রমজানের প্রধান লক্ষ্য কী? পবিত্র কোরআনে এর উত্তর স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়, আর তা হলো তাকওয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের আগের লোকেদের প্রতি ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৩)
তাকওয়া মানে শুধু ভয় নয়, এটি আল্লাহসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নৈতিক দায়িত্ববোধের এক সমন্বিত অবস্থা। রমজান সেই অনুশীলনের মাস, যেখানে মানুষ নিজের প্রবৃত্তির ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে শেখে।
মানুষের জীবনে বেশির ভাগ ভুল ঘটে তাৎক্ষণিক আবেগ, আকাঙ্ক্ষা এবং অপ্রতিহত ইচ্ছার কারণে। আধুনিক সমাজ মানুষকে ক্রমাগত ভোগ, তাড়াহুড়া এবং তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টির দিকে ঠেলে দেয়। এই প্রবণতা ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরের নৈতিক প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করে। রমজান ঠিক এই জায়গায়ই একটি শক্তিশালী নৈতিক প্রশিক্ষণ হিসেবে কাজ করে।
দিনের আলোয় বৈধ খাবার থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ মানুষের ভেতরে একটি গভীর বার্তা দেয় যে সবকিছু পারা মানেই করা নয়, আর সংযমই প্রকৃত শক্তি।
তাকওয়ার প্রথম ধাপ হলো সচেতনতা। একজন রোজাদার যখন একাকী অবস্থায়ও পানাহার থেকে বিরত থাকে, তখন সে আসলে নিজের ভেতরে এক অদৃশ্য পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি অনুভব করে। এই আল্লাহসচেতনতা মানুষের আচরণকে ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে।
আইন, শাস্তি বা সামাজিক চাপ নয়; বরং অন্তরের নৈতিক বোধই তখন প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় ধাপ হলো আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ সাওম পালন করলে সে যেন পাপাচারে লিপ্ত না হয় এবং মূর্খের ন্যায় আচরণ না করে। কেউ তার সঙ্গে ঝগড়া করলে বা তাকে গালমন্দ করলে সে যেন বলে, আমি রোজাদার, আমি রোজাদার।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৬৩)
রোজার মাধ্যমে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রাগ, অপ্রয়োজনীয় কথা, চোখ ও জিহ্বার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকার ধারাবাহিক চর্চা মানুষকে শেখায় কিভাবে ইচ্ছাকে পরিচালনা করতে হয়।
এই অভ্যাস শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রেই নয়, পেশাগত জীবন, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কেও গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যে ব্যক্তি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে অধিক ভারসাম্য ও প্রজ্ঞা দিয়ে।
তৃতীয় ধাপ হলো নৈতিক উৎকর্ষ। তাকওয়া শুধু পাপ এড়িয়ে চলার নাম নয়, এটি সক্রিয় সৎকর্মের সংস্কৃতি গড়ে তোলে। রমজানে দান-সদকা বৃদ্ধি, দরিদ্রের কষ্ট অনুভব, ক্ষমাশীলতা ও সহমর্মিতা চর্চা মানুষের ভেতরে একটি সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি করে। ফলে তাকওয়া ব্যক্তিগত গুণে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সমাজে ন্যায়, সহানুভূতি ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করে।
মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করায়, তার জন্যও রোজা পালনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব রয়েছে। (তিরমিজি, হাদিস : ৮০৭)
রমজান আমাদের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য শেখায়। তাকওয়া তাৎক্ষণিক অর্জন নয়, এটি ধারাবাহিক অনুশীলনের ফল। এক মাসের প্রশিক্ষণ সারা বছরের চরিত্র গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। যদি রমজানের সংযম, সময়ানুবর্তিতা, কম কথা বলা, কম খাওয়া এবং বেশি চিন্তা করার অভ্যাস বছরজুড়ে ধরে রাখা যায়, তবে তাকওয়া ধীরে ধীরে স্থায়ী চরিত্রে পরিণত হয়।
আজকের বিশ্বে নৈতিক নেতৃত্বের সংকট, দুর্নীতি, অস্থিরতা এবং সামাজিক অবিশ্বাসের পেছনে বড় কারণ হলো আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব। রমজান এই সংকটের একটি গভীর সমাধান প্রস্তাব করে। এটি মানুষকে বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শেখায়। যে সমাজে মানুষ নিজে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, সেখানে আইন প্রয়োগের প্রয়োজন কমে এবং আস্থা বৃদ্ধি পায়।
অতএব, রমজান ও তাকওয়ার সম্পর্ক শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি মানুষের নৈতিক বিবর্তনের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া। রমজান আমাদের শেখায়, প্রকৃত শক্তি ক্ষমতায় নয়, সংযমে; প্রকৃত স্বাধীনতা সব ইচ্ছা পূরণে নয়, বরং ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণে। যদি আমরা এই শিক্ষা রমজানের পরও জীবনে ধরে রাখতে পারি, তবে তাকওয়া আমাদের ব্যক্তিত্ব, সমাজ এবং নেতৃত্বের প্রতিটি স্তরে এক স্থায়ী নৈতিক আলো হয়ে জ্বলে থাকবে।