• ই-পেপার

স্বদেশের মাটিতে স্বজন

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এবং রাজনীতির গতিপথ

ড. মাহবুব হাসান

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এবং রাজনীতির গতিপথ

একদল লোক আছেন, যাঁরা বলতেই থাকেন, হেতে ক্যান দ্যাশে আহে না? বিদেশ বইয়া রাজনীতি করবো আর কতকাল?

বললাম, তাঁর কেন দোষ? ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনি তো ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন যাপন করেছিলেন বহু বছর। তিনি ইরানি বিপ্লবের পর দেশে ফিরেছিলেন। অসুবিধা কি?

তিব্বতের দালাই লামা, তিনি ধর্মীয় নেতা ও রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে ভারতে বহু বছর ধরে বাস করছেন। বহু বছরের আশ্রিত লামা ভারতের কাঁধে ভর করে তাঁর দেশ চীনের হাত থেকে উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাঁকে নিয়েও নিশ্চয়ই এমন বাক্য চালু আছে—‘হেতে বাড়িত যান না ক্যান?

এ রকমটা হবেই। ভিন্ন মতের ওপর যখন রাজনৈতিক ও সামরিক বা আধাসামরিক সরকারের অন্যায্য চাপ চড়ে বসে ঘোড়ার জিনের ওপর সওয়ারি বসার মতোতখন ওই রকম বাক্যই শোনা যায়। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ওই বাক্যবাণ হাসিনার আমলে বহুবার বহু তৃণমূলের আওয়ামীর মুখে শুনেছি আমরা। আবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ এই রকম মন্তব্য করছেন। তাঁদের ভাব হচ্ছেদেশে আসো। দেখতে পাবে কত ধানে কত চাল হয় রাজনীতির।

২.

বলাই বাহুল্য, তারেক রহমান দেশেও রাজনীতি করেছেন। তখনই প্রমাণ করেছিলেন, তৃণমূলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে না মিশলে তাদের সমস্যা-সংকট চেনা-বোঝা যাবে না। তরুণদের মনের আশা কী? শুধুই কি চাকরির সুযোগ আর ব্যবসা করে দিনাতিপাত? নাকি আরো বৃহৎ কিছু? দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যে গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা করার অন্য কোনো বিকল্প নেইএটা তিনি যেমন ভালো বুঝেছিলেন, তাঁর দলও বুঝেছিল। কারণ আমাদের চারপাশেই বিরাজমান আধিপত্যবাদীদের থাবা যে দিন দিন হিংস্র ও করাল হয়ে উঠছে, তা তো দিনের আলোর মতোই ফরসা। ফুটবল খেলায় এক পক্ষে ১১ জন থাকে, কিন্তু মেসির পজিশনে তো আর সবাই খেলতে পারে না। তবে যে যেখানেই খেলুক না কেন, দলের রাজনৈতিক স্রোত ও প্রবাহে ভিন্ন ভিন্ন পজিশন থেকে বল পাস করতে হয়। সেই শক্তিই তো মেসিকে গোল দিতে সাহায্য করে। রাজনীতির ময়দানে নিজ দলের পজিশনের মানুষদের অনেকটাই বোঝা কঠিন। এটা তো আর ৮০-৯০ মিনিটের গোল নির্ধারণী খেলা নয়, চিন্তাভাবনার সংশ্লেষের এক রসায়নে
রূপায়িত জীবনসংগ্রামের ভেতর দিয়ে শীর্ষে উঠে আসতে হয়। এই শীর্ষ দখলে প্রয়োজন মেধা আর প্রজ্ঞার আলোকবর্তিকা। তারেক রহমান তা পেয়েছেন পরিবার আর দেশের মানুষের অকুতোভয় সাহসের সমর্থন থেকে।

তিনি চিনেছিলেন প্রকৃত তরুণের স্বপ্ন-সাধ। তখনই তিনি অর্জন করেছিলেন গণমানুষের মনের কথা বুঝে নেওয়ার টেকনিকও। তবে সেই সঙ্গে তিনি ইনহ্যারিট করেছিলেন বাবা জিয়াউর রহমানের সামরিকজীবন-উত্তর রাজনীতির উত্তরাধিকার, সেই বালক বয়সেই। শহীদ জিয়া যেমন প্রতিদিনই গ্রাম-গ্রামান্তর ঘুরে বেড়িয়েছেন, কৃষি আর কৃষকের সমস্যা বুঝেছিলেন, তারেক রহমানও সেই দৃষ্টিচৈতন্য পেয়েছেন। এই পাওয়া শুধু দেশের মানুষের বৃহত্তর কল্যাণ ও নির্মাণের ক্ষেত্রেই নয়, জনশক্তিকে রূপান্তর করার অভিজ্ঞতাও তিনি পেয়েছিলেন। কর্মযজ্ঞের ওই শিখা জ্বালিয়েছিলেন বলেই রোষানলে পড়েছিলেন দুই উদ্দিনের সামরিক-বেসামরিক সরকারের হিংস্র আচরণে। দেশে তাঁর চিকিৎসা দেয়নি উদ্দিনদের নিয়ন্ত্রণাধীন চিকিৎসক ও হাসপাতালগুলো। জনরোষ ঠেকাতেই তাঁকে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার অনুমতি দিয়ে নিজেরা হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলেন। আবার মাইনাস টু ফর্মুলা সাজিয়ে যে নাটক সৃষ্টি করেছিল উদ্দিনদ্বয়ের আওয়ামী লেজুড়রা, সেই তরিকা বেগম জিয়ার অনমনীয় দৃঢ়তায় ভেস্তে যায়। এর পরের ইতিহাস আমরা জানি। এরশাদের শাসনামলে যেসব নির্য়াতনের শিকার হয়েও দেশ ও দেশের প্রতি তাঁর মনোবল দেখিয়েছিলেন, তাঁর সেই অনন্য রাজনৈতিক আপসহীনতার জন্যই আজকে অন্তর্বর্তী সরকার তাঁকে দল-মত-নির্বিশেষে জাতীয় নেতার মর্যাদায় বসিয়েছে। এই মর্যাদার দাবিদার আর মাত্র একজন ছিলেন, তিনি মওলানা ভাসানী।

৩.

জল্পনাকল্পনা আর রাজনৈতিক সমালোচনার মুখে চুনকালি দিয়ে ১৭ বছরের প্রবাসের নির্বাসিত জীবন পেছনে ফেলে নতুন এক তারেক রহমান ফিরে আসছেন। এই সত্যের রসায়নে উদ্বেলিত আজ তরুণ রাজনৈতিক সমাজ। এদের অনেকেই চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের জনসুনামির বরপুত্র-পুত্রী। বিশেষ করে ছাত্রদল ও যুবদলের মানুষরা তৈরি হয়েছে তারেক রহমানের ৩১ দফার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভিযোজনায়। আবার ওই ৩১ দফার মধ্যে আছে খালেদা জিয়ার ২৭ ও শহীদ জিয়ার ১৯ দফার রোপিত স্বপ্ন ও কল্পনার বাস্তবায়নও। এই তিনজনের চেতনার আলোকেই তারেক রহমান তাঁর প্রবাসের রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তিস্তম্ভ নির্মাণ করেছেন। আর এভাবেই নতুন তারেক রহমানের রাজনৈতিক নবজন্ম হয়েছে, যাঁকে আমরা দেখেছি প্রজ্ঞাবান এক দৃঢ়চিত্ত নেতা হিসেবে। দলের নেতৃত্ব দেওয়ার সব গুণই তাঁর ভেতরে বিকাশমান হতে দেখেছি।

একজন গৃহবধূ থেকে রাজনৈতিক ময়দানে এসে যেমন খালেদা জিয়া নিজেকে প্রজ্ঞাবতী ও দূরদৃষ্টির শিখর নির্মাণ করেছিলেন, তাঁর সেই আপসহীন নেতৃত্বের সিংহাসনে দাঁড়িয়েছেন, অনমনীয় ও
মাতৃস্বরূপা মানবী হয়েছেন, দেশের প্রতি তীব্র ভালোবাসা ও প্রেমকে আত্মস্থ করে নিতে পেরেছেন; তাঁকেই অনুসরণ করে গড়ে উঠেছেন তারেক রহমান। প্রাথমিকভাবে মনে হতে পারে, তিনি ইনহ্যারিট করেছেন বাবা ও মায়ের চিন্তার দ্যুতি ও ঐতিহ্য, কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে গণমানুষের প্রতি তাঁর ওয়াদা। সেই ওয়াদা জনসেবা, সেই ওয়াদা আত্মমর্যাদা রক্ষার; সেই ওয়দার পেছনে আছে স্বাধীনতা রক্ষার অকুতোভয় অবস্থান। স্বাগত তারেক রহমান, আপনাকে। আপনার দল অপেক্ষা করছে, অপেক্ষা করছে দেশবাসী।

বিএনপির ৩১ দফা

রাষ্ট্র সংস্কারের নকশা

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাষ্ট্র সংস্কারের নকশা

ক্ষমতার পালাবদলের ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ। গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে আশা-জাগানিয়া এক সম্ভাবনার আলো সামনে। তাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে রাজনীতি। ঠিক এই সময়ই কথা হচ্ছে গণতন্ত্র, নির্বাচন, ভোটাধিকার নিয়ে। কিন্তু তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতন্ত্র, নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বিতর্ক আরো গভীর আকার ধারণ করেছে। ভোটাধিকার সংকট, প্রশাসনের দলীয়করণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যসব মিলিয়ে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক আজ এক জটিল মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাব একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও নীতিগত দলিল হিসেবে আলোচনায় এসেছে।

বিএনপির ৩১ দফা শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মসূচি নয়; বরং এটি একটি বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তার রূপরেখা, যেখানে গণতন্ত্র পুনর্গঠন, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই দফাগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, বিএনপি বর্তমান সংকটকে কাঠামোগত সংকট হিসেবে দেখছে এবং তার সমাধানও কাঠামোগত সংস্কারের মধ্যেই খুঁজছে।

 

গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা

৩১ দফার মূল ভিত্তি হলো জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। বিএনপির ভাষায়, ভোটাধিকার ছাড়া গণতন্ত্র অর্থহীন। বিগত কয়েকটি নির্বাচন ঘিরে যে বিতর্ক ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা থেকেই এই দফার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। দলটি মনে করে, অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়া রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।

বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন, নির্বাচনী আইনের সংস্কার, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। জনগণের ভোটের ওপর আস্থা ফেরানোই এই দফার প্রধান লক্ষ্য।

 

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা

বিএনপির ৩১ দফার অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের দাবি। দলটির যুক্তি হলো, বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।

এই দফার বাস্তবায়ন সহজ নয়, কারণ এটি সংবিধান সংশোধন ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তবে জাতীয় সংলাপ, সর্বদলীয় আলোচনা এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা গেলে এই দফা বাস্তবায়নের পথ তৈরি হতে পারে।

বিচার বিভাগ ও আইনের শাসন

৩১ দফায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আইনের শাসন ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হয় না। তাই উপলব্ধি থেকেই বিচার বিভাগকে নির্বাহী ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা এবং বিচারিক জবাবদিহির একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো। একই সঙ্গে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ৩১ দফাকে মানবাধিকারকেন্দ্রিক একটি প্রস্তাবে পরিণত করেছে।

 

সুশাসন ও দুর্নীতি দমন

দুর্নীতিকে বিএনপি জাতীয় উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ৩১ দফায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি লড়াইয়ের কথা বলা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে কার্যকর ও স্বাধীন করা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত এবং সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে।

বাস্তবায়নের জন্য এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তুললে এই দফা বাস্তবে রূপ নিতে পারে।

 

সংসদ ও প্রশাসনিক সংস্কার

৩১ দফায় সংসদকে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সংসদ শুধু আইন প্রণয়নের জায়গা নয়, বরং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহির প্রধান ক্ষেত্র। এই ধারণা থেকেই বিরোধী দলের অধিকার ও সংসদীয় কমিটিগুলোর ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।

একই সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে আমলাতন্ত্রকে দলনিরপেক্ষ, পেশাদার ও জনবান্ধব করার অঙ্গীকার রয়েছে। মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং সেবামুখী প্রশাসন গড়ে তোলাই এই দফা বাস্তবায়নের মূল চ্যালেঞ্জ।

অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও আর্থিক খাত সংস্কার

বিএনপির ৩১ দফায় অর্থনৈতিক সংকটকে রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট, ব্যাংক খাতে অনিয়ম এবং খেলাপি ঋণএসব সমস্যার সমাধান ছাড়া গণতন্ত্রও অর্থবহ হয় না।

বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংক খাতে জবাবদিহি, উৎপাদনমুখী শিল্পে বিনিয়োগ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তার কথা বলা হয়েছে। অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এই দফার মূল দর্শন।

 

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য : মৌলিক অধিকার হিসেবে রাষ্ট্রের দায়

৩১ দফায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মানসম্মত ও বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা একটি কল্যাণরাষ্ট্রের মূল শর্ত।

বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ জনবল এবং দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কমানোও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

 

নারী, যুব, শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী

বিএনপির ৩১ দফায় নারী ও শিশু অধিকার, যুবসমাজের কর্মসংস্থান, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রয়েছে। এই দফাগুলো সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বাস্তবায়নের জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ অপরিহার্য।

 

জাতীয় ঐক্য ও সংস্কার কমিশন

সর্বশেষ দফায় একটি জাতীয় সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব ৩১ দফার বাস্তবায়নকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে গঠিত একটি কমিশন রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে পারে।

বিএনপির ৩১ দফা একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির চেয়েও বেশিএটি একটি রাষ্ট্র সংস্কারের নকশা। এর বাস্তবায়ন সহজ নয় এবং তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর। তবে বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে এই ৩১ দফা একটি বিকল্প আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছেযেখানে গণতন্ত্র, অধিকার ও সুশাসন নতুন করে ভাবার সুযোগ রয়েছে।

গণতন্ত্র কোনো এক দিনের ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই করতে বিএনপির ৩১ দফা জাতীয় আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দাবি করে।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথযাত্রা

ড. সাইমুম পারভেজ

তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথযাত্রা

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা। নির্যাতিত হয়ে চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ দেড় দশক আগে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। বিদেশের মাটিতে থেকেও বিএনপির মতো বড় ও গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত সুবিস্তৃত একটি রাজনৈতিক দলকে পরিচালনা করেছেন তারেক রহমান। শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে যে গণ-আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার নেতৃত্ব দিয়ে এবং অসংখ্য নির্যাতিত ও বঞ্চিত নেতাকর্মীর পাশে থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পক্ষের লড়াইয়ের অন্যতম আইকন।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক পথযাত্রাগণ-অভ্যুত্থানের মুখে হাসিনা সরকারের শীর্ষ নেতারা যখন দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন, তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, দেশে একটি বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক হত্যাযজ্ঞ হবে। কিন্তু তারেক রহমান দৃঢ়তার সঙ্গে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য বিএনপির নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন। এর ফলে বাংলাদেশে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিশোধমূলক রাজনীতির বদলে একটি দীর্ঘমেয়াদি গঠনমূলক রাজনীতির সূচনা ঘটে। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশকে বারবারই অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে অনবদ্য ভূমিকা রাখেন তারেক রহমান। তাঁর ধীরস্থির কিন্তু দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ফলেই নির্বাচনমুখী হয়েছে দেশ, গণতন্ত্রের পথে অগ্রযাত্রা চলমান থেকেছে।

রাজনৈতিক নেতারা নিজ দলের কর্মী ও সমর্থকদের নেতৃত্ব দেবেন, এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন কোনো রাজনীতিবিদ নিজ দলের নেতৃত্বকে ছাপিয়ে দেশের স্বার্থকে সামনে রাখেন, তিনি হয়ে ওঠেন পুরো দেশের নেতা। তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য, চিন্তা ও কার্যক্রমে এই বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাঁর অগ্রগামী দৃষ্টিভঙ্গি, ভবিষ্যেক বোঝা ও জানার চেষ্টা এবং দেশের স্বার্থে রাজনীতিকে পরিচালনা করার বিশেষ ক্ষমতা তাঁকে বিএনপির নেতা থেকে বাংলাদেশের নেতায় পরিণত করেছে। রাজনৈতিক চটকদারি ও পপুলিস্ট কর্মকাণ্ডের ভিড়ে তিনি হয়ে উঠেছেন একটি ব্যতিক্রম।

একজন সত্যিকারের নেতা হয়ে উঠতে গেলে তিনটি গুণের সম্মিলন প্রয়োজনভিশনারি দৃষ্টিভঙ্গি, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। তারেক রহমানের ভিশনারি বা অগ্রগামী দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ পাওয়া যায় বিএনপির সম্প্রতি নেওয়া পলিসিগুলোর দিকে তাকালে। যেখানে বিএনপির প্রতিপক্ষ শুধু সমালোচনা ও নেতিবাচক রাজনীতিকেই নির্বাচনে জেতার প্রধান অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে, সেখানে তারেক রহমানের ঐকান্তিক চেষ্টায় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নীতির পরিকল্পনা করছে বিএনপি। দলটির নির্বাচনী পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের জীবনে কিভাবে কার্যকর পরিবর্তন আনা যায় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই এগিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে ও পরামর্শে কয়েকটি বিশেষজ্ঞদল গঠন করা হয়েছে, যাঁরা গবেষণার মাধ্যমে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীকে স্বাবলম্বী করে তোলা, কৃষি, পরিবেশ, ক্রীড়া, প্রবাসী এবং ধর্মীয় নেতাদের জীবনমান উন্নয়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় তার বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে নারীকে স্বাবলম্বী এবং সেই সঙ্গে পরিবারগুলোকে ক্ষুধামুক্ত করে তোলার জন্য বিএনপির ফ্যামিলি কার্ডের পরিকল্পনা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই পরিকল্পনার আওতায় বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এনে পর্যায়ক্রমে সব পরিবারকে প্রায় আড়াই হাজার টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে।

প্রথম পর্যায়ে দরিদ্র ৫০ লাখ পরিবারকে এই সুবিধা দেওয়া হবে, যার ফলে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। অনেকেই সরকারি বাজেট না বুঝেই প্রশ্ন তুলেছেন যে, এই অর্থ কোথা থেকে আসবে। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাজেট বরাদ্দ এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। তাই এর মধ্য থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বড় কোনো অঙ্ক নয়। কিন্তু এর ফলে দুস্থ ও দরিদ্র পরিবারের যে বড় ধরনের উপকার হবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ক্ষুধার কষ্ট নিবারণ হলে দরিদ্র পরিবারের সন্তানরাও শিক্ষায় মনোযোগ দিতে পারবে। পরিবারের সঞ্চয় বাড়বে, জমানো অর্থ অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির উন্নতি হবে। এই কার্ডটি বরাদ্দ হবে নারীদের নামে। ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে সঙ্গে কৃষক কার্ডও বাংলাদেশের সব কৃষকের জন্য বরাদ্দ হবে, যা থেকে ফসলের ন্যায্যমূল্য, সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণ ইত্যাদি সুবিধা পাওয়া যাবে। অন্যান্য পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষক ও নারীদের জন্য অগ্রগামী এই চিন্তা এবং পলিসিভিত্তিক রাজনীতির প্রবর্তন তারেক রহমানকে সমসাময়িক অন্যান্য রাজনীতিবিদের চেয়ে আলাদা করেছে। সহিংস রাজনীতি পাল্টে ফেলে পলিসিকেন্দ্রিক রাজনীতি নিয়ে আসার এই চেষ্টা অবশ্যই ভিশনারি চিন্তা।

সাধারণ মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার এই ভিশনারি চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে তারেক রহমানের চারিত্রিক ইন্টেগ্রিটি বা সততাও লক্ষণীয়। তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মতোই সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে যাঁরা তাঁর ঘনিষ্ঠ, তাঁদের প্রত্যেকের বক্তব্যেই উঠে এসেছে তাঁর সাধারণ পোশাক ও অনাড়ম্বর জীবনের কথা। তৃতীয় যে গুণটি একজন যুগান্তকারী নেতার চরিত্রে থাকা প্রয়োজন তা হচ্ছে, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তারেক রহমানের চরিত্রে এ বিষয়টি খুবই দৃশ্যমান। বাংলাদেশের নানা প্রান্তে যেকোনো পর্যায়ের মানুষ যখন বিপদে পড়েন, তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান তিনি। জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন এবং আমরা বিএনপি পরিবার নামের দুটি সংগঠনই তিনি গড়ে তুলেছেন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।

তাই ভিশনারি চিন্তা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সততা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অদম্য আগ্রহ তারেক রহমানকে একটি নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং সামগ্রিক বাংলাদেশের নেতায় পরিণত করেছে। বাংলাদেশ যে ক্রান্তিলগ্নে অবস্থান করছে, সেখানে অশুভ ও পশ্চাৎপদ আদর্শের শক্তিরা দেশকে পেছনে টেনে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। এসব অশুভ শক্তির অস্ত্র হচ্ছে গুজব, ধর্মের অপব্যবহার ও ঘৃণার রাজনীতি। এর বিপরীতে মধ্যপন্থী, সহনশীল ও পলিসিভিত্তিক রাজনীতির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। এই পরিস্থিতিতে তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন আশা-জাগানিয়া। ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ, তার প্রধান সিপাহসালার তিনি। তাঁর নেতৃত্বে একটি সম্ভাবনার ভোর দেখতে পাবএই প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।

 

লেখক : স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্ট

বিএনপি চেয়ারপারসনের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি