একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূলভিত্তি হলো সংবিধান ও আইনের শাসন। কোনো রাষ্ট্রে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন হলে পৃথিবী তাকে অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবেই দেখে থাকে। নিকট অতীতে বাংলাদেশে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন করার অনেক অপচেষ্টা হয়েছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন হিমালয়ের মতো দৃঢ়তা নিয়ে সেসব অপচেষ্টা প্রতিরোধ করেছেন। তাঁকে সহযোগিতা করেছে দেশের প্রধান গণতান্ত্রিক শক্তি ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের সমমনা দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব। রাষ্ট্রপতিকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী। তিন বাহিনীর প্রধানরা বরাবরই তাঁর পাশে থেকেছেন। গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠে প্রকাশিত ‘চমকানো তথ্য দিলেন রাষ্ট্রপতি’ শিরোনামে প্রকাশিত একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি এমন আরো অনেক বিষয় তুলে ধরেছেন, যা একটি সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনোভাবেই কাম্য ছিল না।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়চিত্তে আমার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলাম, যে কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি। বিশেষ করে অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে উপড়ে ফেলার অসংখ্য ছক ব্যর্থ হয়েছে।’ সে সময় একটি পক্ষের লোকজন নানা নামে রাষ্ট্রপতির অপসারণ চেয়েছে, বঙ্গভবনের সামনে অবরোধ সৃষ্টি করেছে, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারেরও কেউ কেউ নানাভাবে তাঁকে হেয় করার চেষ্টা করেছেন, রীতি-রেওয়াজ ভেঙে বিদেশি মিশনগুলো থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি নামিয়ে ফেলা হয়েছে, তাঁকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের আমন্ত্রণ রক্ষা করতে দেওয়া হয়নি—এমন আরো অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তাঁরা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।’
সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘তারা বিভিন্ন সময় আমার কাছে এসে আমাকে মনোবল দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকে আরেকবার আমাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে শুনেছি। তখনো তিন বাহিনীর প্রধানরা আমার পক্ষে অবস্থান নেন।’
রাষ্ট্রপতি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আচরণ ছিল অনেকটাই অসৌজন্যমূলক। তিনি বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা সংবিধানের কোনো বিধান মেনে চলেননি। সংবিধানে বলা আছে, উনি যখনই বিদেশ সফরে যাবেন, সেখান থেকে ফিরে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবেন এবং আমাকে ওই আউটপুটটা জানাবেন। কী আলোচনা হলো, কী হলো, কোনো চুক্তি হলো কি না, কী ধরনের কথাবার্তা হলো, এটা আমাকে লিখিতভাবে অবহিত করার কথা। তো, উনি তো বোধ হয় ১৪-১৫ বার বিদেশ সফরে গেছেন। একবারও আমাকে জানাননি। একবারও আমার কাছে আসেননি।’
আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছি, অনেক অপচেষ্টা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা হারায়নি। এখন রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার। আমরা আশা করি, গত দেড় বছরে করা অধ্যাদেশ, চুক্তি ও অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করা হবে এবং সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু থাকলে সেসব বাতিল করা হবে।

