এগিয়ে আসবেন—এটিও আমরা আশা করছি।
এসিআই দিচ্ছে সুলভ মূল্যে ওষুধ
ডা. আবুল বাশার হাওলাদার
এসিআই-এর পক্ষ থেকে আমরা সব সময় চেষ্টা করে থাকি ওষুধের মূল্য যেন নাগালের মধ্যে থাকে। তবে মানের সঙ্গে কখনোই আপস করা হয় না। মান না কমিয়ে যতটা সম্ভব মূল্য কমিয়ে ওষুধ বিক্রি করি আমরা। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারি নীতিমালা অনেক বড় বাধা। আপনারা জানেন যে ওষুধ শিল্পে আমাদের পাইকারি বা উৎপাদক মূল্যের ওপর প্রায় ১৬.৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয়। কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে সরকার ভ্যাট মওকুফ করে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধে এমন উচ্চহারের করের বোঝা বহন করা অনেক রোগীর পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর। সরকার যদি এই উচ্চহারের ভ্যাট কমানোর পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বাংলাদেশের জনসাধারণের জন্য আমরা আরো সুলভ মূল্যে ওষুধগুলো সরবরাহ করতে পারব। এর ফলে অসচ্ছল রোগীদের মধ্যে কিছু সময় পর চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমবে, স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবেন তাঁরা। মুভমেন্ট ডিস-অর্ডারের জন্য আমরা বিশ্বমানের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ওষুধ তৈরি করে থাকি, যেমন—লেভেডোপা-কার্বিডোপা। এই ওষুধগুলো যেন প্রতিটি রোগী সুলভে কিনতে পারেন, সে বিষয়ে আমরা সব সময়ই সচেষ্ট থাকি।



পিরিয়ড বা মাসিকের সময় নারীদের তলপেটে তীব্র ব্যথা হয়। এ সময় অনেক কিশোরী স্কুলে যেতে পারে না, কাজ করতে পারে না, বারবার টয়লেটে যায়। এটি এন্ডোমেট্রিওসিসের লক্ষণ। বাসাবাড়িতেও এই রোগটিকে মনে করা হয় লজ্জার, কাউকে বলা যাবে না। আমরা চাই সবাই বলুক তাদের কী কষ্ট।
নারীর ক্ষমতায়ন, এন্ডোমেট্রিওসিস যত্নে
এন্ডো-মার্চ সচেতনতার অংশ হিসেবে প্রতিবছর এন্ডোমেট্রিওসিস-অ্যাডেনোমায়োসিস সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ইএএসবি) গোলটেবিল আলোচনাসভার আয়োজন করে থাকে। সারা পৃথিবীতে মার্চ মাস এন্ডো-মার্চ হিসেবে উদযাপিত হয়। এই উদযাপনের উদ্দেশ্য হলো, এন্ডোমেট্রিওসিস রোগীদের প্রতি সহমর্মিতা, তাদের চিকিৎসার অধিকারকে প্রতিষ্ঠা ও চিকিৎসাব্যবস্থা বিস্তৃত করা।
এন্ডোমেট্রিওসিস রোগটি নিয়ে জনসচেতনতার বিকল্প নেই। শুধু দিবসকেন্দ্রিক নয়, সারা বছর বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। রাজধানীতে জাতীয় পর্যায়ের কেন্দ্র স্থাপন, সেখান থেকে একসঙ্গে সারা দেশে বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। প্রেজেন্টেশন, লিফলেট বিতরণ বা ওয়েবিনারের মাধ্যমেও একযোগে এই সচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে। এতে আরেকটি সুবিধা হলো, সবাই জানতে পারবে কোথায় গেলে তারা সঠিক সেবা পাবে।
কিশোরী বা প্রাপ্তবয়স্ত নারীদের এন্ডোমেট্রিওসিসের ক্ষেত্রে প্রথম কাজটি হলো মেডিক্যাল চিকিৎসা। এই রোগটিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ব্যথানাশক নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি ড্রাগস বা এনএসআইডি। এটি একটি নিরাপদ ওষুধ, তবে বারবার খেতে হয়। এটি আবার অনেকের কাছে বড় সমস্যা। প্রায় সময়ই ডোজ মিস হয়ে যায়। তারপর যখন গুরুতর এন্ডোমেট্রিওসিস হয়, তখন এনএসআইডি কাজ করে না। তখন অতিরিক্ত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এর ক্ষতিকর দিক হলো, এসিডিটি বাড়িয়ে দেয়। ফলে এর জন্য আলাদা ওষুধ খেতে হয়। কিশোরী নারীদের এন্ডোমেট্রিওসিসের অপারেশনের পর মেডিক্যাল চিকিৎসা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময় রোগী চিকিৎসা না পেলে রোগটির পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এতে কিশোরী নারীদের ইনফার্টিলিটি বেড়ে যায়। এই সময়ে ফলোআপ চিকিৎসা নিলে সুস্থতা নিশ্চিত করা যাবে।
যথাতথা অপারেশন রোগীর ক্ষতির কারণ
এন্ডোমেট্রিওসিস চিকিৎসায় সার্জারি হলো চিকিৎসার শেষ ধাপ। যখন একজন গাইনোকোলজিস্ট সার্জারির দিকে যাবেন, তখন চিন্তা করতে হবে সার্জারি রোগীর জন্য কতটা জরুরি। এক. সার্জারি করার ফলে রোগীর উন্নতি কী হবে বা তার ফার্টিলিটি ইমপ্রুভমেন্ট হবে কি না। দুই. সার্জারির কারণে রোগীর কী কী সমস্যা হতে পারে। কারণ এতে রোগীর ডিম্বাণুর রিজার্ভ কমে গিয়ে বন্ধ্যাত্বের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। তিন. অস্ত্রোপচারের জটিলতা রোগীর জন্য সহনশীল কি না। এ ক্ষেত্রে সার্জারির আগে সাধারণ পরীক্ষাগুলো করে জানতে হবে কোন ধরনের এন্ডোমেট্রিওসিস; যেমন
শারীরিক পরিশ্রম, শরীরচর্চা, চর্বিজাতীয় খাবার কম খাওয়া এবং ওজন বৃদ্ধির দিকে নজর রাখতে হবে। নারীদের ঋতুস্রাবের সময় খুব বেশি ব্যথা হলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। মনে রাখতে হবে, এন্ডোমেট্রিওসিস চিকিৎসা যত দ্রুত শুরু করা যায়, সুস্থতার সম্ভাবনা তত বেশি। গবেষণায় এন্ডোমেট্রিওসিসের সঙ্গে ক্যান্সারের সম্পর্ক বেরিয়ে এসেছে। জরায়ুমুখের ক্যান্সারে নির্দিষ্ট কারণ জানা গেলেও এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণ জানা যায়নি। যদিও ক্যান্সারের সঙ্গে এই রোগের কিছু মিল পাওয়া গেছে; যেমন
রোগীরা প্রায়ই একটি কথা বলে,
এন্ডোমেট্রিওসিস শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নারীর রোগ নয়, এটি কিশোরী ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের ক্ষেত্রে হতে পারে। তবে রোগটি শুরু হয় কিশোরী বয়সে, অর্থাৎ ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সে। তবে রোগটি আরো আগেও শুরু হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের মাসিকের সময় তলপেটে তীব্র ব্যথা, কিন্তু সাধারণ ওষুধে কাজ হচ্ছে না
কিশোরী বয়স থেকে এন্ডোমেট্রিওসিসের সূত্রপাত হয়। যখন বাচ্চা মায়ের গর্ভে থাকে, তখনো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এন্ডোমেট্রিওসিস রোগীর ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে সিস্ট হতে পারে। আগে আমরা রোগীদের উপসর্গ দেখে বোঝার চেষ্টা করতাম এন্ডোমেট্রিওসিসের সিস্ট হতে পারে। সিস্ট অনেক রকম হয়। পানি ভরার থলির মতো হলে এটাকে চকোলেট সিস্ট বলি। এখন সিস্টের অনেক ধরনের চিকিৎসা এসেছে। ৫ সেন্টিমিটারের কম সিস্ট হলে ওষুধ খেলেই অনেক সময় তা ভালো হয়ে যাচ্ছে।
আমাদের দেশে রোগীর তুলনায় চিকিৎসকের স্বল্পতা আছে। বিশেষজ্ঞদের স্বল্পতা আরো বেশি। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সারাক্ষণ রোগীর ভিড় লেগে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পক্ষে রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, রোগ নির্ণয়, রোগীর ইতিহাস জানা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই এন্ডোমেট্রিওসিস রোগীদের জন্য স্বতন্ত্র এন্ডোকেয়ার ক্লিনিক থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা পেতে যেন রোগীদের ভোগান্তির সম্মুখীন হতে না হয়।
এন্ডোমেট্রিওসিস একটি প্রগতিশীল রোগ। এর চারটি ধাপ আছে। রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীদের মধ্যে লক্ষণও বাড়তে থাকে। এটা এমন কোনো রোগ নয়, যেটা প্রতিকার করা যায়। এর কোনো টিকাও নেই। যত দ্রুত রোগ নির্ণয় করা যাবে, তত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে রোগের বিস্তার থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
এন্ডোমেট্রিওসিস মারণব্যাধি না হলেও তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এন্ডোমেট্রিওসিস মানেই হলো ব্যথা, ব্যথা এবং ব্যথা। চলাফেরায় ব্যথা, মাসিকের ব্যথা, প্রস্রাব-পায়খানা করার সময় ব্যথা, স্বামীর সহবাসের সময় ব্যথা। একটা সময় এ রকম হয় যে ব্যথা নিয়েই তার জীবন চলছে। আমরা যদি এর ব্যাপকতা দেখি, বেশির ভাগ রোগীর ডায়াগনোসিস হয় অন্তত সাত বছর পর। তখন দেখা যায়, রোগীর অনেক বড় একটা সিস্ট হয়ে গেছে এবং এর ব্যাপকতা হিসেবে কিশোরী মেয়েটির সন্তানসম্ভাবনা হওয়ার সক্ষমতা কমে এসেছে। তার ইনফার্টিলিটি এরই মধ্যে বেশি হয়ে গেছে। সুতরাং আমার মনে হয়, স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি ও আক্রান্তদের আলাদা করা যেতে পারে।
মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস অ্যান্ড গাইনি বিভাগে এন্ডোমেট্রিওসিস উইং চালু করা আমাদের স্বপ্ন। এটি যদি করা যায় তাহলে ভবিষ্যতে এন্ডোমেট্রিওসিস অনেক সহজ হয়ে যাবে। এ ছাড়া যদি আমরা এন্ডোকেয়ার ক্লিনিক করতে চাই তাহলে বহির্বিভাগে সপ্তাহে ছয় দিন চিকিৎসা দিতে হবে। এর জন্য বহির্বিভাগে আলাদা কক্ষ থাকতে হবে, আলাদা সেন্টার হতে হবে। কোনো রোগীর যদি বন্ধ্যাত্বের কারণে ল্যাপারোস্কোপির অথবা মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট দরকার হয়, তারপর তারা ইনফার্টিলিটিতে যাবে। যেগুলো বন্ধ্যাত্ব নয়, বিশেষ করে কিশোরী মেয়ে যারা সার্জারি করতে চায় না, তাদের জন্য কাউন্সেলিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে। এ জন্য আলাদা ওয়ার্ড রাখতে হবে। আলাদা চিকিৎসক দরকার। গাইনোকোলজিস্টদের বেশি বেশি প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
সচেতনতা তৈরি এন্ডোমেট্রিওসিস রোগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই রোগ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। আমরা বিএসএমএমইউতে বন্ধ্যাত্বের পাশাপাশি এন্ডোমেট্রিওসিসের চিকিৎসা করি। কিছু রোগী আসে শুধু মাসিকজনিত রোগ নিয়ে। আবার কিছু রোগী আসে বন্ধ্যাত্ব নিয়ে। এ সময় আমরা এন্ডোমেট্রিওসিস রোগী পেয়ে যাই। ৩০ শতাংশ রোগী আমরা আউটডোরে পাই। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ রোগীই এন্ডোমেট্রিওসিস সমস্যা নিয়ে আসে। দেখা যায়, প্রতি দুইজনের একজন এই রোগে ভুগছে। এখানে কিছু কিশোরীও আসে।
প্রথমে আমরা রোগীকে কাউন্সেলিং করি। এরপর প্রত্যেক রোগীর ট্রান্সভ্যাজাইনাল সনোগ্রাফি করি। জানার চেষ্টা করি সিস্টের পরিমাপ চার সেন্টিমিটারের বেশি না কম। একই সঙ্গে আলট্রাসনোগ্রাফ করে বোঝার চেষ্টা করি রোগী কোন পর্যায়ে রয়েছে। এরপর ডিম্বাশয়ের সক্ষমতা যাচাই, বড় ধরনের কোনো সমস্যা বা কোমরবিডিটিস আছে কি না দেখে নিই।
এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্তে ট্রান্স-অ্যাবডোমিনাল আলট্রাসাউন্ড, ট্রান্সভ্যাজাইনাল আলট্রাসাউন্ড ও এমআরআই করে থাকি। কিন্তু এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্তে যেসব পরীক্ষা পদ্ধতি আছে তার মধ্যে ট্রান্সভ্যাজাইনাল আলট্রাসাউন্ড বা টিভিএস একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে সংবেদনশীলতা ও সঠিক রোগ শনাক্তের হার ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ। একই সঙ্গে রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে পারি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আলোকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের চিকিৎসার যত প্রটোকল, গাইডলাইন, চেকলিস্ট
শুধু চিকিৎসা দিয়ে এন্ডোমেট্রিওসিস নিরাময় সম্ভব নয়। আমরা যদি সচেতনতা তৈরি করতে না পারি, আমাদের কোনো পরিশ্রমই অর্থবহ হবে না। স্কুল, পাঠ্যবই, শিক্ষক বা সরকারি কোনো সাহায্যের মাধ্যমে যদি সচেতনতা তৈরি করা যায় তাহলে দ্রুততম সময়ে শনাক্ত ও নিরাময় করতে পারব। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসা অর্থবহ হবে। অনেক রোগীকে সার্জারি পর্যন্ত যেতে না-ও হতে পারে।