• ই-পেপার

এখন দরকার ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি

<li>ফারুক মেহেদী</li>

ক্যান্সার নিবন্ধন কেন প্রয়োজন

ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার

ক্যান্সার নিবন্ধন কেন প্রয়োজন

বাংলাদেশে জাতীয়ভিত্তিক বা জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার রেজিস্ট্রি না থাকায় ক্যান্সারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার, বিস্তারসহ ক্যান্সার সম্পর্কিত কোনো সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। এখনো দেশের ক্যান্সার পরিসংখ্যানের জন্য আমাদের নির্ভর করতে হয় আন্তর্জাতিক সংস্থার দেওয়া তথ্যের ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি) এই দায়িত্বটি পালন করে। বিভিন্ন দেশের জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধনের ফলাফল পর্যালোচনা এবং বিশ্লেষণ করে অন্যান্য দেশ সম্পর্কে একটি অনুমিত হিসাব দেয় এই সংস্থাটি। আমাদের দেশে জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন কর্মসূচি না থাকায় বাংলাদেশ সম্পর্কে তারা যে অনুমতি হিসাবটি দেয়, এটি মূলত আশপাশের দেশের জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে আমাদের জনসংখ্যার বয়স গ্রুপসহ বিভিন্ন দিক সমন্বয় করে পাওয়া। এই সংস্থার দেওয়া গ্লোবোক্যান ২০২২-এর সর্বশেষ হালনাগাদ অনুমিত হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ ৬৭ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং এক লাখ ১৬ হাজার রোগী প্রতিবছর ক্যান্সারে মারা যায়।

আইএআরসিক্যান্সার থেকে সুরক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার  উন্নয়ন ও পরিকল্পনার জন্য সঠিক পরিসংখ্যান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ক্যান্সার রেজিস্ট্রি বা নিবন্ধন চালুর মাধ্যমে এই পরিসংখ্যান ও প্রয়োজনীয় তথ্য সহজেই পাওয়া যায়। উন্নত দেশগুলোতে বহু বছর ধরে ক্যান্সার রেজিস্ট্রি কার্যকর রয়েছে বলেই ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তারা অনেক এগিয়ে। ক্যান্সার রেজিস্ট্রি বা নিবন্ধন এমন একটি সংগঠন বা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ক্যান্সার রোগীদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নিয়মিতভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ব্যাখ্যাসহ প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ ও উন্মুক্ত করা হয়। এতে রোগীর  ইউনিক বা নির্দিষ্ট পরিচিতি সংখ্যা ও বিবরণ, বয়স, লিঙ্গ, আক্রান্ত অঙ্গ, ক্যান্সারের ধরন, রোগ নির্ণয়ের সময় ও পদ্ধতি, রোগের বিস্তার, চিকিৎসার ধরন ও ফলাফল অন্তর্ভুক্ত থাকে। তবে নিবন্ধনের প্রকারভেদ অনুসারে সংগৃহীত তথ্য কমবেশি হতে পারে।

ক্যান্সার নিবন্ধন মূলত দুই ধরনেরহাসপাতালভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন ও জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন। হাসপাতালভিত্তিক নিবন্ধন হলো কোনো নির্দিষ্ট হাসপাতালে আগত ক্যান্সার রোগীদের প্রয়োজনীয় তথ্য, বিশেষ করে রোগ নির্ণয়, প্রাপ্ত চিকিৎসা ও তার ফলাফল, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে ব্যাখ্যাসহ প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করা হয়। হাসপাতালে আগত রোগীর বসবাসের ঠিকানা যেখানেই হোক। এ ধরনের নিবন্ধন কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য হলো, সংগৃহীত তথ্য যাতে রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজনে দ্রুত পুনরুদ্ধার করা যায়, সেবার মান উন্নয়ন ও মূল্যায়নসহ অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা যায়। ক্যান্সার গবেষণার কাজে এর ব্যবহারের সীমিত সুযোগ আছে। অন্যদিকে জনসংখ্যাভিত্তিক নিবন্ধন হলো, একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা বা জনগোষ্ঠীর সব নতুন ক্যান্সার রোগীর তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়, রোগীর চিকিৎসা যে হাসপাতালেই হোক। এ ক্ষেত্রে আক্রান্ত রোগী ও মোট জনসংখ্যার তথ্য হাতে থাকায় ক্যান্সারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার হিসাব করা সম্ভব হয়।

বিভিন্ন কারণে এই নিবন্ধনের প্রয়োজন আছে। যেমনএকটি দেশের ক্যান্সারের প্রকৃত চিত্র নিরূপণ করতে, ক্যান্সারের ধরন ও প্রবণতা নির্ধারণ করতে। চিকিৎসা সুবিধা ও জনবল পরিকল্পনা করতে, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে সর্বোপরি আন্তর্জাতিক তুলনা ও সহযোগিতার জন্য এর প্রয়োজন রয়েছে।

তথ্য সংগ্রহ করা যায় দুইভাবে। যেমনপ্রত্যক্ষ বা সক্রিয় তথ্য সংগ্রহ ও পরোক্ষ তথ্য সংগ্রহ। প্রত্যক্ষ তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে নিবন্ধন কার্যক্রমের পক্ষ থেকে নিয়মিত ক্যান্সার রোগীদের তথ্য নির্ধারিত ফরমে সংগ্রহ করা হয়। অন্যদিকে পরোক্ষ তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এলাকার বিভিন্ন তথ্যসূত্রের পক্ষ থেকে ফরম পূরণ করে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু জাতীয় ক্যান্সার রেজিস্ট্রি না থাকায় প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব হচ্ছে না। কিছু হাসপাতালে সীমিত আকারে তথ্য সংরক্ষণ করা হলেও তা নিবন্ধনের নির্ধারিত কর্মপ্রণালী অনুসরণ করে না। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে একাধিক ক্যান্সার নিবন্ধন চালু থাকলেও আমাদের দেশে ২০০৪ সালের আগে কোনো ধরনের রেজিস্ট্রি বা নিবন্ধন চালু করা সম্ভব হয়নি।

২০০৫ সালে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে প্রথম সরকারিভাবে ক্যান্সার নিবন্ধন শুরু হয়। এর কিছুদিন আগে বর্তমান নিবন্ধকারের উদ্যোগে ক্যান্সার এপিডেমিওলজি বা ক্যান্সার রোগতত্ত্ব বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়, যদিও এই বিভাগটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সময়ে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় নানা প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও ২০২০ সাল পর্যন্ত এই প্রতিবেদন কিছুটা অনিয়মিতভাবে হলেও প্রকাশিত হয়েছে। ক্যান্সার নিবন্ধনের জন্য বিভাগের কোনো বাজেট বরাদ্দ না থাকায়, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক ডেটা বেইস বা তথ্যভাণ্ডার প্রতিষ্ঠা করা না যাওয়ায় ক্যান্সার নিবন্ধনের গুণগত মান বৃদ্ধি বা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও পুরনো আটটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হাসপাতালভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ একাধিকবার নেওয়া হলেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। 

দেশে জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধনের প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ক্যান্সার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায়।  জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের ক্যান্সার এপিডেমিওলজি বিভাগ কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। প্যাসিভ বা পরোক্ষ তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিতে গাজীপুর জেলার সদর উপজেলায় নতুন ক্যান্সার রোগীদের তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। নানা কারণে ফলাফল সন্তোষজনক না হওয়ায় এবং অর্থায়নের অভাবে নিবন্ধন চালু রাখা সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমের একটি গবেষণা প্রকল্পের আওতায় কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলায় বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ ও ইনফরমেটিকস বিভাগের উদ্যোগে ক্যান্সার রোগীদের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে একটি পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, উপরোক্ত দুটি উদ্যোগকে সার্ভে বা জরিপ বলা গেলেও ক্যান্সার নিবন্ধন হিসেবে গণ্য করা যায় না। রেজিস্ট্রি বা সার্ভেইল্যান্স একটি ধারাবাহিকভাবে চলমান প্রক্রিয়া। এর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারের উপযুক্ত কোনো সংস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও স্থায়ীভাবে চালু রাখার নিশ্চয়তাসহ। সরকারি ও বেসরকারি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে হাসপাতালভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন চালু করা এবং কয়েকটি অঞ্চলে কয়েকটি জনগোষ্ঠীভিত্তিক নিবন্ধন চালুর পরিকল্পনাসহ একটি জাতীয় ক্যান্সার নিবন্ধন কর্মসূচি প্রণয়ন করে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর মেডিক্যাল রিসার্চ বা আইসিএমআর (আমাদের দেশের বিএমআরসির মতো) সারা দেশের ক্যান্সার নিবন্ধন কর্মসূচির দেখভাল করে। আমাদের দেশেও বিএমআরসিকে তদারকের দায়িত্ব দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি কিংবা জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে একটি জাতীয় ক্যান্সার নিবন্ধন কর্মসূচি প্রণয়ন করা খুবই জরুরি। 

লেখক : প্রকল্প সমন্বয়কারী, গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ক্যান্সার হাসপাতাল এবং সাবেক অধ্যাপক, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

মশা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ : নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা

ড. কবিরুল বাশার

মশা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ : নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা

মশা মানেই শুধু বিরক্তি নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষাও বটে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকার ও নতুন মন্ত্রিসভা এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন দেশে মশার ঘনত্ব এরই মধ্যে অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় রয়েছে এবং আগামী মাসে তা আরো বেড়ে চরম অস্বস্তিকর ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মশা সার্ভেইল্যান্স তথ্য আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কিউলেক্স মশা এখন কার্যত নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে, আর এডিস মশা আপাতত কমে থাকলেও তা কোনোভাবেই স্থায়ী নিরাপত্তার বার্তা নয়। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, এডিস কখনো ঘোষণা দিয়ে ফিরে আসে না, সে আসে আমাদের অসতর্কতার সুযোগে।

ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর তথ্য বলছে, ঢাকায় সংগৃহীত মোট প্রাপ্তবয়স্ক মশার প্রায় ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির। এটি কোনো পরিসংখ্যানগত কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং এটি নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রতিফলন। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, বছরের পর বছর পরিষ্কার না হওয়া নালা, জলাবদ্ধ বেইসমেন্ট ও পার্কিং এলাকাসব মিলিয়ে ঢাকা শহর নিজেই যেন কিউলেক্স মশার জন্য এক আদর্শ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

মশা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ : নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশাঅন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে এডিস মশার ঘনত্ব কমে আসার তথ্য অনেকের মধ্যেই স্বস্তি তৈরি করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মশা সার্ভেইল্যান্স তথ্য অনুযায়ী এডিস মশার ঘনত্ব এবং ব্রেটো ইনডেক্স কমেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। এটি প্রমাণ করে যে কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগ, জনসচেতনতা, দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টিপাত না থাকা এবং তাপমাত্রা কমে যাওয়া ফ্যাক্টরগুলো একসঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু এডিস মশার ঘনত্ব কমার এই স্বস্তিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা। আমাদের মনে রাখতে হবে, এডিস মশার এই কমে যাওয়া কোনো স্থায়ী অর্জন নয়, বরং এটি এক ধরনের সাময়িক বিরতি। নগরের অলিগলি, বেইসমেন্টে গাড়ি পার্কিং করার স্থান, পুরনো বাড়ির নিচতলা, বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পানির ট্যাংক, প্লাস্টিক ড্রাম ও বালতির ভেতরে এখনো এডিস মশার প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান রয়ে গেছে। বর্ষা শুরু হলেই সামান্য অবহেলা এই মশাকে আবার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেবে। তখন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লে দায় কার হবেএই প্রশ্নের উত্তর আজও স্পষ্ট নয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৫ সালেও দেশে লক্ষাধিক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। এর আগে ২০২৩ সালে ডেঙ্গু ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি রোগের বিস্তার নয়, এটি নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পরিকল্পনা ও শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।

ঢাকা মহানগর ডেঙ্গুর প্রধান কেন্দ্র হলেও এখন সংক্রমণ বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরগুলোতেও বিস্তৃত। এডিস মশার প্রজননচক্র বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে দ্রুততর হয়। ফলে জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এটি মারাত্মক আকার ধারণ করে। তবে ডেঙ্গু এখন সারা বছরই বিদ্যমান। অতএব, মৌসুমি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ অভিযানের পরিবর্তে বার্ষিক, পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক কর্মসূচি অপরিহার্য।

এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের প্রধান কৌশল ছিল কীটনাশক ছিটানো, জরুরি সভা আহবান ও হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো। এগুলো প্রয়োজনীয় হলেও মূলত প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা। কার্যকর নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রয়োগ, যেখানে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ, লার্ভা উৎস ধ্বংস, সম্প্রদায়ভিত্তিক অংশগ্রহণ এবং বৈজ্ঞানিক নজরদারি একসঙ্গে পরিচালিত হবে।

নতুন সরকারের উচিত একটি জাতীয় ডেঙ্গু ও আর্বোভাইরাস কৌশলপত্র প্রণয়ন করা, যেখানে পাঁচ থেকে ১০ বছরের সুস্পষ্ট লক্ষ্য, বাজেট বরাদ্দ এবং কর্মপরিকল্পনা নির্ধারিত থাকবে। ডেঙ্গুকে জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংযুক্ত একটি আন্ত মন্ত্রণালয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

ডেঙ্গু ও অন্যান্য আর্বোভাইরাল রোগের জন্য একটি একীভূত, রিয়াল টাইম ডিজিটাল এন্টোমোলজিক্যাল এবং ডিজিজ সার্ভেইল্যান্স প্ল্যাটফর্ম চালু করা জরুরি। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে বাধ্যতামূলক রিপোর্টিং কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। কেস ডেফিনিশন, রিপোর্টিং টাইমলাইন ও ডেটা ভ্যালিডেশন প্রটোকল মানসম্মত না হলে নীতিনির্ধারণ সঠিক হবে না। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ডেটা অ্যানালিটিকস সেল গঠন করে সাপ্তাহিক ট্রেন্ড বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি পূর্বাভাস প্রকাশ করা উচিত।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রোগীর সংখ্যা জানা যথেষ্ট নয়, এডিস মশার ঘনত্ব, ব্রিডিং ইনডেক্স (HI, CI, BI) এবং কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়মিত পরিমাপ করা অপরিহার্য। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি শক্তিশালী মেডিক্যাল এন্টোমোলজি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে জেলা পর্যায়ে ল্যাব সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে। প্রমাণভিত্তিক তথ্য ছাড়া কীটনাশক নির্বাচন ও ব্যবহার করলে অপচয় ও প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিদুই ঝুঁকিই বাড়ে।

বৃষ্টি, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মতো জলবায়ু উপাদানের সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি ক্লাইমেট লিংকড পূর্বাভাস মডেল তৈরি করা উচিত, যাতে সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাবের চার থেকে ছয় সপ্তাহ আগে সতর্কতা জারি করা যায়। এতে হাসপাতাল প্রস্তুতি, মাঠ পর্যায়ে লার্ভা নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা কার্যক্রম সময়মতো শুরু করা সম্ভব হবে।

ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুহার কমাতে প্রাথমিক পর্যায়েই রোগী  শনাক্তকরণ ও ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় গাইডলাইন নিয়মিত হালনাগাদ করে সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত দ্রুত ডায়াগনস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করলে রোগী রেফারেল চাপ কমবে এবং জটিলতা হ্রাস পাবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রেক্ষাপটভিত্তিক গবেষণা অপরিহার্য। বিশ্ববিদ্যালয়, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ গবেষণা তহবিল গঠন করে ওভিট্র্যাপভিত্তিক নজরদারি, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, কমিউনিটি-ড্রিভেন সোর্স রিডাকশন ও নতুন প্রযুক্তির পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। গবেষণার ফলাফল নীতিনির্ধারণে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করার একটি কাঠামো তৈরি করা জরুরি।

প্রতিটি জেলা ও বিভাগের জন্য নির্দিষ্ট এন্টোমোলজিক্যাল ইনডেক্স নির্ধারণ করে কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা উচিত। মাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন ও উন্মুক্ত ডেটা প্রকাশের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলে নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করাই হবে টেকসই সাফল্যের মূলভিত্তি।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ডেঙ্গু বিস্তারের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ভবন নির্মাণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, ছাদ ও বেইসমেন্টে পানি জমা রোধের নকশা এবং সাইট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান বাধ্যতামূলক করতে হবে। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত প্লট ও জলাবদ্ধ এলাকায় নিয়মিত পরিদর্শন ও জরিমানাকাঠামো কার্যকর করতে হবে। আইন থাকলেও প্রয়োগে শৈথিল্য এডিস মশার প্রজননকে অব্যাহত রাখে। এই সংস্কারটি হতে হবে বাস্তবভিত্তিক ও কঠোর।

খোলা ড্রেন, প্লাস্টিক বর্জ্য ও অব্যবস্থাপিত কঠিন বর্জ্য এডিস মশার কৃত্রিম প্রজননক্ষেত্র তৈরি করে। ওয়ার্ডভিত্তিক বর্জ্য সংগ্রহ, রিসাইক্লিং চেইন উন্নয়ন এবং নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার কর্মসূচিকে রুটিন প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বর্ষার আগে বিশেষ প্রি-মনসুন ড্রাইভ পরিচালনা করে সম্ভাব্য জলাবদ্ধ স্থান চিহ্নিত ও সংস্কার করা জরুরি।

সব এলাকায় সমানভাবে কীটনাশক ছিটানো কার্যকর নয়। ওয়ার্ডভিত্তিক হাউস ইনডেক্স, ব্রেটো ইনডেক্স ও কেস ডেনসিটি অনুযায়ী অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।

ওয়ার্ডভিত্তিক কার্যক্রম, কীটনাশক ব্যবহার, লার্ভা ধ্বংস অভিযান ও নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তির তথ্য অনলাইন ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ করা উচিত। জিও-ট্যাগড রিপোর্টিং চালু করলে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা বাড়বে। নাগরিকদের জন্য হটলাইন বা অ্যাপভিত্তিক রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু করে অংশগ্রহণমূলক তদারকি নিশ্চিত করা যেতে পারে।

ওয়াসা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ সংস্থা, সব সংস্থার কাজের সঙ্গে নগর স্বাস্থ্য সরাসরি সম্পর্কিত। সমন্বয়হীন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রায়ই জলাবদ্ধতা ও অস্থায়ী পানি জমার ঝুঁকি তৈরি করে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে মাসিক সমন্বয় সভা ও যৌথ কর্মপরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে এক সংস্থার কাজ অন্য সংস্থার উদ্যোগকে ব্যাহত না করে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযানকে সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তর করতে পারলে প্রশাসনিক চাপও কমবে।

মশা নিয়ন্ত্রণকে মৌসুমি প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির স্থায়ী অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাঁচ বছরের রোলিং অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করে নির্দিষ্ট সূচক ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত। ধারাবাহিক বাজেট বরাদ্দ ছাড়া অবকাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, পরিবেশ ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। একটি উচ্চ পর্যায়ের জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করে মাসিক পর্যালোচনা সভা ও অগ্রগতি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ প্রায়ই মৌসুমি সংকটের সময় বাড়ানো হয়। কিন্তু স্থায়ী সাফল্যের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় (ADP) নির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। নতুন সরকারের উচিত ডেঙ্গুকে জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস ষাটের দশক থেকে শুরু হয়ে আজ এক জটিল নগর বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। অভিজ্ঞতা, তথ্য ও জ্ঞানসবই আমাদের হাতে রয়েছে। এখন প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতি, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সমন্বিত কর্মপ্রয়াস।

নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, ডেঙ্গুকে আর মৌসুমি আতঙ্ক হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রতিক্রিয়াশীল ধারা থেকে বেরিয়ে প্রতিরোধমূলক, বৈজ্ঞানিক ও টেকসই কৌশল গ্রহণ করা হবে।

লেখক : কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

একটি মানবকেন্দ্রিক ভবিষ্যৎ গঠনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬

নরেন্দ্র মোদি

একটি মানবকেন্দ্রিক ভবিষ্যৎ গঠনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬

মানব ইতিহাসের এক নির্ধারণী মুহূর্তে এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬-এ সমগ্র বিশ্ব নয়াদিল্লিতে একত্র হয়। ভারতে আমাদের জন্য, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, প্রতিনিধি ও উদ্ভাবকদের স্বাগত জানাতে পারাটা ছিল অপরিসীম গর্ব ও আনন্দের একটি মুহূর্ত।

ভারত যা কিছু করে, তা ব্যাপকতা ও উদ্যম নিয়ে করে এবং এই শীর্ষ সম্মেলনটিও এর ব্যতিক্রম নয়। ১০০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিরা একত্র হয়েছিলেন। উদ্ভাবকরা সর্বাধুনিক এআই পণ্যসম্ভার ও পরিষেবাগুলো প্রদর্শন করেছেন। প্রদর্শনী হলগুলোতে হাজার হাজার তরুণ-তরুণীকে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে আর নানা সম্ভাবনার কল্পনা করতে দেখা গেছে। তাদের কৌতূহলই এটিকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও সর্বাধিক গণতান্ত্রিক এআই শীর্ষ সম্মেলনে পরিণত করেছে। আমি এটিকে ভারতের উন্নয়নযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখি। কারণ এআই উদ্ভাবন ও গ্রহণকে কেন্দ্র করে একটি গণ-আন্দোলন সত্যিকার অর্থেই শুরু হয়ে গেছে।

একটি মানবকেন্দ্রিক ভবিষ্যৎ গঠনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬সভ্যতার গতিপথ পরিবর্তন করে দেওয়ার মতো অনেক প্রযুক্তিগত রূপান্তর মানব ইতিহাস প্রত্যক্ষ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগুন, লিখন, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের মতোই সেই একই স্তরে অবস্থান করছে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে আগে কয়েক দশক সময় লেগে যাওয়া পরিবর্তনগুলো এখন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ঘটতে পারে এবং সমগ্র পৃথিবীর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

যন্ত্রগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বুদ্ধিমান করে তুলছে, কিন্তু সেটির চেয়েও বড় কথা হলো, এটি মানব অভিপ্রায়ের জন্য অধিকতর শক্তিবর্ধক একটি মাধ্যম। এআইকে যন্ত্রকেন্দ্রিক নয়, বরং মানবকেন্দ্রিক করে তোলাটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই শীর্ষ সম্মেলনটিতে আমরা সর্বজন হিতায়, সর্বজন সুখায় (সবার ভালো, সবার সুখ) নীতি অনুসরণ করে বৈশ্বিক এআই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মানবকল্যাণকে স্থান দিয়েছি।

আমি সব সময় বিশ্বাস করেছি যে প্রযুক্তি অবশ্যই মানুষের সেবা করবে, এর উল্টোটা নয়। তা সে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট হোক বা কভিডের টিকাকরণ হোক। আমরা নিশ্চিত করেছি যেন ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার কাউকে পেছনে ফেলে না রেখে সবার কাছে পৌঁছে যায়। এই শীর্ষ সম্মেলনটিতে কৃষি, নিরাপত্তা, দিব্যাঙ্গজনদের জন্য সহায়তা এবং বহুভাষিক জনগোষ্ঠীর জন্য উপযোগী সরঞ্জামসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের উদ্ভাবকদের কাজের মধ্যেও এই একই চেতনা আমি দেখতে পেয়েছি।

ভারতে এরই মধ্যে এআইয়ের ক্ষমতায়নের সম্ভাবনার কিছু উদাহরণ বিদ্যমান। সম্প্রতি ভারতীয় দুগ্ধ সমবায় প্রতিষ্ঠান আমূল (AMUL) কর্তৃক শুরু করা এআইচালিত ডিজিটাল সহকারী সরলাবেন (Sarlaben) ৩.৬ মিলিয়ন দুগ্ধ খামারিকে, যাঁদের বেশির ভাগই নারী, তাঁদের নিজস্ব ভাষায় গবাদি পশুর স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা সম্পর্কে রিয়াল টাইম দিকনির্দেশনা প্রদান করছে। একইভাবে ভারত বিস্তার (Bharat VISTAAR) নামে একটি এআইভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম কৃষকদের বহুভাষিক সহায়তা প্রদান করছে, যা আবহাওয়া থেকে শুরু করে বাজারদর পর্যন্ত সবকিছু সম্পর্কে তথ্য দিয়ে তাঁদের ক্ষমতায়িত করে তুলছে।

মানুষ কখনোই কেবল তথ্যবিন্দু বা যন্ত্রের কাঁচামালে পরিণত হতে পারে না। বরং এআইকে বৈশ্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে একটি হাতিয়ারে পরিণত হতে হবে, যা গ্লোবাল সাউথের জন্য অগ্রগতির নতুন দ্বার উন্মোচন করবে। এই দর্শনকে বাস্তবে রূপদান করতে ভারত মানবকেন্দ্রিক এআই পরিচালনা ব্যবস্থা মানব (MANAV) কাঠামো উপস্থাপন করেছে।

* Moral and Ethical Systems (নৈতিক ও আদর্শিক মূল্যবোধের ব্যবস্থা) : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নৈতিক নীতিমালার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা উচিত।

* Accountable Governance (জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা) : স্বচ্ছ নিয়ম-কানুন ও শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা থাকতে হবে।

* National Sovereign (জাতীয় সার্বভৌমত্ব) : তথ্যের ওপর জাতীয় অধিকার ও নিয়ন্ত্রণের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে।

* Accessible and Inclusive (সহজপ্রাপ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক) : এআই যেন কোনো একচেটিয়া ব্যবস্থায় পরিণত না হয়।

* Valid and Legitimate (বৈধ ও গ্রহণযোগ্য) : এআইকে আইন মেনে চলতে হবে এবং এর কার্যক্রম যাচাইযোগ্য হতে হবে।

 মানব (MANAV), যার অর্থ হলো মানুষ এমন নীতিমালা উপস্থাপন করে, যা একবিংশ শতাব্দীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে ভিত্তিবদ্ধ রাখে। বিশ্বাস হলো সেই ভিত্তি, যার ওপর এআইয়ের ভবিষ্যৎ স্থিত থাকে। জেনারেটিভ সিস্টেমগুলো যখন বিশ্বজুড়ে কনটেন্ট তৈরি করছে, তখন গণতান্ত্রিক সমাজগুলো ডিপফেক আর বিভ্রান্তিকর তথ্যের ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। ঠিক যেমন খাদ্যে পুষ্টির লেবেল থাকে, তেমনি ডিজিটাল কনটেন্টেও বিশ্বাসযোগ্যতার লেবেল থাকা উচিত। আমি বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে ওয়াটারমার্কিং ও উৎস যাচাইয়ের জন্য সমন্বিত মানদণ্ড তৈরি করার লক্ষ্যে একত্র হওয়ার আহবান জানাই। ভারত এরই মধ্যে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা কনটেন্টের ক্ষেত্রে স্পষ্ট লেবেলিং করাটাকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে এই লক্ষ্যেই একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

আমাদের সন্তানদের কল্যাণ আমাদের হৃদয়ের খুব কাছের একটি বিষয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সিস্টেমগুলো এমনভাবে বিনির্মাণ করতে হবে, যাতে সেগুলোতে সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে, যা দায়িত্বশীল, পরিবার নির্দেশিত সম্পৃক্ততাকে উৎসাহিত করবে, যা বিশ্বব্যাপী শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আমাদের একই ধরনের যত্নের প্রতিফলন ঘটায়।

প্রযুক্তি তার সর্বোচ্চ সুফল দেয় তখনই, যখন সুরক্ষিত কৌশলগত সম্পদ হিসেবে না রেখে বরং এটিকে সবার মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হয়। উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মগুলো প্রযুক্তিকে আরো নিরাপদ ও মানবকেন্দ্রিক করে তোলার ক্ষেত্রে লাখ লাখ তরুণকে অবদান রাখতে সাহায্য করতে পারে। এই সমষ্টিগত বুদ্ধিমত্তাই মানবজাতির সবচেয়ে বড় শক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একটি বৈশ্বিক সাধারণ কল্যাণ হিসেবে বিকশিত হতে হবে।

আমরা এমন একটি যুগে প্রবেশ করছি, যেখানে মানুষ ও বুদ্ধিমান সিস্টেমগুলো একসঙ্গে সৃষ্টি করবে, একসঙ্গে কাজ করবে আর একসঙ্গে বিকশিত হবে। সম্পূর্ণরূপে নতুন নতুন পেশার আবির্ভাব ঘটবে। যখন ইন্টারনেটের সূচনা ঘটেছিল, তখন কেউ এর সম্ভাবনাগুলোর কথা কল্পনাও করতে পারেনি। এটি অসংখ্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও সেটিই করবে।

আমি নিশ্চিত যে আমাদের ক্ষমতায়িত যুবসমাজই এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগের প্রকৃত চালিকাশক্তি হবে। আমরা বিশ্বের বৃহত্তম ও বৈচিত্র্যময় কিছু দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনা করার মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি, পুনঃ দক্ষতা অর্জন এবং জীবনব্যাপী শিক্ষাকে উৎসাহিত করে চলেছি।

ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ যুব জনগোষ্ঠী আর প্রযুক্তি প্রতিভার আবাসস্থল। আমাদের শক্তিগত সক্ষমতা আর নীতিগত স্পষ্টতার সঙ্গে আমরা এআইয়ের পূর্ণ সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য এক অনন্য অবস্থানে রয়েছি। এই শীর্ষ সম্মেলনটিতে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমাদের তরুণ উদ্ভাবনী সম্প্রদায়ের প্রযুক্তিগত গভীরতা প্রতিফলিত করে দেশীয় এআই মডেল ও অ্যাপ্লিকেশন চালু করতে দেখে আমি গর্বিত বোধ করেছি।

আমাদের এআই ইকোসিস্টেমের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার জন্য আমরা একটি শক্তিশালী অবকাঠামোগত ভিত্তি বিনির্মাণ করছি। ইন্ডিয়া এআই মিশনের অধীনে আমরা হাজার হাজার জিপিইউ স্থাপন করেছি এবং শিগগিরই আরো স্থাপন করার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে বিশ্বমানের কম্পিউটিং পাওয়ারে অ্যাকসেস লাভ করার মাধ্যমে, এমনকি ক্ষুদ্রতম স্টার্টআপগুলোও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে। এ ছাড়া আমরা একটি জাতীয় এআই রেপোজিটরি প্রতিষ্ঠা করেছি, যা ডেটাসেট ও এআই মডেলগুলোতে প্রবেশাধিকারকে গণতান্ত্রিক করে তুলেছে। সেমিকন্ডাক্টর ও ডেটা ইনফ্রাস্ট্রাকচার থেকে শুরু করে বৈচিত্র্যময় স্টার্টআপগুলো এবং প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা পর্যন্ত আমরা সম্পূর্ণ ভ্যালু চেইনকে কেন্দ্র করে কাজ করছি।

ভারতের বৈচিত্র্য, গণতন্ত্র আর জনসংখ্যার গতিশীলতা অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ প্রদান করে। ভারতে সফল হওয়া সমাধানগুলো সর্বত্র মানবজাতিকে সেবা প্রদান করতে পারে। সে জন্যই বিশ্বের প্রতি আমাদের আমন্ত্রণ হলো, ভারতে উদ্ভাবন করুন ও বিকাশ ঘটান। বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিন। মানবজাতির কাছে পৌঁছে দিন।

লেখক : ভারতের প্রধানমন্ত্রী

জলবায়ু সুরক্ষা : রাজনৈতিক অঙ্গীকার কি অস্তিত্ব সংকট ঘোচাতে পারবে

সজল মেহদী

জলবায়ু সুরক্ষা : রাজনৈতিক অঙ্গীকার কি অস্তিত্ব সংকট ঘোচাতে পারবে

বাংলাদেশ আজ ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন কেবল বৈশ্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের ওপর এক চরম আঘাত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে পরিবেশ সুরক্ষায় দীর্ঘ রূপরেখা দিয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি আপাতদৃষ্টিতে আশাব্যঞ্জক মনে হলেও তা বাস্তবায়ন নিবিড় পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ইশতেহারগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর বনায়ন, সবুজ কর্মসংস্থান এবং কার্বন বাণিজ্যের মতো আধুনিক ধারণাগুলো প্রাধান্য পেয়েছে। এতে আঁচ করা যায়, আমাদের নীতিনির্ধারকরা জলবায়ু সংকটের ভয়াবহতা বুঝতে শুরু করেছেন। তবে এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য যে প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, তার ঘাটতি মেটানোই হবে আগামী দিনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের সবার আগে বাংলাদেশ নীতির ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষাকে একটি অর্থনৈতিক বিপ্লবে রূপান্তরের পরিকল্পনা করেছে। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন ও পুনঃখনন এবং সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে ৫.৫ লাখ সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রাটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তারা গতানুগতিক বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম এবং থ্রি মনিটরিং অ্যাপ-এর মাধ্যমে বিজ্ঞানভিত্তিক তদারকির কথা বলেছে। এ ছাড়া ভবনে সবুজ পরিমাপক মানদণ্ড ও ছাদ বাগানের জন্য কর প্রণোদনার বিষয়টি ক্রমবর্ধমান নগরায়নের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী। বিশেষ করে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট জ্বালানির ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা এবং রূপপুর প্রকল্পের কার্যকারিতা পুনঃপরীক্ষার অঙ্গীকার স্বচ্ছতা ও টেকসই উন্নয়নের প্রতি তাদের আগ্রহ প্রকাশ করে। তবে ২৫ কোটি গাছের বিশাল কর্মযজ্ঞ কি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সঠিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর দলটির ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতির ওপর নির্ভর করবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে তিন শূন্য ভিশন অর্থাৎ শূন্য পরিবেশগত অবক্ষয়, শূন্য বর্জ্য এবং শূন্য বন্যাঝুঁকির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তাদের ইশতেহারে ডাচ ডেল্টা মডেলের আদলে বন্যা সুরক্ষা এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে পানি-সার্বভৌমত্ব অর্জনের যে কথা বলা হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রশংসনীয়। প্লাস্টিক বোতলের বিনিময়ে গাছ আন্দোলন বা ডিপোজিট-রিটার্ন সিস্টেমের মতো নাগরিকবান্ধব ধারণাগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে ইশতেহারে কয়লার ব্যবহার সীমিত করার কথা বলা হলেও বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নির্গমন নিয়ন্ত্রণের যে কৌশল দেওয়া হয়েছে, তা কতটা পরিবেশবান্ধব হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। জ্বালানি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে কারিগরি সক্ষমতা এবং বিশাল বাজেটের সংস্থান একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের ২০২৬ সালের ইশতেহারে জলবায়ু পরিবর্তনের সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাবের ওপর বেশি জোর দিয়েছে। জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই আবাসন এবং মাইক্রো-ইনস্যুরেন্স বা ইনডেক্সভিত্তিক বীমার ধারণাটি প্রান্তিক কৃষকদের অকাল বন্যা বা খরা থেকে সুরক্ষায় অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া শহর এলাকায় কুলিং-সেন্টার এবং হিট-অ্যালার্ট প্রটোকল চালুর বিষয়টি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অসহনীয় দাবদাহের শিকার সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তারা তরুণ জলবায়ু অ্যাক্টিভিস্টদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করার যে স্বপ্ন দেখিয়েছে, তা দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হবে।

তবে বড় লক্ষ্য অর্জনে কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জও ইশতেহারে প্রতিফলিত হয়েছে। পানিবণ্টন ও অভিন্ন নদী নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিএনপির জাতিসংঘের ওয়াটার কনভেনশন ১৯৯৭ স্বাক্ষর এবং বড় দলগুলোর  তিস্তা  সম্পর্কিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এক বড় পদক্ষেপ হতে পারে। আবার জামায়াতের জলবায়ু কূটনীতির মাধ্যমে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

রাজনৈতিক দলগুলোর পরিবেশবিষয়ক উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার কথা আলোচিত হলেও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে নদী দখল, পাহাড় কাটা ও বন উজাড়ের মতো পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের পেছনে বহু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের ভূমিকা রয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে পাহাড় নিধনকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অঙ্গীকার থাকলেও সেই শাস্তি বাস্তবে কতটা নিরপেক্ষ, প্রভাবমুক্ত ও কার্যকরভাবে প্রয়োগ হবে, তা নিয়ে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই সংশয় থাকবে। একই সঙ্গে নদী ও খালের পারে গ্রিন ক্যানেল ব্যাংক মডেল বা ইকোট্যুরিজম উন্নয়নের মতো উদ্যোগগুলো আদৌ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও স্বার্থ নিশ্চিত করতে পারবে কি না, সে বিষয়েও আরো স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। এদিকে কার্বন ক্রেডিট থেকে বছরে এক বিলিয়ন ডলার আয় করার যে লক্ষ্যমাত্রা বিএনপি নির্ধারণ করেছে, তা অর্জন করতে হলে MRV (Measurement, Reporting and Verification) ব্যবস্থা অবশ্যই শতভাগ স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হতে হবে। তবে কার্বন ক্রেডিট ও REDD+ নীতির বাস্তবায়নে আমাদের বাড়তি সতর্কতা জরুরি। কারণ যথাযথ তদারকি ও সামাজিক সুরক্ষা না থাকলে এসব উদ্যোগ প্রকৃতিকে পণ্যে রূপান্তর করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়নের বদলে তাদের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে। নৈতিক, দায়বদ্ধ ও জনগণকেন্দ্রিক কার্বন ত্রেদিং উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই মুহূর্তে জলবায়ু অভিযোজন জোরদার করা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক ও অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি (Loss and Damage) প্রতিরোধ করাই জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষার এই অঙ্গীকারগুলো যেন কেবল নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার সবুজ অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। দলগুলোর উচিত তাদের পরিকল্পনার সঙ্গে বাজেটের সমন্বয় এবং একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জনগণের সামনে তুলে ধরা। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তাদের মনে রাখতে হবে যে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ মেনে চলে না। আজকের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা মানেই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি ধ্বংসস্তূপ রেখে যাওয়া। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা কোনো একক দলের বিষয় নয়। এটি একটি জাতীয় ঐকমত্যের ক্ষেত্র। ভোটারদের উচিত ইশতেহারের ভাষার বাইরে গিয়ে প্রতিশ্রুতির গভীরতা, বাস্তবতা ও ধারাবাহিকতা বিচার করা। কারণ এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি নির্ধারণ করবে জলবায়ুঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথচলা।

 

লেখক : পানিসম্পদ প্রকৌশলী ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ