
মারীন আজফার জারীফ, দ্বিতীয় শ্রেণি, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল, ঢাকা


মারীন আজফার জারীফ, দ্বিতীয় শ্রেণি, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল, ঢাকা

তিলে তিলে তিলোত্তমা
আমার জেলা ভোলা
মায়া মমতা মাখা
মায়ের মুখের হাসি
সুখ দুঃখের মালা।
কত পথ হেঁটেছি
কত কী দেখেছি
কোথাও নেই এমন ভূমি,
খাল নদী ফুল ফল
তরুলতা শস্য শ্যামল
তোমার অধর চুমি।
মহিষের দধি ইলিশের বাহার
নারিকেল সুপারি ঠাসা,
পলিমাটির সরল মানুষ
মেহমানদারি নেশা।
উজাড় করে ঢেলে দেয়
হৃদয়ের ভালোবাসা।
ভোলার মানুষ স্বাধীনচেতা
মেধা প্রজ্ঞায় বলীয়ান,
পলিমাটির অধিকার আদায়ে
জীবন করবে দান।
এই তো আমার দেশ
আমার ভালোবাসা
সকল দুঃখ ভুলিয়ে দেয়
পুরায় মনের আশা।

অনেককাল আগের কথা। কাকেরা তখন কথা বলতে পারত। কিন্তু কাকেরা যেটি বলতে চায় তার ঠিক উল্টোটা বলত। যেমন কেউ যদি তার ক্ষতি করে তাহলে বলে ধন্যবাদ, আর সাহায্য করলে বকা দেয়। আবার কাক যদি কাউকে ধন্যবাদ দিতে চায় দিয়ে দেয় গালি, আর গালি দিতে গেলে ধন্যবাদ দেয়। কিন্তু অন্যরা তা বুঝত না। এরকমভাবে একদিন এক জাদুকরকে এক কাক গালি দিল; কিন্তু বলতে চেয়েছিল ধন্যবাদ। গালি শুনে জাদুকর রেগে গিয়ে কাকের ওপর জাদু করে কাকের কথা বলা কেড়ে নেয়। আর সেইদিন থেকে কাক শুধুই কা কা কা কা বলতে থাকে।

তোমাদের যদি বলি, কল্পনায় কোন দেশটায় যেতে চাও তুমি? রসগোল্লার দেশে? পিঠাপুলির দেশে? নাকি চকলেটের দেশে? সবাই যে হুড়মুড়িয়ে চকলেটের দেশেই যেতে চাইবে—এ হলফ করে বলতে পারি! কারণ কী, চকলেট মানে মজা, মজা আর মজা! চকলেটের সঙ্গে তুলনা করা যায় এমন কিছু আছে, আমার তো মনে হয় না। আমি চকলেটটা একটু বেশিই ভালোবাসি কিনা!
সে যাক গে। কিন্তু তোমরা কি ভেবেছো, এত মজার চকলেটটা আদতে কোথা থেকে আসে? হয়তো বলবে, চকলেটের মতোই মজার একটা ফ্যাক্টরি থেকে। ঠিক ‘উইলি ওয়ানকার চকলেট ফ্যাক্টরির মতো। যেই ফ্যাক্টরিতে থাকে চকলেটের এক আস্ত নদী! বাস্তবের চকলেট কিন্তু ওভাবে পাওয়া যায় না। কিভাবে পাওয়া যায় তবে? এসো বলছি
টাকার গাছে টাকা ফলে!
অবাক হচ্ছো বুঝি! সে আবার কেমন দেশ, যেখানে গাছে টাকা ফলে? আদতেই এমন এক দেশ ছিল, যেই দেশে গাছে গাছে টাকা ফলত। আর সেই টাকা দিয়ে মিলত খাবারদাবার, পোশাক-আশাক এমনকি সোনাদানার মতো দামি জিনিস!
সেই দেশটির নাম ছিল মেসোআমেরিকা। প্রাচীন আমেরিকাকে এই নামেই ডাকা হতো। সেই সময় আমেরিকাতে ছিল তিনটি জাতির বাস। তাদের বলা হতো ওলমেক, মায়া আর অ্যাজটেক। এই জাতির লোকেরা কিন্তু সোনা বা তামার পয়সা দিয়ে কেনাকাটা করত না। তার বদলে একরকম বিচি দিয়েই তারা কেনাকাটার কাজটা চালাত। মজার কথা হচ্ছে, সেই বীজটা আর কিছু নয়, আমাদের আজকের চকলেট বীজ!
সোনার চেয়ে দামি!
আদিকালে চকলেট ছিল সোনার চেয়েও দামি! মেসোআমেরিকার রাজ্যগুলোতে চকলেট বীজ দিয়েই হতো বড় বড় সব দেনদরবার। শুধু কি তাই, চকলেট বীজ ছিল মহাপবিত্র! দেবতার পূজায় চকলেট বীজ লাগতই লাগত! তা ছাড়া বড় বড় সব অনুষ্ঠানেও লাগত চকলেট।
সে সময় চকলেট খাওয়ারও ছিল আজব রীতি। চকলেটের বীজ গুঁড়া করে তার সঙ্গে মেশানো হতো ভুট্টার গুঁড়া, মরিচ আর পানি। কখনোসখনো দারুচিনির মতো ঝাঁঝালো গাছের ছালও মেশানো হতো। তাতে চকলেটের স্বাদটা হতো তেতো। তারা এই চকলেট শরবতটাকে বলত জকোলেট। মানে তেতো পানি! বুঝতেই পারছ, সেই জকোলেট থেকেই এসেছে আজকের চকোলেট শব্দটা!
কোথা থেকে আসে চকলেট?
তাহলে বুঝতেই পারলে, চকলেট আসে চকলেট বীজ থেকে। চকলেট বীজের আছে এক গালভরা নাম। ককোয়া বীন। চকলেট ধরে যে গাছে, তারও আছে এক মিষ্টি নাম। কোকোয়া ট্রি। কোকোয়া ট্রি ভালো জন্মায় আফ্রিকার দেশগুলোতে। এই কোকোয়া গাছেই ছোটখাটো নৌকার মতো এক ফল হয়। গাছের নামে ফলের নামও কোকোয়া ফল। সেই কোকোয়া ফল চিড়লে বের হয় ককোয়া বীন নামের কালো বীজ। সেই ককোয়া বীনকে ঠেসে রেখে গাজানো হয়। চকলেটের আসল স্বাদটা কিন্তু এই গাজানো থেকেই আসে! তারপর হয় শুকাতে। শুকানো হলে আগুনে ভাজতে হয়। খোলা ছাড়াতে হয়। এর পরই না বের হয় আমাদের প্রিয় খাবার চকলেট।
সোনা খুঁজতে চকলেট!
জানোই তো, প্রাচীন আমেরিকাটা ছিল আর সব মহাদেশ থেকে আলাদা। সহজে মানুষ ওখানটায় যেতে পারত না। গেলেও পারত না ফিরতে। তাই আমেরিকা মহাদেশের প্রায় সবটাই ছিল মানুষের অজানা।
একসময় হলো এক কাণ্ড! ইউরোপের মানুষ ভাবতে শুরু করল, আমেরিকার মাটির ভাঁজে ভাঁজে বোধহয় সোনা মেশানো। ব্যস, তল্পিতল্পা নিয়ে সবাই আমেরিকায় ছুটল। তোমরা কলম্বাসকে নিশ্চয়ই চেনো? তিনিও কিন্তু সোনার খোঁজ করতে গিয়েই আমেরিকায় হাজির হয়েছিলেন। তবে চমকে গিয়েছিলেন। হয়েছিলেন হতাশ। হবেনই তো! আদি আমেরিকান মানুষ সোনাদানার বদলে গাছের বীজ দিয়ে কেনাকাটা করে। কলম্বাস তেমনি এক বীজবোঝাই ক্যান আটক করেই অবাক বনে যান। আর বীজগুলোর নাম দিয়ে বসেন, ‘কাঠবাদামের মাসতুতো ভাই!’ বুঝতেই পারছ, সেই ‘কাঠবাদামের মাসতুতো ভাই’গুলো আর কিছু না, ছিল আদি ও আসল চকলেট বীজ!
চকলেট এলো ইউরোপে
প্রথম প্রথম ইউরোপীয়রা চললেট একদম দেখতে পারত না। কলম্বাস তো ব্যঙ্গ করে চকলেট বীজকে কাঠবাদামই বানিয়ে ছেড়েছিলেন। গাইলার্মো বেনজোনি নামক এক ইউরোপীয় পর্যটক চকলেটকে বলেছিলেন ‘শূকরের শরবত’!
১৫২৮ সালের কথা। হার্নান কর্টিস নামের এক ব্যক্তি মেসোআমেরিকায় গেলেন আর সব মানুষের মতো সোনা খুঁজতে। রীতিমতো সোনা না পেয়ে হলেন হতাশ। তবে দমে গেলেন না তিনি। হাজিরা দিলেন সেই সময়ের অ্যাজটেক সম্রাট মন্টেজুমার দরবারে। মন্টেজুমা সোনাদানা দিয়ে নয়, তাকে আদর করলেন এক পেয়ালা চকলেটের শরবত দিয়ে। হার্নান কর্টিস সেই শরবত খেলেন। আর চকলেটের মজায় গেলেন মজে। চকলেটের বীজ আস্তিনে করে নিয়ে এলেন তার দেশ স্পেনে। উপহার হিসেবে পেশ করলেন বলো তো কাকে? হুমম, নিজের রাজা, কিং চার্লসকে।
চকলেট হলো আরো মজার
রাজা চার্লসের রঁসু্ইঘরে গিয়ে চকলেটটা কিন্তু একদম বদলে গেল। রাজার পাচকরা চকলেটে মেশালো চিনি আর নানা জাতের মসলা। তাতে চকলেটের স্বাদটা লাফিয়ে বাড়ল। চকলেট হয়ে গেল অভিজাতদের পানীয়। তবে চতুর স্পেনিশরা সবটাই রাখল গোপন। চকলেটের স্বাদ আর কেউ পাক, মোটেই চাইল না। শেষমেশ এক রাজকীয় বিয়ে এই গোপনীয়তায় বাগড়া দিল। চকলেট ছড়িয়ে পড়ল সারা ইউরোপে!
সে ১৬১৫ সালের কথা। ফ্রান্সের রাজা ত্রয়োদশ লুই বিয়ে করলেন স্পেনের রাজকুমারী অ্যান অস্ট্রিয়াকে। বিয়ের ডালায় করে অ্যান ফ্রান্সে নিয়ে গেলেন চকলেট। ব্যস, ফ্রান্সের মানুষ চকলেটের মজাটা পেয়ে গেল। ফ্রান্সে গড়ে উঠল চকলেট হাউস। রসিক ফ্রেন্স হালুইকরেরা কিন্তু স্পেনিশদের মতো গোপন রাখল না ব্যাপারটা। তাদের হাত ধরেই ব্রিটেনে গড়ে উঠল চকলেট হাউস। মানে চকলেট ছড়িয়ে পড়ল আরো একধাপ সামনে।
চকলেট দিয়ে সেপাই তোষণ!
চকলেটভক্ত স্পেনিশদের হাত ধরেই এখনকার আমেরিকায় চকলেট ছড়িয়ে পড়ে। ১৬৪১ সালে স্পেনিশরা ফ্লোরিডায় নামেন এক জাহাজবোঝাই চকলেট নিয়ে। দেখতে দেখতে ১৬৮২ সালে বোস্টনে একটি চকলেট হাউসের পত্তন হয়। আর রাতারাতি আমেরিকার মানুষজন মেতে ওঠে চকলেটের স্বাদে। বড় ব্যবসায়ীরা পাল্লা দিয়ে চকলেট আনতে থাকেন এ দেশ সে দেশ থেকে।
১৭৭২ সালে আমেরিকায় বাধে যু্দ্ধ। সেপাইদের জন্য রেশন হিসেবে বরাদ্দ হয় চকলেট। শুধু কি তাই, খোদ বেতনটাও দেওয়া হয় চকলেট দিয়ে!
চকলেট হলো সস্তা যখন!
চকলেট বীজ থেকে চকলেট বের করে আনা, সে ছিল বেশ ঝক্কি-ঝামেলার কাজ। আর ছিল ভীষণ খরুচে। চকলেট বীজের ঝাড়াই মাড়াই করে ঠিকঠাক গুঁড়া করতে হতো, নাহলে চকলেটের স্বাদ যেত বিগড়ে। তাই চকলেটের স্বাদ নিতে পারত কেবল ধনীরাই। ১৮২৮ সালের আগ পর্যন্ত চকলেট ছিল একরকম ধনীদেরই খাবার।
১৮২৮ সালে কোয়েনরাড ভ্যান হুটেন নামে এক ভদ্রলোকের মাথায় খেলে যায় দারুণ এক বুদ্ধি। তিনি লবণ দিয়ে চকলেট গুঁড়া করার সহজ কায়দা রপ্ত করে ফেলেন! যে গুঁড়া সহজেই মিশে যেত পানি বা দুধে। ব্যস, চকলেট গুঁড়া করা ঝক্কি গেল কমে। আর চকলেটটা চলে এলো ধনী-গরিব সবার নাগালে।
দেখতে দেখতে তিনি একরকম জাঁতাও বানান। যেটা চকলেট থেকে চকলেট-বাটার আলাদা করতে পারত। সেই থেকে চকলেটও গেল বদলে। চকলেট তৈরি হতে লাগল নানা রং আর ধাঁচে।
নেসলে চকলেট বার
আগে চকলেট খাওয়া হতো যে রীতিতে, শুনলে তাজ্জব বনে যাবে। চকলেট খাওয়া হতো কফি বা শরবতের মতো করে। আধো নরম আধো তুলতুলে চকলেট যে হতে পারে, সে কারো জানাই ছিল না সেকালে।
১৮৪৭ সালের কথা। জে এস ফ্রাই অ্যান্ড সন্স নামে এক চকলেট কম্পানি চকলেট নিয়ে খাটাখাটি করেন। আর নরম ঢলঢলে চকলেটকে করে তোলেন শক্তপোক্ত ঢেলার মতো। তবে মজার ব্যাপার কি জানো, তখনো চকলেটে থাকত না দুধ। তাই চকলেট হতো খানিকটা খড়খড়ে।
১৮৭৬ সালে ড্যানিয়েল পিটারই প্রথম চকলেটে দুধ মেশান। কোকোয়া বাটার আর কোকোয়া পাউডারের সঙ্গে মিশিয়ে নেন শুকনা দুধের গুঁড়া। তৈরি হয় পৃথিবীর প্রথম মিল্ক চকলেট!
এরপরই ড্যানিয়েল পিটারের সঙ্গে দেখা হয় হেনরি নেসলের। দুই বন্ধু মিলে চকলেট ফ্যাক্টরি খুলে বসেন। নাম দেন নেসলে। আগের চকলেট ছিল ভারী শক্ত। খেতে হতো চুষে। নেসলে কম্পানিই প্রথম চকলেট কন্চ মেশিন আনে। যেই মেশিন চকলেটকে নরম তুলতুলে করে তোলে। আর ছড়িয়ে দেয় বিশ্বজুড়ে!
তথ্যসূত্র : হোয়াট অন আর্থ, হিস্ট্রি ডটকম