নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর টানা তিনটি নির্বাচন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের অনেক আগ্রহ ছিল। এমন নির্বাচনের পর যে সরকার গঠিত হয়েছে, তাকে অবশ্যই অভিনন্দন জানাতে হবে। এর ভালো দিক হচ্ছে নতুন মন্ত্রিসভায় এক ধরনের বৈচিত্র্যও রয়েছে।
নিউ ইয়র্কভিত্তিক বাংলা গণমাধ্যম ঠিকানা আয়োজিত সংলাপে এসব কথা বলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন। তিনি আরো বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, এবার তাঁদের মন্ত্রী করা হয়নি। বিপরীতে তখন যাঁরা ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাদের রাখা হয়েছে। আবার নতুন অনেককে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়েছে, যারা আগে কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। এভাবে বিভিন্ন প্রজন্মকে নিয়ে সরকার- এটা ভালো দিক।’
‘ডেটলাইন ঢাকা: কেমন সরকার পেলাম’- শিরোনামে বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে ঠিকানার এই সংলাপ হয় অনুষ্ঠিত হয়।
সংলাপে অতিথি হিসেবে আরো ছিলেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন-এর প্রধান সমন্বয়ক অ্যাড. হাসনাত কাইয়ুম, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কাজী জেসিন, আপিল বিভাগের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী এবং নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ।
সংলাপ সঞ্চালনায় ছিলেন ঠিকানার প্রধান সম্পাদক খালেদ মুহিউদ্দীন।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ : বিএনপির অনীহা কেন?
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপির প্রার্থীরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন মঙ্গলবার। কিন্তু তাঁরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। জামায়াত ও এনসিপির বিজয়ীরা দুটি পদের জন্যই শপথ নিয়েছেন।
বিএনপির এমন অবস্থানের সমালোচনা করেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন-এর প্রধান সমন্বয়ক অ্যাড. হাসনাত কাইয়ুম। তিনি বলেন, গণভোট হবে, একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হবে- এসব বিষয় সব দলই জানতো। সেক্ষেত্রে এগুলো নিয়ে যথাযথ আইন করা হয়েছে। বিএনপি জুলাই সনদে সই করা দল। তাঁরা এখন সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের বিষয়টি জানেন না- এটা হতে পারে না।
এ বিষয়ের সঙ্গে একমত নন বিএনপির সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী। তিনি বলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর আবার একটি শপথ নেওয়া- এতে সংবিধান অবমাননার ঘটনা ঘটতো। সংবিধানের মর্যাদা সমুন্নত রাখার জায়গা থেকেই বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি বলে দাবি করেন তিনি।
বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার বিষয়টি হঠাৎ করেই অন্য দলগুলোকে জানিয়েছে- এমন অভিযোগ করেন এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি আগেই বিরোধীদলের নেতাদের জানাতেন যে, সংবিধানে যুক্ত করার পর সব দল মিলে দ্বিতীয় পদটিতে শপথ নিলে ভালো হবে, তখন অন্য কেউ দ্বিমত করতেন না।
এনসিপি নেতা আবদুল হান্নান মাসউদ আরো বলেন, ‘বিএনপি সংসদে নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়ে এখন অবস্থান পরিবর্তন করছে। তাঁরা যদি এখন বলেন গণভোট সংবিধানসম্মত নয়, তাহলে কিছু করার থাকবে না অন্য দলগুলোর। আসলে এত সংবিধান দেখালে, আইন দেখালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানই অসাংবিধানিক ব্যাপার হয়ে যায়।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন খলিলুর রহমান : এই নিয়োগের কারণ কী?
অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি বিএনপি সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। নতুন সরকারের এটা বড় চমক বলে মনে করেন অতিথিরা। কারণ একসময় এই উপদেষ্টারই পদত্যাগ চেয়েছিলেন বিএনপি নেতারা। এখন পুরো বিপরীত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী?- এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, রাজনীতি আসলে স্থির কিছু নয়। প্রথমে একরকম মনে হলেও পরে দেখা গেছে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ড. খলিল অনেক কাজ করেছেন। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যে কূটনীতি, সেখানে তিনি নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছেন।
একই বিষয়ে আপিল বিভাগের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ড. খলিলের পেশাদার জীবনে অনেক কৃতিত্ব রয়েছে। তিনি হয়তো অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিজের দক্ষতার পরিচয় দিতে পেরেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি দক্ষতার সঙ্গে হয়তো বিএনপির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতে পেরেছেন। যার জন্য তিনি পুরস্কৃত হলেন নতুন ক্যাবিনেটে জায়গা পেয়ে।
কূটনীতির কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিএনপি ড. খলিলকে কাজে লাগাতে চায়- এমনটি হতে পারে বলে মনে করেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কাজী জেসিন। তাঁর ভাষ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকার অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছিল। সেই অস্বাভাবিকতা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপার রয়েছে। বিগত সময়ে কূটনীতির দর কষাকষিতে ভূমিকা রেখেছিলেন হয়তো ড. খলিল। বিষয়গুলো এখনো রয়ে গেছে। সেই চ্যালেঞ্জ নিজে নিতে চায় না বিএনপি। তাই খলিলুর রহমানকে নিয়োগ দিয়েছেন তাঁরা।
সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ
অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারে মনযোগ দিয়েছিল। তাঁদের সময়ে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো ছিল না। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিও ছিল নাজুক। বিএনপি সরকারকে এগুলোর ইতিবাচক পরিবর্তনে কাজ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কাজী জেসিন। তিনি আরো বলেন, ‘ড. ইউনূস সরকারের আমলে সাংবাদিকদের প্রতি সরাসরি হুমকি ছিল না। রাষ্ট্রের দিক থেকেও খবরদারি কম ছিল। কিন্তু অনলাইন মব তৈরি করে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের প্রবণতা লক্ষণীয় ছিল। বট বাহিনীর অপতৎপরতা ছিল অনলাইনে। এটা যদি এখনও থাকে, তবে প্রকৃত সাধারণ মানুষের মতামত কিন্তু আমরা জানতে পারব না। সেখান থেকে আমাদের বের হতে হবে।’
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশার জায়গা থেকে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন-এর প্রধান সমন্বয়ক অ্যাড. হাসনাত কাইয়ুম বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ যেটা চায়, সেটা হচ্ছে আইন দ্বারা সে নিপীড়িত হবে না। নতুন সরকারের কাছে আশা করবো, মানুষের এই আকাঙ্খা যাতে পূরণ হয়।’ তিনি বলেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবে যে লুণ্ঠন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি হয়; সেটা যদি বিএনপি সরকার শুরু থেকেই বন্ধ করে, তাহলে মানুষ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে। এই সরকার অনেক দূর যেতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।




