যাদের দেহের ওজন বেশি, ক্লিনিক্যালি তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় ৪০ শতাংশ ডায়াবেটিক রোগী স্থূলকায় নন, হালকা বা শুকনা দেহের অধিকারী। এদের বলা হয় ‘লিন’, সেই সূত্রে এমন রোগীদের ডায়াবেটিসের নাম ‘লিন ডায়াবেটিস’। বিশ্বের প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ এ রোগে ভুগছে। দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকায় এর প্রাদুর্ভাব অপেক্ষাকৃত বেশি। চিকিৎসকের ধারণা, আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে এমন রোগীর সংখ্যা। এ রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ার নেপথ্য কারণ নিয়ে গবেষণা চলমান।
লিন ডায়াবেটিস কী
দেহের উচ্চতা ও ওজনের অনুপাতকে বলা হয় বডি ম্যাস ইনডেক্স (বিএমআই)। চিকিৎসাবিজ্ঞানের চোখে কেউ মোটা বা চিকন কি না শনাক্ত করার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। যেসব ডায়াবেটিক রোগীর বিএমআই ১৮.৫ কেজি/মি২-এর কম এবং ডায়াবেটিসের কারণ দেহে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স নয়, বরং ইনসুলিন উৎপাদনে ঘাটতি, সেসব ক্ষেত্রে লিন ডায়াবেটিস বলা হয়ে থাকে। এ ধরনের ডায়াবেটিস হলে রোগীর অগ্ন্যাশয় সঠিক মাত্রায় ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। এসব রোগীর দেহে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকে এবং শরীরে পেশি থাকে তুলনামূলক কম।
কেন হয় লিন ডায়াবেটিস
বিশেষজ্ঞদের মতে, লিন ডায়াবেটিসের মূল কারণ অপুষ্টি। সঠিক মাত্রায় পুষ্টি না পেলে বাড়ন্ত শিশুদের দেহের গঠন বাধাপ্রাপ্ত হয়, যার প্রভাব বয়ে বেড়াতে হয় আজীবন। পুষ্টির অভাবে অগ্ন্যাশয়ের মধ্যে থাকা ইনসুলিন উৎপাদনকারী ‘বিটা’ কোষ ঠিকমতো গঠন হয় না। ফলে এর কার্যকারিতা হ্রাস পায়, সৃষ্টি হয় ইনসুলিন ঘাটতিজনিত ডায়াবেটিস। এ রোগের প্রাদুর্ভাব উন্নয়নশীল দেশে অপেক্ষাকৃত বেশি দেখা যায়।
উপসর্গ
► এ ধরনের রোগীরা সাধারণত শীর্ণকায় হয়ে থাকে। ১৮.৫ কেজি/মি২-এর কম হয় বিএমআই।
► টাইপ-২ ডায়াবেটিক রোগীদের মতো মেদবহুল না হলেও এসব রোগীর পেটে অস্বাভাবিক চর্বি থাকতে পারে।
► রক্তে ইনসুলিনের ঘাটতি দেখা যায়।
► দারিদ্র্যে বেড়ে ওঠার ইতিহাস।
► ডায়াবেটিসের পাশাপাশি হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি থাকতে পারে।
► রোগীর দেহে সি-পেপটাইড (c-peptide) থাকে স্বাভাবিক অথবা কিছুটা কম মাত্রার।
► লিন ডায়াবেটিস সাধারণত ৪০ বছরের কম বয়সে দেখা দেয়। পুষ্টিহীনতা থাকলে ৩০ বছরেরও কম বয়সে দেখা দিতে পারে।
► অল্পবয়সী রোগীদেরও ইনসুলিন গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।
টাইপ-১ ডায়াবেটিসে নয়
ইনসুলিন গ্রহণ ছাড়া লিন ডায়াবেটিসের চিকিৎসা করা যায় না। এ কারণে টাইপ-১ ডায়াবেটিসের সঙ্গে এর মিল রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসক এটিকে টাইপ-১ ডায়াবেটিস হিসেবে শনাক্ত করতে পারেন। তবে দুটি রোগের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। লিন ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে রোগীর কিটো এসিডোসিস হবে না, পারিবারিক ইতিহাসে ডায়াবেটিক রোগী থাকার আশঙ্কা কম এবং দেহে সি-পেপটাইডের মাত্রা স্বাভাবিক থাকবে। এ ছাড়া পরীক্ষার মাধ্যমে অটো ইমিউন ডিজিজের সঙ্গে এটি তফাত করা যায়।
চিকিৎসা
সঠিক মাত্রায় পুষ্টি গ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। রোগীর খাবারের তালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণ আমিষ থাকতে হবে। শস্যদানা ও চর্বিও থাকতে হবে পরিমাণমতো। মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস; যেমন—ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি এবং আয়রনের ঘাটতি আছে কি না, সেটি নজরে রাখতে হবে। অন্যান্য ডায়াবেটিসের মতো ক্যালরি গ্রহণ খুব বেশি কমানো যাবে না। দেহের ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়াতে রেজিস্ট্যান্স ব্যায়াম (Resistance exercise) করা যেতে পারে। অ্যারোবিক ব্যায়াম করলে দেহের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) এবং হৃদযন্ত্রেরও উপকার হবে। নিয়মিত ইনসুলিন গ্রহণ এ রোগের সর্বোত্তম চিকিৎসা। তবে রোগের প্রকোপ অনুযায়ী অনেক সময় ইনসুলিন নিঃসরণ বাড়ায় এমন ওষুধেও উপশম হতে পারে।
লেখক : ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ
ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতাল





