• ই-পেপার

একটি মানবকেন্দ্রিক ভবিষ্যৎ গঠনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬

<li>নরেন্দ্র মোদি</li>

ক্যান্সার নিবন্ধন কেন প্রয়োজন

ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার

ক্যান্সার নিবন্ধন কেন প্রয়োজন

বাংলাদেশে জাতীয়ভিত্তিক বা জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার রেজিস্ট্রি না থাকায় ক্যান্সারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার, বিস্তারসহ ক্যান্সার সম্পর্কিত কোনো সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। এখনো দেশের ক্যান্সার পরিসংখ্যানের জন্য আমাদের নির্ভর করতে হয় আন্তর্জাতিক সংস্থার দেওয়া তথ্যের ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি) এই দায়িত্বটি পালন করে। বিভিন্ন দেশের জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধনের ফলাফল পর্যালোচনা এবং বিশ্লেষণ করে অন্যান্য দেশ সম্পর্কে একটি অনুমিত হিসাব দেয় এই সংস্থাটি। আমাদের দেশে জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন কর্মসূচি না থাকায় বাংলাদেশ সম্পর্কে তারা যে অনুমতি হিসাবটি দেয়, এটি মূলত আশপাশের দেশের জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে আমাদের জনসংখ্যার বয়স গ্রুপসহ বিভিন্ন দিক সমন্বয় করে পাওয়া। এই সংস্থার দেওয়া গ্লোবোক্যান ২০২২-এর সর্বশেষ হালনাগাদ অনুমিত হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ ৬৭ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং এক লাখ ১৬ হাজার রোগী প্রতিবছর ক্যান্সারে মারা যায়।

আইএআরসিক্যান্সার থেকে সুরক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার  উন্নয়ন ও পরিকল্পনার জন্য সঠিক পরিসংখ্যান অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ক্যান্সার রেজিস্ট্রি বা নিবন্ধন চালুর মাধ্যমে এই পরিসংখ্যান ও প্রয়োজনীয় তথ্য সহজেই পাওয়া যায়। উন্নত দেশগুলোতে বহু বছর ধরে ক্যান্সার রেজিস্ট্রি কার্যকর রয়েছে বলেই ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তারা অনেক এগিয়ে। ক্যান্সার রেজিস্ট্রি বা নিবন্ধন এমন একটি সংগঠন বা ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ক্যান্সার রোগীদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নিয়মিতভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ব্যাখ্যাসহ প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ ও উন্মুক্ত করা হয়। এতে রোগীর  ইউনিক বা নির্দিষ্ট পরিচিতি সংখ্যা ও বিবরণ, বয়স, লিঙ্গ, আক্রান্ত অঙ্গ, ক্যান্সারের ধরন, রোগ নির্ণয়ের সময় ও পদ্ধতি, রোগের বিস্তার, চিকিৎসার ধরন ও ফলাফল অন্তর্ভুক্ত থাকে। তবে নিবন্ধনের প্রকারভেদ অনুসারে সংগৃহীত তথ্য কমবেশি হতে পারে।

ক্যান্সার নিবন্ধন মূলত দুই ধরনেরহাসপাতালভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন ও জনগোষ্ঠীভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন। হাসপাতালভিত্তিক নিবন্ধন হলো কোনো নির্দিষ্ট হাসপাতালে আগত ক্যান্সার রোগীদের প্রয়োজনীয় তথ্য, বিশেষ করে রোগ নির্ণয়, প্রাপ্ত চিকিৎসা ও তার ফলাফল, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে ব্যাখ্যাসহ প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করা হয়। হাসপাতালে আগত রোগীর বসবাসের ঠিকানা যেখানেই হোক। এ ধরনের নিবন্ধন কর্মসূচির প্রধান উদ্দেশ্য হলো, সংগৃহীত তথ্য যাতে রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজনে দ্রুত পুনরুদ্ধার করা যায়, সেবার মান উন্নয়ন ও মূল্যায়নসহ অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা যায়। ক্যান্সার গবেষণার কাজে এর ব্যবহারের সীমিত সুযোগ আছে। অন্যদিকে জনসংখ্যাভিত্তিক নিবন্ধন হলো, একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা বা জনগোষ্ঠীর সব নতুন ক্যান্সার রোগীর তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়, রোগীর চিকিৎসা যে হাসপাতালেই হোক। এ ক্ষেত্রে আক্রান্ত রোগী ও মোট জনসংখ্যার তথ্য হাতে থাকায় ক্যান্সারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার হিসাব করা সম্ভব হয়।

বিভিন্ন কারণে এই নিবন্ধনের প্রয়োজন আছে। যেমনএকটি দেশের ক্যান্সারের প্রকৃত চিত্র নিরূপণ করতে, ক্যান্সারের ধরন ও প্রবণতা নির্ধারণ করতে। চিকিৎসা সুবিধা ও জনবল পরিকল্পনা করতে, প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে সর্বোপরি আন্তর্জাতিক তুলনা ও সহযোগিতার জন্য এর প্রয়োজন রয়েছে।

তথ্য সংগ্রহ করা যায় দুইভাবে। যেমনপ্রত্যক্ষ বা সক্রিয় তথ্য সংগ্রহ ও পরোক্ষ তথ্য সংগ্রহ। প্রত্যক্ষ তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে নিবন্ধন কার্যক্রমের পক্ষ থেকে নিয়মিত ক্যান্সার রোগীদের তথ্য নির্ধারিত ফরমে সংগ্রহ করা হয়। অন্যদিকে পরোক্ষ তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এলাকার বিভিন্ন তথ্যসূত্রের পক্ষ থেকে ফরম পূরণ করে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু জাতীয় ক্যান্সার রেজিস্ট্রি না থাকায় প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব হচ্ছে না। কিছু হাসপাতালে সীমিত আকারে তথ্য সংরক্ষণ করা হলেও তা নিবন্ধনের নির্ধারিত কর্মপ্রণালী অনুসরণ করে না। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে একাধিক ক্যান্সার নিবন্ধন চালু থাকলেও আমাদের দেশে ২০০৪ সালের আগে কোনো ধরনের রেজিস্ট্রি বা নিবন্ধন চালু করা সম্ভব হয়নি।

২০০৫ সালে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে প্রথম সরকারিভাবে ক্যান্সার নিবন্ধন শুরু হয়। এর কিছুদিন আগে বর্তমান নিবন্ধকারের উদ্যোগে ক্যান্সার এপিডেমিওলজি বা ক্যান্সার রোগতত্ত্ব বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়, যদিও এই বিভাগটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সময়ে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় নানা প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও ২০২০ সাল পর্যন্ত এই প্রতিবেদন কিছুটা অনিয়মিতভাবে হলেও প্রকাশিত হয়েছে। ক্যান্সার নিবন্ধনের জন্য বিভাগের কোনো বাজেট বরাদ্দ না থাকায়, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক ডেটা বেইস বা তথ্যভাণ্ডার প্রতিষ্ঠা করা না যাওয়ায় ক্যান্সার নিবন্ধনের গুণগত মান বৃদ্ধি বা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও পুরনো আটটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হাসপাতালভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ একাধিকবার নেওয়া হলেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। 

দেশে জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধনের প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ক্যান্সার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায়।  জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের ক্যান্সার এপিডেমিওলজি বিভাগ কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। প্যাসিভ বা পরোক্ষ তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিতে গাজীপুর জেলার সদর উপজেলায় নতুন ক্যান্সার রোগীদের তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। নানা কারণে ফলাফল সন্তোষজনক না হওয়ায় এবং অর্থায়নের অভাবে নিবন্ধন চালু রাখা সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রমের একটি গবেষণা প্রকল্পের আওতায় কিশোরগঞ্জ জেলার হোসেনপুর উপজেলায় বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ ও ইনফরমেটিকস বিভাগের উদ্যোগে ক্যান্সার রোগীদের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে একটি পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, উপরোক্ত দুটি উদ্যোগকে সার্ভে বা জরিপ বলা গেলেও ক্যান্সার নিবন্ধন হিসেবে গণ্য করা যায় না। রেজিস্ট্রি বা সার্ভেইল্যান্স একটি ধারাবাহিকভাবে চলমান প্রক্রিয়া। এর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারের উপযুক্ত কোনো সংস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও স্থায়ীভাবে চালু রাখার নিশ্চয়তাসহ। সরকারি ও বেসরকারি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে হাসপাতালভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধন চালু করা এবং কয়েকটি অঞ্চলে কয়েকটি জনগোষ্ঠীভিত্তিক নিবন্ধন চালুর পরিকল্পনাসহ একটি জাতীয় ক্যান্সার নিবন্ধন কর্মসূচি প্রণয়ন করে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর মেডিক্যাল রিসার্চ বা আইসিএমআর (আমাদের দেশের বিএমআরসির মতো) সারা দেশের ক্যান্সার নিবন্ধন কর্মসূচির দেখভাল করে। আমাদের দেশেও বিএমআরসিকে তদারকের দায়িত্ব দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি কিংবা জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে একটি জাতীয় ক্যান্সার নিবন্ধন কর্মসূচি প্রণয়ন করা খুবই জরুরি। 

লেখক : প্রকল্প সমন্বয়কারী, গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ক্যান্সার হাসপাতাল এবং সাবেক অধ্যাপক, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

এখন দরকার ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি

ফারুক মেহেদী

এখন দরকার ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি

কঠিন অর্থনৈতিক ও জননিরাপত্তা সংকটের সময়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি জোট ক্ষমতায়। বিগত আওয়ামী সরকারের জঞ্জাল এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে না পারার ধকল এখন তারেক রহমান সরকারের কাঁধে এসে পড়েছে। তাই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন সরকারের প্রথম ১৮০ দিন হবে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। এই লড়াইয়ে মূলভিত্তি হওয়া চাই শূন্য সহনশীলতা নীতি। অনিয়ম, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাস ইত্যাদি দমন করে সবার মধ্যে আস্থা ফেরানো ও নিরাপত্তা জোরদার করা। এ জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ।

অর্থনীতির চাকা সচল করতে প্রথমেই বিনিয়োগকারীদের মনে আস্থা ফেরানো জরুরি। উচ্চ সুদের হার বর্তমানে ব্যবসার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে সঙ্গে নিয়ে সরকারকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতের জন্য ঋণের প্রবাহ সচল রাখা যায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই খাত রক্ষায় বিশেষ প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা না করলে তৃণমূল পর্যায়ে বেকারত্ব কমানো সম্ভব নয়। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো চালুর জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা গেলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা টেকসই করা সহজ হবে।

এখন দরকার ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি রাজস্ব ঘাটতি মোকাবেলায় করব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। হয়রানিমুক্ত কর আদায় প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে করের আওতা বাড়ানো উচিত, যাতে সৎ ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত হন। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থাগুলোর সঙ্গে দ্রুত চুক্তি এবং শক্তিশালী লবিং শুরু করা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। এটি কেবল তহবিলের সংস্থান করবে না, বরং দুর্নীতিবাজদের প্রতি কঠোর বার্তা দেবে। আমদানির ক্ষেত্রে কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশকে শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্কের আওতায় এনে স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে, যা পরোক্ষভাবে ডলার সংকট কাটাতে সাহায্য করবে।

আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক সংস্কারই টেকসই হবে না। মব কালচার বা গণপিটুনি এবং বিনা বিচারে হয়রানির যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা কঠোর হাতে দমন করতে হবে। আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় পুলিশ বাহিনীকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে পেশাদারির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। জনমনে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনতে প্রতিটি শিল্পাঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাকেন্দ্রে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। মানুষ যখন দেখবে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর হয়েছে এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে, তখনই স্থবির হয়ে পড়া ঘরোয়া বিনিয়োগ চাঙ্গা হবে।

রপ্তানি ঝুড়িতে কেবল পোশাক খাতের ওপর নির্ভর না করে তথ্য-প্রযুক্তি ও চামড়াশিল্পের মতো খাতগুলোতে বিশেষ ছাড় দিয়ে বাজার বহুমুখী করতে হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট ভাঙার পাশাপাশি সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইন থেকে চাঁদাবাজি নির্মূল করা গেলে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠা মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে আসবে।

ব্যাংকিং খাতের মূল সমস্যা হলো আস্থার সংকট এবং খেলাপি ঋণের পাহাড়। এই সংকট নিরসনে প্রথম ১৮০ দিনের মধ্যে একটি স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করা জরুরি, যা কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই বড় বড় খেলাপিকে চিহ্নিত করবে এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে। ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কেবল টাকা ছাপিয়ে সহায়তা না করে বরং আন্ত ব্যাংক লেনদেন চাঙ্গা করা এবং আমানতকারীদের মনে এই বিশ্বাস ফেরানো দরকার যে তাঁদের টাকা নিরাপদ। উচ্চ সুদের হার ব্যবসার জন্য শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই উৎপাদনশীল খাতের জন্য বিশেষ ইন্টারেস্ট ক্যাপ বা সুদের হার নির্দিষ্ট করে দিয়ে ঋণের প্রবাহ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করতে হুন্ডি বন্ধে প্রবাসীদের জন্য রেমিট্যান্স প্রেরণে বিশেষ প্রিমিয়াম বা ক্যাশ ইনসেনটিভ ব্যবস্থা আরো জোরদার করতে হবে।

শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন একটি ক্রান্তিকাল পার করছে। কাঁচামাল আমদানির এলসি খুলতে না পারা এবং জ্বালানিসংকটের কারণে অনেক কারখানা বন্ধের মুখে। নতুন সরকারের উচিত হবে জ্বালানি আমদানিতে অগ্রাধিকার দিয়ে শিল্পাঞ্চলগুলোতে লোডশেডিং শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। বিশেষ করে সাভার, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকাগুলোতে মব সন্ত্রাস বা অস্থিরতা বন্ধে একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাস্কফোর্স গঠন করা উচিত, যেখানে শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সরাসরি সমন্বয় থাকবে।

দীর্ঘদিনের দলীয়করণের ফলে রাজনীতি-আমলাতন্ত্র এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মধ্যে যে মেরুকরণ তৈরি হয়েছে, তা রাতারাতি দূর করা বিএনপি সরকারের জন্য হবে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার করতে গেলে এমন অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম বেরিয়ে আসবে, যাঁদের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া প্রশাসন যদি দ্রুত নিরপেক্ষ ও কর্মক্ষম না হয়, তবে সরকারের ঘোষিত ভালো নীতিগুলোও মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।

গত দেড় দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে তৃণমূল পর্যায়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা যদি শক্ত হাতে দমন করা না যায়, তবে কোনো বিনিয়োগকারীই নিরাপদ বোধ করবেন না। শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষকে পুঁজি করে তৃতীয় কোনো পক্ষ যদি অস্থিতিশীলতা তৈরি করে, তবে রপ্তানি খাতে ধস নামার আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া বিগত সরকারের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, যারা এখনো প্রশাসনের ভেতরে বা বাইরে সক্রিয়, তারা অর্থনৈতিক সংস্কারে স্যাবোটাজ তৈরির চেষ্টা করতে পারে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেটগুলো যদি তাদের সরবরাহ চেইন ধরে রাখে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, তবে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ নতুন সরকারের জনপ্রিয়তাকে দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিএনপি সরকারকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রথম ১৮০ দিনে দল-মত-নির্বিশেষে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনকে পূর্ণ পেশাদারির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেওয়া না হলে সংস্কারগুলো কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো এবং সংস্কারপ্রক্রিয়ায় বিরোধী মত বা সুধীসমাজকে আস্থায় নেওয়া হবে একটি বড় রাজনৈতিক কৌশল।

বিএনপি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো জন-আকাঙ্ক্ষাকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোতে রূপ দেওয়া। এর জন্য প্রথম ১৮০ দিনে প্রতিটি উপজেলায় নাগরিক তদারকি কমিটি চালু করা যেতে পারে, যেখানে স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা এবং সাধারণ মানুষ সরাসরি স্থানীয় প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও বাজার মনিটরিংয়ে ভূমিকা রাখবে। এতে প্রশাসনের ওপর জনগণের আস্থা ফিরবে এবং অসাধু কর্মকর্তাদের দুর্নীতি করার সুযোগ কমে যাবে। একটি বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও অস্থির সমাজব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করতে বিএনপির জন্য প্রথম ১৮০ দিনের রোডম্যাপটি তিন ধাপে বাস্তবায়িত হতে পারে।

প্রথম ৬০ দিন : জরুরি স্থিতিশীলতা ও আস্থা পুনরুদ্ধার

এই পর্যায়ের মূল লক্ষ্য হবে মব সন্ত্রাস নির্মূল করা এবং বাজারে স্বস্তি ফেরানো। প্রথমেই পুলিশ বাহিনীকে সক্রিয় করতে দলীয় প্রভাবমুক্ত পেশাদার কর্মকর্তাদের পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আমদানিকারক ও পাইকারি বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে এবং চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা কমাতে একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং কমিশন গঠন করে বড় বড় খেলাপির কাছ থেকে টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর তালিকা করে সেগুলোতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা আসতে হবে।

পরবর্তী ৬০ দিন : অর্থনৈতিক চাকা সচল ও নীতি সংস্কার

মাঝামাঝি সময়ে এসে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে উচ্চ সুদের হার পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। উৎপাদনশীল খাত ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ছাড়ে ঋণের ব্যবস্থা করা এবং এলসি খোলার জটিলতা দূর করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। রাজস্ব বাড়াতে করব্যবস্থাকে অটোমেশন করা এবং করদাতাদের হয়রানি বন্ধে ওয়ানস্টপ সার্ভিস কার্যকর করতে হবে। বেকারত্ব দূরীকরণে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আইটি খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা প্রয়োজন। এই সময়েই উপজেলা পর্যায়ে নাগরিক তদারকি কমিটি গঠন করে স্থানীয় প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সরকারি সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে।

শেষ ৬০ দিন : টেকসই উন্নয়ন ও ফলাফল মূল্যায়ন

শেষ ধাপে এসে সংস্কারগুলোর সুফল জনগণের কাছে দৃশ্যমান করতে হবে। রপ্তানি বহুমুখীকরণে কেবল গার্মেন্টসনির্ভর না থেকে চামড়া, ওষুধ ও কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বিশেষ কার্গো সুবিধা ও ভর্তুকি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ছাত্রসংসদ নির্বাচন বা নিয়মিত একাডেমিক ক্যালেন্ডার কার্যকর করার উদ্যোগ নিতে হবে। মব কালচার চিরতরে বন্ধ করতে প্রতিটি অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই ১৮০ দিন শেষে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে, যা সরকারের প্রতি জনসমর্থনকে আরো সুসংহত করবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার যদি উল্লিখিত ১৮০ দিনের কর্মসূচির একটি পরিকল্পিত বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে পারে, তাহলে জনগণ ও ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা ফিরবে। পরে শুধু এই পরিস্থিতিকে টেকসই রূপ দিতে হবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও

বার্তাপ্রধান, কালের কণ্ঠ

মশা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ : নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা

ড. কবিরুল বাশার

মশা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ : নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা

মশা মানেই শুধু বিরক্তি নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষাও বটে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকার ও নতুন মন্ত্রিসভা এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন দেশে মশার ঘনত্ব এরই মধ্যে অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় রয়েছে এবং আগামী মাসে তা আরো বেড়ে চরম অস্বস্তিকর ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মশা সার্ভেইল্যান্স তথ্য আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কিউলেক্স মশা এখন কার্যত নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে, আর এডিস মশা আপাতত কমে থাকলেও তা কোনোভাবেই স্থায়ী নিরাপত্তার বার্তা নয়। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, এডিস কখনো ঘোষণা দিয়ে ফিরে আসে না, সে আসে আমাদের অসতর্কতার সুযোগে।

ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর তথ্য বলছে, ঢাকায় সংগৃহীত মোট প্রাপ্তবয়স্ক মশার প্রায় ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির। এটি কোনো পরিসংখ্যানগত কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং এটি নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রতিফলন। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, বছরের পর বছর পরিষ্কার না হওয়া নালা, জলাবদ্ধ বেইসমেন্ট ও পার্কিং এলাকাসব মিলিয়ে ঢাকা শহর নিজেই যেন কিউলেক্স মশার জন্য এক আদর্শ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

মশা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ : নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশাঅন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে এডিস মশার ঘনত্ব কমে আসার তথ্য অনেকের মধ্যেই স্বস্তি তৈরি করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মশা সার্ভেইল্যান্স তথ্য অনুযায়ী এডিস মশার ঘনত্ব এবং ব্রেটো ইনডেক্স কমেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। এটি প্রমাণ করে যে কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগ, জনসচেতনতা, দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টিপাত না থাকা এবং তাপমাত্রা কমে যাওয়া ফ্যাক্টরগুলো একসঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু এডিস মশার ঘনত্ব কমার এই স্বস্তিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা। আমাদের মনে রাখতে হবে, এডিস মশার এই কমে যাওয়া কোনো স্থায়ী অর্জন নয়, বরং এটি এক ধরনের সাময়িক বিরতি। নগরের অলিগলি, বেইসমেন্টে গাড়ি পার্কিং করার স্থান, পুরনো বাড়ির নিচতলা, বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পানির ট্যাংক, প্লাস্টিক ড্রাম ও বালতির ভেতরে এখনো এডিস মশার প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান রয়ে গেছে। বর্ষা শুরু হলেই সামান্য অবহেলা এই মশাকে আবার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেবে। তখন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লে দায় কার হবেএই প্রশ্নের উত্তর আজও স্পষ্ট নয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৫ সালেও দেশে লক্ষাধিক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। এর আগে ২০২৩ সালে ডেঙ্গু ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি রোগের বিস্তার নয়, এটি নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পরিকল্পনা ও শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।

ঢাকা মহানগর ডেঙ্গুর প্রধান কেন্দ্র হলেও এখন সংক্রমণ বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরগুলোতেও বিস্তৃত। এডিস মশার প্রজননচক্র বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে দ্রুততর হয়। ফলে জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এটি মারাত্মক আকার ধারণ করে। তবে ডেঙ্গু এখন সারা বছরই বিদ্যমান। অতএব, মৌসুমি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ অভিযানের পরিবর্তে বার্ষিক, পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক কর্মসূচি অপরিহার্য।

এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের প্রধান কৌশল ছিল কীটনাশক ছিটানো, জরুরি সভা আহবান ও হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো। এগুলো প্রয়োজনীয় হলেও মূলত প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা। কার্যকর নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রয়োগ, যেখানে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ, লার্ভা উৎস ধ্বংস, সম্প্রদায়ভিত্তিক অংশগ্রহণ এবং বৈজ্ঞানিক নজরদারি একসঙ্গে পরিচালিত হবে।

নতুন সরকারের উচিত একটি জাতীয় ডেঙ্গু ও আর্বোভাইরাস কৌশলপত্র প্রণয়ন করা, যেখানে পাঁচ থেকে ১০ বছরের সুস্পষ্ট লক্ষ্য, বাজেট বরাদ্দ এবং কর্মপরিকল্পনা নির্ধারিত থাকবে। ডেঙ্গুকে জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংযুক্ত একটি আন্ত মন্ত্রণালয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

ডেঙ্গু ও অন্যান্য আর্বোভাইরাল রোগের জন্য একটি একীভূত, রিয়াল টাইম ডিজিটাল এন্টোমোলজিক্যাল এবং ডিজিজ সার্ভেইল্যান্স প্ল্যাটফর্ম চালু করা জরুরি। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে বাধ্যতামূলক রিপোর্টিং কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। কেস ডেফিনিশন, রিপোর্টিং টাইমলাইন ও ডেটা ভ্যালিডেশন প্রটোকল মানসম্মত না হলে নীতিনির্ধারণ সঠিক হবে না। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ডেটা অ্যানালিটিকস সেল গঠন করে সাপ্তাহিক ট্রেন্ড বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি পূর্বাভাস প্রকাশ করা উচিত।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রোগীর সংখ্যা জানা যথেষ্ট নয়, এডিস মশার ঘনত্ব, ব্রিডিং ইনডেক্স (HI, CI, BI) এবং কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়মিত পরিমাপ করা অপরিহার্য। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি শক্তিশালী মেডিক্যাল এন্টোমোলজি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে জেলা পর্যায়ে ল্যাব সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে। প্রমাণভিত্তিক তথ্য ছাড়া কীটনাশক নির্বাচন ও ব্যবহার করলে অপচয় ও প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিদুই ঝুঁকিই বাড়ে।

বৃষ্টি, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মতো জলবায়ু উপাদানের সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি ক্লাইমেট লিংকড পূর্বাভাস মডেল তৈরি করা উচিত, যাতে সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাবের চার থেকে ছয় সপ্তাহ আগে সতর্কতা জারি করা যায়। এতে হাসপাতাল প্রস্তুতি, মাঠ পর্যায়ে লার্ভা নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা কার্যক্রম সময়মতো শুরু করা সম্ভব হবে।

ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুহার কমাতে প্রাথমিক পর্যায়েই রোগী  শনাক্তকরণ ও ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় গাইডলাইন নিয়মিত হালনাগাদ করে সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত দ্রুত ডায়াগনস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করলে রোগী রেফারেল চাপ কমবে এবং জটিলতা হ্রাস পাবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রেক্ষাপটভিত্তিক গবেষণা অপরিহার্য। বিশ্ববিদ্যালয়, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ গবেষণা তহবিল গঠন করে ওভিট্র্যাপভিত্তিক নজরদারি, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, কমিউনিটি-ড্রিভেন সোর্স রিডাকশন ও নতুন প্রযুক্তির পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। গবেষণার ফলাফল নীতিনির্ধারণে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করার একটি কাঠামো তৈরি করা জরুরি।

প্রতিটি জেলা ও বিভাগের জন্য নির্দিষ্ট এন্টোমোলজিক্যাল ইনডেক্স নির্ধারণ করে কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা উচিত। মাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন ও উন্মুক্ত ডেটা প্রকাশের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলে নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করাই হবে টেকসই সাফল্যের মূলভিত্তি।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ডেঙ্গু বিস্তারের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ভবন নির্মাণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, ছাদ ও বেইসমেন্টে পানি জমা রোধের নকশা এবং সাইট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান বাধ্যতামূলক করতে হবে। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত প্লট ও জলাবদ্ধ এলাকায় নিয়মিত পরিদর্শন ও জরিমানাকাঠামো কার্যকর করতে হবে। আইন থাকলেও প্রয়োগে শৈথিল্য এডিস মশার প্রজননকে অব্যাহত রাখে। এই সংস্কারটি হতে হবে বাস্তবভিত্তিক ও কঠোর।

খোলা ড্রেন, প্লাস্টিক বর্জ্য ও অব্যবস্থাপিত কঠিন বর্জ্য এডিস মশার কৃত্রিম প্রজননক্ষেত্র তৈরি করে। ওয়ার্ডভিত্তিক বর্জ্য সংগ্রহ, রিসাইক্লিং চেইন উন্নয়ন এবং নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার কর্মসূচিকে রুটিন প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বর্ষার আগে বিশেষ প্রি-মনসুন ড্রাইভ পরিচালনা করে সম্ভাব্য জলাবদ্ধ স্থান চিহ্নিত ও সংস্কার করা জরুরি।

সব এলাকায় সমানভাবে কীটনাশক ছিটানো কার্যকর নয়। ওয়ার্ডভিত্তিক হাউস ইনডেক্স, ব্রেটো ইনডেক্স ও কেস ডেনসিটি অনুযায়ী অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।

ওয়ার্ডভিত্তিক কার্যক্রম, কীটনাশক ব্যবহার, লার্ভা ধ্বংস অভিযান ও নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তির তথ্য অনলাইন ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ করা উচিত। জিও-ট্যাগড রিপোর্টিং চালু করলে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা বাড়বে। নাগরিকদের জন্য হটলাইন বা অ্যাপভিত্তিক রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু করে অংশগ্রহণমূলক তদারকি নিশ্চিত করা যেতে পারে।

ওয়াসা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ সংস্থা, সব সংস্থার কাজের সঙ্গে নগর স্বাস্থ্য সরাসরি সম্পর্কিত। সমন্বয়হীন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রায়ই জলাবদ্ধতা ও অস্থায়ী পানি জমার ঝুঁকি তৈরি করে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে মাসিক সমন্বয় সভা ও যৌথ কর্মপরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে এক সংস্থার কাজ অন্য সংস্থার উদ্যোগকে ব্যাহত না করে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযানকে সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তর করতে পারলে প্রশাসনিক চাপও কমবে।

মশা নিয়ন্ত্রণকে মৌসুমি প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির স্থায়ী অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাঁচ বছরের রোলিং অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করে নির্দিষ্ট সূচক ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত। ধারাবাহিক বাজেট বরাদ্দ ছাড়া অবকাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, পরিবেশ ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। একটি উচ্চ পর্যায়ের জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করে মাসিক পর্যালোচনা সভা ও অগ্রগতি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ প্রায়ই মৌসুমি সংকটের সময় বাড়ানো হয়। কিন্তু স্থায়ী সাফল্যের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় (ADP) নির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। নতুন সরকারের উচিত ডেঙ্গুকে জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস ষাটের দশক থেকে শুরু হয়ে আজ এক জটিল নগর বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। অভিজ্ঞতা, তথ্য ও জ্ঞানসবই আমাদের হাতে রয়েছে। এখন প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতি, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সমন্বিত কর্মপ্রয়াস।

নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, ডেঙ্গুকে আর মৌসুমি আতঙ্ক হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রতিক্রিয়াশীল ধারা থেকে বেরিয়ে প্রতিরোধমূলক, বৈজ্ঞানিক ও টেকসই কৌশল গ্রহণ করা হবে।

লেখক : কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

জলবায়ু সুরক্ষা : রাজনৈতিক অঙ্গীকার কি অস্তিত্ব সংকট ঘোচাতে পারবে

সজল মেহদী

জলবায়ু সুরক্ষা : রাজনৈতিক অঙ্গীকার কি অস্তিত্ব সংকট ঘোচাতে পারবে

বাংলাদেশ আজ ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন কেবল বৈশ্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের ওপর এক চরম আঘাত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে পরিবেশ সুরক্ষায় দীর্ঘ রূপরেখা দিয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি আপাতদৃষ্টিতে আশাব্যঞ্জক মনে হলেও তা বাস্তবায়ন নিবিড় পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ইশতেহারগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর বনায়ন, সবুজ কর্মসংস্থান এবং কার্বন বাণিজ্যের মতো আধুনিক ধারণাগুলো প্রাধান্য পেয়েছে। এতে আঁচ করা যায়, আমাদের নীতিনির্ধারকরা জলবায়ু সংকটের ভয়াবহতা বুঝতে শুরু করেছেন। তবে এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য যে প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন, তার ঘাটতি মেটানোই হবে আগামী দিনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের সবার আগে বাংলাদেশ নীতির ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষাকে একটি অর্থনৈতিক বিপ্লবে রূপান্তরের পরিকল্পনা করেছে। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন ও পুনঃখনন এবং সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে ৫.৫ লাখ সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রাটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তারা গতানুগতিক বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম এবং থ্রি মনিটরিং অ্যাপ-এর মাধ্যমে বিজ্ঞানভিত্তিক তদারকির কথা বলেছে। এ ছাড়া ভবনে সবুজ পরিমাপক মানদণ্ড ও ছাদ বাগানের জন্য কর প্রণোদনার বিষয়টি ক্রমবর্ধমান নগরায়নের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী। বিশেষ করে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট জ্বালানির ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা এবং রূপপুর প্রকল্পের কার্যকারিতা পুনঃপরীক্ষার অঙ্গীকার স্বচ্ছতা ও টেকসই উন্নয়নের প্রতি তাদের আগ্রহ প্রকাশ করে। তবে ২৫ কোটি গাছের বিশাল কর্মযজ্ঞ কি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সঠিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর দলটির ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতির ওপর নির্ভর করবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে তিন শূন্য ভিশন অর্থাৎ শূন্য পরিবেশগত অবক্ষয়, শূন্য বর্জ্য এবং শূন্য বন্যাঝুঁকির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তাদের ইশতেহারে ডাচ ডেল্টা মডেলের আদলে বন্যা সুরক্ষা এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে পানি-সার্বভৌমত্ব অর্জনের যে কথা বলা হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রশংসনীয়। প্লাস্টিক বোতলের বিনিময়ে গাছ আন্দোলন বা ডিপোজিট-রিটার্ন সিস্টেমের মতো নাগরিকবান্ধব ধারণাগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে ইশতেহারে কয়লার ব্যবহার সীমিত করার কথা বলা হলেও বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নির্গমন নিয়ন্ত্রণের যে কৌশল দেওয়া হয়েছে, তা কতটা পরিবেশবান্ধব হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। জ্বালানি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে কারিগরি সক্ষমতা এবং বিশাল বাজেটের সংস্থান একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের ২০২৬ সালের ইশতেহারে জলবায়ু পরিবর্তনের সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাবের ওপর বেশি জোর দিয়েছে। জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই আবাসন এবং মাইক্রো-ইনস্যুরেন্স বা ইনডেক্সভিত্তিক বীমার ধারণাটি প্রান্তিক কৃষকদের অকাল বন্যা বা খরা থেকে সুরক্ষায় অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া শহর এলাকায় কুলিং-সেন্টার এবং হিট-অ্যালার্ট প্রটোকল চালুর বিষয়টি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অসহনীয় দাবদাহের শিকার সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তারা তরুণ জলবায়ু অ্যাক্টিভিস্টদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করার যে স্বপ্ন দেখিয়েছে, তা দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হবে।

তবে বড় লক্ষ্য অর্জনে কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জও ইশতেহারে প্রতিফলিত হয়েছে। পানিবণ্টন ও অভিন্ন নদী নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিএনপির জাতিসংঘের ওয়াটার কনভেনশন ১৯৯৭ স্বাক্ষর এবং বড় দলগুলোর  তিস্তা  সম্পর্কিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এক বড় পদক্ষেপ হতে পারে। আবার জামায়াতের জলবায়ু কূটনীতির মাধ্যমে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

রাজনৈতিক দলগুলোর পরিবেশবিষয়ক উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার কথা আলোচিত হলেও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে নদী দখল, পাহাড় কাটা ও বন উজাড়ের মতো পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের পেছনে বহু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের ভূমিকা রয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারে পাহাড় নিধনকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অঙ্গীকার থাকলেও সেই শাস্তি বাস্তবে কতটা নিরপেক্ষ, প্রভাবমুক্ত ও কার্যকরভাবে প্রয়োগ হবে, তা নিয়ে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই সংশয় থাকবে। একই সঙ্গে নদী ও খালের পারে গ্রিন ক্যানেল ব্যাংক মডেল বা ইকোট্যুরিজম উন্নয়নের মতো উদ্যোগগুলো আদৌ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও স্বার্থ নিশ্চিত করতে পারবে কি না, সে বিষয়েও আরো স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। এদিকে কার্বন ক্রেডিট থেকে বছরে এক বিলিয়ন ডলার আয় করার যে লক্ষ্যমাত্রা বিএনপি নির্ধারণ করেছে, তা অর্জন করতে হলে MRV (Measurement, Reporting and Verification) ব্যবস্থা অবশ্যই শতভাগ স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হতে হবে। তবে কার্বন ক্রেডিট ও REDD+ নীতির বাস্তবায়নে আমাদের বাড়তি সতর্কতা জরুরি। কারণ যথাযথ তদারকি ও সামাজিক সুরক্ষা না থাকলে এসব উদ্যোগ প্রকৃতিকে পণ্যে রূপান্তর করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়নের বদলে তাদের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে। নৈতিক, দায়বদ্ধ ও জনগণকেন্দ্রিক কার্বন ত্রেদিং উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই মুহূর্তে জলবায়ু অভিযোজন জোরদার করা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক ও অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি (Loss and Damage) প্রতিরোধ করাই জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষার এই অঙ্গীকারগুলো যেন কেবল নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার সবুজ অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। দলগুলোর উচিত তাদের পরিকল্পনার সঙ্গে বাজেটের সমন্বয় এবং একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জনগণের সামনে তুলে ধরা। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তাদের মনে রাখতে হবে যে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ মেনে চলে না। আজকের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা মানেই আগামী প্রজন্মের জন্য একটি ধ্বংসস্তূপ রেখে যাওয়া। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা কোনো একক দলের বিষয় নয়। এটি একটি জাতীয় ঐকমত্যের ক্ষেত্র। ভোটারদের উচিত ইশতেহারের ভাষার বাইরে গিয়ে প্রতিশ্রুতির গভীরতা, বাস্তবতা ও ধারাবাহিকতা বিচার করা। কারণ এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি নির্ধারণ করবে জলবায়ুঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথচলা।

 

লেখক : পানিসম্পদ প্রকৌশলী ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ