বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে দক্ষিণ এশিয়ায় নারী নেতৃত্ব যখন হাতে গোনা, সেই সময়ে রাজনৈতিক উত্থান ঘটে এক সাধারণ গৃহবধূর। তিনি বাংলাদেশের সাবেক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার যাত্রাটা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার পথচলা মোটেও সুখকর ছিল না। গণতন্ত্রের প্রশ্নে আপসহীন এই নেত্রী দেশের ইতিহাসে নারী নেতৃত্বকে শুধু দৃশ্যমানই করেননি করেছেন নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত।
নানা প্রতিকূলতা পার করে নিজের নেতৃত্ব প্রদানের বিরল সক্ষমতার মাধ্যমে সামরিক শাসনোত্তর রাজনৈতিক এক অস্থির সময়ে তিনি দেশের হাল ধরেন। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা ঘটে মূলত স্বামী সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর। নিজের অসাধারণ দৃঢ়তা দিয়ে নেতৃত্বহীন অগোছালো দল বিএনপিকে পুনর্গঠন করে হয়ে ওঠেন দলটির আশা-ভরসার কেন্দ্রবিন্দু। বারবার গৃহবন্দি, রাজনৈতিক চাপ ও গ্রেপ্তারের মুখে পড়েও নিজেকে একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে গড়ে তোলেন তিনি।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বিজয় শুধু দলের জন্য নয়, দেশের ইতিহাসেও এক বড় পরিবর্তন আনে। সামরিক শাসনের অবসান ঘটার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেন একজন নারী। তিনি এমন এক সময় দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন যখন নারী নেতৃত্ব নিয়ে গোটা বিশ্বই ছিল বহু দ্বিধা ও প্রশ্নের মুখে। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া নিজ গুণে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে নারীরা শুধু শিক্ষা ও অর্থনীতি নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায়ও সক্ষম।
সদ্য সামরিক প্রভাবমুক্ত একটি দেশের গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থায়ী করা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও রাজনৈতিক বিরোধিতাকে সুশৃঙ্খল করার মতো বড় চ্যালেঞ্জ হাতে নিয়ে তিনি দেশ পরিচালনায় নামেন। তাঁর সময়কালে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, টেলিকম খাতের বিকাশ ও অবকাঠামো উন্নয়নের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শুধু তা-ই নয়, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি নারীর ক্ষমতায়নেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। তিনি মেয়েদের জন্য শিক্ষায় উপবৃত্তি কর্মসূচি সম্প্রসারণ করেন। এ ছাড়া নারীর অবস্থান দৃঢ় করতে তিনি নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য উদ্যোক্তা সহায়তা চালু করেছিলেন। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগও তিনি নিয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, স্বাস্থ্য খাতে নারীকে সুরক্ষা প্রদানের জন্য তিনি মাতৃস্বাস্থ্য সেবার উন্নতি ঘটিয়েছিলেন। তাঁর হাত ধরে গ্রামীণ ও শহর উভয় অঞ্চলে নারীরা আর্থিক ও সামাজিকভাবে শক্তিশালী হতে শুরু করে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের জন্য বেগম খালেদা জিয়া এক অনুকরণীয় নাম। সাধারণ এক স্বামী হারানো নারী ব্যক্তিগত শোক কাটিয়ে দলীয় স্বার্থ রক্ষায় দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার এই ত্যাগ ইতিহাসে বিরল। রাজনৈতিক কারণে পরিবার সন্তান থেকে দূরে থেকেও দেশের স্বার্থে ব্যক্তিগত কিছুর তোয়াক্কা না করে দেশের রাজনীতিতে তিনি সক্রিয় ছিলেন। প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু ইতিহাসই গড়েননি, একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার জন্ম দিয়েছিলেন।
নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও যিনি একটি দেশের পুরো রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন তিনি বেগম খালেদা জিয়া।