আমার বাড়ি লালমনিরহাটের সদর উপজেলায়। বাড়ি থেকে ভারত সীমান্তের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। একই দূরত্বের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে দুটি বড় নদী—ধরলা ও তিস্তা। ভৌগোলিকভাবে দূরত্ব খুব বেশি না হলেও নদীর এপাশ আর ওপাশের মানুষের জীবনযাত্রার পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। এই বৈষম্যটি আমাকে ভাবিয়েছে।
পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আমি। এসব সংগঠনের কাজ করতে গিয়ে দেখি, অনেক শিশু স্কুলে ভর্তি হলেও দিকনির্দেশনা ও সচেতনতার অভাবে ধীরে ধীরে ঝরে পড়ছে। চরাঞ্চলের শিশুরা মেধায় নয়, পিছিয়ে সুযোগের অভাবে।
২০১৬ সাল থেকে স্কাউটিং কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে চরাঞ্চলে ত্রাণ কার্যক্রম ও নিয়মিত যাতায়াতের সুযোগ হয়। সেই সুবাদে কাছ থেকে দেখেছি নদীর এপার-ওপারের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত বাস্তবতা কতটা ভিন্ন হতে পারে। কেন চরাঞ্চল এতটা পিছিয়ে, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই বুঝলাম, এর বড় কারণ অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব। অথচ সামান্য সচেতনতাই পারে একটি শিশুর জীবন পুরোপুরি বদলে দিতে।
এই উপলব্ধি থেকেই কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ২০২২ সালে লালমনি বিদ্যাপীঠের যাত্রা শুরু করি। তখন আমাদের বয়স মোটে ১৭ বছর। তবে কয়েক মাস না যেতেই আর্থিক সংকটের কারণে নিয়মিতভাবে কাজ চালানো সম্ভব হয়নি। এই বিরতি আমাদের থামিয়ে দেয়নি, বরং নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। এই সময়টায় আমরা চরাঞ্চলে ঘুরে ঘুরে মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক বাস্তবতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি। ধীরে ধীরে একটি সুসংগঠিত ফ্রেমওয়ার্ক দাঁড় করালাম। সেখানে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, শুধু শিশুদের সহায়তা করলে টেকসই পরিবর্তন আসে না; পরিবারকে স্বাবলম্বী করাই হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
এই ধারণা থেকে খুনিয়াগাছ চরে প্রায় ৫০ জন শিশুকে নিয়ে উঠানভিত্তিক শিক্ষাকেন্দ্র চালু করলাম ২০২২ সালে। এখন তিস্তাতীরের তিনটি চরে ছয়টি শিক্ষাকেন্দ্রে প্রায় ৩০০ জন শিক্ষার্থী আছে আমাদের সঙ্গে। সেখানে নিয়মিত পাঠচক্র, আলোচনা ও সচেতনতা কার্যক্রমের পাশাপাশি শিশুদের পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানে কাজ শুরু হয়। একই সঙ্গে অভিভাবকদের বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী আয়বর্ধক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। হাঁস-মুরগি পালন, সেলাইয়ের কাজ, উন্নত কৃষি প্রশিক্ষণ, বীজ ও কৃষি উপকরণ সরবরাহের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এর ফলে পরিবারের বেকার নারী ও পুরুষরা ধীরে ধীরে আয়মুখী হন। শুরুতে শিশুদের শিক্ষাসামগ্রী দিয়ে সহায়তা করা হলেও পরিবার স্বাবলম্বী হয়ে উঠলে নিজেরাই সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় বহন করতে শুরু করেন। পাশাপাশি শিশুদের অনুপ্রেরণা দিতে তাদের ডাক্তার, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা ও সফল মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। এভাবেই লালমনি বিদ্যাপীঠ একটি সমন্বিত ও মানবিক ফ্রেমওয়ার্কে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে লালমনি বিদ্যাপীঠের কার্যক্রম মূলত স্বেচ্ছাসেবক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুদানে পরিচালিত হয়।
সব চ্যালেঞ্জের মাঝেও লালমনি বিদ্যাপীঠ চরাঞ্চলের শিশু ও তাদের পরিবারের জীবনে টেকসই পরিবর্তন আনতে পেরেছে। কয়েক শ শিশুকে ঝরে পড়া থেকে ফেরানো, শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের ঝুঁকি থেকে দূরে রাখা সম্ভব হয়েছে। অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে শিশুদের শিক্ষায় উপস্থিতি ও আগ্রহ বেড়েছে।
এ ছাড়া চরাঞ্চলের নারীদের আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার ফলে পরিবারগুলো আর ত্রাণনির্ভর নয়। এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০০ পরিবারের অভিভাবক নিজের কন্যাকে বাল্যবিবাহ দেবেন না বলে অঙ্গীকার করেছেন।
ভবিষ্যতে এই ফ্রেমওয়ার্ক নির্দিষ্ট এলাকায় বাস্তবায়ন এবং পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চলে লালমনি বিদ্যাপীঠের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে চাই আমরা।





