ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
অনার্সের প্রথম তিন বছর নাভিদ ছিলেন ক্লাসের সবচেয়ে অমনোযোগী শিক্ষার্থীদের একজন। দ্বিতীয় বর্ষে একটি বিষয়ে একাধিকবার ফেল করেন। ফেল করেন তৃতীয় বর্ষেও। পড়াশোনার পাশাপাশি এলাকায় মোবাইল রিচার্জের দোকান চালাতেন। একপর্যায়ে পড়াশোনায় মন দেন। অনার্সের চতুর্থ বর্ষেই ঘুরে দাঁড়ান। আগের দুই বছরে যেসব বিষয়ে ফেল করেছিলেন, এবার সেগুলোতে পাস করেন। শুধু তাই নয়, অনার্সের চার বছরের মধ্যে অর্জন করেন সর্বোচ্চ পয়েন্ট। নাভিদের উপলব্ধি—চাইলে জীবনে অনেক কিছুই করা সম্ভব। তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল। এরই ধারাবাহিকতায় সফল হন বিসিএসেও।
সফল ক্যারিয়ার
অনার্স সম্পন্ন করে ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত খুলনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে তিন বছর ক্রাফট ইনস্ট্রাক্টরের দায়িত্ব পালন করেন নাভিদ। ৪১তম বিসিএস ছিল তার প্রথম বিসিএস। প্রথমবারেই নন-ক্যাডার ইনস্ট্রাক্টর (পদার্থবিজ্ঞান) পদে নিয়োগ পান। দ্বিতীয় বিসিএস অর্থাৎ ৪৩তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন। পরবর্তী বিসিএসেও ভাইভায় ডাক পেয়েছিলেন; কিন্তু ইতোমধ্যে পছন্দের ক্যাডার পেয়ে যাওয়ায় আর ভাইভা দেননি। আগে থেকেই তার বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন, তাই অন্যকোনো চাকরিতে তেমন আবেদন করেননি।
পরীক্ষার জন্য পরিকল্পিত প্রস্তুতি
প্রিলিমিনারি : প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে প্রথমে তিনি বিগত বছরের বিসিএস প্রশ্নপত্রের কাঠামো বিশ্লেষণ করেন। গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো বাছাই করে বিষয়ভিত্তিক বই থেকে সম্পূর্ণ অধ্যায় দাগিয়ে পড়েন। পরবর্তী ধাপে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো হাইলাইট করে আলাদা মনোযোগ দেন। একই সঙ্গে বিগত এক দশকের জব সলিউশন বা প্রশ্ন ব্যাংক নিয়মিত সমাধান করেন। তিনি অনলাইন ও অফলাইন—উভয় মাধ্যমেই নমুনা প্রশ্নে মডেল পরীক্ষায় অংশ নেন। নতুন ও আনকমন প্রশ্নগুলোর উত্তর আলাদাভাবে নোট করে বারবার রিভিশন দেন তিনি। সময় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে—প্রথম এক ঘণ্টায় গণিত ও মানসিক দক্ষতা বাদ দিয়ে বাকি যেসব প্রশ্নে তিনি নিশ্চিত ছিলেন, সেগুলোর উত্তর দিতেন। পরবর্তী ত্রিশ মিনিটে গণিত ও মানসিক দক্ষতার অংশ শেষ করতেন। এরপর নিশ্চিতভাবে দেওয়া উত্তরের সংখ্যা গণনা করতেন। শেষ ত্রিশ মিনিটে সম্ভাব্য কাটমার্ক বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় বাকি নম্বর পূরণের লক্ষ্যে প্রশ্ন দাগাতেন। এ ক্ষেত্রে যেসব প্রশ্নের উত্তর সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা ফিফটি-ফিফটি, সেগুলোতে জোর দিতেন। সাধারণত তিনি প্রিলিতে ১৪৫ থেকে ১৫৫টির বেশি প্রশ্নের উত্তর দিতেন না।
লিখিত : নাভিদ বলেন, ‘লিখিত পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকাশনীর বই পড়ার পাশাপাশি অনলাইন থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে তা সংক্ষিপ্ত নোট আকারে প্রস্তুত করতাম। উত্তর লেখার সময় সৃজনশীলতা ও স্পষ্টতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। মানচিত্র, তথ্য-উপাত্ত ও প্রাসঙ্গিক উক্তি ব্যবহার করে উত্তরের গুণগত মান বৃদ্ধির চেষ্টা করেছি।’
খাতায় লেখার ক্ষেত্রে যথাসাধ্য সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা ও নির্ভুলতা বজায় রাখতেন। উত্তর লেখার ক্ষেত্রে মূল বক্তব্যগুলো বুলেট পয়েন্টে উপস্থাপন করতেন এবং প্রয়োজনে একাধিক কালির ব্যবহার করতেন। দীর্ঘ লেখা গঠনের পরিবর্তে প্রশ্নের মূল উত্তর পয়েন্ট আকারে, সুসংগঠিত ও নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করাকে তিনি অগ্রাধিকার দিতেন। উত্তরের শুরু ও শেষে নীল কালিতে প্রাসঙ্গিক উক্তি ব্যবহার, অর্থনৈতিক সমীক্ষা বা অন্যান্য উৎস থেকে ছক আকারে ডাটা উপস্থাপন, সম্ভাব্য সমস্যা ও সমাধান এবং নিজের সুপারিশগুলো স্পষ্টভাবে লিখতে তিনি গুরুত্ব দিতেন। তিনি জানান, প্রতিদিন নিয়মিত লেখালিখির অভ্যাস এবং ইংরেজি পত্রিকার অনুবাদের চর্চা ইংরেজি পরীক্ষায় বিশেষ করে অনুবাদ অংশে নম্বর বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
ভাইভা : ভাইভা পরীক্ষার জন্য নিজ জেলার ইতিহাস ও বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে ধারণা নেন নাভিদ। একই সঙ্গে স্নাতক পর্যায়ে পঠিত বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, মুক্তিযুদ্ধ ও পছন্দের শীর্ষ দুইটি ক্যাডার নিয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতেন। ইংরেজিতে কথোপকথনে স্বাচ্ছন্দ্য অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিদিন নিজে নিজে চর্চা করতেন। ভাইভায় তিনি আত্মবিশ্বাস, আই-কন্টাক্ট এবং হাসি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিতেন। নিজ জেলা, নিজ বিষয়, মুক্তিযুদ্ধ এবং পছন্দের ক্যাডারের সঙ্গে নিজের যোগসূত্র ও প্রাসঙ্গিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। কেন ওই ক্যাডারকে প্রথম পছন্দ করেছেন, নিজেকে কিভাবে সেই ক্যাডারের জন্য উপযুক্ত মনে করেন এবং চাকরি পেলে দায়িত্ব পালনের পরিকল্পনা কী—এই বিষয়গুলো যাতে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারেন, সেই প্রস্তুতি ছিল তার।
রুটিন ও সময় ব্যবস্থাপনা
গড়ে প্রতিদিন আনুমানিক ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় দিতেন তিনি। অন্য চাকরিতে থাকা অবস্থায় বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। তাই মূল পড়াশোনার সুযোগ হতে সন্ধ্যার পর। তার মতে, প্রতিদিনের নির্ধারিত পড়ার অংশটি ভালোভাবে বুঝে আয়ত্ত ও আত্মস্থ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাছে পড়াশোনার সময়ের চেয়ে প্রস্তুতির গুণগত মানই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পড়াশোনার ক্ষেত্রে তিনি শর্টকাট সিলেবাস এড়িয়ে প্রথমে বিষয়গুলো বিস্তারিত পড়তেন বোঝার জন্য।
প্রার্থীদের জন্য পরামর্শ
কেবল বিসিএসকেন্দ্রিক প্রস্তুতিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রথম শ্রেণির একজন দক্ষ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হওয়া। পাশাপাশি প্রচণ্ড ধৈর্যশীল হয়ে ওঠার পরামর্শ দেন তিনি। কারণ এ গুণটি প্রস্তুতির চেয়েও কর্মক্ষেত্রে আরো বেশি কাজে আসে। তিনি মনে করেন, যা-ই পড়া হোক না কেন—মনোযোগ দিয়ে, বুঝে এবং জানার উদ্দেশ্যে পড়া জরুরি। এমনভাবে পড়তে হবে, যেন প্রয়োজনে অন্যকে শেখানো যায়। নিত্যনতুন বই কেনার চেয়ে একই বই বারবার দাগিয়ে পড়াকে তিনি বেশি কার্যকর বলে মনে করেন। একই সঙ্গে যত বেশি সম্ভব, মডেল টেস্টে অংশ নিতে হবে। পরীক্ষায় ভালো করার জন্য দরকার—সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য, যথাসাধ্য পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাস। প্রস্তুতির পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপকে সহজভাবে দেখতে হবে। একবারে অনেক দূরের চিন্তা না করে ছোট ছোট ধাপে এগিয়ে যেতে হবে। তাহলেই সফল হওয়া যাবে। নিজের লক্ষ্য ও প্রস্তুতির মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।





