• ই-পেপার

ছিলে গল্প হলে ঠিকানা

চরের শিশুদের বাতিঘর লালমনি বিদ্যাপীঠ

তিস্তার উত্তাল স্রোত আর ভাঙন যেন এখানকার চরাঞ্চলের মানুষের নিত্যসঙ্গী। অপেক্ষাকৃত বঞ্চনা, দারিদ্র্য আর সুযোগের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বেড়ে উঠছে চরাঞ্চলের শিশুদের জীবন। সুবিধাবঞ্চিত এই শিশুদের জন্য গড়ে তুলেছেন ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’। এটি অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা কেন্দ্র। পিন্টু রঞ্জন অর্ককে সেই গল্প শুনিয়েছেন নাঈম রহমান

চরের শিশুদের বাতিঘর লালমনি বিদ্যাপীঠ
চরের শিশুদের সঙ্গে লালমনি বিদ্যাপীঠের উদ্যোক্তা নাঈম রহমান। ছবি : সংগৃহীত

আমার বাড়ি লালমনিরহাটের সদর উপজেলায়। বাড়ি থেকে ভারত সীমান্তের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। একই দূরত্বের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে দুটি বড় নদীধরলা ও তিস্তা। ভৌগোলিকভাবে দূরত্ব খুব বেশি না হলেও নদীর এপাশ আর ওপাশের মানুষের জীবনযাত্রার পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। এই বৈষম্যটি আমাকে ভাবিয়েছে।

পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আমি। এসব সংগঠনের কাজ করতে গিয়ে দেখি, অনেক শিশু স্কুলে ভর্তি হলেও দিকনির্দেশনা ও সচেতনতার অভাবে ধীরে ধীরে ঝরে পড়ছে। চরাঞ্চলের শিশুরা মেধায় নয়, পিছিয়ে সুযোগের অভাবে।

২০১৬ সাল থেকে স্কাউটিং কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে চরাঞ্চলে ত্রাণ কার্যক্রম ও নিয়মিত যাতায়াতের সুযোগ হয়। সেই সুবাদে  কাছ থেকে দেখেছি নদীর এপার-ওপারের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত বাস্তবতা কতটা ভিন্ন হতে পারে। কেন চরাঞ্চল এতটা পিছিয়ে, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই বুঝলাম, এর বড় কারণ অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব। অথচ সামান্য সচেতনতাই পারে একটি শিশুর জীবন পুরোপুরি বদলে দিতে।

এই উপলব্ধি থেকেই কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ২০২২ সালে লালমনি বিদ্যাপীঠের যাত্রা শুরু করি। তখন আমাদের বয়স মোটে ১৭ বছর। তবে কয়েক মাস না যেতেই আর্থিক সংকটের কারণে নিয়মিতভাবে কাজ চালানো সম্ভব হয়নি। এই বিরতি আমাদের থামিয়ে দেয়নি, বরং নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। এই সময়টায় আমরা চরাঞ্চলে ঘুরে ঘুরে মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক বাস্তবতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি। ধীরে ধীরে একটি সুসংগঠিত ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড় করালাম। সেখানে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, শুধু শিশুদের সহায়তা করলে টেকসই পরিবর্তন আসে না; পরিবারকে স্বাবলম্বী করাই হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

এই ধারণা থেকে খুনিয়াগাছ চরে প্রায় ৫০ জন শিশুকে নিয়ে উঠানভিত্তিক শিক্ষাকেন্দ্র চালু করলাম ২০২২ সালে। এখন তিস্তাতীরের তিনটি চরে ছয়টি শিক্ষাকেন্দ্রে প্রায় ৩০০ জন শিক্ষার্থী আছে আমাদের সঙ্গে। সেখানে নিয়মিত পাঠচক্র, আলোচনা ও সচেতনতা কার্যক্রমের পাশাপাশি শিশুদের পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানে কাজ শুরু হয়। একই সঙ্গে অভিভাবকদের বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী আয়বর্ধক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। হাঁস-মুরগি পালন, সেলাইয়ের কাজ, উন্নত কৃষি প্রশিক্ষণ, বীজ ও কৃষি উপকরণ সরবরাহের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এর ফলে পরিবারের বেকার নারী ও পুরুষরা ধীরে ধীরে আয়মুখী হন। শুরুতে শিশুদের শিক্ষাসামগ্রী দিয়ে সহায়তা করা হলেও পরিবার স্বাবলম্বী হয়ে উঠলে নিজেরাই সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় বহন করতে শুরু করেন। পাশাপাশি শিশুদের অনুপ্রেরণা দিতে তাদের ডাক্তার, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা ও সফল মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। এভাবেই লালমনি বিদ্যাপীঠ একটি সমন্বিত ও মানবিক ফ্রেমওয়ার্কে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে লালমনি বিদ্যাপীঠের কার্যক্রম মূলত স্বেচ্ছাসেবক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুদানে পরিচালিত হয়।

সব চ্যালেঞ্জের মাঝেও লালমনি বিদ্যাপীঠ চরাঞ্চলের শিশু ও তাদের পরিবারের জীবনে টেকসই পরিবর্তন আনতে পেরেছে। কয়েক শ শিশুকে  ঝরে পড়া থেকে ফেরানো, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের ঝুঁকি থেকে দূরে রাখা সম্ভব হয়েছে। অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে শিশুদের শিক্ষায় উপস্থিতি ও আগ্রহ বেড়েছে।

এ ছাড়া চরাঞ্চলের নারীদের আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার ফলে পরিবারগুলো আর ত্রাণনির্ভর নয়। এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০০ পরিবারের অভিভাবক নিজের কন্যাকে বাল্যবিবাহ দেবেন না বলে অঙ্গীকার করেছেন।

ভবিষ্যতে এই ফ্রেমওয়ার্ক নির্দিষ্ট এলাকায় বাস্তবায়ন এবং পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চলে লালমনি বিদ্যাপীঠের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে চাই আমরা।

[ দিনগুলি মোর ]

আমার মায়ের মা

আমার মায়ের মা
অলংকরণ : তানভীর মালেক

একটু বোঝার মতো বয়স হলে জানতে পারি, আমাদের মায়েরও একজন মা আছেন। দাদা-দিদিরা তাঁকে ডাকেন দিদা। দিদা নিজের ভিটাবাড়ি ফেলে পাশের দেশে চলে গেছেন আমার জন্মের কিছুকাল পরে। ওই দেশের সঙ্গে আমাদের দেশের মানুষের যাওয়া-আসা নেই পয়ষট্টি সালের এক যুদ্ধের পর থেকে। কিন্তু মাস-দুমাস বাদে চিঠি আসে; খামের ওপর থাকে বাবার নাম। ভেতরে মায়ের কাছে লেখা চিঠি। আর আমরা ছোটরা তাঁর কাছে চিঠি লিখি বছরে দুইবার। বার্ষিক পরীক্ষার ফল বেরোলে সেই খবর জানিয়ে একবার; আরেকবার দুর্গাপূজার শেষে বিজয়ার সকালে। সেই দিনটিতেও আমাদের পড়তে বসতে হয় না, কিন্তু চিঠি লিখতে বসতে হয়। কচি হাতে, শ্রীচরণেষু দিদা, আমার বিজয়ার প্রণাম নেবেন লেখা সব ভাই-বোনের চিঠি একটি খামে পোস্ট করা হয় তাঁর কাছে। দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া আর সব স্বজনের কাছেও। নিজের দেশে আত্মীয় বলতে আমাদের কেউ নেই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দিদাকে লেখা চিঠির কলেবর বাড়ে।

যাঁকে দেখিনি জন্মাবধি, যাঁর একখানা ছবিও নেই আমাদের বাড়ি, তিনি বড়ই জীবন্ত থাকেন আমাদের জীবনে। মায়ের বলা গল্প, দাদা-দিদিদের স্মৃতি, টুকরা কত জিনিস! একখানা পোস্টকার্ড, ১৯২১ সালের। নড়াইল থেকে আমার দাদুকে লিখেছেন তাঁর শ্বশুরমশাই, মানে দিদার বাবা; যাতে লেখা, মা সুবর্ণময়ীর জ্বর ছাড়িয়াছে। গতকাল পথ্য করিয়াছে। কতবার পড়েছি আমরা। সেখান থেকেই দিদার নাম জানা আমার। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যায় একগাদা বই। ১৯৬৩ সালে দাদু-দিদা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে বড় চার ভাই-বোন থলি ভর্তি করে যেসব বই এনেছিলেন মামাবাড়ির পারিবারিক সংগ্রহ থেকে; যারা আমাদের নিয়ে গেছে স্বপ্ন-আনন্দের অসামান্য জগতে; আমরা শুনেছি, পাতায় পাতায় সরস্বতী লাইব্রেরী সিল মারা বইগুলোর পেছনে দিদার যত্নের কথা।

২. নানা গলি ঘুরে নবীন মুখার্জি লেনের ৪১ নম্বর বাড়ির সামনে পৌঁছাই বেশ সকালে, শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকার ছোট মাসির বাড়ি থেকে। ভোর থেকে বৃষ্টি ছিল সেদিন। সাতসকালেই কেন যেতে হবে জানতে চাইলে মাসি বলেছিলেন, এ তোমার বাগেরহাট পেয়েছ? গেলেই উনুন ধরবে? প্রতিটি কয়লার টুকরা এখানে হিসাব করে খরচ করতে হয়। তোমার দিদা তো জানেন না তুমি যাচ্ছ? দেশে পশ্চিমবঙ্গীয় আতিথেয়তার নানা কৌতুকের সঙ্গে পরিচয় ছিল। কৃচ্ছ্রর পেছনে এক নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রপাত ছিল সেই কথোপকথন।

গলি পেরিয়ে রোয়াক, তারপর পুরনো বাড়ির একতলায় দুখানা ঘর। বড় ঘরটির লাগোয়া এক চিলতে রান্নাঘর। ফকিরহাটের মূলঘর, যেখানে কোনো দিন যাইনি, সেখানে একদিন যা ফেলে এসেছিলেন তাঁরা, বর্তমান তার কণাংশ এবং ভাড়া বাড়ি। তবু তো মামাবাড়ি! হোক না আমার বয়স আঠার। প্রথমবার আসার উচ্ছ্বাস আমাকে ঘিরে ধরে। সবাইকে প্রথমবারের মতো দেখলেও রক্তের বাঁধন অনুভব করি। দিদার সঙ্গে যোগাযোগের কারণেই হয়তো, তাঁকে চিরচেনা মনে হতে থাকে। বয়স কিংবা জীবনের ছাপ পড়েছে চুল, মেরুদণ্ড কিংবা মুখের রেখায়; তবু আমার বুঝতে অসুবিধা হয় না, মা-বাবা কেন তাঁর নাম রেখেছিলেন সুবর্ণময়ী; ডাকতেন সুবর্ণা বলে।

৩. তিন মামা চলে গেলেন যার যার অফিসে। বড় মামার দুই ছেলে স্কুলের দিকে। বড় মামি বের হলেন দুর্গাপূজার বাজার করতে। ধীরে ধীরে দিদার রান্না-খাওয়ানোর কাজ শেষ হয়ে আসে। অশীতিপর দাদুর জগৎ অনেকখানি সীমিত বড় ঘরটির একমাত্র খাটটিতে। দুপুরে তিনি খানিকটা ঘুমান। দিদার সঙ্গে গল্প করব। কত কথা জমা হয়ে আছে! মায়ের জন্য ছেলেবেলা থেকে যা করার অভ্যাস আমার, সেই মতো মাদুর পাতি, জলের গ্লাস রাখি, ভাঁজ করে রাখি দিনের পত্রিকা; পাশের ছোট ঘরে যেখানে বড় মামা-মামি থাকেন। দিনের পত্রিকা পড়তে পড়তে দুপুরে ঘুমিয়ে যাওয়া, বহুকালের অভ্যাস দিদার। খুশি হন, কিন্তু সেদিন দিদা পত্রিকা হাতে তোলেন না।

৪. তোদের পিতৃপুরুষের পয়সা-কড়ি তেমন ছিল না, তুই জানিস?’—মাথা নাড়ি আমি, কিন্তু তাঁদের বিদ্যানুরাগ ছিল। তাঁদের বাড়িকে মানুষ বলত পণ্ডিতবাড়ি। বিদ্যা ছিল বলেই দরিদ্রের পরিবারে আমি মেয়েকে বিয়ে দিতে দ্বিধা করিনি। আর একটি কারণ ছিল, সেটি তোর বাবার নাম। আমার বাবা ভোলানাথ বসু। দিদা স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর নাড়িছেঁড়া ধন উমা, ভোলানাথের সঙ্গে সংসার গড়ে শিব-পার্বতীর মতো উদাহরণ হবে।

জ্যেষ্ঠ জামাতার মধ্যে যোগীর ছায়া থাকলেও সংসারে মনোযোগ আছে, দেখেছিলেন দিদা। দেশ ছেড়ে চলে আসার আগে দেখে এসেছিলেন, শিক্ষক পরিবারের ছেলে, সফল ব্যবসায়ী হয়েছে। তাঁর বড় মেয়ের জীবনে সচ্ছলতা দেখা দিয়েছে; সংসারে আসীন হয়েছে মর্যাদায়। চৌষট্টি  থেকে একাত্তর পর্যন্ত পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক উত্থান-পতনে দুলেছে মেয়ের সংসার। বৈরী দুটি দেশের মধ্যে চিঠি চললেও কতটুকু বা জেনে ছিলেন? একাত্তর সালে তাঁর বড় নাতি-নাতনিরা সীমান্ত পেরিয়ে গিয়ে অতিক্রান্ত দুঃসময়ের সবটা জানায়নি তাঁকে। সবাই ভেবেছিল, সেটি সইতে পারবেন না তিনি। দেশ স্বাধীন হলে নাতি-নাতনিদের কারো কারোকে স্বজনরা আর ফিরতে দেয়নি।

দুই দেশের মধ্যে আসা-যাওয়া শুরু হয়েছে। তখন তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, জামাই কেন আসে না! মেয়েগুলোর খোঁজ পর্যন্ত নেয় না! প্রশ্ন, বিস্ময় পার হয়ে একসময় ক্ষোভের জন্ম দেয়। সব প্রশ্নের জবাব মেলে আটাত্তর সালের ডিসেম্বরের এক বিকেলে। স্নেহের পুত্তলী উমা যেদিন বিধবার বেশে এসে দাঁড়ায় তাঁর ঘরের দরজায়। মেয়েকে দেখে মূর্ছিতা হয়েছিলেন দিদা। অনুপুঙ্খ জেনেছিলেন এক যুগের না জানা কথা। আর ঠিক তার আট মাস পর উচ্চ মাধ্যমিক শেষে আমি এসে তাঁর কাছে বসে শুনছি নতুন করে পুরনো সেসব কথা। কতবার ভেবেছি, তোদের বাবাটা কি পাষণ্ড হয়ে গেল? শিবের মতো বাউণ্ডুলে, ঘরের খবর রাখে না? একবারও কেন মনে হয়নি এত বড় যে একটা স্বাধীনতার যুদ্ধ হলো, কত মানুষ হারিয়ে গেল চিরতরে; তোদের বাবাও চলে গেছে সেই পথে? কেন মনে হলো না?

স্ফুট-অস্ফুট কথায় শোক উথলে ওঠে। মাতৃভূমিকে ভালোবেসে নিজ ভূমে থেকে যাওয়া একজন মানুষের জীবন আখ্যান বলতে বলতে, অনিঃশেষ অশ্রুপাতে ভেসে যায় তাঁর বুক। আমি দিদার একখানা হাত দুই হাত দিয়ে ধরে চুপ করে থাকি।

ডা. মানস বসু, অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ, ঢাকা

কাইকর—এক অনন্য উদাহরণ

লেখক কাইকরের জনপ্রিয়তার আড়ালে লুকিয়ে আছেন আবদুল্লাহ আল মামুন। লেখক মানেই গরিব বা অসচ্ছল—এ ধারণা বদলে দিচ্ছেন তিনি। লেখালেখির জগতে অভিনব কিছু ঘটনারও জন্ম দিয়েছেন। পুরোদমে চালাচ্ছেন দুটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তাঁর অধীনে কাজ করে ৪৫ জন। তরুণ এই তুর্কিকে নিয়ে লিখেছেন কামরুল ইসলাম

কাইকর—এক অনন্য উদাহরণ
লেখক সম্মানী ও রয়্যালটির বিষয়েও অভিনব কিছু ঘটনা ঘটিয়েছেন মামুন। বইয়ের প্রথম কপির নিলাম করে পেয়েছেন কয়েক লাখ টাকা। বইতে যুক্ত করেছেন স্পন্সর। ছবি : সংগৃহীত

২০১৬ সাল। বয়স আর কত? যখন বিরাট দুঃসাহসেরা উঁকি দেয়, তেমনই। সে সময়ে তাঁর মনে অঙ্কুরিত হয় লেখালেখির কুঁড়ি। শুরুটা উপন্যাস দিয়ে। একই সময়ে টিভি নাটকে সহকারী পরিচালক হিসেবেও কাজ করতেন। সেই সুবাদে লিখতে শুরু করেন নাটকও। অতঃপর গল্প-কবিতার সঙ্গে নাটকসমান্তরালে চলতে থাকে মামুনের লেখালেখি।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, লেখালেখির আগে পাঠ্যবইয়ের বাইরে কোনো [গল্প, উপন্যাস ও কবিতা] পড়া হয়নি তাঁর। তবে লেখার ভূত মাথায় চাপল কিভাবে? ক্লাস ফোর থেকেই নিয়মিত পত্রিকা পড়তাম। এক দিন না পড়তে পারলে রীতিমতো অস্বস্তি লাগত। পড়ার অভ্যাস থেকেই নিজের ভেতর একটি কল্পনাশক্তি তৈরি হয়েছিল। পরে তা লেখালেখিতে রূপ নেয়। বাড়ির পাশেই [পুবাইল] শুটিং হতো, সেটি দেখে আমার এক ধরনের কৌতূহল কাজ করত। ওই কৌতূহল থেকেই নাটকের জগতে আসা। বললেন মামুন।

কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পা রাখা মামুনের পরিবার অবশ্য সমর্থনই দিয়েছিল। কারণ ছোটবেলা থেকেই তিনি মনোযোগী ছাত্র এবং ঘরকুনো। কখনো কখনো এমন হতো, টানা দেড়-দুই মাস বাড়ি থেকে বের হতেন না। কেবল পড়াশোনা আর নিজেকে নিয়েই থাকতেন। ফলে যখন তিনি কোনো কাজে বাইরে যেতেন, মা-বাবা বরং খুশিই হতেন।

নাট্যকার হিসেবে অল্প সময়েই ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। এরই মধ্যে তাঁর লেখা নাটকের সংখ্যা পেরিয়েছে ৮০। একাধিক পুরস্কারে পেয়েছেন সেরা নাট্যকারের মনোনয়নও। একদিকে নিজের ব্যবসায়িক ব্যস্ততা, অন্যদিকে বইয়ের কাজ, তাই বছর দুয়েক হলো নাটক লেখা কমিয়ে দিয়েছেন। তবে বই চলছে যথানিয়মে। এরই মধ্যে লিখেছেন ১১টিছয়টি উপন্যাস, চারটি কাব্যগ্রন্থ, আর একটি গল্পগ্রন্থ। সবচেয়ে সফল বই কোনটি? মামুনের জবাব, আমি বইয়ের সাফল্যকে সিনেমাটিক স্টাইলে দেখি, হিট বা ফ্লপ হিসেবে। সে বিচারে আমার ফিলোসফির বয়স কত অলটাইম ব্লকবাস্টার। মাত্র এক বছরে বইটি রকমারির ইতিহাসে কবিতা ক্যাটাগরিতে বেস্ট সেলিংয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছিল। এ ছাড়া কাব্যগ্রন্থ কিছু বলা যায় না ব্লকবাস্টার, আর উপন্যাস বনানী কবরস্থান হিট। 

অসামান্য পাঠকপ্রিয়তার সুবাদে দুইবার পেয়েছেন রকমারির বেস্টসেলার অ্যাওয়ার্ড। এখন তাঁর পূর্ণ মনোযোগ নতুন বই ইতিহাস বারোভাতারি নিয়ে। বইটি ঘিরে তাঁর পরিকল্পনা বিশাল। একসঙ্গে ১২ দেশে সাতটি ভাষায় প্রকাশিত হবে এটি। বাংলা ছাড়াও ইংরেজি, ফারসি, উর্দু, লাতিন, স্প্যানিশ ও হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় অনূদিত হবে। আন্তর্জাতিকভাবে বইটি অ্যামাজনের মাধ্যমে ডিস্ট্রিবিউশন করবেন তিনি। মামুন বলেন, ইতিহাস বরাবরই বিকৃত। এটি সময় ও ক্ষমতার পালাবদলে পরিবর্তিত হয়ে যায়। ধরুন, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ; একটি ঘটনা, কিন্তু দুই দেশের মানুষ এর ইতিহাস দুভাবে জানে। তো ইতিহাসের এই বিকৃত অবস্থা নিয়ে একদম প্রাচীন আমল থেকে এই সময় পর্যন্ত তথ্যবহুল একটি বই হতে যাচ্ছে এটি। আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশের উদ্দেশ্য একটিইআমি বাংলা বইয়ের জন্য একটি পথ তৈরি করে দিতে চাই। আমার বইটি সফল হোক বা না হোক, পরের লেখকরা যেন এ রাস্তাটি চেনেনএভাবেও বই করা সম্ভব।

বাংলাদেশের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে মামুনের স্পষ্ট অবস্থান। তিনি বলেন, আমাদের দেশে প্রকাশকরা মূলত ব্যবসায়ী, প্রকৃত প্রকাশক না। প্রকাশকদের কাজ হচ্ছে লেখকের মার্কেট তৈরি করা। কিন্তু এখন লেখককেই তাঁর মার্কেট তৈরি করতে হয়, প্রকাশক শুধু কাগজ ছাপানোর কাজটি করেন। দেশে কয়েক হাজার লাইব্রেরি আছে। সেগুলোতে বই ছড়িয়ে দেন। কিন্তু আমাদের প্রকাশকরা স্থানীয় বাজারটিও ধরতে পারেন না, গ্লোবাল মার্কেট তো দূরের কথা। বাংলাদেশের প্রকাশকরা বই ছাপায় আর ঘুমায়। এ কারণে লেখালেখির জায়গা নিয়ে আমি ওইভাবে আর স্বপ্ন দেখি না। আমি একটি সিস্টেম তৈরি করে দিতে চাই। ৩০ থেকে ৪০ বছর পর আমি যেন বিদেশের লাইব্রেরিতে গিয়ে আমার দেশের বই খুঁজে পাই। 

লেখক সম্মানী ও রয়্যালটির বিষয়েও অভিনব কিছু ঘটনা ঘটিয়েছেন মামুন। যেমনবইয়ের প্রথম কপির নিলাম করে পেয়েছেন কয়েক লাখ টাকা। বইতে যুক্ত করেছেন স্পন্সর। সেখান থেকেও মিলেছে মোটা অঙ্কের অর্থ। আবার বই ছাপানোর আগেই প্রকাশকের কাছ থেকে বুঝে নেন রয়্যালটির টাকা। মামুন বলেন, লেখকদের রয়্যালটি ১৫ শতাংশ। এই টাকায় একজন লেখকের সিগারেটের খরচও ওঠে না। অথচ বিদেশের লেখকরা মিলিয়ন ডলার আয় করেন। তাহলে যে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা যাবে না, সেটিতে মানুষ কেন থাকবে? সে জায়গা থেকেই আমি একটি রাস্তা তৈরির চেষ্টা করেছি। আমার বই করতে হলে চুক্তির সময় একটি টোকেন মানি দিতে হয়। আর বই বিক্রি হোক বা না হোক, ছাপানোর আগেই অগ্রিম রয়্যালটি দিতে হবে। প্রকাশকের তো বিজনেস। সুতরাং তাঁকে যথাযথ বিনিয়োগটা করতে হবে। লেখক যদি আর্থিকভাবে সচ্ছল থাকেন, তবেই তো নিশ্চিন্ত হয়ে লিখতে পারবেন। আরেকটি বিষয় চালু করলাম, সিনেমায় যেমন নায়ক-নায়িকা হিট হলে প্রযোজকরা তাঁদের নানা উপহার পাঠান; একইভাবে লেখকদেরও দিতে হবে। এসব চর্চা আমাদের এখানে নেই। লেখক বা কবি মানেই গরিব, ময়লা পাঞ্জাবি পরে এলোমেলো চলবেনএমন একটি বিষয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ প্রথা ভাঙতে চাই। আমি আমার জায়গায় সফল, আমার দেখাদেখি আরো কয়েকজন এরই মধ্যে বেশ ভালো করছেন। চেইনটি যদি সিনিয়ররা তৈরি করে যেতেন, তাহলে আমাদের এত কষ্ট করতে হতো না।

লেখালেখির বাইরে মামুনের ব্যস্ততা বিজ্ঞাপনী সংস্থা অ্যাডন্যারেট এবং একটি পোশাক কারখানা নিয়ে। দেশের প্রথম সারির বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্রচারণার কাজ করে তাঁর প্রতিষ্ঠান। সামনে রেস্তোরাঁ চালুর পরিকল্পনাও করছেন।

বয়স এখনো ত্রিশ পেরোয়নি। এর মধ্যেই এত কিছু! আমার অফিসে একজন মানুষের ছবি টাঙানো আছের্যাঁবো। তিনি লেখালেখি থেকে অবসরে গিয়েছিলেন মাত্র ২১ বছর বয়সে! সাধারণ মানুষ এই বয়সে কাজ শুরু করে। অর্থাৎ বয়স নয়, অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রমই আসল। ব্যবসা করতে আমার ভালো লাগে। ফলে পরিশ্রম কখনোই কষ্টের মনে হয় না। সারাক্ষণ আমি এসব নিয়েই থাকি, বললেন মামুন। 

মামুনের নামটি কাইকর হয়ে গেল কিভাবে? এটি আসলে তাঁর প্রথম বই বহুরূপী কাইকর থেকে। বইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম এটি। কিন্তু বইটি জনপ্রিয় হওয়ার সুবাদে পাঠকের কাছে লেখক নিজেও কাইকর হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যান। পরে এ নামেই লিখতে থাকেন। তাঁর লেখা ছড়িয়ে যাওয়ার পর অনেকে ভাবতে থাকেন, কাইকর হয়তো বহু আগের কেউ। হয়তো বেঁচেও নেই। এর কারণ বইয়ে কোনো ছবি বা লেখক পরিচিতি রাখেন না মামুন। সেখান থেকেই মানুষের কৌতূহল ও সংশয়ের সূচনা।

মামুনের ভবিষ্যৎ ভাবনা দুটি বিষয় ঘিরে। এক. দেশের লেখকদের জন্য বড় বাজার তৈরি করা। আর দুই. ব্যাবসায়িক জায়গায় আরো বড় হওয়া। কারণ তিনি মনে করেন, নিজে যদি এগিয়ে যান, দেশও তাঁর সঙ্গে এগিয়ে যাবে।

কী লিখি তোমায়

মায়াবতী

ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে লেখা আহবান করেছিল অবসরে। নির্বাচিত আরো কিছু লেখা নিয়ে দ্বিতীয় কিস্তি ছাপা হলো আজ

মায়াবতী
অলংকরণ : তানভীর মালেক

তুমি জানো কি ভোরের আলো, দুপুরের তপ্ত খররৌদ্র, বিকেলের স্নিগ্ধ অবয়ব, গোধূলির সোনালি আলোকচ্ছটা কিংবা রাতের নিস্তব্ধতাসবকিছুই যেন তোমার অনুপম প্রতিবিম্ব হয়ে ধরা দেয় আমার কাছে। ছাদের কার্নিশে উড়তে থাকা তোমার শাড়ির আঁচলের কাল্পনিক দৃশ্য আমার হৃদয়ের আঙিনায় ফাগুনের বাতাস বইয়ে দেয় সব সময়ই। গহিন সরোবরে হংসবলাকা যখন সাঁতার কেটে বেড়ায়, তখন মনের অজান্তেই আমার মানসপটে হংসবলাকার স্থলে যেন তোমাকে আর আমাকেই দেখতে পাই। বিস্তৃত ধানক্ষেতে যখন রাখাল বালক মনের আনন্দে গান ধরে, তখন সেটা গান নয়, মনে হয় তোমার-আমার প্রেমকাব্য। তুমি কি জানো, তোমার কথা বা স্মৃতি যখন মনের দুয়ারে কড়া নাড়ে, তখন আমার চিত্ত হয়ে ওঠে অশান্ত। তুমি আমার জীবনে পাওয়া সবচেয়ে সুন্দর উপহার। কারণ কিছু অনুভূতি তো পার্থিব চাওয়া-পাওয়ার অনেক ঊর্ধ্বে। প্রত্যাশা করি, তোমার জীবন ফুলের গন্ধে বিমোহিত থাকুক। স্নিগ্ধ ফুলের সুরভি ছড়িয়ে তুমি নিজের জগেক আলোকিত করে রাখো। না হয় সে ফুলের কাঁটার যন্ত্রণায় বিদ্ধ হলাম, ক্ষতবিক্ষত করে ফেললাম নিজেকে, তবু সেই ক্ষত ব্যথার বাঁশি হয়ে প্রাণে বাজবে। যখন উদাস মনে বিষণ্নতায় জর্জরিত হবে, মনে রেখো পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে কেউ হয়তো তোমার শুভ কামনায় অশ্রুসিক্ত নয়নে তার হাত দুটি সৃষ্টিকর্তার পানে তুলে রেখেছে।

রায়হান পারভেজ

উপসহকারী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক