অমর একুশে বইমেলা বাংলা বইয়ের সবচেয়ে বড় উৎসব। শুধু দেশের ভূখণ্ডে নয়, বাংলাভাষী সুশীল মানুষ বইমেলার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। দীর্ঘদিনের পথচলায় শুধু ব্যবস্থাপনার নিয়ম-কাঠামো নয়, বইমেলা নিজের কিছু রীতি, বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে। ফলে বইমেলা বললেই আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যমান হয় থরে থরে সাজানো নতুন বই। লেখকদের উদ্দীপনা, পাঠকের নতুন বই সংগ্রহের বাঁধভাঙা আনন্দ—মেলার মাঠ যেন ভূমিজ সংস্কৃতির উৎস কেন্দ্র।
অমর একুশে বইমেলার সূচনা ও বিস্তারের পদরেখার পরিপ্রেক্ষিতে নিজ সংস্কৃতিতে জাগ্রত হওয়া। বিশ্বের অন্য বইমেলার শ্রেণি চরিত্রের সঙ্গে আমাদের মেলার আঙ্গিক উদ্দেশ্য ও ধরনের তফাত আছে। বইমেলার মাঠে ভিড় ঠেলে নতুন বইয়ের স্পর্শ নেবে, বই কিনবে—এটা আমাদের মেলার বহমান সংস্কৃতি। আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির সাংবৎসরিক আয়োজনে দেশের সৃজনশীল প্রকাশনা তো বটেই, সঙ্গে কাগজশিল্প, বাধাইকর্মী, প্রচ্ছদশিল্পী, সম্পাদক, মুদ্রকসহ বহু পক্ষের একটা বাণিজ্যিক প্রাপ্তিযোগ ঘটে। বিশেষত করোনা-পূর্ববর্তী দুই দশক বইমেলার পারিসংখ্যানিক তথ্য সে সাক্ষ্যই দেয়।
বাংলা একাডেমি বহুত্ববাদী চেতনায় দীপ্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর কল্যাণ-চেতনায় ঋদ্ধ প্রতিষ্ঠান। একাডেমির এমন দার্শনিক ভিত সকল অবস্থায় আমাদের জন্য আশা-জাগানিয়া একটা বড় প্ল্যাটফর্ম। বাংলা একাডেমি অধিকন্তু রূপকল্প ও অভিলক্ষ্য মোটাদাগে জ্ঞানভিত্তিক এবং ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতিমনস্ক সমাজ গঠনের ব্রত নিয়ে কাজ করে। বইমেলার বহুপক্ষীয় সৃজনশীল মানুষ ও সৃজনকর্মে নিয়োজিতদের জন্য একটা দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে কাজ করে। এসব দোহাইকে পাশে রেখে যখন দেখি নানা ঘটনা ও অঘটনার মধ্যে বাংলা একাডেমি দেশের ৩০০টির বেশি ইতোপূর্বে নিয়মিত মেলায় অংশগ্রহণ করা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে বাদ রেখেই বইমেলা শুরু করছে, তখন শুধু আশাহত হয়েছিলাম। কিন্তু সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আশ্বাসে প্রকাশকরা মেলায় অংশগ্রহণ করবে, এটা আশার কথা। সাধুবাদ জানাই মন্ত্রণালয়সহ বাংলা একাডেমিকে।
যদিও প্রকাশকদের বড় একটা অংশ যাঁরা সংখ্যা ও গুণতাত্ত্বিক বিচারে অগ্রণী, তারা নানা কারণ দেখিয়ে রমজানে বইমেলা না করার জন্য দাবি এবং দাবির পক্ষে জনমত গঠন করেছে; পক্ষান্তরে বাংলা একাডেমি রমজানের পর বইমেলা প্রাকৃতিক পরিবেশের উপযোগিতা পাবে না বলে রমজানে বইমেলা করতে বদ্ধপরিকর। বইমেলা নিয়ে এমন পরিস্থিতি এর আগে ঘটেনি।
বাংলা একাডেমি বইমেলা আয়োজনে বিধিবদ্ধ অঙ্গীকার হলো—‘জ্ঞানভিত্তিক বিদ্বৎসমাজ গঠনের লক্ষ্যে জনমানুষের কাছে প্রয়োজনীয় গ্রন্থের সহজলভ্যতার জন্য অমর একুশে বইমেলার আয়োজন’।
লাভ-ক্ষতির খতিয়ানের ব্যারোমিটার কার দিকে কতটুকু থাকবে, এই বিশ্লেষণ না করেই বলা যায়, মেলায় অংশগ্রহণে বিরত থাকা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রমজানে বইমেলার সম্ভাব্য ক্ষতির কথা ভেবেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এবং রমজান-পরবর্তী বইমেলা আর্থিক বিচারে ও অন্য বিবেচনায় ভালো বলেই সিদ্ধান্তে অনড় থেকেছিল। প্রশ্ন হলো, ২০২৬-এ যেমন ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম রমজান, ২০২৭ সালে ৭ ফেব্রুয়ারি প্রথম রমজান, ২০২৮ সালে ২৭ জানুয়ারি। তাহলে ২০২৬সহ আগামী দুই বছর রমজানে বইমেলা নিয়ে বাংলা একাডেমি ও তাদের প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের (সংস্কৃতি) দীর্ঘ পরিকল্পনা কী? এ বছর যেমন সংস্কৃতি উপদেষ্টা অদূরদর্শী চিন্তায় বইমেলাসংক্রান্ত আন্ত মন্ত্রণালয় সভা না ডেকে সরাসরি বাংলা একাডেমিতে গিয়ে বইমেলার তারিখ নির্ধারণ করে প্রথমে হোঁচট খেয়েছেন।
দূরদর্শিতা নিয়ে বইমেলার আগামী দু-তিন বছরের জন্য পরিকল্পনা হলে হয়তো সংকট এড়ানো যেত। বাংলা একাডেমি আইন দ্বারা পরিচালিত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও নীতিনির্ধারণী বড় পরিসরের সিদ্ধান্তে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীল। বইমেলার দিনক্ষণ নির্ধারণে মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় যথাযথ ছিল না। প্রকাশকদের সংগঠনের দুর্বলতাও বর্তমানে প্রকট। বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি যত দিন কার্যকর ছিল, তাদের বইমেলা আয়োজনে প্রকাশকদের প্রতিনিধিরা প্রধান অংশীজন ছিল। যৌথ দর-কষাকষির ভিত্তিতে বইমেলা আয়োজনে অংশ নিয়েছে; বড় কোনো অচলাবস্থা তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির কার্যক্রমের একটা ছোট স্ট্যান্ডিং কমিটির মাধ্যমে সৃজনশীল প্রকাশকদের কার্যক্রমের তদারক ও সমন্বয় যে যথাযথ নয়, তা তাদের কার্যক্রমেই দৃষ্ট। প্রকাশকদের বড় একটা অংশ বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির কার্যক্রমের প্রতি যথেষ্ট পরিমাণে আস্থাশীল নয়। এই সংকটই বইমেলার সময়কাল নিয়ে অচলাবস্থার একটা বড় কারণ।
বইমেলা শুরু থেকে সৃজনশীল প্রকাশনার উৎকর্ষ সাধনে সৃজনশীল প্রকাশকদের প্রধানত স্টল বরাদ্দ দিয়েছে। গত বছর থেকে ধর্মীয় বইয়ের প্রকাশকদের ব্যাপক হারে বইমেলার স্টল বরাদ্দ দিয়ে বইমেলার জন্য নতুন একটা আঙ্গিক দাঁড় করা হচ্ছে। নতুন এই ন্যারেটিভ সৃজনশীল প্রকাশক, লেখক ও পাঠকরা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেননি। তাঁদের ভাষ্য, ধর্মীয় বই প্রকাশ, বিপণন হবে—এটা কখনোই বাংলা একাডেমির বইমেলার ঐতিহ্যের পরম্পরায় উপযুক্ত স্থান নয়।
বাংলা একাডেমির ভালো কাজকে ভালো, মন্দ কাজকে মন্দ বলাই শ্রেয়। এতে একাডেমি সঠিক পথের দিশা পাবে। সম্প্রতি লাইব্রেরি, গবেষণা বৃত্তি, অনুবাদ সেলের কার্যক্রম, লেখকদের জন্য স্বল্প ভাড়ায় মিলনায়তন, শিখা পত্রিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন, নিজস্ব ফন্ট ডেভেলপমেন্ট, রেফারেন্স শৈলী নির্ধারণ ইত্যাদি আমাদের দৃষ্টি কাড়ে; কিন্তু দুর্লভ বই সংরক্ষণে অপারগতা—সর্বোপরি বইমেলাকে লেজে-গোবরে করার বিষয়টি পীড়াদায়ক।
বাংলা একাডেমি সপক্ষ সমর্থন করে হয়তো প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়, প্রকাশনা সংগঠনসহ অনেকের ওপর দায় চাপাবে, কিন্তু গড়ে বইমেলার কমবেশি ১০০ কোটি টাকার লেনদেনের যদি কমতি হয়, তার দায় নেবে কে? যেহেতু বইমেলায় ভ্রূণ বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রোথিত—এ যন্ত্রণার দায় অন্য পক্ষ অস্বীকার করলেও বাংলা একাডেমি নিরুপায়।
আমাদের ইতিহাসের খেরোখাতা খুলে দেখতে হবে, তাহলেই বইমেলার গতি-প্রকৃতি আঁচ করা যাবে। ২০১৪ সালে যখন বইমেলা বাংলা একাডেমির ক্ষুদ্র আঙিনা ছেড়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারিত হয়, তার আগে একটা পক্ষ বাংলা একাডেমির আঙিনা ছেড়ে বইমেলা বিস্তৃত না করতে দিতে বদ্ধপরিকর ছিল। তাদের আবেগে ছোট আঙ্গিকে ঢাকা ছিল বইমেলা। কিন্তু বইমেলা তো সপ্রতিভ রূপেই বিস্তৃত হয়েছে এবং ২০১৪ সালের পর মেলার আর্থিক ও সৌন্দর্যগত দিকের ব্যাপ্তি ঘটেছে।
আইন, বিধি, রীতি মানুষের জন্য। যেমন লেখক, পাঠক, প্রকাশকদের জন্য বইমেলা। বইমেলায় মানসম্মত প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ যত বাড়বে, ততই বইমেলার উৎকর্ষের বৃদ্ধি ঘটবে। এ বিষয়টি সর্বাগ্রে সবার মস্তিকে ধারণ করা মঙ্গল। এ জন্য আয়োজনের বিভিন্ন বিষয়ে স্থিতিস্থাপকতা প্রয়োজন। ১৯৮৩ সালে বইমেলার আয়োজন সম্পূর্ণ হওয়ার পরও তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার ছাত্র মিছিলে ট্রাক তুলে দেওয়ার প্রতিবাদে সে বছর বইমেলা আয়োজন সম্ভব হয়নি। করোনাকালেও বইমেলা আয়োজনের সময়ের হেরফের হয়েছে। ভালো দৃষ্টান্তও আছে অনেক। গত এক দশকে প্রকাশকদের দাবির মুখে বইমেলার সময়কাল একাধিকবার এক-দুই দিন বৃদ্ধি করে অধিক বই বিক্রির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে এবং পাঠক বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। বইমেলায় বড় পুঁজির প্রকাশকরা মুনাফাসহ ফিরতে পারলেও বিগত দিনে ছোট পুঁজির প্রকাশকদের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। কিন্তু পাঠকদের সঙ্গে যোগাযোগে দীর্ঘমেয়াদি শুভযোগ ঘটে। আর্থিক প্রাপ্তির সঙ্গে বিপুল পাঠকের যোগাযোগ একটা বড় বিষয়। শুধু বইমেলার স্টলের ভাড়া কমিয়ে বা মওকুফ করেই প্রণোদনা সম্ভব নয়। হিসাবটা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার নয়—হিসাবটা মুনাফারও বটে। সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতা, প্রচার, যোগাযোগ, পরিচিতি ইত্যাদি রয়েছে। লোকসমাগম না হলে লোকপ্রিয় বইমেলা হবে না, যে মেলায় এত দিন আমরা অভ্যস্ত ছিলাম। বাংলা একাডেমি, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও প্রকাশকদের বইমেলার মূল উদ্দেশ্য অর্থাৎ পাঠকবান্ধব একটা বইমেলার আয়োজন হোক আমরা আশা করি।