বাংলাদেশে জাতীয়ভিত্তিক বা জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার রেজিস্ট্রি না থাকায় ক্যান্সারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার, বিস্তারসহ ক্যান্সার সম্পর্কিত কোনো সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। এখনো দেশের ক্যান্সার পরিসংখ্যানের জন্য আমাদের নির্ভর করতে হয় আন্তর্জাতিক সংস্থার দেওয়া তথ্যের ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি) এই দায়িত্বটি পালন করে। বিভিন্ন দেশের জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধনের ফলাফল পর্যালোচনা এবং বিশ্লেষণ করে অন্যান্য দেশ সম্পর্কে একটি অনুমিত হিসাব দেয় এই সংস্থাটি। আমাদের দেশে জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন কর্মসূচি না থাকায় বাংলাদেশ সম্পর্কে তারা যে অনুমতি হিসাবটি দেয়, এটি মূলত আশপাশের দেশের জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে আমাদের জনসংখ্যার বয়স গ্রুপসহ বিভিন্ন দিক সমন্বয় করে পাওয়া। এই সংস্থার দেওয়া গ্লোবোক্যান ২০২২-এর সর্বশেষ হালনাগাদ অনুমিত হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ ৬৭ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং এক লাখ ১৬ হাজার রোগী প্রতিবছর ক্যান্সারে মারা যায়।
ক্যান্সার থেকে সুরক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও পরিকল্পনার জন্য সঠিক পরিসংখ্যান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ক্যান্সার রেজিস্ট্রি বা নিবন্ধন চালুর মাধ্যমে এই পরিসংখ্যান ও প্রয়োজনীয় তথ্য সহজেই পাওয়া যায়। উন্নত দেশগুলোতে বহু বছর ধরে ক্যান্সার রেজিস্ট্রি কার্যকর রয়েছে বলেই ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তারা অনেক এগিয়ে। ক্যান্সার রেজিস্ট্রি বা নিবন্ধন এমন একটি সংগঠন বা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ক্যান্সার রোগীদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নিয়মিতভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ব্যাখ্যাসহ প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ ও উন্মুক্ত করা হয়। এতে রোগীর ইউনিক বা নির্দিষ্ট পরিচিতি সংখ্যা ও বিবরণ, বয়স, লিঙ্গ, আক্রান্ত অঙ্গ, ক্যান্সারের ধরন, রোগ নির্ণয়ের সময় ও পদ্ধতি, রোগের বিস্তার, চিকিৎসার ধরন ও ফলাফল অন্তর্ভুক্ত থাকে। তবে নিবন্ধনের প্রকারভেদ অনুসারে সংগৃহীত তথ্য কমবেশি হতে পারে।
ক্যান্সার নিবন্ধন মূলত দুই ধরনের—হাসপাতালভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন ও জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন। হাসপাতালভিত্তিক নিবন্ধন হলো কোনো নির্দিষ্ট হাসপাতালে আগত ক্যান্সার রোগীদের প্রয়োজনীয় তথ্য, বিশেষ করে রোগ নির্ণয়, প্রাপ্ত চিকিৎসা ও তার ফলাফল, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে ব্যাখ্যাসহ প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করা হয়। হাসপাতালে আগত রোগীর বসবাসের ঠিকানা যেখানেই হোক। এ ধরনের নিবন্ধন কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য হলো, সংগৃহীত তথ্য যাতে রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজনে দ্রুত পুনরুদ্ধার করা যায়, সেবার মান উন্নয়ন ও মূল্যায়নসহ অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা যায়। ক্যান্সার গবেষণার কাজে এর ব্যবহারের সীমিত সুযোগ আছে। অন্যদিকে জনসংখ্যাভিত্তিক নিবন্ধন হলো, একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা বা জনগোষ্ঠীর সব নতুন ক্যান্সার রোগীর তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়, রোগীর চিকিৎসা যে হাসপাতালেই হোক। এ ক্ষেত্রে আক্রান্ত রোগী ও মোট জনসংখ্যার তথ্য হাতে থাকায় ক্যান্সারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার হিসাব করা সম্ভব হয়।
বিভিন্ন কারণে এই নিবন্ধনের প্রয়োজন আছে। যেমন—একটি দেশের ক্যান্সারের প্রকৃত চিত্র নিরূপণ করতে, ক্যান্সারের ধরন ও প্রবণতা নির্ধারণ করতে। চিকিৎসা সুবিধা ও জনবল পরিকল্পনা করতে, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে সর্বোপরি আন্তর্জাতিক তুলনা ও সহযোগিতার জন্য এর প্রয়োজন রয়েছে।
তথ্য সংগ্রহ করা যায় দুইভাবে। যেমন—প্রত্যক্ষ বা সক্রিয় তথ্য সংগ্রহ ও পরোক্ষ তথ্য সংগ্রহ। প্রত্যক্ষ তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে নিবন্ধন কার্যক্রমের পক্ষ থেকে নিয়মিত ক্যান্সার রোগীদের তথ্য নির্ধারিত ফরমে সংগ্রহ করা হয়। অন্যদিকে পরোক্ষ তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এলাকার বিভিন্ন তথ্যসূত্রের পক্ষ থেকে ফরম পূরণ করে পাঠানো হয়।
বাংলাদেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু জাতীয় ক্যান্সার রেজিস্ট্রি না থাকায় প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব হচ্ছে না। কিছু হাসপাতালে সীমিত আকারে তথ্য সংরক্ষণ করা হলেও তা নিবন্ধনের নির্ধারিত কর্মপ্রণালী অনুসরণ করে না। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে একাধিক ক্যান্সার নিবন্ধন চালু থাকলেও আমাদের দেশে ২০০৪ সালের আগে কোনো ধরনের রেজিস্ট্রি বা নিবন্ধন চালু করা সম্ভব হয়নি।
২০০৫ সালে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে প্রথম সরকারিভাবে ক্যান্সার নিবন্ধন শুরু হয়। এর কিছুদিন আগে বর্তমান নিবন্ধকারের উদ্যোগে ক্যান্সার এপিডেমিওলজি বা ক্যান্সার রোগতত্ত্ব বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়, যদিও এই বিভাগটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সময়ে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় নানা প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও ২০২০ সাল পর্যন্ত এই প্রতিবেদন কিছুটা অনিয়মিতভাবে হলেও প্রকাশিত হয়েছে। ক্যান্সার নিবন্ধনের জন্য বিভাগের কোনো বাজেট বরাদ্দ না থাকায়, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক ডেটা বেইস বা তথ্যভাণ্ডার প্রতিষ্ঠা করা না যাওয়ায় ক্যান্সার নিবন্ধনের গুণগত মান বৃদ্ধি বা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও পুরনো আটটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হাসপাতালভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ একাধিকবার নেওয়া হলেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
দেশে জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধনের প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ক্যান্সার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায়। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের ক্যান্সার এপিডেমিওলজি বিভাগ কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। প্যাসিভ বা পরোক্ষ তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিতে গাজীপুর জেলার সদর উপজেলায় নতুন ক্যান্সার রোগীদের তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। নানা কারণে ফলাফল সন্তোষজনক না হওয়ায় এবং অর্থায়নের অভাবে নিবন্ধন চালু রাখা সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমের একটি গবেষণা প্রকল্পের আওতায় কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলায় বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ ও ইনফরমেটিকস বিভাগের উদ্যোগে ক্যান্সার রোগীদের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে একটি পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, উপরোক্ত দুটি উদ্যোগকে সার্ভে বা জরিপ বলা গেলেও ক্যান্সার নিবন্ধন হিসেবে গণ্য করা যায় না। রেজিস্ট্রি বা সার্ভেইল্যান্স একটি ধারাবাহিকভাবে চলমান প্রক্রিয়া। এর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারের উপযুক্ত কোনো সংস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও স্থায়ীভাবে চালু রাখার নিশ্চয়তাসহ। সরকারি ও বেসরকারি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে হাসপাতালভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন চালু করা এবং কয়েকটি অঞ্চলে কয়েকটি জনগোষ্ঠীভিত্তিক নিবন্ধন চালুর পরিকল্পনাসহ একটি জাতীয় ক্যান্সার নিবন্ধন কর্মসূচি প্রণয়ন করে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর মেডিক্যাল রিসার্চ বা আইসিএমআর (আমাদের দেশের বিএমআরসির মতো) সারা দেশের ক্যান্সার নিবন্ধন কর্মসূচির দেখভাল করে। আমাদের দেশেও বিএমআরসিকে তদারকের দায়িত্ব দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি কিংবা জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে একটি জাতীয় ক্যান্সার নিবন্ধন কর্মসূচি প্রণয়ন করা খুবই জরুরি।
লেখক : প্রকল্প সমন্বয়কারী, গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ক্যান্সার হাসপাতাল এবং সাবেক অধ্যাপক, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল



রাজস্ব ঘাটতি মোকাবেলায় করব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। হয়রানিমুক্ত কর আদায় প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে করের আওতা বাড়ানো উচিত, যাতে সৎ ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত হন। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থাগুলোর সঙ্গে দ্রুত চুক্তি এবং শক্তিশালী লবিং শুরু করা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এটি কেবল তহবিলের সংস্থান করবে না, বরং দুর্নীতিবাজদের প্রতি কঠোর বার্তা দেবে। আমদানির ক্ষেত্রে কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশকে শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্কের আওতায় এনে স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে, যা পরোক্ষভাবে ডলার সংকট কাটাতে সাহায্য করবে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে এডিস মশার ঘনত্ব কমে আসার তথ্য অনেকের মধ্যেই স্বস্তি তৈরি করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মশা সার্ভেইল্যান্স তথ্য অনুযায়ী এডিস মশার ঘনত্ব এবং ব্রেটো ইনডেক্স কমেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। এটি প্রমাণ করে যে কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগ, জনসচেতনতা, দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টিপাত না থাকা এবং তাপমাত্রা কমে যাওয়া ফ্যাক্টরগুলো একসঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু এডিস মশার ঘনত্ব কমার এই স্বস্তিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা। আমাদের মনে রাখতে হবে, এডিস মশার এই কমে যাওয়া কোনো স্থায়ী অর্জন নয়, বরং এটি এক ধরনের সাময়িক বিরতি। নগরের অলিগলি, বেইসমেন্টে গাড়ি পার্কিং করার স্থান, পুরনো বাড়ির নিচতলা, বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পানির ট্যাংক, প্লাস্টিক ড্রাম ও বালতির ভেতরে এখনো এডিস মশার প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান রয়ে গেছে। বর্ষা শুরু হলেই সামান্য অবহেলা এই মশাকে আবার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেবে। তখন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লে দায় কার হবে
