
পার্বত্য ৩ জেলায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ফলাফল : ২০২৬

ব্রিটেনের সভ্য সংস্কৃতিই তারেক রহমানের বদলে যাওয়ার নেপথ্যে
ব্রিটিশ রাজনীতির শীর্ষ ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনযাপন কাছ থেকে দেখেছেন তারেক রহমান। তাই দেশে ফিরে তাঁর সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়া কিংবা বিমান থেকে নেমে নিজের লাগেজ নিজে বহন করা—এসবকেই ব্রিটেনে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কারের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা

দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত বা দলীয় অধ্যায়ের পরিবর্তন নয়, বরং নেতৃত্বের ধরন ও রাজনৈতিক আচরণের এক দৃশ্যমান রূপান্তরের গল্প। বিমান থেকে নেমে নিজের লাগেজ নিজে বহন করা, জনসভায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে অনায়াসে মিশে যাওয়া কিংবা ডায়েসে তুলে সরাসরি তাদের কথা শোনা—এসব দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেমন আলোড়ন তুলেছে, তেমনি বিশ্লেষকদের চোখে এটি ব্রিটেনে কাটানো সময়ের প্রভাবেই গড়ে ওঠা এক নতুন রাজনৈতিক বার্তা। প্রবাসের অভিজ্ঞতা, ব্রিটিশ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সংস্পর্শ এবং দীর্ঘ সময়ের দূরবর্তী নেতৃত্ব, সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ভাবনায় যে পরিবর্তন এসেছে, সেটিই এখন বিএনপির রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সম্প্রতি নির্বাচনী সফরের সময় দেখা গেছে, বিমান থেকে নেমে নিজের লাগেজ নিজেই টেনে নিচ্ছেন তারেক রহমান। অনেকেই লাগেজটি নিতে এগিয়ে এলেও তিনি তা কাউকে দেননি। এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে দ্রুতই ভাইরাল হয়। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে ট্রল করলেও অনেকের কাছে এটি হয়ে ওঠে এক ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক বার্তা। একইভাবে কখনো জনসভায় দর্শক সারি থেকে হঠাত্ একজন নারী কিংবা পুরুষকে ডেকে ডায়েসে এনে তাঁর কথা শোনা, আবার হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছেলের অনায়াসে মিশে যাওয়ার দৃশ্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ব্রিটেনের রাজনীতি ও জীবনধারার গভীর প্রভাব। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনে ব্রিটেনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তারেক রহমানকে ভিন্নভাবে গড়ে তুলেছে। ব্রিটেনের রাজনীতি ও বাংলাদেশের রাজনীতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী কিংবা এমপি—কারো জন্যই পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এক মিনিটও অপেক্ষা করে না। নিয়ম ভাঙলে সাধারণ মানুষের মতোই জরিমানা দিতে হয়। বাস ও ট্রেনে মন্ত্রী-এমপিদের সাধারণ মানুষের সঙ্গে চলাচল সেখানে নিত্যদিনের দৃশ্য। বিপরীতে বাংলাদেশে একজন মন্ত্রী বা এমপির জন্য বিমানের সূচি পরিবর্তনের ঘটনাও বিরল নয়।
দলীয় সূত্র জানায়, তারেক রহমান নিজেও ব্রিটেনে নিয়মিত বাস ও ট্রেনে চলাচল করেছেন। ব্রিটিশ রাজনীতির শীর্ষ ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনযাপন তিনি কাছ থেকে দেখেছেন। তাই দেশে ফিরে তাঁর সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়া কিংবা বিমান থেকে নেমে নিজের লাগেজ নিজে বহন করা—এসবকেই ব্রিটেনে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কারের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পথে। এই অভিষেক শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং ব্রিটেনে কাটানো সময় তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, নেতৃত্বের ভাষা ও রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণায় যে পরিবর্তন এনেছে, তারই আনুষ্ঠানিক প্রকাশ।
ব্রিটেনে কেমন কেটেছে তারেক রহমানের নির্বাসিত ১৭ বছর? সেই তথ্য খুঁজতে গেলে জানা গেছে, ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার ও শারীরিক নির্যাতনের পর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিত্সার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে যান তারেক রহমান। চিকিত্সা সফর হিসেবে শুরু হলেও দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেটিই রূপ নেয় দীর্ঘ নির্বাসনে। একদিকে কারাগারে বন্দি ও গুরুতর অসুস্থ মা বেগম খালেদা জিয়া, অন্যদিকে দেশে শত শত নেতাকর্মীর কারাবাস, এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই কেটেছে তাঁর নির্বাসিত জীবন। নির্বাসনে থেকেও তিনি দলীয় রাজনীতি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। অনলাইন বৈঠক, নিয়মিত নির্দেশনা ও সাংগঠনিক তদারকির মাধ্যমে বিএনপিকে সংগঠিত রাখা, আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যত্ রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা তৈরিতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং পরে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরও যুগপত্ আন্দোলন, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও কৌশল নির্ধারণে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় নেতাদের মতে, ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার ও উন্নয়ন পরিকল্পনাও এই দীর্ঘ নির্বাসিত সময়ের রাজনৈতিক চিন্তারই ফসল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন এমবিই কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তারেক রহমান নিয়মিত পাবলিক ট্রান্সপোর্টে বাস ও ট্রেনে যাতায়াত করতেন। এই অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও এমপিরা কিভাবে কোনো বিশেষ প্রটোকল ছাড়াই সাধারণ মানুষের সঙ্গে একই পরিবহন ব্যবস্থায় চলাচল করেন। ক্ষমতার আড়ম্বর নয়, বরং সেবাভিত্তিক রাজনীতিই যে গণতন্ত্রের শক্ত ভিত্তি—এই উপলব্ধি তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।’
এই অভিজ্ঞতার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় দেশে ফেরার পরও। বিমান থেকে নেমে নিজের লাগেজ নিজে বহন করা, সাধারণ যাত্রীর মতো বিমানবন্দর ত্যাগ করা কিংবা বিভিন্ন সময়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলা—এসবই রাজনীতিতে ভিন্ন বার্তা দিয়েছে।
যুক্তরাজ্য বিএনপি নেতারা জানান, নির্বাসনের সবচেয়ে কঠিন সময় আসে যখন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে বন্দি হন এবং একাধিক জটিল রোগে আক্রান্ত হন। দূরে থেকেও তাঁর চিকিত্সা নিয়ে আইনজীবী, চিকিত্সক, পারিবারিক সদস্য ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন তারেক রহমান। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও উন্নত চিকিত্সার দাবিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিদেশি কূটনৈতিক মহলেও নীরব কূটনৈতিক তত্পরতা চালানো হয়। ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি উন্নত চিকিত্সার জন্য খালেদা জিয়া লন্ডনে পৌঁছলে দীর্ঘদিন পর মা-ছেলের সাক্ষাত্ হয়। ওই সময়ে নিজ হাতে মায়ের চিকিত্সা তদারকি করেন তারেক রহমান। চিকিত্সা শেষে দেশে ফেরার সময় লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে নিজে গাড়ি চালিয়ে মাকে পৌঁছে দেন তিনি। নির্বাসনের দীর্ঘ সময়ে তারেক রহমান ব্যক্তিজীবনে সংযত ও পরিকল্পিত জীবন যাপন করেন। ধর্মীয় অনুশাসনে নিয়মিত থাকা, গভীর পাঠাভ্যাস বজায় রাখা এবং ব্রিটেনের সংসদীয় গণতন্ত্র ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। এই সময়টাই তাঁকে রাজপথের রাজনীতির বাইরে থেকেও রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।
দলীয় নেতারা বলছেন, এই ১৭ বছর যদি তিনি দেশে কাটাতেন, তবে রাজনৈতিক মামলার বাস্তবতায় হয়তো তাঁকে দীর্ঘ সময় কারাগারেই থাকতে হতো। সে ক্ষেত্রে জিয়া পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁর জীবনে এমন পরিবর্তন আসা কঠিন ছিল। কারণ বাংলাদেশের বাস্তবতায় সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ছেলের এমন স্বাভাবিক চলাফেরা কল্পনাই করা যায় না। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে তা শুধু একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে আচরণ, নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনে পরিবর্তনের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হবে—এমনটাই মনে করছেন বিলেতে থাকা দলের শীর্ষ নেতারা।
যুক্তরাজ্য বিএনপির আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থেকেও তারেক রহমান কখনো দলীয় নেতৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। বরং কঠিন সময়েই তিনি বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন। দল পুনর্গঠন, আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ এবং ভবিষ্যত্ রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা তৈরিতে তাঁর ভূমিকা ছিল সুস্পষ্ট।’
তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিজীবনে তারেক রহমান অত্যন্ত সংযত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। নামাজের সময় হলে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক থাকলেও তিনি তা আদায়কে অগ্রাধিকার দেন। নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ ছিল ব্যতিক্রমী। তাঁর স্মরণশক্তি অত্যন্ত প্রখর, যুক্তরাজ্যে বসে পুরো দেশের সাংগঠনিক পরিস্থিতি এবং দেশ গঠনের পরিকল্পনা যেভাবে তিনি সামলাতেন, তা আমাদের জন্য বিস্ময়কর।’
বিএনপি সদস্যসচিব খসরুজ্জামান খসরু বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসনের এই দীর্ঘ সময় তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রভাবকে আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। তিনি ব্রিটেনের রজনীতি চর্চা করেছেন। স্বাভাবিক চলাফেরা রপ্ত করা—এটা ব্রিটেনের রাজনৈতিক চর্চার ফসল। খসরু বলেন, তিনি প্রচুর বই পড়তেন, ব্রিটেনে রাজনীতি অনুসরণ করতে। তিনি ১৭ বছর পরিবারকে সময় দেওয়া ছাড়া বাকি পুরো সময়টুকুই রাজনৈতিক চর্চা করে কাটিয়েছেন। ব্রিটেনের রাজনৈতিক পথচলা আগামীর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সহায়তা করবে, দেশ উন্নত বিশ্বের মতো এগিয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশাও করেন এ নেতা।
শোভাযাত্রা


