• ই-পেপার

স্মার্ট প্রযুক্তিতে নিরাপদ মসজিদুল হারাম

দোয়া

ইফতারের সময় পড়ার দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইফতারের সময় পড়ার দোয়া
প্রতীকী ছবি

ইফতারের সময় দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ মুহূর্ত। তাই ইফতারের আগে ও পরে নিজের প্রয়োজন, ক্ষমা প্রার্থনা এবং উম্মাহর কল্যাণের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা সুন্নাহসম্মত ও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।

ইফতারের সময় যে দোয়াটি রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে সহিহ সূত্রে প্রমাণিত, তা হলো—

ذَهَبَ الظَّمَأُ، وَابْتَلَّتِ العُرُوقُ، وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ

উচ্চারণ: যাহাবায্‌ যামাউ, ওয়াবতাল্লাতিল উরূকু, ওয়া সাবাতাল আজরু ইন শা আল্লাহ।

অর্থ: “তৃষ্ণা দূর হলো, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং সওয়াব স্থির হলো, যদি আল্লাহ চান।” (আবু দাউদ, হাদিস: ২৩৫৭)

আরেকটি দোয়া অনেকের মুখে শোনা যায়—

اللهم لك صمت وعلى رزقك أفطرت
(হে আল্লাহ! তোমার জন্যই রোজা রেখেছি এবং তোমার দেওয়া রিজিক দ্বারাই ইফতার করছি।)

তবে এটির সনদ দুর্বল বলে মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন। তাই প্রথম দোয়াটি পড়াই উত্তম।

বাহ্যিক নয়, অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনেই রমজানের প্রকৃত সার্থকতা

ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক
বাহ্যিক নয়, অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনেই রমজানের প্রকৃত সার্থকতা
প্রতীকী ছবি

রমজানের প্রধান লক্ষ্য কী? পবিত্র কোরআনে এর উত্তর স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়, আর তা হলো তাকওয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের আগের লোকেদের প্রতি ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৩)

তাকওয়া মানে শুধু ভয় নয়, এটি আল্লাহসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নৈতিক দায়িত্ববোধের এক সমন্বিত অবস্থা। রমজান সেই অনুশীলনের মাস, যেখানে মানুষ নিজের প্রবৃত্তির ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে শেখে।

মানুষের জীবনে বেশির ভাগ ভুল ঘটে তাৎক্ষণিক আবেগ, আকাঙ্ক্ষা এবং অপ্রতিহত ইচ্ছার কারণে। আধুনিক সমাজ মানুষকে ক্রমাগত ভোগ, তাড়াহুড়া এবং তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টির দিকে ঠেলে দেয়। এই প্রবণতা ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরের নৈতিক প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করে। রমজান ঠিক এই জায়গায়ই একটি শক্তিশালী নৈতিক প্রশিক্ষণ হিসেবে কাজ করে।

দিনের আলোয় বৈধ খাবার থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ মানুষের ভেতরে একটি গভীর বার্তা দেয় যে সবকিছু পারা মানেই করা নয়, আর সংযমই প্রকৃত শক্তি।

তাকওয়ার প্রথম ধাপ হলো সচেতনতা। একজন রোজাদার যখন একাকী অবস্থায়ও পানাহার থেকে বিরত থাকে, তখন সে আসলে নিজের ভেতরে এক অদৃশ্য পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি অনুভব করে। এই আল্লাহসচেতনতা মানুষের আচরণকে ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে।

আইন, শাস্তি বা সামাজিক চাপ নয়; বরং অন্তরের নৈতিক বোধই তখন প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় ধাপ হলো আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ সাওম পালন করলে সে যেন পাপাচারে লিপ্ত না হয় এবং মূর্খের ন্যায় আচরণ না করে। কেউ তার সঙ্গে ঝগড়া করলে বা তাকে গালমন্দ করলে সে যেন বলে, আমি রোজাদার, আমি রোজাদার।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৬৩)

রোজার মাধ্যমে ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রাগ, অপ্রয়োজনীয় কথা, চোখ ও জিহ্বার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকার ধারাবাহিক চর্চা মানুষকে শেখায় কিভাবে ইচ্ছাকে পরিচালনা করতে হয়।

এই অভ্যাস শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রেই নয়, পেশাগত জীবন, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কেও গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যে ব্যক্তি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে অধিক ভারসাম্য ও প্রজ্ঞা দিয়ে।

তৃতীয় ধাপ হলো নৈতিক উৎকর্ষ। তাকওয়া শুধু পাপ এড়িয়ে চলার নাম নয়, এটি সক্রিয় সৎকর্মের সংস্কৃতি গড়ে তোলে। রমজানে দান-সদকা বৃদ্ধি, দরিদ্রের কষ্ট অনুভব, ক্ষমাশীলতা ও সহমর্মিতা চর্চা মানুষের ভেতরে একটি সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি করে। ফলে তাকওয়া ব্যক্তিগত গুণে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সমাজে ন্যায়, সহানুভূতি ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করে।

মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করায়, তার জন্যও রোজা পালনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব রয়েছে। (তিরমিজি, হাদিস : ৮০৭)

রমজান আমাদের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য শেখায়। তাকওয়া তাৎক্ষণিক অর্জন নয়, এটি ধারাবাহিক অনুশীলনের ফল। এক মাসের প্রশিক্ষণ সারা বছরের চরিত্র গঠনের ভিত্তি তৈরি করে। যদি রমজানের সংযম, সময়ানুবর্তিতা, কম কথা বলা, কম খাওয়া এবং বেশি চিন্তা করার অভ্যাস বছরজুড়ে ধরে রাখা যায়, তবে তাকওয়া ধীরে ধীরে স্থায়ী চরিত্রে পরিণত হয়।

আজকের বিশ্বে নৈতিক নেতৃত্বের সংকট, দুর্নীতি, অস্থিরতা এবং সামাজিক অবিশ্বাসের পেছনে বড় কারণ হলো আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব। রমজান এই সংকটের একটি গভীর সমাধান প্রস্তাব করে। এটি মানুষকে বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শেখায়। যে সমাজে মানুষ নিজে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, সেখানে আইন প্রয়োগের প্রয়োজন কমে এবং আস্থা বৃদ্ধি পায়।

অতএব, রমজান ও তাকওয়ার সম্পর্ক শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি মানুষের নৈতিক বিবর্তনের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া। রমজান আমাদের শেখায়, প্রকৃত শক্তি ক্ষমতায় নয়, সংযমে; প্রকৃত স্বাধীনতা সব ইচ্ছা পূরণে নয়, বরং ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণে। যদি আমরা এই শিক্ষা রমজানের পরও জীবনে ধরে রাখতে পারি, তবে তাকওয়া আমাদের ব্যক্তিত্ব, সমাজ এবং নেতৃত্বের প্রতিটি স্তরে এক স্থায়ী নৈতিক আলো হয়ে জ্বলে থাকবে।

রমজান : জান্নাতের দুয়ার উন্মুক্ত হওয়ার মাস

ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা
রমজান : জান্নাতের দুয়ার উন্মুক্ত হওয়ার মাস
ফাইল ছবি

রমজানুল মোবারক মুসলিম উম্মাহর জীবনে এক অনন্য ও বরকতময় মাস। এটি শুধু সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাসই নয়, বরং মানবজাতির হেদায়েতের জন্য অবতীর্ণ সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল-কোরআনের স্মরণবাহী মাস। এ মাসেই রোজা ফরজ করা হয়েছে, নাজিল হয়েছে কোরআন, আর লাইলাতুল কদরের মতো মহিমান্বিত রাত এই মাসকেই মর্যাদার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা রমজানের মাধ্যমে বান্দাকে পাপমুক্ত হয়ে নতুন জীবন গঠনের এক সুবর্ণ সুযোগ দান করেন।

তাই রমজানের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে একে যথাযথভাবে পালন করাই মুমিনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

রমজানের অনন্যতা : রমজান আল্লাহ তাআলার অপূর্ব রহমতের বারিধারায় সমৃদ্ধ, ইবাদতের বসন্ত, মুমিনের প্রার্থিত এবং মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সুবর্ণ সুযোগসংবলিত মহিমান্বিত একটি মাস। মহান আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ কোরআন মজিদকে এ মাসেই অবতীর্ণ করেছেন। আবার রোজাকে এ মাসেই ফরজ করা হয়েছে।

কোরআন অবতরণের সূত্র ধরেই রমজান শ্রেষ্ঠ মাস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘রমজান মাস, এতে মানুষের দিশারি এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী রূপে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পাবে তারা যেন এই মাসে রোজা পালন করে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৫)

আবার মহিমান্বিত কদরের রাত, যা হাজার মাস থেকে উত্তম এই রমজান মাসেই।

আল্লাহ বলেন, ‘আর আপনি কি জানেন কদরের রাত কী? কদরের রাত হলো হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এ রাতে ফেরেশতা ও রুহুল কুদুস [জিবরাইল (আ.)] তাদের পালনকর্তার আদেশক্রমে প্রত্যেক মঙ্গলময় বস্তু নিয়ে (পৃথিবীতে) অবতরণ করে। (এ রাতের) আগাগোড়া শান্তি, যা ফজর হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।’ (সুরা : কদর, আয়াত : ২-৫)

জীবন গঠনের এক অনন্য সুযোগ : রমজান মাসে ইবাদতের অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করে। রহমত ও জান্নাতের দুয়ার খোলা থাকে, জাহান্নাম বন্ধ থাকে আর শয়তানকে বন্দি করে রাখা হয়।

আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত কল্যাণের প্রতি অগ্রসর হওয়ার ঘোষণা আসতে থাকে। আল্লাহ তাআলা ইবাদতের সওয়াব বাড়িয়ে দেন। ক্ষমা ও অনুগ্রহের মাত্রা বৃদ্ধি করেন। প্রতিদিন ইফতারের সময় অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। এসবের প্রভাবে মানুষের মধ্যে ভালো কাজের প্রতি আগ্রহ জন্মায় এবং খোদাভীতি সৃষ্টি হয়। কাজেই জীবন গঠনের এক অনন্য সুযোগ হিসেবেই রমজান আগমন করে। এমন পরিবেশে যথার্থভাবে রমজানকে উদ্যাপন করার মাধ্যমে মহান আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দা হিসেবে জীবনকে সাজানোই বান্দার মূল কাম্য বিষয়। রমজানের ইবাদতের অনুকূল পরিবেশ বিষয়ে হাদিসে বলা হয়েছে—আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন রমজান মাস আসে তখন জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৩১০৩; মুসলিম, হাদিস : ২৫৪৭)

রমজান পেয়েও ব্যর্থ যারা : মহান আল্লাহ বান্দাকে ক্ষমা ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য রমজান মাস দান করেন। কিন্তু এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যারা আল্লাহর ক্ষমাপ্রাপ্ত জীবন গঠনে ব্যর্থ, তাদের ধ্বংস অনিবার্য। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সে ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত হোক; যার কাছে আমার নাম উচ্চারিত হওয়ার পরও আমার প্রতি দরুদ পড়ে না। সে ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত হোক; যার কাছে রমজান মাস এসে চলে যায় অথচ তার পাপগুলো মাফ করিয়ে নিতে পারে না। সে ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত হোক; যে তার পিতা-মাতা বা তাদের একজনকে বার্ধক্য অবস্থায় পেয়েছে কিন্তু তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারেনি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৫৪৫)

পরিশেষে বলা যায়, রমজান হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের অপূর্ব উপহার। এ মাসে জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত থাকে, জাহান্নামের দরজা বন্ধ থাকে এবং শয়তান শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে—যা আত্মশুদ্ধি ও নেক আমলের পথকে সহজ করে দেয়। অতএব, আমাদের কর্তব্য হলো রমজানকে গাফিলতিতে নয়, বরং সচেতনতা, ইখলাস ও আমলের মাধ্যমে গ্রহণ করা; যাতে এ মাস আমাদের জীবন বদলে দেওয়ার এক সফল উপলক্ষে পরিণত হয় এবং আমরা আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টি অর্জনে ধন্য হতে পারি।

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

রোজা কবুলের পথে ১২টি নববী নির্দেশ

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
রোজা কবুলের পথে ১২টি নববী নির্দেশ
প্রতীকী ছবি

রমজান ইবাদতের বসন্ত এবং আল্লাহর সান্নিধ্য ও ভালোবাসা অর্জনের মৌসুম। আর কোনো আমল আল্লাহর দরবারে তখনই পরিপূর্ণ ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়, যখন তা মহানবী (সা.)-এর নিদের্শনা অনুসারে আদায় করা হয়। তাই রোজাদার ব্যক্তিরও উচিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত ও নির্দেশনা মেনে চলা। নিম্নে রোজাদারের প্রতি নবীজি (সা.)-এর ১২টি বিশেষ নির্দেশনা তুলে ধরা হলো।

১. রাতে নিয়ত করা : ফরজ রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের আগেই সম্পন্ন করতে হবে। তবে নিয়ত সম্পন্ন হওয়ার জন্য তা মুখে উচ্চারণ করা আবশ্যক নয়, বরং ব্যক্তির মনের ইচ্ছা, ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া এবং সাহরি গ্রহণ নিয়ত হিসেবে গণ্য হবে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রাতে রোজার নিয়ত করবে না, তার রোজা হবে না।’ (নাসায়ি, হাদিস : ২৩৩৪)

২. সতর্কতার সঙ্গে অজু করা : রোজা রাখা অবস্থায় ব্যক্তি সতর্কতার সঙ্গে নাকে পানি দেবে এবং কুলি করবে।

কেননা রোজাদার ব্যক্তির জন্য যদি অজুর সময় রোজার কথা স্মরণ থাকে এবং অসতর্কতার কারণে গলার ভেতর পানি চলে যায়, তবে তাঁর রোজা ভেঙে যাবে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘তুমি ভালোভাবে অজু করো, আঙুলগুলোর মধ্যে খিলাল করো। আর তুমি রোজাদার না হলে নাকের গভীরে পানি পৌঁছে দাও।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৭৮৮)

৩. অধিক পরিমাণ ইবাদত করা : মহানবী (সা.) রমজান মাসে অধিক পরিমাণ ইবাদত করতেন এবং তিনি অন্যদেরও অধিক পরিমাণে ইবাদত করতে উৎসাহিত করতেন।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, নবী (সা.) সর্বাপেক্ষা বেশি দানশীল ছিলেন। তাঁর দানশীলতা বহুগুণ বর্ধিত হতো রমজানের পবিত্র দিনে যখন জিবরাইল (আ.) তাঁর সঙ্গে দেখা করতেন। জিবরাইল (আ.) রমজানে প্রতি রাতে তাঁর সঙ্গে দেখা করে কোরআনের সবক দিতেন। নবী (সা.) কল্যাণ বণ্টনে প্রবাহিত বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল ছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৫৫৪)

৪. অবিরাম রোজা না রাখা : ইফতার ও সাহরি না খেয়ে ধারাবাহিকভাবে রোজা রাখা মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ পরিপন্থী।

তিনি এমনটি করতে নিষেধ করেছেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) লোকদের ওপর দয়াপরবশ হয়ে তাদের অবিরাম রোজা রাখা থেকে নিষেধ করেন। তখন সাহাবিরা বললেন, আপনি যে অবিরাম রোজা রেখে থাকেন! তিনি বললেন, আমি তোমাদের মতো নই, আমার প্রতিপালক আমাকে পানাহার করান।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৬৪)

৫. সাহরি খাওয়া : সাহরি খাওয়া সুন্নত আর বিলম্বে সাহরি খাওয়া উত্তম। মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা সাহরি খাও। কেননা সাহরিতে বরকত আছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯২৩)

আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনটি জিনিস নববী আখলাকের অন্তর্ভুক্ত : দ্রুত ইফতার করা, বিলম্বে সাহরি খাওয়া এবং নামাজে বাঁ হাতের ওপর ডান হাত রাখা। (তাবারানি : ২/১০৮)

৬. দ্রুত ইফতার করা : ইফতারের সময় হওয়ার পর দ্রুত ইফতার করা সুন্নত। নবীজি (সা.) বলেন, ‘মানুষ তত দিন কল্যাণের ওপর থাকবে, যত দিন তারা দ্রুত ইফতার করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৫৭)

৭. অধিক পরিমাণে দোয়া করা : মহানবী (সা.) একাধিক হাদিসে রোজাদার ব্যক্তিকে অধিক পরিমাণে দোয়া করতে বলেছেন। কেননা রোজাদারের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না : সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া, রোজাদের দোয়া ও মুসাফিরের দোয়া।’ (বায়হাকি, হাদিস : ৬৬১৯)

৮. তাহাজ্জুদ আদায় : মহানবী (সা.) রমজান মাসে অধিক পরিমাণে তাহাজ্জুদ আদায় করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানে রাত্রি জাগরণ করবে, আল্লাহ তাঁর পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় কদরের রাতে জাগ্রত থাকবে, আল্লাহ তাঁর পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৫০২৭)

৯. অন্যকে ইফতার করানো : রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করানো অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে তারও রোজাদারের মতো সওয়াব হবে। কিন্তু রোজাদারের কোনো সওয়াব কমানো হবে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৮০৭)

১০. গুনাহ পরিহার করা : রোজাদার ব্যক্তি যদি রোজার বরকত লাভ করতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই গুনাহ পরিহার করতে হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘রোজা ঢালস্বরূপ। সুতরাং অশ্লীলতা করবে না এবং মূর্খের মতো কাজ করবে না। যদি কেউ তার সঙ্গে ঝগড়া করতে চায়, তাকে গালি দেয়, তবে সে যেন দুইবার বলে, আমি রোজা পালন করছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৯৪)

১১. শেষ দশকে ইবাদতের পরিমাণ বৃদ্ধি : মহানবী (সা.) শেষ দশকে ইবাদতের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতেন এবং পরিবার-পরিজনকেও ইবাদতের প্রতি উৎসাহিত করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রমজানের শেষ দশকে মহানবী (সা.) রাত্রি জাগরণ করতেন, পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং লুঙ্গি শক্ত করে বেঁধে নিতেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১১৭৪)

১২. কদরের রাত অনুসন্ধান করা : রমজান মাসের একটি বিশেষ রাত হলো শবেকদর। এই রাতে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি দয়া করেন এবং তাদের পাপ মার্জনা করেন। রমজানের শেষ দশকে নবীজি (সা.) কদরের রাত অনুসন্ধান করতে বলেছে। তিনি বলেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকে কদরের রাত অনুসন্ধান কোরো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০২০)

আল্লাহ সবাইকে সঠিকভাবে রোজা রাখার তাওফিক দিন। আমিন।