একটু বোঝার মতো বয়স হলে জানতে পারি, আমাদের মায়েরও একজন মা আছেন। দাদা-দিদিরা তাঁকে ডাকেন দিদা। দিদা নিজের ভিটাবাড়ি ফেলে পাশের দেশে চলে গেছেন আমার জন্মের কিছুকাল পরে। ওই দেশের সঙ্গে আমাদের দেশের মানুষের যাওয়া-আসা নেই পয়ষট্টি সালের এক যুদ্ধের পর থেকে। কিন্তু মাস-দুমাস বাদে চিঠি আসে; খামের ওপর থাকে বাবার নাম। ভেতরে মায়ের কাছে লেখা চিঠি। আর আমরা ছোটরা তাঁর কাছে চিঠি লিখি বছরে দুইবার। বার্ষিক পরীক্ষার ফল বেরোলে সেই খবর জানিয়ে একবার; আরেকবার দুর্গাপূজার শেষে বিজয়ার সকালে। সেই দিনটিতেও আমাদের পড়তে বসতে হয় না, কিন্তু চিঠি লিখতে বসতে হয়। কচি হাতে, ‘শ্রীচরণেষু দিদা, আমার বিজয়ার প্রণাম নেবেন’ লেখা সব ভাই-বোনের চিঠি একটি খামে পোস্ট করা হয় তাঁর কাছে। দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া আর সব স্বজনের কাছেও। নিজের দেশে আত্মীয় বলতে আমাদের কেউ নেই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দিদাকে লেখা চিঠির কলেবর বাড়ে।
যাঁকে দেখিনি জন্মাবধি, যাঁর একখানা ছবিও নেই আমাদের বাড়ি, তিনি বড়ই জীবন্ত থাকেন আমাদের জীবনে। মায়ের বলা গল্প, দাদা-দিদিদের স্মৃতি, টুকরা কত জিনিস! একখানা পোস্টকার্ড, ১৯২১ সালের। নড়াইল থেকে আমার দাদুকে লিখেছেন তাঁর শ্বশুরমশাই, মানে দিদার বাবা; যাতে লেখা, ‘মা সুবর্ণময়ীর জ্বর ছাড়িয়াছে। গতকাল পথ্য করিয়াছে।’ কতবার পড়েছি আমরা। সেখান থেকেই দিদার নাম জানা আমার। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যায় একগাদা বই। ১৯৬৩ সালে দাদু-দিদা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে বড় চার ভাই-বোন থলি ভর্তি করে যেসব বই এনেছিলেন মামাবাড়ির পারিবারিক সংগ্রহ থেকে; যারা আমাদের নিয়ে গেছে স্বপ্ন-আনন্দের অসামান্য জগতে; আমরা শুনেছি, পাতায় পাতায় ‘সরস্বতী লাইব্রেরী’ সিল মারা বইগুলোর পেছনে দিদার যত্নের কথা।
২. নানা গলি ঘুরে নবীন মুখার্জি লেনের ৪১ নম্বর বাড়ির সামনে পৌঁছাই বেশ সকালে, শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকার ছোট মাসির বাড়ি থেকে। ভোর থেকে বৃষ্টি ছিল সেদিন। সাতসকালেই কেন যেতে হবে জানতে চাইলে মাসি বলেছিলেন, ‘এ তোমার বাগেরহাট পেয়েছ? গেলেই উনুন ধরবে? প্রতিটি কয়লার টুকরা এখানে হিসাব করে খরচ করতে হয়। তোমার দিদা তো জানেন না তুমি যাচ্ছ?’ দেশে পশ্চিমবঙ্গীয় আতিথেয়তার নানা কৌতুকের সঙ্গে পরিচয় ছিল। কৃচ্ছ্রর পেছনে এক নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রপাত ছিল সেই কথোপকথন।
গলি পেরিয়ে রোয়াক, তারপর পুরনো বাড়ির একতলায় দুখানা ঘর। বড় ঘরটির লাগোয়া এক চিলতে রান্নাঘর। ফকিরহাটের মূলঘর, যেখানে কোনো দিন যাইনি, সেখানে একদিন যা ফেলে এসেছিলেন তাঁরা, বর্তমান তার কণাংশ এবং ভাড়া বাড়ি। তবু তো মামাবাড়ি! হোক না আমার বয়স আঠার। প্রথমবার আসার উচ্ছ্বাস আমাকে ঘিরে ধরে। সবাইকে প্রথমবারের মতো দেখলেও রক্তের বাঁধন অনুভব করি। দিদার সঙ্গে যোগাযোগের কারণেই হয়তো, তাঁকে চিরচেনা মনে হতে থাকে। বয়স কিংবা জীবনের ছাপ পড়েছে চুল, মেরুদণ্ড কিংবা মুখের রেখায়; তবু আমার বুঝতে অসুবিধা হয় না, মা-বাবা কেন তাঁর নাম রেখেছিলেন সুবর্ণময়ী; ডাকতেন সুবর্ণা বলে।
৩. তিন মামা চলে গেলেন যার যার অফিসে। বড় মামার দুই ছেলে স্কুলের দিকে। বড় মামি বের হলেন দুর্গাপূজার বাজার করতে। ধীরে ধীরে দিদার রান্না-খাওয়ানোর কাজ শেষ হয়ে আসে। অশীতিপর দাদুর জগৎ অনেকখানি সীমিত বড় ঘরটির একমাত্র খাটটিতে। দুপুরে তিনি খানিকটা ঘুমান। দিদার সঙ্গে গল্প করব। কত কথা জমা হয়ে আছে! মায়ের জন্য ছেলেবেলা থেকে যা করার অভ্যাস আমার, সেই মতো মাদুর পাতি, জলের গ্লাস রাখি, ভাঁজ করে রাখি দিনের পত্রিকা; পাশের ছোট ঘরে যেখানে বড় মামা-মামি থাকেন। দিনের পত্রিকা পড়তে পড়তে দুপুরে ঘুমিয়ে যাওয়া, বহুকালের অভ্যাস দিদার। খুশি হন, কিন্তু সেদিন দিদা পত্রিকা হাতে তোলেন না।
৪. ‘তোদের পিতৃপুরুষের পয়সা-কড়ি তেমন ছিল না, তুই জানিস?’—মাথা নাড়ি আমি, ‘কিন্তু তাঁদের বিদ্যানুরাগ ছিল। তাঁদের বাড়িকে মানুষ বলত পণ্ডিতবাড়ি।’ ‘বিদ্যা ছিল বলেই দরিদ্রের পরিবারে আমি মেয়েকে বিয়ে দিতে দ্বিধা করিনি। আর একটি কারণ ছিল, সেটি তোর বাবার নাম।’ আমার বাবা ভোলানাথ বসু। দিদা স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর নাড়িছেঁড়া ধন উমা, ভোলানাথের সঙ্গে সংসার গড়ে শিব-পার্বতীর মতো উদাহরণ হবে।
জ্যেষ্ঠ জামাতার মধ্যে যোগীর ছায়া থাকলেও সংসারে মনোযোগ আছে, দেখেছিলেন দিদা। দেশ ছেড়ে চলে আসার আগে দেখে এসেছিলেন, শিক্ষক পরিবারের ছেলে, সফল ব্যবসায়ী হয়েছে। তাঁর বড় মেয়ের জীবনে সচ্ছলতা দেখা দিয়েছে; সংসারে আসীন হয়েছে মর্যাদায়। চৌষট্টি থেকে একাত্তর পর্যন্ত পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক উত্থান-পতনে দুলেছে মেয়ের সংসার। বৈরী দুটি দেশের মধ্যে চিঠি চললেও কতটুকু বা জেনে ছিলেন? একাত্তর সালে তাঁর বড় নাতি-নাতনিরা সীমান্ত পেরিয়ে গিয়ে অতিক্রান্ত দুঃসময়ের সবটা জানায়নি তাঁকে। সবাই ভেবেছিল, সেটি সইতে পারবেন না তিনি। দেশ স্বাধীন হলে নাতি-নাতনিদের কারো কারোকে স্বজনরা আর ফিরতে দেয়নি।
দুই দেশের মধ্যে আসা-যাওয়া শুরু হয়েছে। তখন তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, জামাই কেন আসে না! মেয়েগুলোর খোঁজ পর্যন্ত নেয় না! প্রশ্ন, বিস্ময় পার হয়ে একসময় ক্ষোভের জন্ম দেয়। সব প্রশ্নের জবাব মেলে আটাত্তর সালের ডিসেম্বরের এক বিকেলে। স্নেহের পুত্তলী উমা যেদিন বিধবার বেশে এসে দাঁড়ায় তাঁর ঘরের দরজায়। মেয়েকে দেখে মূর্ছিতা হয়েছিলেন দিদা। অনুপুঙ্খ জেনেছিলেন এক যুগের না জানা কথা। আর ঠিক তার আট মাস পর উচ্চ মাধ্যমিক শেষে আমি এসে তাঁর কাছে বসে শুনছি নতুন করে পুরনো সেসব কথা। ‘কতবার ভেবেছি, তোদের বাবাটা কি পাষণ্ড হয়ে গেল? শিবের মতো বাউণ্ডুলে, ঘরের খবর রাখে না? একবারও কেন মনে হয়নি এত বড় যে একটা স্বাধীনতার যুদ্ধ হলো, কত মানুষ হারিয়ে গেল চিরতরে; তোদের বাবাও চলে গেছে সেই পথে? কেন মনে হলো না?’
স্ফুট-অস্ফুট কথায় শোক উথলে ওঠে। মাতৃভূমিকে ভালোবেসে নিজ ভূমে থেকে যাওয়া একজন মানুষের জীবন আখ্যান বলতে বলতে, অনিঃশেষ অশ্রুপাতে ভেসে যায় তাঁর বুক। আমি দিদার একখানা হাত দুই হাত দিয়ে ধরে চুপ করে থাকি।
ডা. মানস বসু, অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ, ঢাকা




