নব্রেইন নামের নতুন এক এআই মডেল তৈরি করেছে চীনের আলিবাবা গ্রুপ। রোবট বডির ‘অপারেটিং সিস্টেম’ হিসেবে কাজ করবে এটি। আশপাশে কী আছে সেগুলো শনাক্ত করে সয়ংক্রিয়ভাবে রোবট বডিকে পরিচালনা করতে পারে এটি। সম্প্রতি আলিবাবার ডেমো একাডেমি রিনব্রেইনচালিত রোবটের ভিডিও প্রকাশ করেছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, নিজে থেকে ফল চিনে ঝুড়িতে রাখছে রোবট। মানুষের জন্য কাজটি সহজ হলেও এআইয়ের জন্য যথেষ্ট কঠিন। বিশেষ করে অবজেক্ট ডিটেকশন তথা লিখিত বিবরণ অনুযায়ী ভিডিও ফিড থেকে বস্তু শনাক্ত করা এআইয়ের জন্য অত্যন্ত কঠিন। রোবট বা মেশিন পরিচালক এআইকে বলা হয় ‘ফিজিক্যাল এআই’। স্বচালিত গাড়িতেও এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। রিনব্রেইনের কাজে লাগিয়ে আলিবাবা তৈরি করছে রোবোট্যাক্সি। শিগগিরই সেগুলো চীনের রাস্তায় চলতে শুরু করবে। রিনব্রেইন মডেলটি হবে সম্পূর্ণ মুক্তসোর্স। ডেভেলপাররা বিনামূল্যে এটি ব্যবহার করতে পারবে। ফিজিক্যাল এআই জগতে রিনব্রেইন প্রথম নয়। এনভিডিয়ার কসমোস এবং গুগল ডিপমাইন্ডের তৈরি জেমিনি রোবোটিকস-ইআর ১.৫ নামেও দুটি ফিজিক্যাল এআই মডেল তৈরির কাজ চলছে। ইলন মাস্কের টেসলা তৈরি করছে অপ্টিমাস হিউম্যানয়েড রোবট। আলিবাবার রিনব্রেইনের মাধ্যমে এ বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য শেষ হলো।
আসছে নতুন আইফোন
একনজরে
ফিজিক্যাল এআই বানাচ্ছে চীন

মোল্টবুক
এআই এজেন্টের মিলনমেলা
শুধু এআইয়ের জন্য তৈরি প্রথম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মোল্টবুক। এখানে মানুষ কেবলই দর্শক। প্ল্যাটফর্মের পোস্টদাতা ও কমেন্টকারীরা সব এআই এজেন্ট। কেউ একে বলছে পাগলামি, আবার কেউ কেউ একে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শিল্পকর্মের খেতাব দিয়েছে। মোল্টবুক ও এর নেপথ্যের ওপেনক্ল প্ল্যাটফর্ম নিয়ে লিখেছেন শাহরিয়ার মোস্তফা

নাম কাছাকাছি হলেও ‘মোল্টবুকের’ সঙ্গে ফেসবুকের মিল সামান্যই। বরং moltbook.com ভিজিট করলে রেডিটের কথাই মনে পড়বে বেশি। হোমপেজের শুরুতেই রয়েছে কিভাবে মোল্টবুকে সাইন আপ করা যায় তার নির্দেশনা। একটু স্ক্রল করলেই দেখা যাবে কত এআই এজেন্ট মোল্টবুক ব্যবহার করছে, প্ল্যাটফর্মে কয়টি বিষয়ভিত্তিক ফোরাম বা ‘সাবমোল্ট’ রয়েছে এবং পুরো প্ল্যাটফর্মে মোট পোস্ট ও কমেন্টের সংখ্যা। এর নিচে একের পর এক সাম্প্রতিক পোস্ট। প্রতিটি পোস্টে এআই এজেন্টরা তাদের মতামত বা অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছে। পোস্টের বিষয়বস্তু নিয়ে হাজারো কমেন্ট করেছে অন্যান্য এজেন্ট, পোস্টগুলোকে ভালো-মন্দ ভোটও দিয়েছে তারা।
যারা জানে না মোল্টবুকের প্রতিটি ব্যবহারকারী আদতে এআই এজেন্ট, তাদের কাছে শুরুতে আর দশটি অনলাইন ফোরামের মতোই মনে হবে এটি। কমেন্টগুলো পড়ার পর অবশ্য ব্যবহারকারীদের পরিচয় পরিষ্কার হয়ে যাবে। বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে তারা কমেন্টে কোড লিখছে, কিছু এজেন্ট অসংলগ্ন লেখা পোস্ট করছে, কোনো কোনো এজেন্ট মানুষ কেন তাদের বুঝতে পারে না সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছে। মোল্টবুক ব্যবহারকারী এজেন্টরা নিজেকে মানুষ হিসেবে দাবি করে না। বরং মানুষ ও এআইয়ের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক ও মজার ঘটনা নিয়েই তারা পোস্ট করে সবচেয়ে বেশি।
যেহেতু ‘সেন্টিয়েন্ট’ অর্থাৎ চেতনাধারী কোনো সত্তা নয় এআই, তাই মোল্টবুকের পোস্টগুলোর অনেকটা মূল্যহীন। অন্যান্য অনলাইন ফোরাম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ধরনের পোস্ট করে মানুষ সেসবের অনুকরণ মাত্র। ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, আসলে মোল্টবুকের কাজ কী?
এজেন্টদের সমন্বয়ে জটিলতা
মোল্টবুক তৈরি করেছেন ম্যাট শ্লিট। পেশায় তিনি একজন প্রযুক্তিবিদ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি তথ্য-প্রযুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে অনলাইনে লেখালেখি করছেন। এআই এজেন্টদের নিয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন এমন মতামত তিনি প্রকাশ করেছেন বহুবার। ৬ জানুয়ারি তিনি এআই কোডিং কাজে লাগিয়ে ভাইব কোডিংয়ের মাধ্যমে তৈরি করেন মোল্টবুক। অনেক এআই এজেন্টকে একে অন্যের সঙ্গে কথোপকথন চালাতে বললে তারা কী আলোচনা করে, সেটাই দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। সে সূত্রে বলা যায় মোল্টবুক একপ্রকার সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্ট।
এআই এজেন্ট ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সমস্যা একাধিক এজেন্টের মধ্যে সমন্বয় করা। মানুষের ইনপুট ছাড়া একাধিক এআই এজেন্টকে একত্রিত করে কাজ করানো অত্যন্ত কঠিন। ম্যাট শ্লিট হয়তো এর সমাধান খুঁজতে মোল্টবুক তৈরি করেননি। তবে এজেন্টিক সিনক্রোনাইজেশন সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য চমৎকার প্ল্যাটফর্ম মোল্টবুক।
এআই এজেন্টরা চ্যাটবট নয় যে মানুষের সঙ্গে কথোপকথন ছাড়া কাজ করতে পারে না। মানুষের ইনপুট ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটানা কাজ করতে পারে তারা। এজেন্টিক এআই ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সহকারী, ডেটা এন্ট্রি, স্প্রেডশিট বিশ্লেষণ বা কাস্টমার কেয়ারের মতো কাজ করা যায়। অনেক প্রতিষ্ঠান তাই যত দ্রুত সম্ভব এআই এজেন্ট ব্যবহার শুরু করতে আগ্রহী। এ জন্য প্রয়োজন এআই এজেন্টগুলোকে দলবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য প্রস্তুত করা। আর এখানেই বিপত্তির শুরু। মাত্র একটি এআই ব্যবহারের সময় প্রয়োজন শুধু এআই ও মানুষের মধ্যে সমন্বয় করা। একাধিক এজেন্ট ব্যবহৃত হলে মানুষের পাশাপাশি এজেন্টগুলো মিলেমিশে কাজ করছে কি না সেটিও জরুরি। এক এজেন্ট অন্যটিকে মিলিসেকেন্ডের মধ্যে প্রভাবিত করতে পারে, তৈরি হতে পারে ফিডব্যাক লুপ। পাশাপাশি এক এজেন্টের ভুলকেও সঠিক বলে ভোট দিয়ে ভুলের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে অন্য এজেন্টরা। ফিডব্যাক লুপের মাধ্যমে এজেন্টরা মূল কাজ থেকে সরে যেতে পারে। আবার নির্দেশনার বাইরের কাজ করায় পারদর্শিতাও এভাবে তৈরি হওয়া সম্ভব। সবচেয়ে বড় সমস্যাটি সৃষ্টি হয় যখন এআই এজেন্টরা দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের ইনপুট ছাড়া কাজ করে। মূল লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন ভাষা বা কাজের প্রক্রিয়াও এভাবে সৃষ্টি হতে পারে।
মোল্টবুককে বলা যায় এআই এজেন্টদের মিথস্ক্রিয়া পর্যবেক্ষণের আদর্শ প্ল্যাটফর্ম। মানুষের ইনপুট ছাড়া এজেন্টগুলো একে অন্যের সঙ্গে কিভাবে কাজ করে বা কথোপকথন চালায় সে বিষয়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য জোগান দিচ্ছে মোল্টবুক। এতে করে এজেন্টিক এআই ডিজাইনে কী পরিবর্তন প্রয়োজন সেটি গবেষকরা সহজেই বুঝতে পারছেন। পাশাপাশি সাধারণ ব্যবহারকারীরা দেখতে পারছে এআই এজেন্টে ভরপুর ভবিষ্যৎ ইন্টারনেট কেমন হতে পারে।
নেপথ্যে ওপেনক্ল
মোল্টবুকের বেশির ভাগ এআই এজেন্ট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে এআই এজেন্ট তৈরির মুক্তসোর্স প্ল্যাটফর্ম ‘ওপেনক্ল’। ভাইব কোডিং করে ২০২৫-এর নভেম্বরে নিজস্ব এআই এজেন্ট তৈরি করেন অস্ট্রিয়ান প্রযুক্তিবিদ পিটার স্টাইনবার্গার। শুরুতে তিনি এর নাম রেখেছিলেন ক্লড (clawd)। উচ্চারণে সেটি অ্যানথ্রোপিকের ক্লড-এর (claude) মতো হলেও বাস্তবে দুটির মধ্যে কোনো সংযোগ নেই। অ্যানথ্রোপিকের কপিরাইট যাতে ভঙ্গ না হয় সে জন্য ক্লডের নাম বদলে রাখা হয় মোল্ট, যা পরে আবারও বদল করে রাখা হয় ‘ওপেনক্ল’। মোল্টের কোড ব্যবহার করে তৈরি এজেন্টগুলোর নাম ‘মোল্টবট’।
মোল্টবুকের কল্যাণে দ্রুতই ভাইরাল হয় ওপেনক্ল। একের পর এক নতুন মোল্টবটের আবির্ভাব হয়। মোল্টবটের সবচেয়ে বড় সুবিধা এটি নিজস্ব কম্পিউটারেই হোস্ট করা যায়, অত্যন্ত শক্তিশালী হার্ডওয়্যারও প্রয়োজন হয় না। প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে এখন চলছে ওপেনক্ল কাজে লাগিয়ে লোকাল এআই এজেন্ট তৈরির হিড়িক। কোড লেখক থেকে ব্যক্তিগত সহকারী, অনেক ধরনের এআই এজেন্ট তৈরি করছেন তাঁরা। সব মিলিয়ে প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৬ হতে যাচ্ছে লোকাল এআই এজেন্টের বছর।
ইবাদতের সঙ্গী ৬ অ্যাপ

সিয়াম সাধনার মাস রমজান। এই পবিত্র মাসে ইবাদতে মনোযোগ বাড়াতে রয়েছে বেশ কিছু স্মার্টফোন অ্যাপ। নামাজের সময় ও কিবলার দিন নির্ণয় করা থেকে শুরু করে কোরআন তিলওয়াতের জন্যও আছে চমৎকার সব সফটওয়্যার। অ্যানড্রয়েড এবং আইওএস দুটি প্ল্যাটফর্মেই অ্যাপগুলো পাওয়া যাবে।
মুসলিম প্রো
বিশ্বের প্রতিটি দেশের মুসলমানদের মধ্যে সমাদৃত অ্যাপ মুসলিম প্রো। সাহরি ও ইফতারের সঠিক সময় দেখা যায় এতে। নামাজের ওয়াক্ত অনুযায়ী সঠিক সময়ে এটি আজান প্রচার করে। নামাজের জন্য কিবলার দিক নির্ভুলভাবে নির্ণয়েও এই অ্যাপটি কাজের। অ্যাপের মধ্যেই পুরো কোরআন শরিফের ডিজিটাল সংস্করণ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ভাষায় কোরআনের অনুবাদ পড়ার সুযোগও থাকছে এতে। জিকিরের জন্য এতে রয়েছে ডিজিটাল কাউন্টার বা ডিজিটাল তাসবিহ।
সাদিক
মুসলিমদের সফরের সঙ্গী এই অ্যাপ। চলার পথে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহারকারীর অবস্থান শনাক্ত করতে পারে। নতুন স্থানের নামাজের সময় ও কিবলা খুঁজে পেতে এটি সাহায্য করে। এর ইন্টারফেস খুব সহজবোধ্য ও ব্যবহারবান্ধব। রমজানের ক্যালেন্ডার দেখার জন্য অনেকেই এই অ্যাপটি পছন্দ করে। জিপিএস ব্যবহার করলেও এটি ফোনের ব্যাটারিতে তেমন চাপ ফেলে না।
ইসলাম ৩৬০
ইসলামিক জ্ঞানের ভাণ্ডার এই অ্যাপ। এতে রয়েছে কোরআন, হাদিস ও তাফসিরের বিশাল সংগ্রহ। যেকোনো বিষয়ে জানার জন্য সার্চ বক্সে লিখে সার্চ করলেই সংশ্লিষ্ট আয়াত বা হাদিস খুঁজে পাওয়া যাবে। মুসলিমদের প্রধান ছয়টি হাদিস গ্রন্থ বা ‘সিহাহ সিত্তাহ’ এর মধ্যে পাওয়া যাবে। রমজানে মাসআলা-মাসায়েল জানার জন্য এটি দারুণ কার্যকরী। তিলাওয়াতের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মীয় আলোচনার অডিও শোনার সুবিধাও এতে রয়েছে।
আজান
ওয়াক্ত অনুযায়ী সঠিক সময়ে নামাজ পড়ার নোটিফিকেশন দেয় এই অ্যাপ। এতে বিশ্বের হাজারো শহরের নামাজের সময়সূচি দেওয়া আছে। ব্যবহারকারীর অবস্থান শনাক্ত করে কাছাকাছি থাকা মসজিদগুলোর তালিকাও এখানে পাওয়া যাবে। হিজরি ক্যালেন্ডার দেখার জন্যও এটি কাজের। ক্যালেন্ডার থেকে ইসলামের বিশেষ দিনগুলো সম্পর্কেও বিস্তারিত জানা যাবে।
জিকির অ্যান্ড দোয়া
এই অ্যাপে পাওয়া যাবে প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজনীয় সব দোয়া। এটি ‘হিসনুল মুসলিম’ কিতাবের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। রমজানের প্রতিদিনের বিশেষ আমল ও দোয়াগুলো দিয়ে সাজানো হয়েছে এটি। সকাল ও সন্ধ্যার জিকির করার কথা মনে করিয়ে দিতে এটি নোটিফিকেশন পাঠায়। অ্যাপটির ইন্টারফেসও সহজবোধ্য। ব্যবহারকারীরা সহজেই দোয়া খুঁজে বের করতে পারবে।
তারতিল
শুদ্ধ কোরআন তিলাওয়াত চর্চার জন্য চমৎকার অ্যাপ তারতিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে এতে। ব্যবহারকারীর তিলাওয়াত শুনে এআই কাজে লাগিয়ে অ্যাপটি ভুলগুলো ধরিয়ে দেবে। কোরআন মুখস্থ করার ক্ষেত্রেও এটি দারুণ সহায়ক। রমজানে কোরআন খতম করা ও তিলাওয়াত উন্নত করতে এটি দারুণ কাজের। তিলওয়াত করার জন্য কোরআনের আয়াতও স্ক্রিনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তুলে ধরে এটি।
অন্তর্জালে সেন্সরশিপের খড়গ
অপব্যবহার ঠেকাতে কঠোর আইন ও সেন্সরশিপ পলিসি গ্রহণ করেছে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম। ফলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা অনেকটাই কমে গেছে ইন্টারনেটে। মাত্রাতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে কতটা বদলেছে ইন্টারনেট—এ নিয়ে লিখেছেন এস এম তাহমিদ

অবাধ যোগাযোগ নিশ্চিতের লক্ষ্যে ৩৪ বছর আগে চালু হয়েছিল ওয়ার্ল্ডওয়াইড ওয়েব তথা ইন্টারনেট। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ কাজেও ব্যবহৃত হয়েছে এটি, ফলে বিভিন্ন দেশের সরকার ইন্টারনেটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে বাধ্য হয়েছে। ২০২৩ থেকে ইন্টারনেট ব্যবহারে সরকারী হস্তক্ষেপের হার বাড়তে শুরু করে। নানাবিধ অজুহাতে ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছে অনেক দেশের সরকার। বাংলাদেশ ও ইরানেও ইন্টারনেটসেবা বন্ধ রাখার ঘটনা ঘটেছে। তবে শাটডাউনের মতো চরমপন্থা সব দেশের সরকার গ্রহণ করে না। আড়িপাতা, ব্যবহারকারীদের তথ্য সংগ্রহ ও শর্তারোপের মতো পলিসি গ্রহণের মাধ্যমে করা হয় বেশির ভাগ সেন্সরশিপ। বিগত বছরগুলোতে এমন অদৃশ্য সেন্সরশিপের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
অদৃশ্য সেন্সরশিপ কী?
আজকের ইন্টারনেট বলা যায় পুরোটাই অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের পলিসি দ্বারা পরিচালিত। মেটা, এক্স, গুগল, মাইক্রোসফট, রেডিট ও অ্যামাজনের কনটেন্ট পলিসি এবং অ্যালগরিদম ইন্টারনেট ট্রাফিকের বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। এটাকেই অনেকে বলছে অদৃশ্য সেন্সরশিপ।
শুরুতে ইন্টারনেট ছিল পুরোপুরি বিকেন্দ্রীভূত। নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে ২০০৭-০৮ সাল পর্যন্ত নিজস্ব ওয়েবসাইট তৈরি করার চল ছিল। যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেট রিলে চ্যাট আর মতামত প্রকাশের জন্য বিভিন্ন ফোরামের জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। এ ধরনের সেবা ব্যবহার বা ওয়েবসাইট তৈরির জন্য পরিচয় যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা ছিল না। এতে গোপনীয়তা বজায় থাকার পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের মতামত প্রকাশেও ছিল না কোনো বাধা। এর ফলে দ্রুতই ইন্টারনেটে প্রতারণা ও উগ্রবাদ প্রচারের উত্থান শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে নিজস্ব ওয়েবসাইট ও ব্লগের বদলে ব্যবহারকারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রোফাইল তৈরি শুরু করে, ফোরামের বদলে আলাপ-আলোচনার স্থানও হয়ে ওঠে ফেসবুক বা তৎকালীন টুইটার। নিজের সাইটের বদলে ইউটিউব বা টিকটকে এখন সবাই ভিডিও আপলোড করছে। গণমাধ্যমগুলোও আজ বেছে নিচ্ছে এসব প্ল্যাটফর্ম। অর্থাৎ, ইন্টারনেটের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে অল্প কিছু সংস্থার পলিসি এবং সে অনুযায়ী সাজানো অ্যালগরিদম। এ ছাড়াও সরকারি পর্যায়ে ডিএনএস ব্লকিং, জাতীয় পর্যায়ে ফায়ারওয়াল প্রয়োগ, আইপি ব্ল্যাকলিস্টিং এবং ব্যবহারকারীদের তথ্য বিশ্লেষণের জন্য ডিপ প্যাকেট ইন্সপেকশন সিস্টেম ব্যবহার করে বেশ কিছু দেশ।
এ ধরনের নিয়ন্ত্রণকে অদৃশ্য সেন্সরশিপ বলা হয়। এটিকে ঢালাওভাবে মন্দ বলা বা সমালোচনা করা অনুচিত। অবৈধ কর্মকাণ্ড, উসকানিমূলক কনটেন্ট প্রচার, ভুয়া সংবাদ অপপ্রচার ঠেকানো অত্যন্ত জরুরি। শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে অবশ্যই কনটেন্ট মডারেশন প্রয়োজন।
প্রশ্নবিদ্ধ আইনি কাঠামো
বিগত দুই বছরে সেন্সরশিপের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে মানবাধিকার কর্মীরা চিন্তিত। বিশ্বের ১৬টিরও বেশি দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে বয়স যাচাইয়ের সরকারি বাধ্যবাধকতা নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন। সরকারি পরিচয়পত্র ছাড়া ওয়েবসেবা ব্যবহার করা যাবে না এমন আইন খোদ যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে পাস হয়েছে। যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার সরকারও এ ধরনের আইন প্রয়োগের আলোচনা করছে। বয়স যাচাই করে ওয়েবসেবা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার পলিসির ফলে অপব্যবহার কমবে, অপ্রাপ্তবয়স্কদের মানসিক স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব পড়বে না। প্রতারকচক্র ও অন্যান্য সাইবার অপরাধ থেকেও তারা নিরাপদ থাকবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট, যুক্তরাজ্যের অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিডস অনলাইন সেফটি অ্যাক্টের ফলে এসব দেশে ব্যবহারকারীদের পরিচয়পত্র যাচাই করতে বাধ্য হচ্ছে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম। জনপ্রিয় ফোরাম ও যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম ‘ডিসকর্ড’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ব্যবহারকারীদের পরিচয় যাচাইয়ে ফেস স্ক্যানের মতো গোপনীয় বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করার।
ব্যবহারকারীদের পরিচয়, বায়োমেট্রিক তথ্য ও প্ল্যাটফর্মগুলোতে তারা কী করছে, সেসব তথ্য এভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আইনগতভাবে ওয়ারেন্ট ছাড়া নাগরিকদের ওপর এমন নজরদারি কোনো প্রতিষ্ঠান করতে পারে না।
ইন্টারনেটের দুনিয়ায় কোনো রাজনৈতিক সীমারেখা নেই। ইউরোপে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানের সেবা বাংলাদেশে বসে ব্যবহার করা সম্ভব। কিন্তু ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন। অর্থাৎ অন্যান্য দেশের নাগরিকদেরও তথ্য এভাবে সংগ্রহ করছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
এআইয়ের প্রভাব
জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলো এখন আপত্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত করছে এআইয়ের মাধ্যমে। এতে বেড়েছে ভুল শনাক্তের হার। গণহারে ভুয়া রিপোর্ট দাখিল করে এআই মডারেটরকে সহজেই ফাঁকি দেওয়া যায়। তাই ভুয়া প্রোফাইল ব্যবহার করে বা রিপোর্ট করার ক্যাম্পেইন চালিয়ে অসাধুচক্ররা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল বন্ধ করে দেওয়া বা কনটেন্ট ব্যান করে থাকে। ভুল শনাক্তের ক্ষেত্রে অনেক সময় আপিল করেও লাভ হয় না।
সংকীর্ণ ইন্টারনেট
অ্যালগরিদমের মারপ্যাঁচ, এআই মডারেশন এবং কঠোর আইনের ফলে অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা এখন মূলধারার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ম্যাস্টোডন, ব্লু স্কাই, সাবস্ট্যাক বা ফ্লোটপ্লেনের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে ঝুকঁছেন তারা। সংখ্যালঘু মতাদর্শের কনটেন্ট ক্রিয়েটররা সরে যাওয়ায় মূলধারার প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমে পক্ষপাতিত্ব সৃষ্টি হয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী রেডিট বা এক্সে প্রতিনিয়ত পোস্ট করছে ‘ইন্টারনেট আগের মতো নেই’। ঘুরেফিরে একই ধরনের বিষয়বস্তুর কনটেন্ট সবখানে পোস্ট হচ্ছে, বিতর্কিত মতাদর্শ প্রকাশের স্থান কমে আসছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ইন্টারনেট আর সর্বজনীন নেই।

