বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ঘটনা। নির্যাতিত হয়ে চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ দেড় দশক আগে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। বিদেশের মাটিতে থেকেও বিএনপির মতো বড় ও গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত সুবিস্তৃত একটি রাজনৈতিক দলকে পরিচালনা করেছেন তারেক রহমান। শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে যে গণ-আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার নেতৃত্ব দিয়ে এবং অসংখ্য নির্যাতিত ও বঞ্চিত নেতাকর্মীর পাশে থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পক্ষের লড়াইয়ের অন্যতম আইকন।
গণ-অভ্যুত্থানের মুখে হাসিনা সরকারের শীর্ষ নেতারা যখন দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন, তখন অনেকেই মনে করেছিলেন, দেশে একটি বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক হত্যাযজ্ঞ হবে। কিন্তু তারেক রহমান দৃঢ়তার সঙ্গে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য বিএনপির নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন। এর ফলে বাংলাদেশে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিশোধমূলক রাজনীতির বদলে একটি দীর্ঘমেয়াদি গঠনমূলক রাজনীতির সূচনা ঘটে। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশকে বারবারই অশান্তি ও বিশৃঙ্খলার রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে অনবদ্য ভূমিকা রাখেন তারেক রহমান। তাঁর ধীরস্থির কিন্তু দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ফলেই নির্বাচনমুখী হয়েছে দেশ, গণতন্ত্রের পথে অগ্রযাত্রা চলমান থেকেছে।
রাজনৈতিক নেতারা নিজ দলের কর্মী ও সমর্থকদের নেতৃত্ব দেবেন, এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন কোনো রাজনীতিবিদ নিজ দলের নেতৃত্বকে ছাপিয়ে দেশের স্বার্থকে সামনে রাখেন, তিনি হয়ে ওঠেন পুরো দেশের নেতা। তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য, চিন্তা ও কার্যক্রমে এই বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাঁর অগ্রগামী দৃষ্টিভঙ্গি, ভবিষ্যেক বোঝা ও জানার চেষ্টা এবং দেশের স্বার্থে রাজনীতিকে পরিচালনা করার বিশেষ ক্ষমতা তাঁকে বিএনপির নেতা থেকে বাংলাদেশের নেতায় পরিণত করেছে। রাজনৈতিক চটকদারি ও পপুলিস্ট কর্মকাণ্ডের ভিড়ে তিনি হয়ে উঠেছেন একটি ব্যতিক্রম।
একজন সত্যিকারের নেতা হয়ে উঠতে গেলে তিনটি গুণের সম্মিলন প্রয়োজন—ভিশনারি দৃষ্টিভঙ্গি, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। তারেক রহমানের ভিশনারি বা অগ্রগামী দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ পাওয়া যায় বিএনপির সম্প্রতি নেওয়া পলিসিগুলোর দিকে তাকালে। যেখানে বিএনপির প্রতিপক্ষ শুধু সমালোচনা ও নেতিবাচক রাজনীতিকেই নির্বাচনে জেতার প্রধান অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে, সেখানে তারেক রহমানের ঐকান্তিক চেষ্টায় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নীতির পরিকল্পনা করছে বিএনপি। দলটির নির্বাচনী পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের জীবনে কিভাবে কার্যকর পরিবর্তন আনা যায় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই এগিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে ও পরামর্শে কয়েকটি বিশেষজ্ঞদল গঠন করা হয়েছে, যাঁরা গবেষণার মাধ্যমে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীকে স্বাবলম্বী করে তোলা, কৃষি, পরিবেশ, ক্রীড়া, প্রবাসী এবং ধর্মীয় নেতাদের জীবনমান উন্নয়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় তার বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে নারীকে স্বাবলম্বী এবং সেই সঙ্গে পরিবারগুলোকে ক্ষুধামুক্ত করে তোলার জন্য বিএনপির ফ্যামিলি কার্ডের পরিকল্পনা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই পরিকল্পনার আওতায় বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এনে পর্যায়ক্রমে সব পরিবারকে প্রায় আড়াই হাজার টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে।
প্রথম পর্যায়ে দরিদ্র ৫০ লাখ পরিবারকে এই সুবিধা দেওয়া হবে, যার ফলে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। অনেকেই সরকারি বাজেট না বুঝেই প্রশ্ন তুলেছেন যে, এই অর্থ কোথা থেকে আসবে। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাজেট বরাদ্দ এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। তাই এর মধ্য থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বড় কোনো অঙ্ক নয়। কিন্তু এর ফলে দুস্থ ও দরিদ্র পরিবারের যে বড় ধরনের উপকার হবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ক্ষুধার কষ্ট নিবারণ হলে দরিদ্র পরিবারের সন্তানরাও শিক্ষায় মনোযোগ দিতে পারবে। পরিবারের সঞ্চয় বাড়বে, জমানো অর্থ অন্য কাজে ব্যবহার করা যাবে এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির উন্নতি হবে। এই কার্ডটি বরাদ্দ হবে নারীদের নামে। ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে সঙ্গে কৃষক কার্ডও বাংলাদেশের সব কৃষকের জন্য বরাদ্দ হবে, যা থেকে ফসলের ন্যায্যমূল্য, সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণ ইত্যাদি সুবিধা পাওয়া যাবে। অন্যান্য পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষক ও নারীদের জন্য অগ্রগামী এই চিন্তা এবং পলিসিভিত্তিক রাজনীতির প্রবর্তন তারেক রহমানকে সমসাময়িক অন্যান্য রাজনীতিবিদের চেয়ে আলাদা করেছে। সহিংস রাজনীতি পাল্টে ফেলে পলিসিকেন্দ্রিক রাজনীতি নিয়ে আসার এই চেষ্টা অবশ্যই ভিশনারি চিন্তা।
সাধারণ মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার এই ভিশনারি চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে তারেক রহমানের চারিত্রিক ইন্টেগ্রিটি বা সততাও লক্ষণীয়। তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মতোই সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে যাঁরা তাঁর ঘনিষ্ঠ, তাঁদের প্রত্যেকের বক্তব্যেই উঠে এসেছে তাঁর সাধারণ পোশাক ও অনাড়ম্বর জীবনের কথা। তৃতীয় যে গুণটি একজন যুগান্তকারী নেতার চরিত্রে থাকা প্রয়োজন তা হচ্ছে, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তারেক রহমানের চরিত্রে এ বিষয়টি খুবই দৃশ্যমান। বাংলাদেশের নানা প্রান্তে যেকোনো পর্যায়ের মানুষ যখন বিপদে পড়েন, তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান তিনি। ‘জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন’ এবং ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ নামের দুটি সংগঠনই তিনি গড়ে তুলেছেন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।
তাই ভিশনারি চিন্তা, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সততা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অদম্য আগ্রহ তারেক রহমানকে একটি নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং সামগ্রিক বাংলাদেশের নেতায় পরিণত করেছে। বাংলাদেশ যে ক্রান্তিলগ্নে অবস্থান করছে, সেখানে অশুভ ও পশ্চাৎপদ আদর্শের শক্তিরা দেশকে পেছনে টেনে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। এসব অশুভ শক্তির অস্ত্র হচ্ছে গুজব, ধর্মের অপব্যবহার ও ঘৃণার রাজনীতি। এর বিপরীতে মধ্যপন্থী, সহনশীল ও পলিসিভিত্তিক রাজনীতির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। এই পরিস্থিতিতে তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন আশা-জাগানিয়া। ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ, তার প্রধান সিপাহসালার তিনি। তাঁর নেতৃত্বে একটি সম্ভাবনার ভোর দেখতে পাব—এই প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি।
লেখক : স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্ট
বিএনপি চেয়ারপারসনের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি