রমজান একটি বিদ্যালয়ের মতো। মুমিন রমজান মাসে সেসব আমলের অনুশীলন করে, যা তাকে সারা বছর পথ দেখায়।
—আবদুল্লাহ বিন রাবাহ (রহ.)

রমজান একটি বিদ্যালয়ের মতো। মুমিন রমজান মাসে সেসব আমলের অনুশীলন করে, যা তাকে সারা বছর পথ দেখায়।
—আবদুল্লাহ বিন রাবাহ (রহ.)

দোয়ায়ে কুনুত না পড়ে রুকুতে গিয়ে আবার দাঁড়ানো
প্রশ্ন : দোয়ায়ে কুনুত না পড়ে রুকুতে চলে গেলে আবার দোয়ায়ে কুনুত পড়ার জন্য দাঁড়ানোর বিধান কী?
রিয়াজ, ময়মনসিংহ
উত্তর : দোয়ায়ে কুনুত না পড়ে রুকুতে চলে গেলে আবার দোয়ায়ে কুনুত পড়ার জন্য দাঁড়াবে না। যদি দাঁড়িয়ে যায় এবং কুনুত পড়ে, তাহলে দ্বিতীয়বার রুকু না করে সিজদায় চলে যাবে এবং শেষে সিজদায়ে সাহু করে নেবে।
(রদ্দুল মুহতার : ২/৮১, আহসানুল ফাতাওয়া : ৪/২৩, ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত : ৪/৪৬৬)

রমজান শুধু একটি মাস নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মহাসুযোগ। এই মাস কিভাবে সর্বোত্তমভাবে কাটাতে হয়—তার জীবন্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মহানবী মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর রমজানের দিনলিপি ছিল সুশৃঙ্খল, ভারসাম্যপূর্ণ এবং গভীর আধ্যাত্মিকতায় ভরপুর। ইবাদত, পারিবারিক দায়িত্ব, সমাজসেবা ও আত্মসংযম—সবকিছুর অপূর্ব সমন্বয় ছিল তাঁর জীবনচর্যায়।
সাহরি : বরকতময় সূচনা
রমজানে তাঁর দিন শুরু হতো সাহরির মাধ্যমে। তিনি ফজরের অল্প কিছুক্ষণ আগে সাহরি গ্রহণ করতেন। কখনো স্ত্রীদের সঙ্গে, কখনো সাহাবিদের সঙ্গে বসে সামান্য আহার করতেন—কয়েকটি খেজুর কিংবা অল্প খাবার ও পানি। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা সাহরি খাও; কারণ সাহরিতে বরকত আছে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯২৩)
দিনের বেলার কার্যক্রম
রমজানের দিনে তিনি মসজিদে গিয়ে ফরজ নামাজ আদায় করতেন এবং সাহাবিদের ইমামতি করতেন। পাশাপাশি ঘরেও তিনি ছিলেন একজন দায়িত্বশীল মানুষ। বাড়িতে তিনি তাঁর স্ত্রীদের ঘরকন্নার কাজে সাহায্য করতেন। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘তিনি ঘরের কাজে সাহায্য করতেন; আর নামাজের সময় হলে মসজিদে যেতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৩৬৩)
বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি নিজের কাপড় সেলাই করতেন, ছাগলের দুধ দোহন করতেন অর্থাৎ পারিবারিক কাজকে অবহেলা করতেন না। এতে প্রমাণিত হয়, রমজানের ইবাদত মানে সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়, বরং দায়িত্ব ও ইবাদতের সুন্দর ভারসাম্য রক্ষা করাই রমজানের মূল শিক্ষা।
ইফতার
মাগরিবের আগে তিনি জিকিরে মশগুল থাকতেন। সময় হলে খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করতেন; খেজুর না থাকলে পানি দিয়ে রোজা ভাঙতেন। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) পাকা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন; তা না থাকলে শুকনা খেজুর, তাও না থাকলে কয়েক চুমুক পানি।
(সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৫৬)
ইফতারের এই সরলতা আমাদের ভোগবিলাস থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেয়। ইফতারের পর তিনি মাগরিবের নামাজ আদায় করতেন এবং পরে বাড়িতে সুন্নত নামাজ পড়তেন।
এশা ও তারাবি
এশার নামাজের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রথমে বাড়িতে সুন্নত নামাজ আদায় করতেন, এরপর মসজিদে গিয়ে জামাতে ইমামতি করতেন। তিনি টানা তিন দিন মসজিদে নববীতে জামাতের সঙ্গে তারাবি নামাজ পড়েছিলেন, কিন্তু পরে তা বন্ধ করে দেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল যে এটি উম্মতের জন্য ফরজ হয়ে যেতে পারে এবং তা পালন করা তাদের জন্য কষ্টকর হবে। তাই তিনি বাড়িতেই তারাবি নামাজ পড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পরবর্তীকালে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) সাহাবিদের এক ইমামের পেছনে তারাবি আদায়ের ব্যবস্থা করেন।
রাতের ইবাদত
রমজানের রাত ছিল তাঁর ইবাদতের সময়। দীর্ঘ কিয়ামুল লাইল, গভীর তিলাওয়াত ও অশ্রুসিক্ত দোয়া—এসব ছিল তাঁর রাতের সঙ্গী। হাদিস থেকে জানা যায়, রমজানের রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বাড়িতে দীর্ঘ সময় নামাজে কাটাতেন। বিতর নামাজের আগে তিনি অল্প সময়ের জন্য ঘুমাতেন, তারপর জেগে উঠে বিতর আদায় করতেন। তাঁর লক্ষ্য থাকত বিতর নামাজ যেন রাতের শেষ নামাজ হয়।
এ ছাড়া তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে রাত জাগে (কিয়াম করে), তার আগের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি, হাদিস : ২০০৯)
কোরআন তিলাওয়াত ও দানশীলতা
রমজান হলো কোরআনের মাস। এই মাসেই পবিত্র কোরআন নাজিল শুরু হয়। তাই রমজান মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) পবিত্র কোরআনের পেছনে অধিক সময় ব্যয় করতেন। তখন পর্যন্ত কোরআনের যেটুকু অংশ নাজিল হয়েছিল, তার পুরোটাই তিনি তিলাওয়াত করতেন। জিবরাইল (আ.) প্রতি রমজানে এসে তাঁর সঙ্গে কোরআন দাওর করতেন।
এ ছাড়া রমজানে তিনি অত্যন্ত দানশীল হয়ে উঠতেন। এমনিতেও দান-সদকা ছিল তাঁর চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু রমজানে তা বহুগুণ বেড়ে যেত। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রমজান মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দানশীলতা প্রবাহিত বাতাসের মতো দ্রুত সবার কাছে পৌঁছে যেত।
(বুখারি, হাদিস : ৬)
শেষ দশক
রমজানের শেষ ১০ দিনে তিনি ইবাদতের তীব্রতা আরো বাড়িয়ে দিতেন। ইতিকাফ করতেন এবং পরিবারকেও জাগিয়ে তুলতেন। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘শেষ ১০ দিন এলে তিনি কোমর বেঁধে ইবাদতে লেগে যেতেন, রাত জাগতেন এবং পরিবারকে জাগাতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ২০২৪)
এ ছাড়া লাইলাতুল কদরের সন্ধানে তিনি অধিক জিকির ও দোয়ায় মগ্ন থাকতেন। তিনি লাইলাতুল কদরে এই দোয়া পড়তে বলে গেছেন—‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি।’
(হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব, আমাকে ক্ষমা করুন।)

রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করানো অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইফতার করানোর বিশেষ ফজিলত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে; অথচ রোজাদারের সওয়াব থেকে কোনো অংশ কমানো হবে না।’
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৮০৭)
একটি খেজুর, এক গ্লাস পানি বা সামান্য খাবার দিয়েও একজন মুমিন রোজার সমপরিমাণ সওয়াব অর্জন করতে পারে। সামর্থ্য কম হলেও এই আমল থেকে বঞ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। এখানে খুব সুন্দর করে প্রমাণিত হয়েছে যে ইফতার করানো শুধু দান নয়, এটি আল্লাহর কাছে প্রিয় একটি বিশেষ ইবাদত। তাই মুসলমান মাত্রই চেষ্টা করে রোজাদার ব্যক্তির জন্য সামান্য হলেও ইফতারের আয়োজন করতে।
সারা বিশ্বের মুসলিম সমাজে সম্মিলিত ও গণ-ইফতারের ধারণা এখান থেকেই এসেছে। এই ক্ষেত্রে এগিয়ে মিসরের মুসলমানরা। সড়কে গণ-ইফতারের আয়োজনে তারা অন্য সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। মিসরীয়রা খুবই আনন্দ ও উৎসাহের সঙ্গে গণ-ইফতারের আয়োজন করে থাকে।
মিসরীয়দের ভাষায় গণ-ইফতারকে ‘মায়িদাতুর রহমান’ বা আল্লাহর দস্তরখান বলে। ইংরেজিতে বলা হয় ইফতার ব্যাংকুয়েট। মিসরের প্রধান প্রধান শহরে রমজানের প্রতিদিন উন্মুক্ত ইফতারের আয়োজন দেখা যায়। স্থানীয় মুসলমান ও ব্যবসায়ীরা পথচারীদের জন্য ইফতারের আয়োজন করে। অনেকে নিজের জন্য নিয়ে আসা ইফতার অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খায়। পথচারীদের তারা নিজেদের ইফতারের দস্তরখানে আমন্ত্রণ জানায়।
প্রতিবছর মিসরের রমজানের নির্ধারিত দিনে কায়রো ও আলেকজান্দ্রিয়ার মতো বড় বড় শহরে বিরাট ইফতারের আয়োজন করা হয়। এতে অসংখ্য মানুষ অংশ নিয়ে থাকে। যেমন—গত বছর ১৫ রমজান কায়রোতে ইফতার ব্যাংকুয়েটের আয়োজন করা হয়। যাতে ৭০০ টেবিল বসানো হয় এবং ৩০ হাজার মানুষ অংশ নেয়। আয়োজন সম্পন্ন করতে কাজ করে চার শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী। বিশাল এই আয়োজনে প্রত্যেক এলাকার মানুষ প্রস্তুত খাবার সরবরাহে সহযোগিতা করে। মিসরের এই গণ-ইফতার সামাজিক সম্প্রীতির বড় নিদর্শন হয়ে উঠেছে। এতে সব শ্রেণির মানুষ, এমনকি অমুসলিম পথচারীরাও অংশ নিয়ে থাকে।
সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ডটকম
ও ইজিপ্ট টুডে ডটকম