• ই-পেপার

সবার অংশগ্রহণে হোক একুশে বইমেলা

<li>জব্বার আল নাঈম</li>

দীপান্বিতা পালিত

দুঃখ তুমি বসন্ত

দুঃখ তুমি বসন্ত

হঠাৎ বুনো মেঘ হয়ে যেতে ইচ্ছে করে,

ইচ্ছে করে তোমার সীমানা পেরিয়ে চলে যাই বহুদূর—

ভাবি, তোমায় ছেড়ে গেলে আমায় এমন যত্ন করে দুঃখ দেবে কে?

সন্ধে নামার লগ্নে বসন্ত হয়ে তুমি এলে!

অষ্টাদশীর মতো উচ্ছ্বাস এলো পলাশের গালে!

আমার হৃৎপিণ্ড এখন তোমার দখলে।

সব ফুরালে বাকি থাকে অদৃশ্য যে দান—

সে-ই তো তোমার দান...

 

 

 

তোফায়েল তফাজ্জল

ওয়ান ওয়ে

ওয়ান ওয়ে

তারাও সম্যক অবগত,

যা করছে তা সামাজিক নয়, বুনো কর্ম;

উচ্চারণ করলেও এগুলো থেকে বেরোয় দুর্গন্ধ।

তবু নিত্য ভাবে, এভাবেই কদিনে আঙুল ফুলে

ধনাঢ্যের মধ্যে হবে গণ্য।

নিষেধের জ্বলন্ত বাতিকে

বাঁ হাত দেখিয়ে বাসনার ভৃত্য বনে পৌঁছে যাবে

কাঙ্ক্ষিত বৃক্ষের কাছে, যা দাঁড়িয়ে থাকে

ফুল ও ফলের ডালি হাতে,

মনমতো খাবে, ভোগ করবে এবং দিনের শেষে

অছোঁয়া দেয়াল তুলবে এইসব পথে;

অনুতাপ করে, মালা জপে ভক্তবেশে হয়ে যাবে

সদ্যঃপ্রসূত পবিত্র শিশু।

 

অনুরূপে যারা বুনে থাকে কল্পজাল

তারা চাহিদার ঘোড়ার বাগিগতে চড়ে

ফিরে আসতে পারে কি কখনো,

আবহাওয়া থাকে কি সমুদ্র সমতল, অনুকূলে?

 

কেননা, ওয়ান ওয়ে এটি,

পথিকের পুষ্টি-ঘাটতি-ইচ্ছে পড়ে থাকে

পাহাড়ের পিচ্ছিল ঢালুতে

বা এরা বাঘের পিঠে উঠে পড়া ভুলের সওয়ারি

যাদেরকে অবেলায় গুনতে হয় শুধু

অনিবার্য মৃত্যুর প্রমাদ।

 

 

আরিফ মঈনুদ্দীন

সুখকর পরিণতি

সুখকর পরিণতি

কৈশোরের ধুলট সন্ধ্যায় যখন সমাপ্ত দিনের খেলায়

                                সাঙ্গ হয়েছিল বেলা

তখনই বপন করা হয়েছিল এদিনের বীজ

মহীরুহ না হোক, হয়েছে যা কিছু

আমিও সন্তুষ্টির শাখা-প্রশাখায় মেলে দিয়েছি নিজেকে

 

প্রতিটি ডাল—পাতার পর পাতা, কখনো বা ঘন ছায়া

ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে যায় রোদ

রৌদ্রছায়ার খেলার সাথি

আর কেউ না থাকুক—কেটেছে কিছুটা কাল

নির্জনতা অথবা মেসবাড়ির আড্ডার সাথিরা

                    আনজাম দিয়েছে আরকের

অবশেষে বটবৃক্ষের ছায়ায় এসে যোগ দিয়েছে যে

সে-ই তো পরিপূর্ণ করেছে আমাকে

 

অদ্যাবধি পান করছি আমি তাহাকে

তৃষ্ণার্ত চাতক পাখির মতন সেও পান করছে আমাকে

এ তো সামান্য নমুনা মাত্র—স্বর্গের যা কিছু আছে

সব থেকে কাঙ্ক্ষিত বাঞ্ছিত সুধা জমা হয়ে আছে তার কাছে

            ডাগরনয়না অসূর্যম্পশ্যা অপেক্ষমাণ যারা আছে।

 

 

 

বন্ধু

জাকিয়া শিমু

বন্ধু
অঙ্কন : তানভীর মালেক

হাসপাতালের এই ছোট্ট রুমটিতে অধিক শীতাতপে মাঘ মাসের মতো কড়া ঠাণ্ডা জমেছে। অস্পষ্ট ধূসর নীল রঙের একটি বাল্ব ঘরের এক কোনায় টিমটিমিয়ে জ্বলছে। আবছায়াময় এই ঘরে সুনীল বন্ধু মতিনের কুঞ্চিত হাত জোড়া যক্ষের ধনের মতো বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে বসে আছে। ওর চোখে ভরা বর্ষার জল, টলমল চোখে অপলক তাকিয়ে আছে বদ্ধ ঘরের দেয়ালের দিকে। দেয়ালের গায়ে প্রোজেক্টরে যেন ভেসে উঠেছে মস্তিষ্কের খোঁড়লে ডুবে থাকা স্মৃতিরা, যা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে বহুকাল আগের সেই হিজলতলা গাঁয়ে, তেলাকুচালতার মতো জড়াজড়ি করে মতিনের সঙ্গে নির্ভারে কেটে যাওয়া অতীত সময়ের কাছে।

হিজলতলা গাঁয়ে ওদের দুই বাড়ির সীমানা ঘেঁষে বয়সের ভারে ন্যুব্জ, ছাল-বাকলা ক্ষয়ে পড়া প্রকাণ্ড এক গাবগাছ ছিল। বড়রা বলত, গাবগাছে ভূত থাকে, যাতে ওদের ভয় ধরে। তখন অবশ্য ভূত-প্রেতে ভয় পাওয়ার বয়স ওদের। মায়েরা সন্ধ্যা না নামতে হাত-মুখ ঘষেমেজে পরিষ্কার করে জেঁতেজুঁতে অবেলায় ঘুম পাড়িয়ে রাখত। স্বভাবমতো মোরগডাকা ভোরে ঘুম ভেঙে যেত। বাড়ির বয়স্করা ভোর-সকালে নানা কাজে ব্যস্ত বলে অবাধে উঠানে যেতে বাধা ছিল না ছোটদের।

পুব আকাশে সবে আবছায়া-জাফরান রঙের ছোঁয়া লাগতে শুরু, আধো আলো-অন্ধকার হাতড়ে ভূত-প্রেতের ভয় সরিয়ে দুজন দুই বাড়ির উঠান পেরিয়ে গাবতলায় মিলিত হয় প্রতিদিন ওরা। গাবতলা বিছিয়ে থাকত নেশাতুর ধূসর সাদা রঙের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নক্ষত্রের মতো গাবফুলে। এখনো পরিষ্কার মনে আছে সুনীলের; ভরা বর্ষায় বৃদ্ধ গাছটির বাকল খসে গাছের গায়ে লেপটে থাকত। ওরা বলত, ‘মানুষের মতো গাছের আত্মা আছে, শরীর আছে। শরীর বেয়ে গন্ধ বের হয়। গন্ধ শুঁকে গাছের সুখ-দুঃখ আঁচ করা যায়। যারা গাছ ভালোবাসে, তাদের সঙ্গে গাছ কথা বলে।’ সুনীলের কাছে তা সত্য মনে হয়। আদতে গাছদের মতো মানুষের শরীরেও স্বতন্ত্র ঘ্রাণ আছে। মতিনের শরীরের গন্ধ সে টের পায়।

তখনো এ যুগের পকেটওয়ালা প্যান্ট-শার্টের পাইকারি প্রচলন শুরু হয়নি। আর ছোটদের জামা-কাপড় তো সে ক্ষেত্রে আরো এক ধাপ পিছিয়ে। তাদের জন্য গজকাপড়ে দর্জিঘরে বানানো হতো গিরা অবধি নেমে যাওয়া টেট্রন কাপড়ের রঙিন হাফপ্যান্ট। অবশ্য কালো সুতার তাকি কোমরে বেঁধে পকেটের কাজ কৌশলে পুষিয়ে নেওয়া হতো তাকিবাঁধা কোঁচরে গাবফুল গুঁজে সিঁদুর টিপের মতো বিশাল সূর্যটা দেখতে ওরা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যেত মতিনদের স্যাতলা-পড়া শান-বাঁধানো পুকুরঘাটের দিকে। ততক্ষণে পুব আকাশে গাঢ় কমলা রঙের ডিমের কুসুমের মতো সূর্যটা তার অস্তিত্ব জানান দিতে উঁকিঝুঁকি মারছে। দুই বন্ধু পুকুরঘাটে পাশাপাশি পা ঝুলিয়ে বিস্ময়ে হাঁ হয়ে দেখত সূর্যোদয়ের সেই অপার্থিব দৃশ্য।

গাঁয়ের বাড়িঘরগুলোর চারপাশ ছিল উদোম, উন্মুক্ত। ওপরে বিস্তর খোলা আকাশ, চারপাশ আদিগন্ত খোলামেলা। প্রকৃতির মতো দিলখোলা ছিল গাঁয়ের মানুষগুলো। সারা দিন মাঠের মতো বড় খোলা উঠানে ধুলো-জলে মাখামাখি কাড়াকাড়ি করে তাদের শৈশবের দুর্দান্ত সময় কেটে গেছে। সুনীল তার সামনে উপস্থিত নির্মম বাস্তবতাকে একদম ভুলে গিয়ে স্মৃতির অতল পারে পানকৌড়ির মতো টুপ করে ডুবে থাকে। এত দিনের জমা স্মৃতিরা পসর মেলে বসেছে, ঘুরে ঘুরে ভাসছে চোখের সামনে।

কাছিমের পিঠে ভর করে ওদের সময় ধীরলয়ে শৈশব থেকে কৈশোরে ফেরে। মতিন ও সুনীলের বয়সের ফারাক মাত্র চার মাস উনিশ দিনের। হিজলতলা গাঁয়ের প্রাইমারি স্কুল বাড়ি থেকে মাইলখানেকের হাঁটাপথ। দুই জোড়া ক্ষুদ্র পায়ে অতটুকু পথ পেরোতে সূর্য আসমানের মধ্যিখানে চলে আসত, তার পরও সব দিন স্কুলে যাওয়া হতো, তা কিন্তু নয়! মতিন ছোটবেলা থেকেই ছিল বয়সের তুল্যে বেশ আঁটসাঁট, শক্ত-সমর্থ, তবে একটু বেশিই যেন চপল। সুনীল ছিল তার উল্টো—বারোমেসে পীড়িত। নির্দিষ্ট সময়ের মাসখানেক আগে জন্ম নেওয়া সুনীলের সূতিকাগার থেকেই শরীর-মনে জোর ছিল বড্ড স্তিমিত। তবে মতিনের এক জোড়া নির্ভরতার হাত সুনীলের জন্য আগ বাড়িয়ে থাকত বলেই তার জীবনটা হয়ে ওঠে শরতের নির্মেঘ আকাশের মতো নির্ঝঞ্ঝাট। এত ভালোবাসা পিঠাপিঠি ভাইয়ে ভাইয়েও সহজে মেলা ভার।

গ্রাম ঘেঁষে ইছামতী নদী! একসময় সেই নদী নাকি প্রমত্তা ছিল। ওদের ছেলেবেলায় অবশ্য সেই নদীকে বড় খালের মতো দেখেছে ওরা। শীতকালে নদীর পানি শুকিয়ে তলায় চলে যায়। অল্প পানিতে মাছ আটকা পড়ে প্যাঁক-কাদায় লাফঝাঁপ করত, গাঁয়ের প্রায় সবাই দল বেঁধে মাছ ধরতে ছুটত নদীতে। এমন চিত্র প্রায় বছরই হয়েছে—সবাই হল্লা করে মাছ তাড়িয়ে ফাঁদে ফেলে যেই মাছ ধরতে যাবে, এমন মোক্ষম সময়ে সুনীল পা চেপে যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে উঠবে। পায়ে তার জিয়ল মাছের কাঁটা ফুটেছে। মতিন মাছ ধরা রেখে দৌড়ে ফিরে যায় বন্ধুর কাছে। নদীর পারে বসিয়ে সেই বয়সে অনেকটা বিজ্ঞজনের মতো বিশেষ গাম্ভীর্য মুখে এঁটে মাছের কাঁটার মন্ত্র, তাতিয়ে ওঠা সূর্যের দিকে মুখ ফিরিয়ে সুনীলকে পাঠ করায়। মন্ত্রপাঠে তো নয়, বন্ধুর ভালোবাসার স্পর্শে সুনীলের ব্যথা উড়ে যায়।

এভাবে পাখির ডানায় ভর করে দিনগুলো বেশ কেটে যায়। তখন কত আর তাদের বয়স হবে, প্রাইমারি ছেড়ে হাই স্কুলের তিন ক্লাসে সবে উঠেছে ওরা। সে বছরের ঘটনা। একদিন ভোর-সকালে হুট করে সুস্থ-সবল মানুষ সুনীলের মুদি দোকানি বাপ মরে গেল। লোকে বলল, সন্ন্যাস রোগে মরেছে। বাবা চিতায় উঠতে না উঠতে সুনীলের সুখগুলো ঝড়ে ছাই ওড়ার মতো হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার পথ রইল না। বই-খাতা সের দরে বেচে দিয়ে বাবার মুদি দোকানে কাজে লেগে গেল।

সুনীলের গায়ে বরাবর জোর কম। দোকানের ভারী কাজগুলো তাই মতিন স্কুল শেষে সেরে দিয়ে আসে। বেশ রাত করে বাজার ভাঙে। মতিন স্কুলের পড়া শেষ করে সুনীলের দোকানের ঝাঁপি টানতে বাজারে ঠিক সময়মতো চলে যায়। বাজার থেকে আঁধার রাতে জুনিপোকার আলোতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে যতটুকু সময় মেলে, দুই বন্ধু সারা দিন জমিয়ে রাখা কথার ঝুড়ি খুলে বসে। কত স্বপ্ন তাদের! সেই শৈশব থেকে মুঠো মুঠো করে জমিয়ে রাখা স্বপ্নগুলো যদিও হঠাৎ হঠাৎ আকাশের নক্ষত্র ক্ষয়ে পড়ার মতো করে ঝরে যায়, তার পরও আবার নতুন স্বপ্ন এসে তা ভরাট করে দেয়। দুজনের পথ মাঝপথে এসে হোঁচট খেয়ে বাঁক ঘুরে গেছে সেই সুনীলের বাপ চলে যাওয়ার দিন থেকে। তার পরও মতিন সুনীলের চোখে বুনে দেয় আসমান সমান স্বপ্নবৃক্ষের চারা। সুনীলের জীবনের ধুনুচি হয়ে মতিন সব সময় আগলে রাখে তাকে। মিইয়ে পড়া সুনীল বুকে বল পায়।

অনেক কিছু বদলে দিয়ে সময় বয়ে যায়। মতিন স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় ভালো ফল করে। এবং শহুরে কলেজে ভর্তি হতে বন্দোবস্ত হয়। ঠিক সে সময় মতিনের বাবার কর্কট রোগ ধরা পড়ে। ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে মস্ত বড় অফিসার বানানোর স্বপ্নটা মাঝপথে এসে থেমে যায়! মতিন সংসারের জোয়াল ধরতে শহরে চাকরির খোঁজে চলে যায়। এবং বাবার পরিচিত এক লোক ধরে পিয়নের একটা কাজও জুটিয়ে ফেলে। মতিন শহরে চলে গেলে সুনীল সারাক্ষণ জোড়াভাঙা ছানার মতো ছটফট করে।

সুনীলের মা ওদিকে আরেক কাণ্ড ঘটায়। সুনীলের দাড়ি-গোঁফ তখনো ঠিকঠাক গজায়নি, ঠোঁটের উপরিভাগে কালো রেখার দাগে কিঞ্চিৎ লোমের আঁচড় সবে পড়তে শুরু করেছে। নরম বয়স। তা ছাড়া শরীর-মন উভয়ই তার বয়সের চেয়ে বেশ পিছিয়ে আছে। বাপমরা ছেলেকে নিয়ে মায়ের উৎকণ্ঠার শেষ নেই। ছেলেকে বিয়ে দিয়ে সমস্ত দুঃখের অবসান ঘটাতে মায়ের তোড়জোড় শুরু হয়। সুনীল প্রথম প্রথম বেঁকে বসলেও পরে অবশ্য মায়ের কথার অবাধ্য হতে পারে না। মায়ের ইচ্ছা মেনে নিয়ে সে বিয়ের সম্মতি দেয় এবং মায়ের দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায়।

মতিনের দম ফেলার ফুসরত নেই। পিয়নের কাজে ছুটি পাওয়া বড় মুশকিল। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও অফিসের স্যারের ফুটফরমাশ খেটে দিন পার হয়। মাসে একবার বড়জোর দুবার গাঁয়ে ফিরতে পারলেও ছুটি মাত্র এক দিনের। একসময় কাজের ব্যস্ততায় শহুরে ইট-কাঠের খপ্পরে পড়ে শহুরে ফাঁপরজীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। শহুরে মেয়ের সঙ্গে ভাব-ভালোবাসা বিনিময়ে বিয়ে করে সংসারও পাতে। সুনীলের বন্ধুর জন্য খুব মন পোড়ে। যদিও দুই বন্ধুর প্রায় মাসে চিঠিপত্রে যোগাযোগ হয়। কিন্তু তাতে সুনীলের মন ভরে না। এরপর মাঝেমধ্যে অবশ্য সুনীল পরিবারসহ বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে শহরে যায়। কত কথা জমা হয়ে থাকে দুজনের! দুই বন্ধু বহুদিন পর পর হলেও সেই আগের মতো দিল খুলে গল্প করে। গল্পে গল্পে কখন রাত শেষে ভোর হয়, খেয়ালে থাকে না।

তারও বছরখানেক পরের এক আষাঢ়ে ডলকের সন্ধ্যাবেলা, মতিন বসে আছে তার দোকামরা ঘরের ঝুলবারান্দায়। সন্ধ্যা নামতে মাঝরাতের আঁধার জেঁকে বসেছে শহরে। বাইরে উথাল-পাথাল বৃষ্টির ঢল। আকাশে মেঘের গমগম আওয়াজ। এমন দুঃসময়ে কাকভেজা হয়ে পোস্টমাস্টার ঝুলবারান্দার ফাঁক দিয়ে তাকে একখানা হলুদ খামের চিঠি ধরিয়ে দিয়ে যায়। খামের ওপর সুনীলের ঠিকানা। চিঠির ওজন পাখির পালকের মতো হালকা। মতিনের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। সে উত্সুক হয়ে আধভেজা খামটা খুলে ফেলে। একখানা চিরকুট।

সুনীলের চিঠিগুলো সাধারণত চার-পাঁচ পৃষ্ঠার বেশি হয়। প্রায় সপ্তাহে তার চিঠি আসে, মতিন যত্ন করে বসার ঘরে টেবিলের ওপর তা রেখে দেয়। সাধারণত ছুটির দিনে ঘটা করে বিশেষ অভিনিবেশে সেই চিঠি খোলে এবং আদ্যেপান্ত পড়ে। যদিও শহুরে ব্যস্ততায় তার ঘন ঘন উত্তরপত্র লেখা হয় না, কিন্তু বন্ধু তাতে ক্ষান্ত হয় না। তার চিঠিতে হিজলতলা গাঁয়ের খুঁটিনাটি বিষয়ও বিস্তারিত লেখা থাকে। কোনো ঘটনাই বাদ থাকে না। ব্যালকনিতে অন্ধকার, সে চিরকুট নিয়ে ভেতরঘরে আলোর কাছে যায়। চিঠিটি পড়তে শুরু করলে দুলাইনি চিঠির ভারে মুহূর্তে চূড়াভাঙা পাহাড়ের মতো ধপাস করে বসে পড়ে। সুনীলের দুই কিডনিই অচল!

সুনীল মুদি দোকানি। জমিজিরাত বলতে দাদার কালানের এক কানি জমি। এরই মধ্যে সংসারে যোগ হয়েছে দুই কন্যাসন্তান। সেই জমির ওপর ভর করে চলছে চারজনের সংসার। দোকানটা বিক্রি করতে হয়েছে। তাকে রাজরোগে ধরেছে। সে বুঝতে পারে, এই রোগ তাকে চিতায় তুলে তবেই ক্ষান্ত হবে। চোখে-মুখে অমানিশার কালো আঁধার এঁটে রাত-দিন বাড়ির পুব কোণের বাঁশের মাচানে বসে থাকে। সামনের ভাবনায় জমাটবাঁধা অন্ধকারে ডুবে থাকে তার মন। পাঁজরফাটা দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে বুক। মেয়েরা সারাক্ষণ চোখের সামনে হাঁটিহাঁটি করে। বউ কান্না সামলে উঠতে মুখে শাড়ির আঁচলের খুঁট গুঁজে আবডালে লুকায়। সুনীলের অসহায় দুচোখের জল শুকিয়ে পাথর হয়। হাত-পা ফুলে ঢোল হয়ে আছে। শরীরটায় অসহনীয় কষ্ট, সে নিজেও এখন দিন-রাত মৃত্যুদূতের আগমন কামনা করে।

একদিন ভোরের আদুরে আলোয় ভর করে সুনীলের জীবনের ঘোর আঁধার কেটে আচম্বিতে সুখ ফিরে আসে। সুখ হয়ে বরাবরের মতো বন্ধু মতিন হাজির হয়। মতিনের সঙ্গে সুনীলের কিডনি মিলে যায়। যদিও এই প্রক্রিয়া মোটেও সহজ ছিল না। মতিনের বহুমূত্র রোগ ছাড়া আরো বেশ কিছু জটিলতা ছিল এবং এ কারণে তার জীবনের ঝুঁকি বিষয়ে ডাক্তারদের উদ্বেগ কম ছিল না; কিন্তু মতিনের সাহস এবং বন্ধুর প্রতি বিশুদ্ধ ভালোবাসার কাছে সমস্ত দুর্ভাবনা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। দেশে সে সময় কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট মোটেও সহজতর ছিল না। কিন্তু দেশের বাইরে চিকিৎসা নেওয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা দুই বন্ধুর নেই। অবশেষে বাধ্য হয়ে দেশের সরকারি হাসপাতালে অপারেশন হয় এবং সবকিছু ভালোয় ভালোয় শেষও হয়। সুনীল সুস্থ হয়ে হিজলতলা গাঁয়ে ফিরে আসে।

চল্লিশ বছর পর দেখা যায়, মতিনের হাতে লাল রঙের একটি ফাইল। সে ডাক্তারের চেম্বারে মাথা নুয়ে বসে আছে। অল্পবয়সী ডাক্তার সবে হয়তো প্র্যাকটিস শুরু করেছেন, তিনি  রিপোর্ট পড়ে, মতিনের নিচু হওয়া মুখের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছেন। মতিন সামনে রাখা শীতল পানির বোতল থেকে একটু বেশি শব্দ করেই কয়েক ঢোক পানি গলায় ঢেলে নিজের মধ্যে যেন দম ফেরায়। আচমকা ডাক্তারের মুখে এমন কথা শুনে সে চেষ্টা করেও স্থির থাকতে পারছে না। বয়সের ভারে কোটরে লুকানো ধূসর চোখ জোড়ায় মুমূর্ষু মানুষের মতো নিরুপায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

একটিমাত্র কিডনি তার। বাকিটা বন্ধু সুনীলের শরীরে। একমাত্র কিডনি, তা-ও কিনা বিকল হয়ে গেছে! বেশ কয়েক দিন ধরে শরীরটা ভারী হয়ে আসছিল। শরীরের জোর কমছিল খুব দ্রুত। একটুতেই হাঁপিয়ে ওঠা। ঘুম হতো না মোটেও, তার ওপর মুখে একদম রুচি নেই। কিন্তু শেষ বয়সে এসেও শরীরটা বলতে গেলে এই কদিন আগেও মোটামুটি মন্থর হয়েও চলছিল তো। শুধু ওই যে বহুমূত্র রোগটা, যা বাড়াবাড়ি রকম ভোগাত। শেষমেশ কিনা সেই চল্লিশ বছর আগেকার প্রতিধ্বনি নিজের সায়ংকালে শুনতে হলো তার একটিমাত্র কিডনি, যারও কিনা শরীরকে চালিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা প্রায় নিঃশেষ হয়ে এসেছে। নিজে মরার আগেই কিডনি মরে গেল। প্রকৃতির কী খেয়াল! যে কদিন বেঁচে থাকা, প্রতি সপ্তাহে তাকে ডায়ালিসিসের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

সপ্তাহের বুধবার সকাল ১০টায় মতিনের সময়বাঁধা ডায়ালিসিস শুরু হয়। আষাঢ়ে ডলক কিংবা জিরজিরে হাড়-কাঁপানো শীতের প্রকোপ ঠেলে হিজলতলা গাঁ থেকে সুনীল প্রতি বুধবার ভোরের আবেশ না কাটতে বন্ধুর বাসায় উপস্থিত হয়। দুহাত ভরে নিয়ে আসে বন্ধুর প্রিয় খাবার। এদিন মতিনের খাবারে কড়াকড়ি একটু কম থাকে। এই সুযোগে বন্ধুর প্রিয় খাবার বয়ে নিয়ে সেই আঁধারভোরে বাসে চেপে বসে সে। মতিনের ইদানীং সেই কবেকার খাবারের কথা খুব মনে পড়ে। মুখে আগের স্বাদ নেই, তার পরও মন চায় পছন্দের খাবার চেখে দেখার। শৈশবের জিভে লেগে থাকা মায়ের হাতের কত খাবারের কথা মনে পড়ে মতিনের। কখনো চুলার ছাইয়ে পোড়া জিয়ল মাছের ডিমের হাতে ডলা ভর্তা, লাউপাতায় চ্যাপা শুঁটকি কিংবা খেজুর গুড়ের ক্ষীর।

দুই বন্ধু বুধবারে রাজ্যের গল্প করে। ডায়ালিসিসের পুরোটা সময় সুনীল মতিনের সুঁচে-ফুটা হাতটা ধরে বসে থাকে। ও হাতে মায়াভরা নিজের হাতটা ছুঁয়ে দিলে যেন বন্ধুর কষ্টটা একটু হলেও লাঘব হয়। দূষিত রক্তস্রোত হাতে জড়ানো পাইপের ভেতর দিয়ে মেশিনে শুদ্ধ হতে চলতে শুরু করলে মতিনের চিরচেনা হাসিমাখা মুখটা কেমন বিষণ্ন হয়ে ওঠে। সুনীল বন্ধুর মন ফেরাতে জমানো কথার হাঁড়ি খুলে বসে। এই সুযোগে সেই শৈশব-কৈশোরবেলার মতো অঢেল সময় পেয়ে যায় ওরা। ফেলে আসা সেইসব দুর্দান্ত স্মৃতি হাতড়ে ডায়ালিসিসের বিরক্তিকর সময় আলগোছে পার করে দেয়। বছরখানেক এমন রুটিনে চললেও এ বছরের গোড়ার দিকে মতিনের শরীর খুব কাহিল হয়ে পড়ে। সপ্তাহে এক দিনের পরিবর্তে ডায়ালিসিস দুই দিন, এরপর তিন দিন করা হয়।

আজও ডায়ালিসিস চলছিল। সুনীল বরাবরের মতো আলাপ জমিয়ে বন্ধুকে খুশি রাখতে চেষ্টা করে। মতিন নিজের অস্থিরতা কাটাতে স্মিতহাস্যে সুনীলের মুখের দিকে তাকিয়ে গল্প শোনে। একসময় তার চোখ বুজে আসে। অবশ্য ডায়ালিসিসের সময় ক্লান্ত হয়ে প্রায়ই সে ঘুমিয়ে পড়ে। সুনীল বন্ধুর হাত ধরে চুপচাপ বসে থাকে, যাতে বন্ধু নির্ভারে ঘুমাতে পারে। অনেকটা সময় চলে গেলেও বন্ধুর ঘুম ভাঙে না। সুনীলের বুক কেঁপে ওঠে! অশুভ ভাবনা আসতে মতিনের শরীরের সঙ্গে লাগোয়া পাইপের বেয়ে চলা রক্তের দিকে তাকায়। রক্তের রং কালো কালির মতো। জমাট বেঁধে আছে পাইপের সঙ্গে। বুঝতে পারে বন্ধু চলে গেছে!